Chapter 4

সমকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তা: অগ্রণী চিন্তাবিদগণ

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর


1. গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শনের মূল সূত্রগুলি আলোচনা করো।** [WBCHSE '13]


অথবা, গান্ধির চিন্তাধারার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।


উঃ গান্ধিজি আদর্শ রাষ্ট্র তথা সমাজ প্রতিষ্ঠার যে ধ্যানধারণা প্রচার করেন, তাকেই অনেকে গান্ধিবাদ বলে অভিহিত করতে চেয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় দর্শন দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়েছিল।


গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শনের মূল সূত্রসমূহ: গান্ধিজির মতাদর্শের বা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল সূত্রগুলিকে নিম্নে আলোচনা করা হল-


★ অহিংসা: গান্ধিজির কাছে অহিংসা ছিল ইতিবাচক ভালোবাসা। তিনি হিন্দ স্বরাজ গ্রন্থে এই বিষয়ে বলেন, অহিংসা হল আত্মার অঙ্গ এবং ধর্ম এবং এই নীতিটি প্রত্যেকের জীবনে পালন করা প্রয়োজন। অহিংসা কোনো দুর্বলতা নয়, এক নৈতিক শক্তি।


★ সত্যাগ্রহ: সত্যাগ্রহের সাধারণ অর্থ হল সত্যের প্রতি আগ্রহ। সত্যাগ্রহে কাপুরুষতার কোনো স্থান নেই। সত্যাগ্রহের মধ্যে কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নেই, আছে শুধুমাত্র প্রেম ও ভালোবাসা।

★ সর্বোদয়: সর্বোদয়ের মধ্য দিয়ে গান্ধিজির জীবনের আদর্শ ও সমাজদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। সর্বোদয়ের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল সবার উদয় বা উন্নয়ন। এর মুখ্য উদ্দেশ্য সমাজে এক নৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা যেখানে কোনো সম্পত্তিশালী শ্রেণির হাতে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হবে না, বরং ব্যক্তি বা শ্রেণি নির্বিশেষে সকলের কল্যাণই সাধিত হবে।

★ রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্র : গান্ধিজি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, আদর্শ সমাজব্যবস্থার ভিত্তি হল অহিংস নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্র।

★ স্বরাজ: গান্ধিজি পূর্ণস্বরাজ বা স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে জাতপাত ও ধর্ম নির্বিশেষে জনসাধারণের অধিকার সমভাবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এক আদর্শ সমাজ গঠন করেছিলেন।


★ রামরাজ্য: গান্ধিজি শ্রেণিহীন, শোষণহীন, রাষ্ট্রহীন সাম্যভিত্তিক অহিংস সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীভূত এবং স্বনিয়ন্ত্রিত করতে চেয়েছিলেন। গান্ধি কল্পিত এই অহিংস গণতান্ত্রিক সমাজই হল রামরাজ্য।


★ সমালোচনা: গান্ধিজির রাজনৈতিক চিন্তাদর্শনকে অনেকে সমালোচনা করে বলেছেন, রাজনীতি সংক্রান্ত তাঁর চিন্তাদর্শন মূলত স্ববিরোধী প্রকৃতির। তাছাড়া গান্ধিজি রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে উপেক্ষা করে ধর্ম এবং নৈতিকতার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।


পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে ভারতবর্ষের সমাজনীতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গান্ধিজির রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়, এখানেই গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বিরাজমান।


2. গান্ধিজির সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত ধারণাটির ব্যাখ্যা করো। [HS Model Question '24]

উত্তর: গান্ধিজির সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত ধারণা: গান্ধিজির তত্ত্বের অন্যতম প্রধান নীতি হল সত্যাগ্রহ, তাঁর কাছে সত্যাগ্রহ হল সুসংবদ্ধ জীবনদর্শন, যা ব্যক্তিকে তার স্বার্থের বন্ধন থেকে মুক্ত করে তাকে সমাজমুখী করে তোলে। গান্ধিজির সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত ধারণাগুলি হল-


★ সত্যাগ্রহের সংজ্ঞা: গান্ধিজির সত্যাগ্রহ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল সত্যের প্রতি আগ্রহ (সত্য + আগ্রহ)। সত্যাগ্রহ হল বলপ্রয়োগ না করে, ঘৃণা, ক্রোধ ও হিংসার আশ্রয় না নিয়ে যুদ্ধ করার এক অভিনব কৌশল।


★ সত্যাগ্রহের প্রকৃতি: গান্ধিজি সত্যাগ্রহের প্রকৃতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা-


i. নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নয়: গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহ নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নয়, সত্যাগ্রহ হল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা অন্যায়কে প্রতিরোধ করার সংগ্রাম।


ii. অহিংসা নীতি: গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শন তাঁর অহিংসা তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। সত্যসন্ধানের উদ্দেশ্যে তিনি অহিংসাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। অহিংসার মধ্য দিয়ে সত্যলাভ সম্ভব বলেই একজন সত্যাগ্রহী সর্বদাই হিংসাকে পরিহার করে চলবে।


iii. আত্মনিগ্রন্থ: আত্মনিগ্রহ হল সাহসের নামান্তর। প্রতিপক্ষের হৃদয় জয় করার জন্য সত্যাগ্রহীদের আত্মপীড়নরূপ সাহসের প্রয়োজন হয়। গান্ধিজির মতে, ভালোবাসা কখনও প্রতিশোধ নেয় না বরং তার পরিবর্তে নিজে যন্ত্রনা ভোগ করে।


★ সত্যাগ্রহের বিভিন্ন রূপ: গান্ধিজি সত্যাগ্রহের বিভিন্ন ধরনের রূপের কথা বলেছেন। যথা-অহিংস অসহযোগ, আইন অমান্য, অনশন, পিকেটিং, গঠনমূলক কর্মসূচি, অন্যান্য পদ্ধতি।


মূল্যায়ন: গান্ধিজির সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত ধারণাটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। অনেক সমালোচকদের মতে, গান্ধিজি প্রবর্তিত সত্যাগ্রহ এতটাই আধ্যাত্মিক যে, ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদের কাছে এই আন্দোলন একেবারেই গুরুত্বহীন। তাছাড়া গান্ধিজি তাঁর সত্যাগ্রহ সম্পর্কে নিজেই আস্থাশীল ছিলেন না। এই কারণেই তিনি বহু আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়ে তা পুনরায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।


সমালোচনা সত্ত্বেও পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির সত্যাগ্রহ মানবমুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দোলনের এক উল্লেখযোগ্য এবং অনন্য প্রয়াস।


3. সত্যাগ্রহের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।*

উঃ সত্যাগ্রহের বৈশিষ্ট্যসমূহ: মহাত্মার সত্যাগ্রহ তত্ত্ব বিশদে জানতে হলে এর প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া দরকার। যা হল


(1) আত্মিক শক্তির সংগ্রাম: গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহ হল এক আত্মিক শক্তির সংগ্রাম। যেখানে জয়-পরাজয় বলে কিছু নেই। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করাই হল এই সংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য। সত্যাগ্রহীদের মধ্যে বিদ্বেষমূলক মনোভাবের পরিবর্তে প্রেম-ভালোবাসা, সৌভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে হৃদয় পরিবর্তনের উপর আলোকপাত করা হয়। এমনকি বিপক্ষ শক্তিরও মন পরিবর্তনের আশা করা হয়।


(2) নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নয়: গান্ধিজি তাঁর 'Satyagraha in South Africa' গ্রন্থে বলেছেন সত্যাগ্রহ কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নয়, এ হল সর্বশক্তি দিয়ে অন্যায়কে অস্বীকার করার সংগ্রাম। নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ হল দুর্বল, ভীরু ও কাপুরুষের অস্ত্র, এক্ষেত্রে বিপক্ষের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ থাকতে পারে, কিন্তু সত্যাগ্রহে এগুলির কোনো স্থান নেই।


(3) জন্মগত অধিকার: গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহ হল মানুষের সহজাত জন্মগত অধিকার। এই কারণে গান্ধিজি একে পবিত্র অধিকার ও পবিত্র কর্তব্য বলে অভিহিত করেছেন।


(4) সত্যাগ্রহ ও প্রতিপক্ষ: প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো বা তার উপরে চরম আঘাত হানা সত্যাগ্রহের কাজ নয়। অহিংসা, প্রেম ও ভালোবাসার সাহায্যে প্রতিপক্ষের হৃদয় জয় করাই হল সত্যাগ্রহের মূল উদ্দেশ্য।


(5) একটি সৃজনশীল পদ্মতি: গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহীর মূল উদ্দেশ্য হল প্রতিপক্ষের মনে শুভবোধ জাগ্রত করে তার হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটানো। এই কারণে সত্যাগ্রহকে একটি সৃজনশীল পদ্ধতি বলে অভিহিত করা হয়। ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় বরং এটি হল ব্যক্তির নীতি, কর্মপদ্ধতি ও কাজের বিরুদ্ধে এক সংগ্রাম।


(6) সত্যাগ্রহ ও অহিংসা: সত্যাগ্রহ ও অহিংসা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সত্যাগ্রহী কখনোই ঘৃণা, হিংসাকে প্রশ্রয় দেয় না। প্রতিপক্ষের অন্যায় প্রতিরোধ করার জন্য সত্যাগ্রহী সর্বদা অহিংস পথ অবলম্বন করবেন 


4. গান্ধিবাদের মূলনীতি অহিংসার অর্থ আলোচনা করো। [Amtapitambar High school '19]

উঃ অহিংসার অর্থ: গান্ধিজির মতাদর্শের মূলনীতি হল অহিংসা। তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন, ইয়ং ইন্ডিয়া, হরিজন-সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, বক্তৃতায় অহিংসার ধারণা ব্যক্ত হয়েছে। সংস্কৃত শব্দ অহিংসাকে গান্ধিজি সাবেকি অর্থে ব্যবহার করেছিলেন, যার ইংরেজি অর্থ Non-injury or non-killing। তবে পরবর্তীকালে গান্ধিজি Non-Violence-কে বিরোধীর প্রতি আঘাত বা তাঁর মৃত্যুর কারণ হতে পারে, এই ধরনের শারীরিক বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা অর্থে প্রয়োগ করেন। সাধারণভাবে অহিংসা বলতে অন্যকে হিংসা না করা বা অন্যের ক্ষতি না করাকে বোঝায়। কিন্তু গান্ধিজি অহিংসাকে সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ না করে ব্যাপক ও ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। ব্যাপক ও ইতিবাচক অর্থে অহিংসা বলতে বোঝায় নিঃস্বার্থপরতা। প্রতিপক্ষকে ভালোবেসে তার হৃদয় জয় করা। সর্বোপরি অহিংসা হল অপরের কল্যাণসাধন করা। গান্ধিজি বলেছিলেন, অহিংসা বলতে আমি জগতের সবচেয়ে সক্রিয় শক্তিকে বুঝি। অহিংসা হল সর্বোত্তম আদর্শ। বিশ্বের মহান বিজয় নীতিগুলির মধ্যে একটি হল অহিংসা। বিশ্বের কোনো শক্তি অহিংসাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। অহিংসা মৃত্যুহীন।


গান্ধিজি অহিংসাকে ব্যক্তিগত স্তর থেকে জাতিগত স্তরে উন্নীত করে এর অর্থকে আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গান্ধিজির মতে, একমাত্র অহিংসার পথে সত্যের উপলব্ধি সম্ভব। কাপুরুষ বা ভীরু ব্যক্তি কখনোই অহিংস নীতি অনুসরণ করতে পারে না। একমাত্র সাহসী, সত্যবান চরিত্রের ব্যক্তিদের দ্বারাই অহিংসার নীতিকে উপলব্ধি করা সম্ভব। ভয়ার্ত না হয়ে মাথা উঁচু করে অন্যায়ের প্রতিরোধ করাই অহিংস আদর্শের প্রধান নীতি। গৌতম বুদ্ধের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে গান্ধিজি বলেন, জীবনযাপন করা এবং অন্যদের নিজস্ব জীবনযাপনে সাহায্য করা হবে বিশ্বজনীন সমন্বয়ের রাজপথ।


সারাজীবন জুড়ে অহিংসাকে অবলম্বন করে গান্ধিজি তাঁর কাজ করেছিলেন এবং গান্ধিজির চিন্তার বিশেষত্ব হল এই যে, তিনি অহিংসাকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই নীতিকে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন।