Chapter 11
আড্ডা
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'আড্ডা' প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ২ 'আড্ডা' প্রবন্ধটি কার লেখা এবং কোন্ মূলগ্রন্থ থেকে এটি সংকলিত? প্রবন্ধটির ভাববস্তু বিচার করো।
উত্তরঃ লেখক: 'আড্ডা' প্রবন্ধটি বহুভাষাবিদ ও বাংলা সাহিত্যের সুরসিক প্রজ্ঞাবান প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা।
মূলগ্রন্থ: সৈয়দ মুজতবা আলীর 'পঞ্চতন্ত্র' (১৯৫২) নামক প্রবন্ধগ্রন্থ থেকে সংকলিত এবং পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধসমূহের শেষ প্রবন্ধটি হল 'আড্ডা'।
ভাববস্তু: 'বিষয়সংক্ষেপ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ৩ “ইংরিজিতে দেখলুম আড্ডা হামলা চালিয়েছে”- কার লেখা, কোন্ রচনার অংশ? উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তরঃ যাঁর লেখা: বহুভাষাবিদ, বাংলা রম্যরচনার স্বনামধন্য শিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী প্রশ্নোক্ত অংশটির রচয়িতা।
যে রচনার অংশ: প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি আলী সাহেবের 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের অন্তর্গত 'আড্ডা' প্রবন্ধ থেকে সংকলিত।
প্রতিপাদ্য বিষয়: বাঙালি ও আড্ডার সম্পর্ক হরিহর আত্মার মতোই অবিচ্ছেদ্য। তাদের অন্দরমহল কি হেঁসেল কিম্বা বৈঠকখানা কি বহির্বাটির দাওয়া, এমনকি তারপর অলিগলি পেরিয়ে রাজপথ হয়ে শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির আঙিনা- সর্বত্রই একটি বড়ো উদ্দীপক হল বাঙালির আড্ডা। এই আড্ডা যেমন জন্ম দিয়েছে সার্থক স্রষ্টার তেমনই এই আড্ডার স্থলেই সৃষ্টি হয়েছে বিখ্যাত সব রচনার। আড্ডাপ্রিয় সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালির এই আড্ডাপ্রিয়তা নিয়ে গর্ববোধ করতে গিয়ে বলেছেন, বাঙালির আড্ডা কেবল বাঙালির মধ্যেই এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। ইংরেজিতেও সে প্রসঙ্গে লেখালেখির সূত্রপাত ঘটেছে। প্রাবন্ধিক রসিকতা করে বলেছেন, এই আড্ডা যেন 'কোটপাতলুন-কামিজ' পরে চণ্ডীমণ্ডপের ভট্টাচার্য মহাশয় এবং জমিদার-হাবেলির মৌলবি সাহেবকে সঙ্গে করে ইংরেজি পত্রিকার অফিসে গিয়ে ঢুকেছে। অর্থাৎ, বাঙালির আড্ডা ইংরেজদের কলমে সাহেবি বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে সাহেবি ভঙ্গিমায় ইংরেজি স্টেটসম্যান সংবাদপত্রের অফিসে প্রবেশ করেছে।। বাংলার একান্ত বিষয় যে ইংরেজদের মধ্যেও কৌতূহল সঞ্চার করেছে এবং তারা আগ্রহী হয়ে সেই ভাষাতেও আড্ডা নিয়ে চর্চা করতে শুরু করেছে- এই বিষয়টি প্রাবন্ধিককে পুলকিত করেছিল। সেই প্রসঙ্গেই খানিক রসিকতা করেই প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতিটির অবতারণা।
প্রশ্নঃ ৪ "যেন হঠাৎ কোটপাতলুন-কামিজ পরে গঙ্গট করে স্টেটসম্যান অফিসে ঢুকলেন।"- কারা, কেন স্টেটসম্যান অফিসে ঢুকেছিলেন প্রসঙ্গ-সহ ব্যাখ্যা করো। অথবা, "আমার তাতে আনন্দই হল।"- কার, কখন এবং কেন আনন্দ হয়েছিল?
উত্তরঃ যার আনন্দ হয়েছিল: সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত 'আড্ডা' প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত উক্তিটি নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য উক্তিটিতে স্বয়ং প্রাবন্ধিকের আনন্দ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যখন আনন্দ হয়েছিল: বাঙালির আড্ডা ইংরেজি সাহিত্যেও যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছে দেখে এবং চর্চিত হচ্ছে দেখে প্রাবন্ধিক আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
আনন্দের কারণ: বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে আড্ডা। আলী সাহেব নিজেও ছিলেন আড্ডারসিক। বাঙালির আড্ডা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে বসে তিনি হার্দিক আনন্দ প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, বাঙালির আড্ডা বা সেই সম্বন্ধীয় লেখালেখি কেবল বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই। বাঙালির আড্ডা এবার হামলা চালিয়েছে অর্থাৎ চর্চিত হচ্ছে ইংরেজি সাহিত্যের দরবারেও। উপমা প্রয়োগে, ভাষাবৈচিত্র্য সৃষ্টিতে, চিত্রকল্প নির্মাণে সৈয়দ মুজতবা আলী সিদ্ধহস্ত। এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক রসিকতা করে বলেছেন, বাংলার চণ্ডীমণ্ডপের আড্ডাবাজ ভট্টাচার্য মহাশয় এবং জমিদার-হাবেলির আড্ডাপ্রিয় মৌলবি সাহেব ও যেন ইংরেজি ভাষায় আমন্ত্রিত হয়ে, সাহেবের 'কোটপাতলুন-কামিজ' পরিধান করে সাহেবি ভঙ্গিমায় ইংরেজি স্টেটসম্যান সংবাদপত্রের অফিসে প্রবেশ করেছেন। প্রাবন্ধিক বাঙালি হিসেবে গৌরবান্বিত। তাঁর এই গৌরববোধ অধিকরূপে প্রকাশিত বাঙালির আড্ডাপ্রীতির প্রসঙ্গে। তাই বাঙালির আড্ডা ইংরেজের দরবারে সমাদৃত হচ্ছে দেখে আলী সাহেব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্নঃ ৫ কিন্তু এসম্পর্কে একটি বিষয়ে আমার কিঞ্চিৎ বক্তব্য আছে।- কী সম্পর্কে? লেখকের বক্তব্যটি কী?
অথবা, "বাংলার বাইরে নাকি আড্ডা নেই" প্রবন্ধ অবলম্বনে উদ্ধৃতিচির সত্যতা বিচার করো।
অথবা, "কথাটা ঠিকও, ভুলও।" কোন্ প্রসঙ্গে কথাটি বলা হয়েছে? একই সঙ্গে তা ঠিক এবং ভুল কেন বলা হয়েছে?
উত্তরঃ প্রসঙ্গ: বাংলা গদ্য সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'আড্ডা' প্রবন্ধে বলেছেন, বাঙালির আড্ডা নিয়ে ইংরেজি বা অন্য যে ভাষাতেই চর্চা হোক-না-কেন, বাঙালি আড্ডাবাজরা বলতে চান, বাংলার বাইরে নাকি আড্ডা নেই। তবে এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক সহমত প্রকাশ করেননি, বরং খানিক সংশয়ই প্রকাশ করেছেন।
একই সঙ্গে তা ঠিক ও ভুল হওয়ার কারণ: বাংলার আড্ডাবাজরা দাবি করেন যে, বাংলার বাইরে আড্ডা নেই। এই কথাটা আংশিকভাবে সঠিক, কারণ বাঙালিরা আড্ডাপ্রিয়; সে চন্ডীমণ্ডপে হোক বা জমিদারের হাবেলি- সর্বত্র তারা জমিয়ে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। আবার কথাটা আংশিকভাবে ভুলও, কারণ কোন্ জাতির মানুষ সেরা আড্ডাবাজ তার সঠিক বিচার করা দুঃসাধ্য। লেখকের মতে, আড্ডা ভোজনরসের মতন রসবস্তু। ব্যক্তিভেদে পছন্দের তারতম্য সেখানে স্বাভাবিক, ফলে সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিচার করা প্রায় অসম্ভব। বাঙালিরা সরষেবাটা আর কাঁচালংকা দিয়ে যে ইলিশ মাছ রান্না করে তার অপূর্ব স্বাদ সিন্ধিরা পছন্দ করে না। আবার তাদের রান্না করা ইলিশ মাছ ভরোচের লোকজনের মুখে রোচে না। কাজেই স্থানভেদে, ব্যক্তিভেদে, জাতিভেদে রসের বিচার বদলে যায়। তাই কায়রো শহরের আড্ডাবাজরা যখন ভাবেন তারাই পৃথিবীর সেরা আড্ডাবাজ-তাঁদের তুলনা শুধু তাঁরাই, তার সঠিক বিচার অসম্ভব। ফলে আড্ডাপ্রিয় জাতি হিসেবে বাঙালির দাবি ঠিকও আবার ভুলও।
প্রশ্নঃ ৬ "তুলনা দিয়ে নিবেদন করছি- কোন প্রসঙ্গে, কীসের তুলনা এনে বক্তা কী নিবেদন করেছেন?
অথবা, "উপযুক্ত সর্ব মৎস্য একই বস্তু দেশভেদে ভিন্ন নাম"-প্রবন্ধ সাপেক্ষে উদ্ধৃতিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বিত্ত করো।
উত্তরঃ প্রসঙ্গ: সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'আড্ডা' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বলেছেন, বাঙালি আড্ডাবাজরা এই বিষয়টি মানতে নারাজ যে বাংলার বাইরেও নাকি আড্ডা আছে। তবে এই বিষয়টি কতখানি সত্য তাতে সন্দেহ প্রকাশ করেই প্রাবন্ধিক একটি তুলনা এনে তা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন।
তুলনার বিষয়: প্রাবন্ধিক 'আড্ডা' প্রবন্ধে দেশভেদে আড্ডার শ্রেষ্ঠর বিচার করতে গিয়ে ইলিশ মাছের তুলনা এনেছেন।
বক্তার নিবেদিত বিষয়: বাঙালি আড্ডাবাজরা বলে থাকেন, বাংলার বাইরে আড্ডা নেই। এই প্রসঙ্গেই প্রাবন্ধিক তুলনা দিয়ে বলতে চেয়েছেন, সিন্ধুনদে ধরা পড়া যে মাছের নাম 'পাল্লা', নর্মদা নদীতীরে ভরোচ শহরে সেই মাছের নাম 'মদার'; আবার গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহে আপামর বাঙালির ভালোবাসার বস্তু সেই একই মাছের নাম 'ইলিশ'। খোট্টা মুল্লুকে অর্থাৎ প্রাবন্ধিকের বক্তব্য অনুযায়ী, সে মাছ বিহার-উত্তরপ্রদেশে ভেসে গেলে তার নামান্তর ঘটে 'হিল্সা'-য়। একই মাছ, শুধু রন্ধনপ্রণালী এবং খাদ্যরুচি ভিন্ন। বাঙালি সরষেবাটা ও কাঁচালংকা সহযোগে ইলিশদেবীর আরাধনা করেন। আবার সেই স্বাদগ্রহণে সিব্বিরা নাক সিঁটকে মন্তব্য করে, বাঙালি এইভাবে 'উম্দা চীজ' বরবাদ করে দিল। এদিকে ভরোচের মহাজনগণ সিন্ধির 'পাল্লা' খেয়ে 'আল্লা আল্লা' বলে রোদন শুরু করে। আসলে প্রাবন্ধিক বলতে চেয়েছেন, রসনার যেমন নিরপেক্ষ বিচার সম্ভব নয় তেমনই দেশভেদে আড্ডাবাজদেরও চরিত্র আলাদা আলাদা। পরম উপাদেয় ইলিশের তুলনা এনে এভাবেই লেখক তাঁর বুদ্ধিমত্তার দ্বারা কার আড্ডা সর্বশ্রেষ্ঠ- এই বিতর্কের সমাধান করেছেন।
প্রশ্নঃ ৭ কী উম্দা চীজকে বরবাদ করে দিলে।"- এ কথা কারা বলে এবং উম্দা চীজ কোন্টি? কীভাবে তা বরবাদ হয়েছে?
অথবা, "সিন্ধীর রান্না পাল্লা খেয়ে 'আল্লা আল্লা' বলে রোদন করেন।"- কারা, কেন রোদন করেন?
অথবা, "কে সূক্ষ্ম নিরপেক্ষ বিচার করবে? এ যে রসবস্তু- এবং আমার মতে ভোজনরস সর্বরসের রসরাজ।"- কোন্ বিষয়ে বিচারের কথা বলা হয়েছে এবং কেন বলা হয়েছে? আড্ডা' রচনায় প্রাবন্ধিক কীভাবে এ কথা প্রমাণ করেছেন, তা আলোচনা করো।
উত্তরঃ যে বিষয়: সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'আড্ডা' প্রবন্ধে রান্না করা ইলিশ মাছের স্বাদ কোথায় শ্রেষ্ঠ সেই বিষয়ে বিচারের কথা বলা হয়েছে। বলার কারণ: বাঙালির রান্নাঘরে সরষেবাটা আর ফালি ফালি কাঁচালংকা দিয়ে যে ইলিশ মাছ রান্না করা হয় তার অসাধারণ স্বর্গীয় স্বাদ সিধিদের কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বাঙালির সরষে-ইলিশ খেয়ে নাক সিঁটকে বলেন, 'কী উমদা চীজকে বরবাদ করে দিলে'। ইলিশ মাছের অসাধারণ স্বাদকে এইভাবে বিনষ্ট করাটা তাদের পছন্দ নয়। আবার, গুজরাটের ভরোচ শহরের লোকেরা সিন্ধিদের হাতে রান্না করা ইলিশ বা পাল্লা খেয়ে 'আল্লা আল্লা' বলে কাঁদতে থাকেন- সেই স্বাদ তাঁদের কাছে অত্যন্ত বিশ্রী মনে হয়। লেখকের মতে, যা রসবস্তু তার সূক্ষ্ম নিরপেক্ষ বিচার করাটা প্রায় অসম্ভব। কারণ স্থানভেদে, জাতিভেদে ও ব্যক্তিভেদে পছন্দের তারতম্য ঘটে। ফলে সঠিক বিচার আপাত অসম্ভব।
যেভাবে প্রমাণ করেছেন: লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের অন্তর্গত 'আড্ডা' নিবন্ধে বাঙালির আড্ডা ও অন্য জাতের আড্ডার মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে ইলিশ মাছের উপমা এনেছেন। সিন্ধুনদে ধরা পড়া যে মাছের নাম 'পাল্লা', নর্মদা নদীতীরে ভরোচ শহরে সেই মাছের নাম 'মদার'; আবার গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহে আপামর বাঙালির ভালোবাসার ধন সেই একই মাছের নাম 'ইলিশ'। একই মাছ শুধু রান্নার প্রণালী ও স্বাদগ্রহণের ধরন ভিন্ন। বাঙালি সরষেবাটা ও কাঁচালংকা দিয়ে রান্না করে ইলিশ মাছ খেয়ে অতি উপাদেয় বোধ করে। অথচ সিন্ধিরা তা খেলে নাক সিঁটকোবেন। আবার সিধিদের রান্না ভরোচের অধিবাসীর মুখে রোচে না। ফলে তাঁরা উভয়ে উভয়ের রান্না পছন্দ করবেন না। রসনার উপর কারও জোর চলে না। রসবস্তু কে কীভাবে উপভোগ করবে, তা বলে দেওয়া যায় না, এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই লেখক বলেছেন- "ভোজনরস সর্বরসের রসরাজ।"
প্রশ্নঃ ৮ "একমাত্র তাঁরাই নাকি আড্ডা দিতে জানেন।- তাঁরা কারা? তাঁদের সম্পর্কে প্রাবন্ধিক এমন মন্তব্য করেছেন কেন?
অথবা, "কাইরোর আড্ডা কঙ্খনো কোন অবস্থাতেই কারো বাড়িতে বসে না।- উক্তিটি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দাও।
অথবা, “তাতে করে আড্ডার নিরপেক্ষতা- কিংবা বলুন গণতন্ত্র-লোপ পায়।" মন্তব্যটি সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ বক্তা: বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, রম্যরচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের 'আড্ডা' নিবন্ধে মিশরের কায়রো শহরের আড্ডার স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে উদ্ধৃত মন্তব্যটির উল্লেখ করেছেন। মন্তব্যটি সাধারণত কায়রো শহরের আড্ডাবাজরা করে থাকেন।
প্রসঙ্গ: প্রাবন্ধিক আলী সাহেব মিশরের কায়রো শহরে অবস্থানকালে লক্ষ করেছেন, বাড়িতে আড্ডা বসানোর প্রসঙ্গ এলেই আড্ডারসিক কায়রোবাসী উদ্ধৃত মন্তব্যটি করে প্রবল আপত্তি তোলে।
মন্তব্যটির কারণ: কায়রো শহরের আড্ডাপ্রিয় মানুষেরা মনে করেন, বাড়ির আড্ডায় সকলের সমানাধিকার থাকে না। সেখানে স্বাধীনভাবে মনের খুশিতে দীর্ঘস্থায়ী আলোচনাও চলতে পারে না, কারণ-
প্রথমত: কারও বাড়িতে আড্ডা বসালে আপ্যায়নের দায়িত্ব এবং আর্থিক দায়ভার কর্তার উপর বর্তায়। খাদ্য-পানীয়, খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা- সব কিছুই বিনামূল্যে জোগান দিতে হয় তাকে। ফলে সবাই তাকে একটু বেশি তোয়াজ করেন, এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই আড্ডায় কিছুটা পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয়। গণতন্ত্রে সকলের সমান অধিকার স্বীকৃত থাকাটাই প্রথা কিন্তু এক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হয়।
দ্বিতীয়ত: পূর্বোক্ত কারণে আড্ডা যার বাড়িতে বসে তার কিছু তোষামোদকারী বা খয়ের খাঁ জুটে যায়। এর ফলে ক্ষমতার সমীকরণেও ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।
তৃতীয়ত: বাড়িতে আড্ডার আসর বসলে সেই বাড়ির গিন্নিরা দীর্ঘ আড্ডার উপর বিরক্ত হন, তখন তাঁদের ব্যক্ত-অব্যক্ত শাসানিতে অকারণে গৃহশান্তি বজায় রাখতে অসময়ে আড্ডা থামিয়ে দিতে হয়- ক্যাফেতে যা হয় না।
এইসব কারণে কায়রোতে কারও বাড়িতে কখনোই আড্ডা বসে না, আড্ডা বসে ক্যাফেতে। ফলে নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র অক্ষুণ্ণ থাকে।