Chapter 5
নুন - জয় গোস্বামী
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ 'নুন' কবিতার নামকরণের সার্থকতা কী?
উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ২ 'নুন' কবিতাটির মর্মবস্তু আলোচনা করো।
উত্তরঃ 'বিষয়সংক্ষেপ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ৩ 'নুন' কবিতার শিল্পসার্থকতা আলোচনা করো। অথবা, 'নুন' কবিতায় জয় গোস্বামীর আঙ্গিক নির্মাণকৌশলের কৃতিত্ব আলোচনা করো।
উত্তরঃ ভূমিকা: জয় গোস্বামীর 'ভুতুমভগবান' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'নুন' কবিতায় কবি নিম্নবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিষয়সংক্ষেপ: নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনযন্ত্রণাই কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু। এই শ্রেণির মানুষেরা কোনোরকমে 'সাধারণ ভাতকাপড়ে', অর্থাভাবে, অর্ধাহারে দিন কাটায়। অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা ভুলতে তারা গঞ্জিকায় নেশাচ্ছন্ন থাকে। তাদের দাবি সম্পর্কে সমাজ সচেতন নয়, তাই তাদের প্রাপ্য সামান্য অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। কবিতায় বর্ণিত একটি পরিবারের কাহিনি সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক, যা তৃতীয় বিশ্বের শ্রেণিবৈষম্যের সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে। কবি সেখান থেকে উত্তরণের দিশা দেখাতে চান।
ব্যঞ্জনা: সমগ্র কবিতায় 'নুন' শব্দটি দারিদ্র্যের বাস্তব সমস্যাকে প্রতীকায়িত করে। শেষ পঙ্ক্তিতে নুন শব্দের মার্জিত রূপ লবণ ব্যবহার করে কবি সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষের উদাসীনতাকে আঘাত করতে চেয়েছেন।
যতিচিহ্নের ব্যবহার: ১৬ লাইনের কবিতাটিতে কবি জীবনযন্ত্রণার নিরন্তর প্রবহমানতাকে সুস্পষ্ট করার জন্য মাত্র চারটি পূর্ণযতি ব্যবহার করেছেন। আবার অন্যদিকে, গভীর জীবনজিজ্ঞাসার প্রতীক হিসেবে প্রশ্নবোধক চিহ্নের অধিক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি বিরতিচিহ্নের সাহায্যে কবিতাটি ক্রমশ সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয়েছে।
শব্দের ব্যবহার: ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জীবনের রুক্ষ বাস্তবতা উপস্থাপনে সুললিত কাব্যিক শব্দের পরিবর্তে কথ্য শব্দ যেমন- 'ভাতকাপড়ে', 'বাপব্যাটা, 'ধারদেনা' ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে। 'গঞ্জিকা'র মতো তৎসম শব্দের পাশাপাশি এখানে 'রাত্তির'-এর মতো অর্ধতৎসম শব্দেরও ব্যবহার আছে। এ ছাড়া তদ্ভব, দেশি-বিদেশি শব্দ এবং শব্দদ্বৈতের ব্যবহারও আলোচ্য কবিতায় পরিলক্ষিত হয়েছে। দলবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাটিতে অলংকারের ক্ষেত্রে অন্ত্যানুপ্রাসই চোখে পড়ে। বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিল্প-আঙ্গিক একীভূত হয়ে কবিতাটিকে বিশিষ্ট করেছে।
প্রশ্নঃ ৪ 'নুন' কবিতাটি কার লেখা এবং কোন্ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত? এই কবিতায় শ্রেণিবৈষম্যের চিত্র কীভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তরঃ রচয়িতা ও কাব্যগ্রন্থ: 'নুন' কবিতাটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ কবি জয় গোস্বামী রচিত 'ভুতুমভগবান' (২৫ বৈশাখ, ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
শ্রেণিবৈষম্যের চিত্র: আলোচ্য কবিতায় দেখা যায়, নিম্নবিত্তের জীবনের চরম সত্য 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' অবস্থা। ব্যঞ্জন সহযোগে ভাত তাদের কপালে দৈবাৎ জোটে। বেশিরভাগ দিনই ঠান্ডা, শুকনো ভাত নুন মেখে খেতে হয়। সাধারণ ভাতকাপড়েই সন্তুষ্ট এইসব তুচ্ছ প্রাণ। তারা নিজেদের সামান্য হিসেবেই জানে। অসুখবিসুখ হলে ধারদেনা করে দিন চলে, কারণ সামান্য আয়ে জোটে শুধু নুন-ভাত, কখনো-বা তাও জোটে না। তখন গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে বাস্তব ভুলে থাকতে চায় তারা। নিত্য অভাবের সংসারে কখনো দু-পয়সা আয় বেশি হয়। মনের আনন্দে সেদিন বাজার হয় মাত্রাছাড়া। সাময়িক আবেগে সৌন্দর্যবোধের চাহিদা মেনে কেনা হয় একটি গোলাপচারা। তবে তাতে ফুল হবে কি না, সে সংশয় থেকেই যায়। রাতদুপুরে বাড়ি ফেরার পর কোনো দিন ঠান্ডা ভাতে নুনও জোটে না। রাগের মাথায় দুই বাপব্যাটা তখন চিৎকার করে উচ্চবিত্তের স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না। নিম্নবিত্তের ভাতের পাতে নুনের দাবি সমাজের উচ্চশ্রেণির কান অবধিও পৌঁছোয় না।
প্রশ্নঃ ৫ "আমরা তো অল্পে খুশি"- 'অল্পে খুশি' মানুষদের জীবনযন্ত্রণার যে ছবি 'নুন' কবিতায় ফুটে উঠেছে, তার পরিচয় দাও।
অথবা, শ্রমজীবী বঞ্চিত মানুষের জীবনযন্ত্রণা 'নুন' কবিতায় যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা সংক্ষেপে লেখো।
অথবা, নিম্নবিত্ত জীবনের ছবি 'নুন' কবিতায় কীভাবে ফুটে উঠেছে?
অথবা, "আমরা তো অল্পে খুশি"- কারা, কেন অল্পে খুশি? তাদের জীবনযন্ত্রণার পরিচয় দাও।
অথবা, "আমরা তো অল্পে খুশি"- 'আমরা বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? তাদের অল্পে খুশি থাকার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ যারা, যে কারণে অল্পে খুশি: জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও বঞ্চিত মানুষের জীবনযন্ত্রণা বাত্ময় হয়েছে। তাদের কাছে জীবনের অর্থ কোনোরকমে টিকে থাকা। তাদের প্রাত্যহিক জীবনপ্রণালী শত অভিযোগ, অনুযোগেও পরিবর্তিত হয় না। এভাবে আপস করতে করতে আক্ষেপ বা বিলাপ করতেও তারা ভুলে যায়। অল্পেই খুশি থাকতে শিখে যায় এই নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা।
জীবনের সমস্যা: শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নিম্নবিত্ত মানুষের এই 'মানিয়ে চলা'-র মধ্যে একে একে তাদের ইচ্ছে, কল্পনা, স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যায়। সঙ্গে মিশে থাকে ভুখা পেটে খিদের যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় সাহিত্য বিচিত্রা হিসেবে তারা স্নায়ুর শৈথিল্যের জন্য গঞ্জিকাসেবনকে বেছে নেয়। চরম অর্থকষ্টেও হাতে হঠাৎ টাকা এলে তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে ইচ্ছাপূরণে মেতে ওঠে। সাময়িক আনন্দে রঙিন স্বপ্নগুলিকে বাস্তবায়িত করতে চায় তারা, গোলাপচারা কিনে শৌখিনতার ছোঁয়া আনে জীবনে। তাদের অতিরিক্ত চাহিদা নেই, সামান্য প্রাপ্তিতেই তারা তাদের সমস্যায় জর্জরিত জীবনে শান্তি খোঁজে।
যন্ত্রণা: সারাদিন পরিশ্রম করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে তারা কেবল ঠান্ডা ভাতে নুনের প্রত্যাশা করে। কিন্তু সেই ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাটুকু থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। তাই উচ্চকিত দাবিতে সোচ্চার হলেও উদাসীন উচ্চবিত্ত সমাজ তাদের দাবি মেটাতে অক্ষম। প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতে তাদের হাহাকার, প্রতিবাদ ক্রমশ ম্লান হয়ে যায়। তারা তবুও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাবি জানাতে থাকে "আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।" এভাবেই 'নুন' কবিতায় নিম্নবিত্ত মানুষের সামগ্রিক জীবনযন্ত্রণার ধারাভাষ্য রচিত হয়েছে।
প্রশ্নঃ ৬ "কী হবে দুঃখ করে?"- এখানে কোন্ দুঃখের কথা বলা হয়েছে এবং বক্তা সেই দুঃখকে অর্থহীন মনে করেছেন কেন?
উত্তরঃ দুঃখ: জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় 'দুঃখ' বলতে শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত মানুষদের অর্থাভাবের কারণে দিনযাপনের দুঃখকে বোঝানো হয়েছে।
দুঃখ অর্থহীন: সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষদের আর্থিক দুরবস্থা তাদের জীবনকে কঠোর, রুক্ষ বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদাপূরণ হলেই 'সাধারণ ভাতকাপড়ে' কষ্ট করে তাদের দিন কেটে যায়। অসুখে আর ধারদেনায় তাদের জীবন জর্জরিত। তবু কখনও বাড়তি অর্থসংস্থান হলে তারা সৌন্দর্যচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। তারা জীবনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নুনের দাবিতে সোচ্চার হলেও সমাজের উচ্চশ্রেণি তাদের নিয়ে বিচলিত হয় না।
নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে এই নিদারুণ জীবনের দৈন্যে দুঃখ করা অনর্থক। কারণ তারা তাদের জীবনের এই গতানুগতিকতাকেই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে। তাই সাময়িক মুক্তির জন্য তারা গঞ্জিকাসেবন করে। স্নায়ুর এই শিথিলতায় তারা কঠোর বাস্তবকে ভুলে থাকতে চায়। আর চেতনা ফিরলে তাদের সামাজিক শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়। ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য ঠান্ডা ভাতে সামান্য নুনের ব্যবস্থা না হলে তাদের মাথায় 'রাগ চড়ে'। রাগবশত চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করলেও তাতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে না। তাই তারা বিলাপ না করে আপস করে নেয়।
প্রশ্নঃ ৭ "আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাতকাপড়ে।”- 'সাধারণ ভাতকাপড়' বলতে কী বোঝায়? কথাটির মাধ্যমে সমাজে টিকে থাকার প্রবল বৈষম্যের দিকটি ফুটিয়ে তোলো।
অথবা, সাধারণ ভাতকাপড়ে 'অল্পে খুশি' থাকা মানুষগুলো কারা ও তাদের দুঃখ না করার কারণ কী? তাদের দৈনন্দিন জীবন কীভাবে অতিবাহিত হয়?
অথবা, 'নুন' কবিতার কথক কেন দুঃখ করতে চায় না ও কীভাবে তারা দিন কাটায়?
অথবা, "আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাতকাপড়ে।"-আমাদের বলতে কবি কাদের কথা বুঝিয়েছেন? 'সাধারণ ভাতকাপড়ে দিন চলে যাওয়ার কারণ কী?
উত্তরঃ যারা: সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ কবি জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে পাঠকসাধারণের পরিচয় হয়। তারা 'সাধারণ ভাতকাপড়ে' অর্থাৎ ন্যূনতম চাহিদাপূরণ হলেই খুশি থাকে।
দুঃখ না করার কারণ: সমাজের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো অনুযায়ী শ্রেণি বিভাজনে, প্রচলিত নিয়মেই দিন আনা দিন খাওয়া মানুষরা সমাজের নীচের সারিতে পড়ে থাকে। তাদের কথা রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক বা সমাজের উচ্চবিত্তরা কখনও ভাবে না। অবহেলা, অনাদর ও উপেক্ষায় তারা কষ্ট পায় না। বরং সামান্য উপার্জনের দ্বারা অর্জিত সাধারণ ভাতকাপড়ে তারা সন্তুষ্ট থাকে।
যেভাবে দিন কাটে: দৈনন্দিন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ে নিম্নবিত্তেরা বুঝে গিয়েছে, 'অল্পে খুশি' থাকার অভ্যাসটাই তাদের ভবিতব্য। কখনো-কখনো ব্যতিক্রম হতে পারে, তবে তা এক-আধ দিন। তাই জীবনকে উপভোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় শৌখিন বস্তু পাওয়ার চেষ্টায় সময় নষ্ট করে না নিম্নবিত্ত বাস্তববাদীর দল। তাই সাধারণ ভাতকাপড়েই দিন কাটিয়ে দেয় তারা। সেই অতিসাধারণ জীবনযাপনেই তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ন্যূনতম খাদ্য ও বস্ত্র পেলেই তারা বিনা প্রতিবাদে জীবন কাটিয়ে দেয়। কষ্টকেও আর কষ্ট মনে করে না তারা। সামান্য অন্ন-বস্ত্রের সন্তুষ্টিতেই, তৃপ্তিতে জীবন কাটায় নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ।
প্রশ্নঃ ৮ "চলে যায় দিন আমাদের..."- কাদের, কীভাবে দিন চলে যায়? ভাবে দিন চলার কারণ কী?
অথবা, সাধারণ মানুষের অসুখ হলে কীভাবে দিন কাটে এবং এভাবে দিন কাটে কেন?
উত্তরঃ দিন চলে যেমন: কবি জয় গোস্বামী রচিত 'নুন' কবিতায় সাধারণ ভাতকাপড়ে, অসুখে ও ধারদেনাতে কঠোর জীবনসংগ্রামে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর দিন চলে যায়।
এভাবে দিন কাটার কারণ: 'নুন' কবিতায় কবি নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের নিত্য অভাব-অনটনের চিত্র তুলে ধরেছেন। শুকনো ভাতে নুনের জোগান দিতেই যাদের নাভিশ্বাস ওঠে তাদের ঘরে অসুখ বড়ো বালাই। কারণ পথ্য ও ওষুধ কেনার মতো বাড়তি অর্থ তাদের থাকে না। তাই সুস্থ হওয়ার তাগিদে অন্যের থেকে টাকাপয়সা ধার করে চিকিৎসা চালাতে হয়। নিম্নবিত্ত মানুষেরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ তারা দিন আনে দিন খায়। সঞ্চয় বলে তাদের কিছু নেই। তাই হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ধারদেনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় তাদের কাছে থাকে না। এই ধারদেনা যদিও তাদের 'সাধারণ ভাতকাপড়'-এ সন্তুষ্ট থাকা শান্তিময় জীবনে এক উপদ্রবস্বরূপ। কিন্তু নিম্নবিত্তদের জীবনের এক অঙ্গাঙ্গি অংশ হয়ে গিয়েছে ধার করা, ধারদেনা তাদের অসময়ের সম্বল।