Chapter 17
বাংলা কথাসাহিত্যের ধারা: উপন্যাস-ছোটোগল্প-শিশু-কিশোর সাহিত্য
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ কথাসাহিত্য কী? কথাসাহিত্যের ধারাগুলি কী কী?
উত্তরঃ কথাসাহিত্য: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ধারা হল কথাসাহিত্য। ইংরেজিতে একে Fiction বলা হয়ে থাকে। বাস্তবিক কোনো বিষয়কে ভিত্তি করে কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বা মানুষের কোনো অবস্থাকে কেন্দ্র করে রচিত মূলত কাল্পনিক সাহিত্য হল কথাসাহিত্য। কথাসাহিত্য নিছক কোনো গল্প নয়, এটি তার চেয়ে বৃহত্তর কিছুকে লক্ষ্য করে রচিত হয়। কথাসাহিত্যে সংলাপের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী তা প্লটের পরিবর্তে থিমের উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে।
কথাসাহিত্যের ধারা: কথাসাহিত্যের মধ্যে প্রধানত আটটি উপধারা বর্তমান। সেগুলি হল- (১) হরর, (২) রহস্য, (৩) কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন, (৪) ওয়েস্টার্ন, (৫) ফ্যান্টাসি, (৬) ঐতিহাসিক, (৭) রোমান্স, (৮) থ্রিলার বা সাসপেন্স। অবশ্য অনেক উপশ্রেণিও রয়েছে। বেশিরভাগ কথাসাহিত্য এই বিভাগগুলির কোনো একটির অন্তর্গত হবে। উপন্যাস ও ছোটোগল্প এই উপশ্রেণিগুলির মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট।
প্রশ্নঃ ২ উপন্যাস কাকে বলে? উপন্যাসকে ক-টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ও কী কী?
উত্তরঃ উপন্যাসের সংজ্ঞা: কথাসাহিত্যের একটি বিশিষ্ট উপশ্রেণি হল উপন্যাস। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Novel, যা এসেছে ইতালীয় শব্দ 'Novella' থেকে। উপন্যাস এমন এক সাহিত্যসৃষ্টি যেখানে লেখকের জীবনদর্শন ও জীবনানুভূতি কোনো বাস্তব কাহিনি অবলম্বন করে এক বর্ণনামূলক শিল্পকর্মে - রূপায়িত হয়। বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের উদাহরণ হল-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ', রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চোখের বালি', শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবদাস' ইত্যাদি।
উপন্যাসের শ্রেণিবিভাগ: উপন্যাস বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। কখনও তা কাহিনিনির্ভর, কখনও চরিত্রনির্ভর, আবার কখনো-বা বক্তব্যধর্মী। উপন্যাসকে মূলত ষোলোটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
প্রশ্নঃ ৩ বাংলা উপন্যাসের উদ্ভব ঘটেছিল কীভাবে? উপন্যাসের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
উত্তরঃ উপন্যাসের উদ্ভব ঘটে যেভাবে: মানুষের গল্প শোনার আগ্রহ সুপ্রাচীন কাল থেকে এই আগ্রহের ফলেই কাহিনির উদ্ভব। প্রাচীন কালে লোকমুখে বিভিন্ন দেবদেবীর কথা, রাজাদের রাজ্যজয়ের কাহিনি ইত্যাদি প্রচার হত। পরবর্তী সময়ে নিজের চাহিদা অনুসারে মানুষই তা লিপিবদ্ধ করতে শুরু করে। এভাবেই কাব্য, মহাকাব্য ও নাটকের সৃষ্টি। পরবর্তীকালে তা থেকেই উপন্যাসের জন্ম।
উপন্যাসের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশঃ বাংলা উপন্যাসের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে এসে পড়ে ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে হ্যানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স-এর লেখা 'ফুলমণি ও করুণার বিবরণ' বা ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা 'আলালের ঘরের দুলাল' অথবা কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোম প্যাঁচার নক্সা' ইত্যাদি রচনার কথা। এগুলিকে অনেকে বাংলা উপন্যাসের উৎস হিসেবে মনে করলেও এগুলিতে মানুষের পূর্ণ জীবনের গভীরতা ও চরিত্রসৃষ্টির অনন্যতা ধরা পড়েনি। প্রকৃত অর্থে বাংলা উপন্যাসের সার্থক রূপকার হিসেবে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫) থেকে পরপর অনেকগুলি বিচিত্রধর্মী উপন্যাস রচনার মাধ্যমে বাংলা উপন্যাসের অনবদ্য প্রতিমা গড়ে তুলেছিলেন।
এরপর একে একে বাংলা উপন্যাসের প্রাথমিক ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে প্রতাপচন্দ্র ঘোষের 'বঙ্গাধিপ - পরাজয়', রমেশচন্দ্র দত্তের 'মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত' ও 'রাজপুত জীবন সন্ধ্যা'; হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'বেনের মেয়ে', 'কাঞ্চনমালা'; স্বর্ণকুমারী দেবীর 'মিবাররাজ' ও 'বিদ্রোহ'; মীর মোশারফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু' প্রভৃতির নাম করতেই হয়। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'স্বর্ণলতা'-র নামও উল্লেখযোগ্য। তবে এঁদের ধারা পেরিয়ে পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের লেখনীর স্পর্শে ধন্য হয়ে বাংলা উপন্যাস আজ পর্যন্ত অসংখ্য প্রতিভাবান লেখকের ধারা বেয়ে তার ক্রমবিকাশের গতিকে অব্যাহত রেখেছে।
প্রশ্নঃ ৪ উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য কী কী? কোন্ রচনাকে, কেন বাংला সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ধরা হয়?
উত্তরঃ উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য: উপন্যাসের গঠন কেমন হবে তা নিয়ে বিশিষ্টজনের নানারকম মতামত আছে। উপন্যাস গঠনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল-
(১) উপন্যাস মূলত মানবজীবননির্ভর। মানবচরিত্রের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চরিত্রের মধ্যে বিবর্তন ফুটিয়ে তোলেন প্রাবন্ধিক। (২) উপন্যাসের ভিত্তি একটি দীর্ঘ কাহিনি ও সুপরিকল্পিত প্লট। প্লটের মধ্যে ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়াকাণ্ডকে সুবিন্যস্তভাবে আকর্ষণীয় ও বাস্তবোচিত করে তোলেন ঔপন্যাসিক। (৩) উপন্যাসের চরিত্রদের আচরণ, ভাবনা, ক্রিয়াকাণ্ড হয়ে ওঠে কাহিনির মূলভিত্তি। উপন্যাসের চরিত্ররাই ঘটনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। (৪) স্থান-কাল অনুযায়ী চরিত্রদের মুখের ভাষা বা সংলাপের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক চরিত্রদের মনস্তত্বকে প্রকাশ করেন ও উপন্যাসের বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলেন। (৫) ঔপন্যাসিকের স্টাইল, স্বাতন্ত্র্য, জীবনদর্শন সব কিছুর উপর ভিত্তি করেই উপন্যাস গড়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস: প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত 'আলালের ঘরের দুলাল' গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ধরা হয়। এটি ১৮৫৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। 'আলালের ঘরের দুলাল একটা ব্যঙ্গাত্মক নকশা জাতীয় রচনা। 'আখ্যানধর্মী বৈশিষ্ট্যের' জন্য 'আলালের ঘরের দুলাল'-কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই রচনার মাধ্যমে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে, সহজবোধ্য ও বোধগম্য করে সাধুভাষাকে পরিবেশন করা হয়েছিল।
প্রশ্নঃ ৫ লেখকের নাম ও প্রকাশকাল-সহ প্রথম চলিতভাষায় লেখা বাংলা গদ্যের নাম লেখো। এই রচনার বৈশিষ্ট্য কী সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তরঃ প্রথম চলিতভাষায় লেখা বাংলা গদ্য: কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা 'হুতোম প্যাঁচার নক্শা' প্রথম চলিতভাষায় লেখা বাংলা গদ্য। এটি ১৮৬১-৬২ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এটি মূলত ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটায়ারধর্মী রচনা।
রচনার বিষয়: উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা ও শহরতলির ভন্ডামি, উচ্ছৃঙ্খলতা, বুচিহীনতা, সমসাময়িক সমাজজীবনের উৎসব-অনুষ্ঠানের বিবরণ ইত্যাদি সমাজজীবনের নানা টুকরো টুকরো নকশা জাতীয় ঘটনার উপস্থাপন হল এর মূল বিষয়বস্তু।
'হুতোম প্যাঁচার নকশা' রচনার ভাষা ছিল সহজসরল, প্রাঞ্জল। ক্রিয়াপদের ব্যবহার, উচ্চারণরীতি সবেতেই পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল কথা বাংলা ভাষার। এ ভাষায় কথ্য ও সাধু ক্রিয়াপদের মিশ্রণ ছিল না। কালীপ্রসন্ন সিংহ বুঝেছিলেন, নব্য আধুনিক কলকাতার অনাচার, ভ্রষ্টতা, বিকৃতিকে আক্রমণ করতে হলে সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলার থেকে সর্বজনীন কথ্যভাষার প্রয়োগ বেশি প্রভাব বিস্তার করবে।
প্রশ্নঃ ৬ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বে বাংলা উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত রচনাগুলি সম্পর্কে কী জানো? অথবা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বে বাংলা উপন্যাস রচনার প্রস্তুতিপর্বের ধারাটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তরঃ প্রস্তুতিপর্ব: ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে হ্যানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স নামের এক বিদেশিনি বাংলা ভাষা শিক্ষা করে 'The Last Day of the Week' নামক এক ইংরেজি আখ্যান অনুসারে রচনা করেন 'ফুলমণি ও করুণার বিবরণ'। এটি সাধু বাংলায় লেখা। তবে রচনাটিতে লেখিকার কোনো মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায় না। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা 'আলালের ঘরের দুলাল' গ্রন্থটি প্রথম মৌলিক রচনার রূপ লাভ করে। গ্রন্থটির ভাষা অত্যন্ত সহজ ও বোধগম্য। তাঁর অনুসৃত ধারার সার্থক অনুসারী ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। তাঁর লেখা 'হুতোম প্যাঁচার নক্শা' গ্রন্থটি চলিতভাষায় লেখা। তাঁর রচনায় শালীনতা, চিত্রময়তা, বাঙালিয়ানা লক্ষ করা যায়। এই সময়পর্বে আরও দুটি উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত রচনা প্রকাশিত হয়। একটি হল ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের 'ঐতিহাসিক উপন্যাস' এবং অপরটি হল কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের 'দূরাকাঙ্ক্ষের বৃথা ভ্রমণ'।
উল্লিখিত গদ্য আখ্যানগুলি বাংলা উপন্যাসের পথ প্রস্তুত করেছিল। তবে সার্থক বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।