Chapter 10
পঁচিশে বৈশাখ
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা কী?
উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ২ 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধের বিষয়বস্তু আলোচনা করো।
উত্তরঃ 'বিষয়সংক্ষেপ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ৩ পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধটি কার লেখা, কোন্ গ্রন্থের অন্তর্গত? প্রাবন্ধিকের রম্যরচনা সৃষ্টির গুণ আলোচ্য প্রবন্ধে কতখানি জায়গা করে নিয়েছে?
উত্তরঃ রচয়িতা ও মূলগ্রন্থ: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর অন্যতম সেরা রম্যরচনা 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের প্রথম পর্ব থেকে 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধটি গৃহীত। এ ছাড়াও রচনাটি 'সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী'-র প্রথম খণ্ডে স্থান পেয়েছে।
রম্যরচনার গুণ: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী হলেন বাংলা সাহিত্যে, কথা বলার সহজ, সরস, মজলিশি ভঙ্গিতে রম্যরচনার অন্যতম একজন রূপকার। 'পঞ্চতন্ত্র' প্রাবন্ধিকের রম্যরচনার গ্রন্থ। সুতরাং, সেই গ্রন্থে স্থান করে নেওয়া 'পঁচিশে বৈশাখ' রচনাটিতেও রম্যরচনার গুণগুলি প্রকাশ পেয়েছে। প্রবন্ধটি পড়ে আপাতভাবে হাস্যরসের উদ্রেক হয় না ঠিকই কিন্তু প্রবন্ধটিতে সাজানো রয়েছে রম্যরচনার বহুল রসদ।
প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম একটি শাখা হল-রম্যরচনা। এই ধরনের রচনাগুলিকে বাহ্যিকভাবে ভারী চালের বা সংবেদনশীল ভাবোদ্রেককারী বলে মনে না হলেও, এর ধার অতি তীক্ষ্ণ। সর্বোপরি, পাঠক রম্যরচনা পড়ার সময় অধিক গুরুতর কোনো বার্তা প্রত্যাশা করে না বলেই তা, তাকে আরও তীব্রভাবে প্রভাবিত করে যায়। 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধটিও সেইরূপ। প্রবন্ধটি, প্রাবন্ধিকের পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশে, তাদেরকে অপরাধ না নেওয়ার অনুরোধ করে অত্যন্ত লঘুচালে শুরু হয়। এই প্রবন্ধ যে শেষাবধি রবীন্দ্রসংগীতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মধ্যে উপনীত হবে তা বোঝার উপায় থাকে না। কিন্তু, প্রবন্ধটি যখন শেষ হয় তখন আমরা বুঝতে পারি যে রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক বহু গবেষণামূলক, গুরুগম্ভীর বিশ্লেষণ প্রাবন্ধিক আমাদের সামনে তুলে ধরলেন এবং আমরা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পড়ে ফেললাম অথচ, সেই বিষয়ের ভার টের পেলাম না এতটুকুও, মুজতবা আলীর রম্যরচনার এই গুণ। তা সাবলীলভাবে আমাদের বৌদ্ধিক চেতনার উদ্রেক ঘটিয়ে আবার অতি সাধারণভাবেই শেষ হয়ে যায় আর পাঠকের মনে স্ফুরিত হয় জ্ঞানের ভান্ডার। এই সকল বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ হয়েই 'পঁচিশে বৈশাখ' রম্যরচনায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
প্রশ্নঃ ৪ রবীন্দ্রনাথের সাহচর্য পেয়েছিলুম বক্তা কীভাবে রবীন্দ্রনাথের সাহচর্য পেয়েছিলেন, তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ কৈশোরে রবীন্দ্রদর্শন: সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলাদেশের সিলেট তথা শ্রীহট্ট জেলার করিমগঞ্জে ১৯০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে তিনি প্রথম রবীন্দ্রনাথকে দেখেন সিলেটে গোবিন্দনারায়ণ সিংহের এক অনুষ্ঠানে। মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে আয়োজিত সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছাত্রদের উদ্দেশে একটি বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্রনাথ। বক্তৃতার বিষয় ছিল- 'আকাঙ্ক্ষা'। রবীন্দ্রনাথের সেই বক্তৃতা ১৫ বছর বয়সি কিশোর মুজতবা আলীর মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব ফ্যালে। এরপর তিনি রবীন্দ্রনাথকে পত্র পাঠিয়ে একটি প্রশ্ন করেন, "আকাঙ্ক্ষাকে বড় করার উপায় কী?", "অর্থাৎ তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার?"
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষালাভ: এরপর, ১৯২১ সালে তিনি পড়তে আসেন শান্তিনিকেতনে। তাঁর স্মৃতিচারণায় জানা যায়- "শ্রীহট্টবাসীরূপে আমার এই গর্ব যে বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগে আমিই প্রথম বাইরের ছাত্র।" এই বাইরের ছাত্রটিই খুব তাড়াতাড়ি 'ভিতরের মানুষ' হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে পড়েছিলেন 'বলাকা' কাব্যের গতিতত্ত্ব, জেনেছিলেন শেলি ও কীট্সকে। শৈশবে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে উত্তর পাওয়া থেকেই কবিগুরুর প্রতি মুজতবা আলীর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভক্তির মাত্রা শতগুণ বৃদ্ধি পায় এবং আজীবন বজায় থাকে। সঙ্গে অতিরিক্ত পাওনা রবীন্দ্রসান্নিধ্য।
রবীন্দ্রসান্নিধ্য: রবীন্দ্রনাথকে তিনি চোখের সামনে দেখেছেন। তাঁর কাছে পড়েছেন। তাঁর অমানুষিক কর্মদক্ষতা ও অপরিসীম জ্ঞানতৃয়া তাঁকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছে। লেখক তাঁর মধ্যে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ সমাহিত হতে দেখেছেন। এভাবেই তিনি কবিগুরুর সাহচর্য লাভ করেছিলেন।
প্রশ্নঃ ৫ আশা করি, সুশীল পাঠক এবং সহৃদয়া পাঠিকা অপরাধ নেবেন না।- উক্তিটি কার ও তিনি কোন্ প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন? কেন পাঠক-পাঠিকারা অপরাধ নেবেন না?
উত্তরঃ যাঁর উক্তি: 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধটির সূচনাতেই লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন।
প্রসঙ্গ: প্রাবন্ধিকের মতে, এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রসৃষ্টি বিষয়ক আলোচনা যদি নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক না হয়, যদি লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায় তবে, পাঠক-পাঠিকারা যেন মার্জনা করেন। এই প্রসঙ্গেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে।
কারণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাস্থানের ছাত্র ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। ১৯২১ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাই তাঁর আলোচনায় ব্যক্তিগত রবীন্দ্রদৃষ্টি চলে আসলে পাঠক ও পাঠিকারা অপরাধ যাতে না নেন তার অনুরোধ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টির মহামিলনে বিভিন্ন মানুষের কাছে বিচিত্রভাবে ধরা দিয়েছেন। মানুষ ও সময়ের ভেদে চিন্তনের ফসলে তাঁর অবাধ গতি। সুশীল পাঠক ও সহৃদয়া পাঠিকা যাঁরা রবীন্দ্রসৃষ্টিতে মগ্ন থাকেন তারা সৃষ্টির খোলা হাওয়ায় অনুসন্ধান করেন রবীন্দ্রসৃষ্টিরই স্বর্ণফসল। সমালোচনায় মগ্ন থাকেন সেই ফসলের মাত্রানির্ণয়ে। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথকে চেনেন, গুরুদেব হিসেবে স্বীকার করেন। তাঁর লিখনে রবীন্দ্রনাথের সাহচর্য পাওয়ার কথা গর্বভরে উঠে আসলে সুশীল পাঠক ও সহৃদয়া পাঠিকা অপরাধ নেবেন না, তিনি এই অনুরোধই করেছেন।
প্রশ্নঃ ৬ তিনি মপাসী, চেখফকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন”- মপাসী ও চেখফের পরিচয় দিয়ে কে, কোন্ ক্ষেত্রে মপাসাঁ ও চেখফকে ছাডিয়ে গিয়েছেন তা লেখো।
উত্তরঃ বক্তা: 'পঁচিশে বৈশাখ' রচনার লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী আলোচ উক্তিটির বক্তা।
মপাসাঁ ও চেখফের পরিচয়: 'টীকাটিপ্পনী' অংশে প্রদত্ত 'মপাসা' ও 'চেখফ' টীকা দুটি অনুসরণে লেখো।
যিনি, যেক্ষেত্রে: সার্বভৌম কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্তমান বিশ্বের বিস্ময়। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রেই। তাঁর অবাধ বিচরণ। বাংলা সাহিত্যের ছোটোগল্পের সার্থক ও সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার তিনি। তাঁর ছোটোগল্পগুলি শুধুমাত্র বাংলা নয় সমগ্র বিশ্বের অমূল্য সম্পদ। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, ছোটোগল্পের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মপাসাঁ ও চেখফকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছেন শ্রেষ্ঠ ও অনন্য।
প্রশ্ন: ৭ "ছোটগল্পে তিনি মপাসী, চেখফকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন- 'মপাসী' কে এবং 'তিনি' বলতেই বা কাকে বোঝানো হয়েছে? তাঁর সঙ্গে মপাসীর ছোটোগল্পের একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত হয়েছে।
মপাসী: মপাসাঁ হলেন একজন বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক, যাঁকে ছোটোগল্পের জনক বলা হয়।
যিনি মপাসাঁকে অতিক্রম করে গিয়েছেন: 'তিনি' বলতে প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বুঝিয়েছেন।
মপাসাঁ ও রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পের তুলনা: মপাসাঁর ছোটোগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য সংহতি এবং তীক্ষ্ণতা। রবীন্দ্রনাথের প্রথম, সাথর্ক ছোটোগল্প 'দেনা-পাওনা'-তেই গল্পের সংহতি ও বিদ্রুপের তীক্ষ্ণতায় তা হয়ে উঠেছে > মপাসাঁরই সমধর্মী। তেমনই 'উলুখড়ের বিপদ' এবং 'পুত্রযজ্ঞ' গল্পের সংহতি এবং তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ মপাসাঁকে স্মরণ করালেও, মপাসাঁর নিরাসক্তি ও বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টি সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথের স্বধর্ম নয়।
সাধারণভাবে নরনারীর মূল জৈবিক সম্পর্ক নিয়ে গল্প লেখার যে ঝোঁক মপাসাঁর ছিল সে ঝোঁকও রবীন্দ্রনাথের খুব বেশি ছিল না। অন্যদিকে, ৪ স্নেহ-প্রেম-বাৎসল্য-করুণাই প্রতিকূল পরিবেশে তাঁর গল্পে উত্তেজনা সৃষ্টি ও করেছে বেশি। মপাসাঁর চমকসৃষ্টিও রবীন্দ্রনাথের হৃদয়াবেগসমৃদ্ধ গল্পের ঘটনাগত ক্রমোন্নতির সঙ্গে মেলে না। এইসকল মিল-অমিলের সহাবস্থানেই শ্রেষ্ঠত্বের নিরিখে মপাসাঁ-কে ছাড়িয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
প্রশ্নঃ ৮ "ছোটগল্পে তিনি মপাসাঁ, চেখফকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন- চেখফ কে এবং 'তিনি' বলতেই বা কাকে বোঝানো হয়েছে? তাঁর সঙ্গে চেখফের ছোটোগল্পের একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তরঃ 'পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধে, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে বলতে গিয়েই চেখফের প্রসঙ্গ এনেছেন।
চেখফ: একজন বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক হলেন আন্তন চেখফ। তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন ছোটোগল্পকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যিনি চেখফকে অতিক্রম করে গিয়েছেন: 'তিনি' বলতে সৈয়দ মুজতবা আলী এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলেছেন।
চেখফ ও রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পের তুলনা: রুশ দেশের দরিদ্র, শোষিত এবং শ্রেণি নির্বিশেষে ভাগ্যহত মানুষের প্রতি চেখফের গভীর সহানুভূতি এবং তাঁদের সঙ্গে কাজের সূত্রে যুক্ত থাকার ফলে সেইসব মানুষের জীবনযাপনের সহজ ছবিকে কাছ থেকে দেখা, তাদের জীবনের ভাবভঙ্গি নিয়ে স্নিগ্ধ কটাক্ষ এবং তাদের ব্যর্থতার ট্র্যাজেডি, স্পষ্ট রেখার চরিত্রচিত্রণ-এই বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলিই রবীন্দ্র গল্পগুচ্ছের গল্পগুলিতে ছিল।
চেখফের 'গুসেভ' বা 'দি এনকেস্ড ম্যান ইন্ একজাইল' গল্পগুলির বিচিত্র চরিত্রের সংহত আবেগদীপ্ত প্রকাশ, বৈপরীত্য সৃষ্টির মধ্যেও সহানুভূতি এবং বিনম্র কৌতুক ও পরিহাস রবীন্দ্রনাথের বহু গল্পকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। পোস্টমাস্টার, রামকানাই, যজ্ঞনাথ (সম্পত্তি সমর্পণ), মোহিতমোহন ও ক্ষীরোদা (বিচারক), সুভার মতো অনেক স্মরণীয় চরিত্রই চেখফকে মনে করায়।