Chapter 2

তেলেনাপোতা আবিষ্কার - প্রেমেন্দ্র মিত্র

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর


প্রশ্নঃ ১ 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। 


উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।


প্রশ্নঃ ২ তেলেনাপোতা যাওয়ার কারণ কী? একে লেখক 'আবিষ্কার' বলেছেন কেন?


উত্তরঃ তেলেনাপোতা যাওয়ার কারণ: বাংলা কথাসাহিত্যের বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' নামক ছোটোগল্পে কথক মহানগরী থেকে তিরিশ মাইল দূরে তেলেনাপোতায় এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। চারদিক গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন, চেতনালোকের শেষপ্রান্তে এই তেলেনাপোতার অবস্থান। নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে যদি হঠাৎ ছুটি পাওয়া যায় এবং কেউ যদি প্ররোচনা দেয় যে, কোনো এক আশ্চর্য সরোবরে পৃথিবীর সরলতম মাছেরা জলজীবনের প্রথম বড়শিতে বিদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুলভাবে অপেক্ষারত তাহলে পুঁটি ছাড়া অন্য কোনো মাছ ধরার অভিজ্ঞতা নেই- এমন ব্যক্তি তেলেনাপোতায় যেতে পারেন। প্রতিমুহূর্তে বিস্ময়ে আবিষ্ট হতে হতে তিনি কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যে ঘেরা তেলেনাপোতায় উপস্থিত হবেন।


আবিষ্কার বলার কারণ: 'আবিষ্কার' শব্দটিকে ইংরেজি আভিধানিক অর্থ অনুযায়ী দু-ভাবে প্রকাশ করা যায়-


প্রথমত, Discovery অর্থাৎ যার অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল কিন্তু হঠাৎই তার সন্ধান পাওয়া গেল। দ্বিতীয়ত, Invention অর্থাৎ যা সদ্য-আবিষ্কৃত, আবিষ্কারের পূর্বে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।


এই সূত্র ধরে বলা যায়, 'তেলেনাপোতা' নামে বাস্তবে কোনো গ্রাম নেই। আবার বাংলাদেশের বহু গ্রামই তেলেনাপোতার মতো- রসিক সহৃদয় ব্যক্তি তার সন্ধান পায়। কথক সেই মানসিকতা থেকে তেলেনাপোতা খুঁজে পান। 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে লেখক তেলেনাপোতার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান উল্লেখ করেননি। শহর থেকে তিরিশ মাইল দূরে এই গ্রাম যেন এক কালো অন্ধকারের অভেদ্য দেয়াল দিয়ে চেতনালোক থেকে আলাদা হয়ে যায়। তেলেনাপোতার চরিত্রসমূহ, তাদের জীবন কিংবা পারিপার্শ্বিক আবহ অনুভূতিহীন, কুয়াশাময়। তাই তেলেনাপোতায় পৌঁছে মনে হয়, যেন জীবন্ত পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে এক কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতিলোকে এসে পড়েছেন। তেলেনাপোতা থেকে ফিরে এসেও মনে হয়, যেন তেলেনাপোতার অস্তিত্ব অস্ত যাওয়া তারার মতো ঝাপসা। লেখক তেলেনাপোতাকে চেতন এবং অবচেতনলোকের মধ্যবর্তী স্তরে 'ঝাপসা একটা স্বপ্ন'-এর মতো উপস্থাপন করেন। গল্পের কাঠামোতেও পাঠক তাই মূল গল্পবস্তু অনুসন্ধান করেন এবং তেলেনাপোতার কাহিনির মধ্যে পাঠক সেই 'আবিষ্কার'-এর স্বাদ খুঁজে পান। লেখক পাঠকের চেতনাক্রিয়ার এই দিকটিকে গুরুত্ব দিয়ে 'আবিষ্কার' শব্দটি ব্যবহার করেন।


প্রশ্নঃ ৩ "হঠাৎ একদিন তেলেনাপোতা আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন।" কোন্ পরিস্থিতিতে এমনটি সম্ভব বলে লেখক মনে করেছেন? অথবা, তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে কী কী শর্ত পালন করতে হবে? 


উত্তরঃ তেলেনাপোতা আবিষ্কারের শর্তসমূহ: বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে লেখক তেলেনাপোতা আবিষ্কারের এক বিশেষ পন্থার কথা ব্যক্ত করেছেন। কাজেকর্মে হাঁফিয়ে উঠে শহরজীবনের ব্যস্ততা থেকে যদি মুক্তির অবকাশ পাওয়া যায়, যদি দু-দিনের ছুটি পাওয়া যায় তবে শনি বা মঙ্গলবার তেলেনাপোতায় যাত্রার একটা সুযোগ হতে পারে। আবার যদি কেউ হঠাৎ এসে প্ররোচনা দেয় যে, তেলেনাপোতার এক আশ্চর্য সরোবরে পৃথিবীর সরলতম মাছেরা তাদের জলজীবনের প্রথম বড়শিতে বিদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রত, তাহলে তেলেনাপোতা আবিষ্কারের একটি অছিলা পাওয়া যেতে পারে। আবার, ইতিপূর্বে যদি পুঁটি ছাড়া অন্য কোনো মাছ ধরার সুযোগ না হয়ে থাকে তাহলে হঠাৎ কোনো একদিন তেলেনাপোতা আবিষ্কার অভিযানে যাওয়া যায়। অত্যন্ত কষ্টকল্পিত পথে ভাদ্র মাসের বিকেলবেলায় পড়ন্ত রোদে গরমে-ঘামে-ধুলোয় চটচটে শরীর নিয়ে জিনিসে-মানুষে ঠাসাঠাসি বাসে রাস্তার ঝাঁকানি এবং মানুষের গুঁতোয় ক্লান্ত হয়ে ঘণ্টা দুয়েক যাত্রা করে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে। সেই রাস্তার চারদিকে কেবল ঘন জঙ্গল আর একটা নালা চোখে পড়বে। সেই নালার জমা জল থেকে উঠে আসা কুণ্ডলীকৃত মশকবাহিনীর অত্যাচার এবং চারদিকের এই রহস্যময় পরিবেশই তেলেনাপোতার অন্দরমহলে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাবে।


প্রশ্নঃ ৪ 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পে গল্পকথকের বন্ধুদ্বয়ের চরিত্র দুটির উপযোগিতা সম্বন্ধে আলোচনা করো। 


উত্তরঃ চরিত্রদ্বয়: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে কথক দুই বন্ধু-সহ তেলেনাপোতা গ্রামে মৎস্যশিকার উপলক্ষ্যে এসেছিলেন। আলোচ্য গল্পে কথকের ভূমিকাই প্রাধান্য পেলেও দুই বন্ধুর মধ্যে মণি নামক এক ব্যক্তির বিশেষ গুরুত্ব আছে। অপর চরিত্রটির তেমন গুরুত্ব বা সক্রিয়তা দেখা যায় না। জানা যায়, ভগ্ন অট্টালিকার জীর্ণ ঘরে রাত্রিবাসকালে তিনি মেঝের উপর শতরঞ্চি পাতামাত্রই নিদ্রামগ্ন হয়েছেন; কথক তাকে 'নিদ্রাবিলাসী কুম্ভকর্ণের দোসর' বলেছেন।


মণি চরিত্রের ভূমিকা: অপরপক্ষে, মণি এ গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র; যামিনী যাকে 'মণিদা' বলে সম্বোধন করেছে। সম্ভবত তিনিই বন্ধুদেরকে তেলেনাপোতায় তার জ্ঞাতির গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাতে যাওয়ার প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। আরও বলা যায় এই মণি দা চরিত্রটি না থাকলে যামিনীর ব্যক্তিগত জীবনের শূন্যতা, বেদনা ও উপেক্ষিত জীবনরহস্যের পর্দাটি সরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার কথক ব্যস্ত জীবনের অবসরে সবান্ধব মৎস্যশিকারে আসবেন- এ ধরনের বাস্তবসম্মত পটভূমি রচনার ক্ষেত্রেও দুই বন্ধুর উপযোগিতা এ গল্পে অবশ্যই আছে। কিন্তু মণি যেখানে কিছুটা প্রকট, অপর বন্ধুর প্রচ্ছন্নতা কাহিনির মধ্যে ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্য সৃষ্টির পক্ষেও সহায়ক। এইভাবে দুটি চরিত্রই গল্পের ভারসাম্য ও শিল্পসৌন্দর্য রচনার ক্ষেত্রে অনুকূল হয়েছে।


প্রশ্নঃ ৫ 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পে গল্পকথকের বন্ধু মণিবাবুর চরিত্র সংক্ষেপে আলোচনা করো। 


উত্তরঃ মণিবাবুর চরিত্র: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে কথক তাঁর যে দুজন সঙ্গী-সহ তেলেনাপোতা যাত্রা করেছিলেন, তাদের মধ্যে গল্পে কেবল মণিবাবুরই প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। গল্পের ঘটনা সংঘটনে চরিত্রটির { বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।


চরিত্রবৈশিষ্ট্য: মণিবাবুর সঙ্গে যামিনীদের পরিচয়সূত্রেই তেলেনাপোতায় এসে কথক যামিনীদের অতিথি হন। কারণ যামিনী তাকে 'মণিদা' বলে ডেকেছে এবং কথকও তারই সূত্রে যামিনীদের পারিবারিক বিষয়ে সম্পর্কিত হয়েছেন। মণিবাবুর চরিত্রের কয়েকটি দিক তার আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেগুলি হল-


সুরাসক্ত: তিনি প্রবলভাবে সুরাসক্ত, তেলেনাপোতায় পৌঁছে একটি ঘরে আশ্রয় পাওয়ামাত্রই তিনি 'পানপাত্রে নিজেকে নিমজ্জিত' করেছেন। গ্রাম্য শোভা উপভোগ করার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না।


আচরণে ত্রুটি: তার স্বভাবে গুরুজন সম্পর্কে শ্রদ্ধা বা নৈতিক আচরণের যথেষ্ট অভাব আছে। যামিনীর অন্ধ, চলচ্ছক্তিহীন মা সম্পর্কে তিনি যখন বলেন, "বুড়ির হাত-পা পড়ে গেছে, চোখ নেই, তবু বুড়ি পণ করে বসে আছে কিছুতেই মরবে না।”- তখন তার এই স্থূল আচরণ পাঠককে আহত করে।


মূল্যবোধের অভাব: তিনি যামিনীকে 'ঘুঁটে-কুড়ুনির মেয়ে' বলে উল্লেখ করেন এবং নিরঞ্জনের প্রবঞ্চনাকে কার্যত সমর্থন করে বলেন যে, 'বুড়ি নাছোড়বান্দা বলে' সে ধাপ্পা দিয়েছিল। এ থেকে মণিবাবুর চরিত্রের নৈতিক মূল্যবোধের চরম অভাবটাও ধরা পড়ে।


প্রশ্নঃ ৬ 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের যামিনীর চরিত্রটি আলোচনা করো।


উত্তরঃ যামিনী চরিত্র: 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' ছোটোগল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্রের চরিত্রনির্মাণশৈলী গল্পের চরিত্রগুলিকে স্বল্পায়তনে বিশিষ্ট করে তুলেছে। গ্রামীণ পরিবারের সহায়সম্বলহীন অবিবাহিতা কন্যা যামিনী। বারংবার পুরুষের অবাঞ্ছিত আশা প্রদানের নৈরাশ্য তাকে অনন্ত দুঃখে নিমজ্জিত করেছে। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-


রহস্যময়তা: 'যামিনী' শব্দের অর্থ রাত্রি। গল্পে যামিনীর আবির্ভাবও রাত্রির পটভূমিতে জীর্ণ অট্টালিকার বাতায়নপ্রান্তে ক্ষীণ আলোর রেখার ছায়ামূর্তিরূপে। রাত্রির মতোই তার অস্তিত্ব রহস্যময়। গল্পে কথকের চেতনায় তার অবস্থান বাস্তব-অবাস্তবের মধ্যবর্তী জিজ্ঞাসার মতো। গল্পের পরিণামে কথকের মানসপটে তার স্থান একই সূচকে গিয়ে চিরকালের জন্য থেমে গিয়েছে।


সম্প্রতিত: যামিনী শান্ত, সহজ, সাবলীল স্বভাবের এক সাধারণ মেয়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে করতে ও সংসার সামলাতে সামলাতে তার আচরণ হয়েছিল আড়ষ্টতাবিহীন। তার মুখের শান্ত-করুণ গাম্ভীর্য গ্রাম্য স্বভাবের স্বাভাবিকত্বের পরিচয় দেয়। দেহ তার অপুষ্টির শিকার, মন প্রবঞ্চনায় জর্জরিত কিন্তু মুখে সর্বক্ষণ লেগে থাকে দীপ্ত হাসির আভা।


বাস্তববাদী ও সহিষ্ণু: যামিনী বাস্তববাদী। তাই নিরঞ্জনের প্রকৃত সত্য জানলেও মৃত্যুপথযাত্রী মাকে তা জানায় না। পাশাপাশি লক্ষণীয় তার সেবাপরায়ণ মানসিকতা, সহনশক্তি ও দায়িত্ববোধ। সত্যিই সে একাধারে নারী ও পুরুষ হয়ে তার মায়ের মুমূর্ষু প্রাণের জীবনদীপ হয়ে উঠেছিল।


স্বপ্নময়তা: গল্পকথক যামিনীকে দেখার ক্ষণ থেকে মানসিকভাবে তাকে 'বন্দিনী রাজকন্যা'র আসনে বসান। তাই যামিনীর চরিত্রেও যেন ক্ষণকালের জন্য রোমান্টিকতা জেগে ওঠে। যামিনী যেন ক্ষণিক স্বপ্নের বুদবুদের মতো গল্পের কাহিনিপ্রবাহে উপস্থিত হয়। কথকের নিরঞ্জন হতে চাওয়া, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি যামিনীর ভিতরকার সুগভীর নৈরাশ্যকেও যেন শিথিল করে দেয়। 


উপেক্ষিতা: পূর্বের নিরঞ্জনের মতো তেলেনাপোতায় কথকেরও শেষপর্যন্ত ফিরে না যাওয়া, যামিনীকে অসম্মান, অবজ্ঞায় নিমজ্জিত করে। এই অসম্মান নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে যামিনী তেলেনাপোতার অন্ধকারে স্মৃতির ধূসরতায় বিলীন হয়ে যায়।


প্রশ্নঃ ৭ যামিনীর মায়ের চরিত্র সংক্ষেপে পর্যালোচনা করো।


উত্তরঃ যামিনীর মায়ের চরিত্র: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে যামিনীর মায়ের চরিত্রটির গল্পের বিন্যাস ও সামগ্রিক বিষয়বস্তুর গতি। নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গভীর ও সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। অন্ধ ও চলচ্ছক্তিহীন এই নারীচরিত্রটির কয়েকটি বিশেষ দিক ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমাদের চোখে পড়ে।


সচেতন: তিনি দৃষ্টিহীন অশীতিপর হলেও চেতনার দিক থেকে অত্যন্ত সজাগ। নিরঞ্জন যে তার মেয়েকে বিবাহ করবে, এই বিশ্বাসে অটল থেকে তিনি কথকের ছদ্ম-নিরঞ্জন পরিচয়কে সন্দেহ না করে তার সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করেছেন।।


দায়িত্ববোধসম্পন্ন: তিনি পঙ্গু হলেও কন্যা যামিনীর প্রতি বাৎসল্য ও দায়িত্ববোধে অবিচল। যামিনীকে পাত্রস্থ করে তিনি নিশ্চিন্ত হতে চান। দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি ও পঙ্গুত্ব তাঁর দায়িত্ববোধকে মলিন করেনি।


আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন: প্রগাঢ় আভিজাত্যবোধ যামিনীর মায়ের ব্যক্তিত্বে ধরা পড়ে। কথককে নিরঞ্জন ভেবে তার সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাঁর এতটুকু মানসিক দৈন্য ধরা পড়েনি, আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখে তিনি কথা বলেছেন।


সরল: পরিশেষে বলা যায়, অকপট বিশ্বাস ও সরলতা তাঁর চরিত্রের সম্পদ। মানুষ কথা দিলে কথা রাখে- এই বিশ্বাস বা মনুষ্যত্বের প্রতি আস্থা তাঁর রয়েছে।


প্রশ্নঃ ৮  'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' ছোটোগল্প হিসেবে কতখানি সার্থক?


উত্তরঃ আড়ম্বরহীন ঘটনা: কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' শীর্ষক গল্পে ছোটোগল্পের বৈশিষ্ট্য মেনেই আড়ম্বরহীন কাহিনির শর্ত রক্ষিত হয়েছে। গল্পের কাহিনি-কথকের সবান্ধবে তেলেনাপোতা আবিষ্কার, মাছ ধরার নেশা পূরণ করতে গিয়ে যামিনীর সঙ্গে আলাপ, তার প্রতি অনুরক্ত হওয়া, যামিনীর মায়ের কাছে মিথ্যে নিরঞ্জন সেজে যামিনীকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া, যামিনীর নিরাশ মনে আশার প্রদীপ জ্বালানো, পরিশেষে নগরে এসে তেলেনাপোতাকে ভুলে যাওয়া- এই পরম্পরায় সমাপ্ত হয়।


সংক্ষিপ্ততা: আলোচ্য গল্পের গদ্য বিবরণধর্মী, সংক্ষিপ্ত, সংযত। লেখক ভাববাচ্যের বর্ণনাভঙ্গি এনে গল্পকাহিনিকে প্রাণবন্ত করেছেন। চরিত্রগুলি কখনো-কখনো নিজস্ব সংলাপবর্জিত হয়েছে এবং ভাববাচ্যের বাক্যগঠন সে অভাব পূরণ করে গদ্যভঙ্গিকে সম্ভাবনাময় শিল্পরূপ দান করেছে।


রোমান্টিকতা: আধুনিক ছোটোগল্পে গীতিকাব্যের যে বন্ধন এবং রোমান্টিকতা ফুটে ওঠে, এ গল্পেও তা বারবার দেখা যায়। ছোটোগল্পে বিশেষ বিশেষ ঘটনার ব্যঞ্জনা প্রতীকায়িত হয়- এ গল্পে সে লক্ষণও বারবার প্রকাশিত। তেলেনাপোতার সভ্যতার আলোবর্জিত জীবন কথকের বর্ণনায়- “কিন্তু মনে - হবে এখানে রাত কখনও ফুরোয় না।"

অথবা, যামিনীর সঙ্গে হৃদয়সম্পর্ক তৈরি হওয়ার দিনের সকাল বর্ণনায় ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে- “যখন জেগে উঠবেন অবাক হয়ে দেখবেন, এই রাত্রির দেশেও সকাল হয়।"

ব্যঞ্জনাগর্ড সমাপ্তি: ব্যঞ্জনা সৃষ্টির এক অসাধারণ কৌশল গল্পটিকে চিত্তাকর্ষক করে তুলেছে। গল্পকারের লিখনশৈলীর গুণে পাঠকমনে এই প্রত্যাশা জন্মেছিল যে, নায়ক হয়তো পুনরায় তেলেনাপোতায় ফিরে আসবে। কিন্তু শহরে গিয়ে নায়ক রোগাক্রান্ত হওয়ার দরুন সেই প্রতিশ্রুতি ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়। তাই "একবার ক্ষণিকের জন্যে আবিষ্কৃত হয়ে তেলেনাপোতা আবার চিরন্তন রাত্রির অতলতায় নিমগ্ন হয়ে যাবে।” গল্পের এই ধরনের পরিণামী ব্যঞ্জনার মধ্যে ছোটোগল্পের সার্থকতা নিহিত।

আকস্মিক সমাপ্তি: 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পটি 'a single impression of reader' তৈরিতে সক্ষম। কাহিনি ও ঘটনার একমুখী প্রবাহ এ গল্পে বজায় আছে। গল্পের পরিণামী ব্যঞ্জনা সমাপ্ত হয় চরম নিরাশায়। সেখানেও ছোটোগল্পের ধর্ম বজায় রাখতে লেখক সক্ষম। তাই 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' এক অভিনব, সার্থক ছোটোগল্প।