Chapter 1
সমস্থিতির ধারণা
বিশ্লেষণধর্মী উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলি
1. অভিকর্ষজ অসংগতি বলতে কী বোঝ। অভিকর্ষজ অসংগতি সৃষ্টির কারণগুলি লেখো। বিভিন্ন প্রকার অভিকর্ষজ অসংগতিগুলি লেখো।
উত্তরঃ অভিকর্ষজ অসংগতি
কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে বা অক্ষাংশে অভিকর্ষের মান যা হওয়া উচিত (অর্থাৎ, তাত্ত্বিক অভিকর্ষ) এবং ওই স্থানে সমীক্ষা করে অভিকর্ষের যে মান পাওয়া যায় (অর্থাৎ প্রকৃত অভিকর্ষ), এই দুটি মানের মধ্যে যে পার্থক্য হয়, তাকে অভিকর্ষজ অসংগতি বা অভিকর্ষ বিচ্যুতি (gravity anomaly) বলে।
অভিকর্ষজ অসংগতি সৃষ্টির কারণ
অভিকর্ষজ অসংগতি সৃষ্টির কারণগুলি হল—
[1] ভূত্বক গঠনকারী শিলাস্তরে যদি সমস্থিতিগত ভারসাম্য না থাকে তাহলে তা কোথাও উঠে অথবা নেমে একটি ভারসাম্য অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
এরফলে অভিকর্ষজ অসংগতি দেখা যায়।
[2] কোথাও শিলাস্তরের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি হলে অভিকর্যজ অসংগতি দেখা যায়।
বিভিন্ন প্রকার অভিকর্ষজ অসংগতি
[1] মুক্ত বায়ুর অভিকর্ষজ অসংগতি: ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে অভিকর্ষের মান হ্রাস পায়। মুক্ত বায়ুতে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ অভিকর্ষজ অসংগতি হয়, তাকে যদি সামগ্রিক অসংগতির মান থেকে বাদ দিয়ে সংশোধন করে নেওয়া হয়, তাহলে তাকে মুক্ত বায়ুর অভিকর্ষজ অসংগতি (Free-Air Gravity Anomaly) বলে। অবশ্য এক্ষেত্রে অভিকর্ষ মাপক যন্ত্রের উচ্চতাজনিত অভিকর্ষজ বিচ্যুতিও সংশোধন করতে হয়।
[2] ব্যুগের অভিকর্ষজ অসংগতি: পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য অভিকর্ষের মান কমলেও উচ্চভূমির অতিরিক্ত শিলাস্তূপের জন অভিকর্ষের মান সামান্য বাড়ে। তবে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত পদার্থের জন্য অভিকর্ষ মানের যে সংশোধন প্রয়োজন হয়, তা করার পরেও পর্যবেক্ষিত অভিকর্ষজ মানে যে অসংগতি থাকে, তাকে ব্যুগের অভিকর্ষজ অসংগতি (Bouguer Gravity Anomaly) বলে।
[3] সমস্থিতি অসংগতি: ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, ভূমির উচ্চতা, আশেপাশের উচ্চভূমির আকর্ষণ এবং সমস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সবধরনের। সংশোধনের পরেও পর্যবেক্ষিত অভিকর্ষজ মানে কিছু অসংগতি লক্ষ করা যায়। একেই সমস্থিতি অসংগতি (Isostatic Gravity Anomaly) বলে।
2. সমস্থিতির খারণা দাও।
উত্তরঃ সমস্থিতির ধারণাঃ আমরা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে যত ধরনের ভূমিরূপ দেখি, যেমন-পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, নিম্নভূমি, উপকূলভূমি, মহাসাগরীয় অঞ্চল ইত্যাদি, সেগুলি কিন্তু কোনোটিই এলোমেলো অবস্থায় নেই। প্রতিটি ভূমিরূপই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পদার্থসমূহের ওপর ভেসে আছে বা অবস্থান করছে, যাকে ভারসাম্য অবস্থা বলা যেতে পারে। আর যখন এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় তখন অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি ভূগাঠনিক প্রক্রিয়াগুলি সক্রিয় হয়। এইভাবে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে ভারসাম্য বজায় রাখার ঘটনাকে সমস্থিতি বলা হয়।
সংজ্ঞাঃ ইংরেজি isostasy কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ হল সমস্থিতি। isostasy বা সমস্থিতি বলতে বোঝা যায় ভূত্বকের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন উচ্চতায় ভারসাম্য বজায় রেখে অবস্থান। অন্যভাবে বলা যায় যে, উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির মধ্যে যে সাম্যবস্থার জন্য ভূপৃষ্ঠে পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, নিম্নভূমি,মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রভৃতি পরস্পরের মধ্যে উচ্চতার তারতম্য বজায় রাখে সেই সাম্যবস্থাকে সমস্থিতি বলে।
শব্দটির ব্যবহারঃ ভারসাম্যের ভিত্তিতে ভূত্বকের বিভিন্ন অংশ যথা পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, সমভূমি ইত্যাদি অবস্থান করছে। একথা বোঝাতে আইসোস্ট্যাসি (isostasy) কথাটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন আমেরিকার ভূতত্ত্ববিদ ডাটিন (1889 সালে)। তিনি দুটি গ্রিক শব্দ যথাক্রমে 'laos' (যার অর্থ সমান বা equal) এবং 'stasis' (যার অর্থ নিশ্চল বা standing still) মিশিয়ে ইংরেজিতে এই isostasy কথাটি ব্যবহার করেছিলেন।
সমস্থিতি তত্ত্বের ভিত্তি (Basis of isostatic Theory]
অভিকর্ষ সম্পর্কীয় প্রচলিত ধারণাঃ পৃথিবীর আকার সম্পূর্ণ গোল নয়, অভিগত গোলাকার অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুপ্রান্ত সামান্য চাপা এবং মধ্যভাগ বা নিরক্ষীয় প্রদেশ সামান্য স্ফীত (কিছুটা কমলালেবুর মতো)। এজন্য নিউটনের অভিকর্ষ তত্ত্ব অনুসারে ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র অভিকর্ষের মান এক হয় না। নিরক্ষরেখায় এই মান কম এবং মেরুর দিকে তা একটু করে বাড়তে থাকে অর্থাৎ অক্ষাংশের মান বাড়লে অভিকর্ষের মানও বাড়ে। এ ছাড়া, উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে অভিকর্ষের প্রমান কমে যায় (যেহেতু, ভুকেন্দ্র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে)। আবার ভূমিরূপ গঠনকারী শিলার ঘনত্বের পার্থক্য হলেও অভিকর্ষের মানের তারতম্য হয়।
ব্যুগের-এর অভিকর্ষজ অসংগতি পর্যবেক্ষণঃ ভূপৃষ্ঠে অভিকর্ষের মান সম্পর্কে উল্লিখিত ধারণার পটভূমিতে 1735 খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ভূতত্ত্ববিদ পিয়ের ব্যুগের (Pierre Bouguer) আন্দিজ পর্বতমালায় অভিকর্ষের মান নির্ণয়ের জন্য চিম্বোরাজো পর্বতের উত্তরে ও দক্ষিণে এক বিশেষ সমীক্ষা করেন। ওই সময় তিনি লক্ষ করেন যন্ত্রের ওলন দড়ি বা প্লাম্বরেখা নিউটনের অভিকর্ষ নির্ণয় পদ্ধতি অনুসারে যতটা আন্দিজের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার কথা ততটা হচ্ছে না। ব্যুগের-এর অভিকর্ষ অসংগতি সম্পর্কীয় ওই পর্যবেক্ষণ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তা কিন্তু সেই সময়কার বিজ্ঞানীমহলে তেমন সাড়া ফেলতে পারে নি।
ভারতে জর্জ এভারেস্টের নেতৃত্বে অভিকর্ষজ অসংগতি পর্যবেক্ষণঃ ব্যুগের'-এর আন্দিজ পর্বতামালার অভিকর্ষের মান পর্যবেক্ষণের প্রায় 120 বছর পর (1859 খ্রি.) ভারতের তৎকালীন সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেস্টের নেতৃত্বে একই দ্রাঘিমায় কিন্তু ভিন্ন অক্ষাংশে অবস্থিত এরকম তিনটি স্থানে একটি বিশেষ জরিপ কার্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই জরিপের উদ্দেশ্য ছিল ওই তিনটি স্থানের অক্ষাংশ ও দূরত্ব নির্ণয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর আকার ও আয়তন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। ট্রানজিট থিয়োডোলাইটের সাহায্যে নক্ষত্রের উন্নতি কোণ পরিমাপ করে যেমন একটি স্থানের অক্ষাংশ নির্ণয় করা যায়, তেমনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ জানা আছে বলে বিভিন্ন স্থানের মধ্যে দূরত্ব নির্ণয় করাও সহজ হয়।
উল্লিখিত জরিপকার্যের জন্য (i) প্রথমে 78° পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত উত্তর-মধ্য ভারতের তিনটি স্থান নির্বাচন করা হয়। এগুলি হল— (a) উত্তর ভারতে শিবালিক পর্বতের পাদদেশে কালিয়ানা, (b) এর 603 কিমি দক্ষিণে কালিয়ানপুর এবং (c) কালিয়ানপুরের 680 কিমি দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যের দামারিদদ্গা। (ii) এরপর ট্রানজিট থিয়োডোলাইটের সাহায্যে নক্ষত্রের উন্নতি কোণ মেপে কালিয়ানা, কালিয়ানপুর ও দামরিদ্গার অক্ষাংশ এবং এদের মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ণয় করা হয়। এ ছাড়া, (iii) একইসঙ্গে ত্রিভুজ বা ট্রায়াঙ্গুলেশান (triangulation) পদ্ধতি অনুসারেও কালিয়ানা ও কালিয়ানপুরের দূরত্ব সরাসরি মাপা হয়। (iv) কিন্তু অবাক হওয়ার ব্যাপার এই যে, এই দুই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত মানের মধ্যে 5.236 সেকেন্ড কৌণিক পার্থক্য হয়, যা ভূমির দৈর্ঘ্যের হিসেবে 268 মিটার দূরত্বের পার্থক্য নির্দেশ করে। (v) কী কারণে এই পার্থক্য হল তা নির্ণয় করতে গিয়ে 1855 খ্রিস্টাব্দে ভূবিজ্ঞানী আর্কডিকন প্র্যাট (Archdeacon Pratt) প্রাপ্ত শিলার গড় ঘনাঙ্কের সাহায্যে হিমালয়ের সম্ভাব্য ভর (mass) নির্ণয় করেন এবং তার ফলে থিয়োডোলাইটের ওলন দড়ি বা প্লাম্বরেখার ওপর কতটা অভিকর্ষীয় টান হওয়া সম্ভব তাও তিনি হিসাব করে দেখান। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, হিমালয়ের আকর্ষণে প্লাম্বরেখার বিক্ষেপ বা বিচ্যুতি হওয়া উচিত ছিল 15.885 সেকেন্ড। কিন্তু প্রকৃত বিচ্যুতি ঘটে মাত্র 5.236 সেকেন্ড অর্থাৎ তিনভাগের একভাগ মাত্র। (vi) নির্ণীত বিক্ষেপের তুলনায় প্রকৃত বিক্ষেপের মান কম হওয়ায় এবার বিষয়টি প্রায় 120 বছর আগে আন্দিজ পর্বতমালার অসংগতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (vii) এইভাবে প্লাম্বরেখার প্রকৃত বিক্ষেপ কম হওয়ার কারণ দু-ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, (a) হিমালয়ে শিলার যে ঘনত্ব ধরা হয়েছে তা ঠিক নয় অর্থাৎ অভ্যন্তরভাগ হালকা শিলা দ্বারা গঠিত বা ফাঁপা প্রকৃতির। অথবা, (b) সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর হিমালয়ের যে অংশ দেখা যায় সেখানে বিপুল পরিমাণে শিলাস্তূপ থাকলেও মাটির নীচে ওই পর্বতের যে অংশ আছে তা নিশ্চয়ই আশেপাশের শিলা থেকে হালকা। তাই হিমালয় পর্বত প্লাম্বরেখা বা ওলন দড়িকে যতটা আকর্ষণ করা উচিত ছিল তা করেনি। এই দুটি ব্যাখ্যার মধ্যে প্রথমটি অবান্তর বলে বাতিল করা হলেও দ্বিতীয়টি সত্য বলেই মনে হয়। এর কারণ, (viii) 1855 খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অ্যাস্ট্রোনোমার রয়্যাল (Astronomer Royal) স্যার জর্জ অ্যারি প্রথম বলেন যে, পর্বতগুলির বিশাল ভরের জন্য মাটির নীচে পর্বতগুলির নিম্নদেশ অপেক্ষাকৃত ঘন পদার্থের মধ্যে অনেকটাই ঢুকে আছে এবং এইভাবে ভাসমানতার মাধ্যমে পর্বতগুলি ভারসাম্যে পৌঁছেছে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আছে। (ভেসে থাকার সময় বরফের যেমন 9/10 ভাগ জলে ডুবে থাকে, তেমনই পর্বতসহ অন্যান্য ভূত্বকীয় ভূখণ্ডেরও নিম্নাংশ নীচের অপেক্ষাকৃত ঘন অ্যাসথেনোস্ফিয়ার স্তরে ডুবে আছে)। আর এজন্যই পর্বতসমূহের ভরের তুলনায় তাদের অভিকর্ষীয় টান কম হয়।
3. সমস্থিতি সম্পর্কে জর্জ এইরির মতবাদটি লেখো।
উত্তরঃ সমস্থিতি সম্পর্কে জর্জ এইরির মতবাদঃ সমস্থিতি মতবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন বিতর্ক চললেও এ বিষয়ে গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী এইরির (Airy) মতবাদ (1855 সালে) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানী এইরি বলেন যে—
[1] অপেক্ষাকৃত হালকা শিলায় গঠিত ভূত্বক, নিম্নস্থ ভারী পদার্থের ওপর ভাসমান রয়েছে। এই মতকে অনুসরণ করে। তিনি বলেন যে, কোনো পদার্থ জলে ভাসলে তার কিছু অংশ জলের নীচে থাকে। ঠিক তেমনই মহাদেশগুলোর নীচের অংশও তরল গুরুমণ্ডলে নিমজ্জিত আছে।
[2] ভূপৃষ্ঠের উঁচু স্থানগুলি নীচের দিকে বেশি প্রসারিত ও নীচু স্থানগুলি কম প্রসারিত হয়ে অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, হিমালয় ভূ-অভ্যন্তরে প্রায় 71 কিমি প্রোথিত বলে মনে করা হয়।।
[3] তাঁর মতে, ভূপৃষ্ঠস্থ প্রতিটি পর্বতের নীচে স্বল্প ঘনত্বের শিলারাশি দ্বারা গঠিত একটি মূল বা শিকড় অন্যল (Root Zone) থাকে। এই সত্যতা প্রমাণ করার জন্য তিনি বিভিন্ন মাপের লোহার দণ্ডকে পারদপূর্ণ পাত্রে রেখে দেখান যে, সেগুলি উচ্চতা অনুসান্ধে পারদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
[4] এইরির মডেলের বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে এই অঞ্চলটির ওপর জমে থাকা গ্লিস্টোসিন যুগে বরফ স্তরের প্রতিনিয়ত গলনের দরুন তার উপরিস্থিত ভার প্রতিমুহূর্তে লাঘব হয়ে চলেছে। এরই ফলশ্রুতি হিসেবে অঞ্চলটি প্রতি বছরে প্রায়। সেমি করে উচ্চতা লাভকরে চলেছে। তাঁদের মতে সম্পূর্ণ সাম্য অবস্থায় পৌঁছতে অঞ্চলটিকে আরও প্রায় 213 মিটার উচ্চতা লাভ করতে হবে।
সমালোচনাঃ এইরির মতবাদটি সেইসময় বিজ্ঞানীমহলে সাড়া যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছিল। কারণ— (i) হিমশৈল বা বরফের মতো ভাসমানতাও যদি 1:9 হয়, তাহলে হিমালয়ের 8,848 মিটার উঁচু হিমালয়ের ভূ-অভ্যন্তরে গভীরতা হবে প্রায় 79,632 মিটার যা একেবারেই সম্ভব নয়। কারণ, হালকা শিলা বা সিয়াল (ঘনত্ব 2.7 গ্রাম/ঘনসেমি) মহাদেশীয় শিলায় গঠিত পর্বতের পক্ষে অপেক্ষাকৃত ভারী শিলা বা সিমা (ঘনত্ব 3.0 গ্রাম/ঘন সেন্টিমিটার)-এর মধ্যে অত গভীর পর্যন্ত প্রোথিত থাকা সম্ভব নয়। (ii) ভূ-অভ্যন্তরের 79,632 মিটার গভীরে উন্নতা এত বেশি যে ওই অবস্থায় কোনো পদার্থের কঠিন অবস্থায় থাকাও সম্ভব নয়।
4. সমস্থিতি ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে প্র্যাটের তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ সমস্থিতি ধারণার উৎপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্র্যাটের তত্ত্বঃ এইরির সমস্থিতি সম্পর্কীয় তত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার প্রায় চার বছর পর 1859 সালে গণিতবিদ ও ধর্মযাজক জে এইচ প্র্যাট (JH Pratt) পর্বত, মালভূমি, সমভূমি প্রভৃতি ভূখণ্ডের ভারসাম্যের বিষয়ে একটি নতুন তত্ত্ব প্রকাশ করেন। প্র্যাটের মতে—
[1] পর্বত, মালভূমি, সমভূমি প্রভৃতি ভূত্বকীয় স্তম্ভগুলির ঘনত্ব সমান নয়।
[2] তিনি মনে করেন, ভূত্বকের নীচের স্তরে এমন একটি তল আছে, যেখানে পদার্থ সমপ্রকৃতির এবং প্রত্যেক ভূত্বকীয় স্তম্ভ সেখানে সমান চাপ প্রয়োগ করে। তিনি ওই তলকে প্রতিবিধান তল বা প্রতিপূরণ তল (Level of Compensation) নামে অভিহিত করেছেন।
[3] তাঁর মতে, ভূত্বকীয় স্তম্ভগুলি ওই প্রতিবিধান তলে সমান চাপ প্রয়োগ করলেও তাদের ঘনত্বের পার্থক্যের জন্য প্রতিবিধান তলের ওপরে স্তম্ভগুলির উচ্চতায় তারতম্য ঘটে। বেশি ঘনত্বের বা ভারী পদার্থে গঠিত স্তম্ভের তুলনায় কম ঘনত্বের বা হালকা পদার্থে গঠিত স্তম্ভের উচ্চতা বেশি হবে। পর্বতের শিলাস্তরের ঘনত্ব কম বলে তার উচ্চতা বেশি। এরপর মালভূমি, সমভূমি ও সমুদ্র তলদেশের ঘনত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে বলে তাদের উচ্চতাও ক্রমশ কমে যায়।
[4] ঘনত্বের পার্থক্যে কীভাবে উচ্চতার তারতম্য হয় তা বোঝানোর জন্য মহাদেশীয় ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশকে বিভিন্ন ধাতব খণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। রুপো, দস্তা, পাইরাইট, অ্যান্টিমনি, লোহা, নিকেল, তামা ও সিসা এই ধাতব খণ্ডগুলি সমআয়তনের হলেও ওগুলিকে যখন পারদের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়, তখন দেখা যায় ঘনত্বের পার্থক্যের জন্য ওগুলি বিভিন্ন উচ্চতায় ভাসছে। এর মধ্যে পাইরাইট সবচেয়ে হালকা বলে তার উচ্চতাও বেশি। এ ছাড়া অবশিষ্ট খণ্ডগুলির ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতাও ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে।
সমালোচনাঃ (i) প্র্যটি অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে বিস্তৃত যে প্রতিপুরণ তলের ধারণা দিয়েছেন তা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ের ফলে প্রতিপুরণ তল কিছুটা উঠবে, আবার সঞ্চয়ক্ষেত্রে প্রতিপুরণ তল অবনমিত হবে। তাই প্রতিপূরণ তল সকল সময় সমভাবে সমান তলে অবস্থান করবে, তা ঠিক নয়। প্রতিপুরণ তলের সমতলতা বিঘ্নিত হবে। (ii) ভূত্বকীয় খণ্ডগুলির প্রত্যেকটির সর্বত্র যে নির্দিষ্ট মাত্রার ঘনত্ব থাকবে, তা বাস্তবে সম্ভব নয়।
5. সমস্থিতি সম্পর্কে এইরি ও প্র্যাটের মতবাদের তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তরঃ সমস্থিতি সম্পর্কে এইরি ও প্ল্যাটের মতবাদের তুলনা
6. 'প্রতিবিধান তল'-এর সংজ্ঞা দাও। সিমাটোজেনি (Cymatogeny) কাকে বলে?
উত্তরঃ প্রতিবিধান তলঃ 1859 সালে জে এইচ প্র্যাট প্রতিবিধান তলের ধারণাটি দেন। প্র্যাট তাঁর সমস্থিতি তত্ত্বে বলেন যে-ভূত্বকের নীচের স্তরে এমন একটি তল আছে, যেখানে অনুভূমিক দিকে পদার্থ সমপ্রকৃতির এবং প্রত্যেক ভূত্বকীয় স্তম্ভ সেখানে সমান চাপ প্রয়োগ করে। তিনি ওই তলকে প্রতিবিধান তল (level of compensation) নামে অভিহিত করেন।।
বৈশিষ্ট্যঃ প্রতিবিধান তলের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
[1] পাহাড়, পর্বত, মালভূমি প্রভৃতি প্রত্যেকটি ভূত্বকীয় স্তম্ভ প্রতিবিধান তলের ওপর সমান চাপ প্রয়োগ করে।
[2] ভূত্বকীয় স্তম্ভগুলির যেগুলি হালকা শিলা গঠিত, প্রতিবিধান তলের ওপর সেগুলির উচ্চতা বেশি হয়।
[3] অপরদিকে যে সকল অংশ ভারী শিলা গঠিত, প্রতিবিধান তলের ওপর সেগুলির উচ্চতা কম। যেমন- পর্বতের শিলাস্তরের ঘনত্ব কম বলে প্রতিবিধান তলের ওপর তার উচ্চতা বেশি। এরপর মালভূমি, সমভূমি ও সমুদ্রতলদেশের ঘনত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে বলে, তাদের উচ্চতাও ক্রমশ কমে যায়।
সিমাটোজেনি
প্রখ্যাত ভূমিরূপবিজ্ঞানী লেস্টার কিং (Lester King)-এর মতে, প্রাকৃতিক শক্তির কার্যের ফলে পার্বত্যভূমি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ক্ষয়জাত পদার্থসমূহ পাশের সমুদ্রতলদেশে সঞ্চিত হতে থাকে। এরফলে সঞ্চিত পদার্থের ভারে যখন সমুদ্রতলদেশ ক্রমশ নীচু হতে থাকে, তখন পার্বত্যভূমি হালকা হওয়ায় ক্রমশ উঁচু হয়। এইভাবে চাপের হ্রাসবৃদ্ধি হয় বলে এই সময় ওখানকার ভূগর্ভের উত্তপ্ত তরল পদার্থ অবনমিত সমুদ্রতলদেশের নীচ থেকে হালকা পার্বত্য ভূমিরূপের নীচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে পার্বত্যভূমি একটু একটু করে উঁচু হতে থাকে এবং সমুদ্রতলদেশ অবনমিত হয়। এইভাবে ক্ষয়ের সাথে সাথে পার্বত্যভূমিরূপের উত্থানকে লেস্টার কিং সিমাটোজেনি (cymatogeny) নামে অভিহিত করেছেন।
7. "ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে ক্ষয় ও সঞ্চয় ঘটলে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশের মধ্যে পুনরায় ভারসাম্য বা সমস্থিতি রক্ষিত হয়" ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে প্রত্যেকটি ভূমিরূপ (যেমন-পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, উপকূলভূমি, মহাসাগরীয় অঞ্চল) একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পদার্থসমূহের ওপর অবস্থান করছে। একে ভারসাম্য অবস্থা বলা যেতে পারে। আর যখন এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, তখন অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি ভূগাঠনিক প্রক্রিয়াগুলি সক্রিয় হয়ে। এইভাবে ভুপৃষ্ঠের উপরিভাগে ভারসাম্য বজায় রাখার ঘটনাকে সমস্থিতি বলে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের ওপর বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি (নদী, বায়ু, হিমবাহ) কার্যকরী থাকে বলে তুমিরূপের বিভিন্ন অংশে ক্ষয় ও সঞ্চয় সাধিত হয়। ফলে সমস্থিতির ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু তা পুনরায় ভারসাম্যে ফিরে আসে অর্থাৎ সমস্থিতি রক্ষিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে লক্ষ করে দেখা গেছে যে, কোথাও বোঝার সঞ্চয় বা অপসারণ ঘটলে সেখানে ভূমির অবনমন বা উত্থান ঘটে। যেমন—
[1] হিমযুগে বাল্টিক সাগর তীরবর্তী দেশগুলি পুরু বরফে ঢাকা পড়েছিল। তারপর কয়েক হাজার বছর আগে হিমযুগের অবসানের পর ওই বরফ গলে যাওয়ার ফলে যে ভার বা বোঝার লাঘব হয়, সেই কারণে ওখানকার (বিশেষত সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের) ভূমি প্রায় 270 মিটার উঠেছে।
[2] একই কারণে কানাডার দক্ষিণ-পূর্বাংশে এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মেইন রাজ্যে ভূমির ব্যাপক উত্থান ঘটেছে।
[3] বোঝা সঞ্চয়ের ফলে যে ভূমির অবনমন ঘটে তার প্রমাণ হল, কলকাতা-সংলগ্ন গলা বদ্বীপ অঞ্চল। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েকশো ফুট নীচে পলিস্তরের মধ্যে কাঠের টুকরো, স্পলচর প্রাণীর হাড় প্রভৃতি পাওয়া গেছে। সুতরাং এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, পলিস্তরের ভারে ওই অঞ্চলটির অবনমন ঘটেছে।
[4] ইটালির পো নদীর বদ্বীপেও এরকম অনেক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে এবং ওই অঞ্চলটিরও অবনমন ঘটেছে।
[5] আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বোনেভিল হ্রদের জল অপসারিত হওয়ার পর সেখানকার ভূমির সমস্থিতিক উত্থান ঘটেছে।