Chapter 18
লৌকিক সাহিত্যের নানা দিক
প্রশ্নঃ ১ লোকশ্রুতি বলতে কী বোঝো? Folklore শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিরূপণ করো।
উত্তরঃ লোকশ্রুতি: 'লোকশ্রুতি'-র ইংরেজি প্রতিশব্দ হল- 'Folklore'। অর্থাৎ কোনো একটি বিশিষ্ট জনসমষ্টি বা জনজাতির দীর্ঘকালব্যাপী ইতিহাসের প্রচলিত নানান গল্প, কাহিনি, জনশ্রুতি-কেই একত্রিতভাবে 'লোকশ্রুতি' বলা হয়ে থাকে। এই 'লোকশ্রুতি'-র বৈশিষ্ট্য হল পরিবর্তনশীলতা। লোকশ্রুতিগুলি সর্বদাই লোকের মুখে মুখে পরিবর্তিত হতে হতে প্রচারিত হতে থাকে। কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং সমষ্টিই লোকশ্রুতির বাহক।
Folk: 'Folk' শব্দটির সর্বজনগৃহীত অর্থ হল-'লোক'।
Lore: 'Lore' শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। প্রাচীন ইংরেজিতে শব্দটি ছিল 'Lar', ডাচ ভাষায় 'Lier' এবং জার্মান ভাষায় 'Lewre'। প্রাচীন টিউটোনিক ভাষায় 'Lore' -এর অর্থ ছিল জ্ঞানদান বা আহরণ করা। পরবর্তীতে এর অর্থ হয়-প্রাচীন বিশ্বাস বা কাহিনি বা 'Wisdom of folk' ।
Folklore: উইলিয়ম জন থম্স প্রথম 'Folklore' শব্দটি ব্যবহার করেন তাঁর 'দ্য এথেনিয়াম' পত্রিকায় লেখা একটি চিঠিতে। 'Folklore' শব্দটি জার্মান 'Volkskunde' শব্দটির সম্ভাব্য অনুবাদ বলে মনে করা হয়। কারও মতে, 'Folklore' হল লোকশ্রুতি: আবার কারও মতে, লোকসংস্কৃতি বা লোকযান।
২) লোকসাহিত্য কাকে বলে? লোকসাহিত্যের প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
উত্তরঃ 'লোকসাহিত্য': লোকসাহিত্য হল, লোকশ্রুতিরই পরিমার্জিত ও পরিণত রূপ। 'লোক'-এর মুখে মুখে রচিত, প্রচলিত ও সংরক্ষিত সাহিত্যকেই সাধারণত 'লোকসাহিত্য' বলা হয়। এই সাহিত্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা সৃষ্ট হলেও সমষ্টির দ্বারাই তা পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং যুগের পর যুগ প্রচলিত হতে থাকে। লোকসাহিত্য কথ্যরূপেই সংরক্ষিত হয়ে এসেছে। তাই পরিবর্তনশীলতাই এই সাহিত্যের ধর্ম, তবে লেখ্যরূপটি মান্যতা পেলে এই পরিবর্তন ব্যাহত হয়- যদিও তাতে লোকসাহিত্যের গুণমান কোনোভাবে হ্রাস পায় না। লোকশ্রুতি বা প্রচলিত কাহিনির লিখিত রূপ উভয়ই লোকসাহিত্যের প্রকরণ।
লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য:
নামহীন: লোকসাহিত্যের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হল যে, এর প্রকরণগুলি-স্রষ্টার নামহীন, কিছু কিছু কাব্য-কবিতায় লেখকের ভণিতা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রচয়িতার নাম জানা যায় না। অর্থাৎ লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যে স্রষ্টার পরিচয় গৌণ, সৃষ্টিই মুখ্য।
পরিবর্তনশীলতা: লোকসাহিত্যের আত্মপ্রকাশ লিখিতরূপে ঘটে না, মৌখিকভাবেই তা প্রচলিত এবং যুগযুগ ধরে সংরক্ষিত হয়। কথ্যরূপে প্রচলিত হওয়ার কারণে সাহিত্যের ভাষা ও রূপটি পরিবর্তিত হতে হতেই নবরূপ লাভ করে ও প্রচলিত হয়। পরিবর্তনশীলতাই লোকসাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
স্মৃতিনির্ভর: লোকসাহিত্যের প্রচার কার্যত স্মৃতি এবং শ্রুতিনির্ভর। সংহত সমাজের মানুষেরা তাদের শুনে, মনে রাখা লোকসাহিত্যের স্মৃতিবিজড়িত রূপটিই আর-এক জনের কাছে ব্যক্ত করে-সেও সেটা শোনে, স্মৃতিতে রাখে। সংহত সমাজের জনগোষ্ঠীই লোকসাহিত্যের প্রধান ধারক ও বাহক।
প্রশ্নঃ ৩ লৌকিক সাহিত্যের স্বরূপটি বিশ্লেষণ করে, এর ভাগগুলি নির্দেশ করো এবং লোকসাহিত্যের উপবর্গগুলি উল্লেখ করো।
উত্তরঃ অলৌকিক সাহিত্যের স্বরূপ: দীর্ঘ ঐতিহ্যশালী কোনো জাতির নিবিড় সন্নিবিষ্ট জীবন - অভিজ্ঞতাপ্রসূত গৌরববোধ, স্বপ্ন ও চেতনা যখন সেই জনসমষ্টি বা তার ব্যক্তিগত কোনো প্রতিভার দ্বারা সৃষ্ট সাহিত্য আঙ্গিকের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে বিস্তৃতি লাভ করে, তখন সেই অনাড়ম্বর সাহিত্য উপকরণকে লৌকিক সাহিত্য বা লোকসাহিত্য বলা যায়।
লোকসাহিত্যের ভাগ: লোকসাহিত্যকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। (১) গদ্যনির্ভর লোকসাহিত্য: লোককথা; (২) পদ্যনির্ভর লোকসাহিত্য: ধাঁধা, ছড়া, প্রবাদ, লোকসংগীত; (৩) গদ্যপদ্যনির্ভর লোকসাহিত্য: লোকনাট্য এবং গীতিকা।
লোকসাহিত্যের উপবৰ্গ: লোকসাহিত্যের সাধারণ উপবর্গগুলি পৃথিবীর অধিকাংশ জাতির ক্ষেত্রে অনেকটাই এক। এর মুখ্য উপবর্গগুলি হল- (ক) কথা বা লোককথা (খ) ছড়া (গ) ধাঁধা (ঘ) প্রবাদ ও প্রবচন।
লোকসাহিত্য কোনো জাতির বৃহত্তর লোকসংস্কৃতির অঙ্গ। একটি জাতির লোকসাহিত্য কখনও ব্যক্তিগত প্রতিভা বা কখনও সমষ্টিগত সংযোজন এবং তাদের সামগ্রিক জীবন অভিজ্ঞতার দ্বারা লবধ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং নিজস্ব নান্দনিকতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রকৃতপক্ষে, একটা গোটা জাতির জীবনভাবনা লোকসাহিত্যে প্রতিফলিত হয়।
প্রশ্নঃ ৪ লোকাচার ও লোকনীতি বলতে কী বোঝো? এদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
উত্তরঃ লোকাচার: লোকাচার হল সমাজের স্বীকৃত বা অনুমোদিত আচরণবিধি, যা কোনো বিশিষ্ট জনসমষ্টি তাদের জীবনকে সর্বাঙ্গসুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য বহুদিন ধরে পালন করে আসছে। লোকাচার পালন বাধ্যতামূলক নয়, এটি মানুষের সাধারণ জীবনযাপনের রীতিনীতি, বিধিনিষেধ মাত্র। যেমন-নমস্কার করা, শুভেচ্ছা বিনিময় ইত্যাদি।
লোকনীতি: লোকনীতি কথাটি এসেছে লাতিন শব্দ 'Moralis' থেকে, যার অর্থ-'প্রথা' বা 'Custom' অর্থাৎ এটির পালন বাধ্যতামূলক। লোকনীতি হল মানবীয় সম্পর্ক ও আচরণের নিয়ন্ত্রক একপ্রকার শিষ্টাচার। এটি সমাজকেও বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। এককথায় লোকনীতি হল-অবশ্যপালনীয় লোকাচার। যেমন-গুরুজনকে শ্রদ্ধা করা, পিতা-মাতার আজ্ঞাপালন ইত্যাদি।
পার্থক্য: লোকনীতি এবং লোকাচারের প্রধান পার্থক্যগুলি হল-
প্রশ্নঃ ৫ লোকবিশ্বাস কী? 'ট্যাবু' (Taboo) ও টোটেম' (Totem) কাকে বলে?
উত্তরঃ লোকবিশ্বাস: লোকবিশ্বাস ও সংস্কার হল এক ধরনের প্রত্যয়। কোনো সংহত জনসমষ্টি যদি কোনো লোকাচারকে কর্তব্য বা অকর্তব্য বলে বিশ্বাস করে এবং প্রত্যহ ব্যাবহারিক জীবনে তা মেনেও চলে, তখন সেই লোকাচার লোকবিশ্বাসে পরিণত হয়। যেমন-মেয়ের শ্বশুর বা শাশুড়ি কেউ মারা গেলে তার বাপের বাড়ি থেকে মেয়ে-জামাই ও তাদের পুত্রকন্যাদের নতুন বস্ত্র দান করতে হয় এবং সেই বস্ত্র পরেই পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
বহু লোকবিশ্বাসই কুসংস্কার বা বিধিনিষেধ তথা 'ট্যাবু' (taboo)-তে পরিণত হয়।
ট্যাবু: 'ট্যাবু' হল সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারজাত বিধিনিষেধ বা অলিখিত নিষেধ। ট্যাবুর মধ্যে ধর্মভাবনা জড়িয়ে থাকে। বিধিনিষেধের প্রতি বিশিষ্ট জনসমষ্টির এত দৃঢ় বিশ্বাস নিহিত থাকে যে, সেই নিষেধ অমান্য করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। এই ভয়ে তারা যুগের পর যুগ নির্দ্বিধায় 'taboo'-র পালন করে চলে। তাই 'ট্যাবু' সমাজ নিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জন করে। ভীতি, অপরাধবোধ, মৃত্যুভয়, বিবেকদংশন ইত্যাদি থেকেই ট্যাবু-র উৎপত্তি।
টোটেম: 'টোটেম' হল-কোনো কিছুকে 'মান্য করা'। কোনো একটি বিশেষ গোত্র বা জনগোষ্ঠী যদি কোনো প্রাণী, বৃক্ষ বা অপ্রাণীবাচক বস্তুকে মান্য করে এই ভেবে যে, ওই প্রাণী; বৃক্ষ বা অপ্রাণীবাচক বস্তুতে তাদের
আত্মা বা প্রাণ সঞ্চারিত হয়ে আছে তবে সেগুলি হল ওই বিশেষ জনগোষ্ঠীর 'টোটেম'। এই বিশ্বাসবোধের কারণে ওই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিশেষ কোনো প্রাণী, বৃক্ষ বা অপ্রাণীর একটি সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই জনগোষ্ঠী মনে করে সেই বিশেষ প্রাণী, বৃক্ষ বা অপ্রাণী থেকেই তাদের জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ ওই টোটেম (Totem) থেকে তারা জন্ম নিয়েছে এবং তাদের মৃত্যুর পর ওই গোত্রের টোটেমেই তাদের আত্মা বিলীন হয়ে যাবে।
প্রশ্নঃ ৬ লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করো।
উত্তরঃ বৈশিষ্ট্য: লোকসাহিত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
লোকসাহিত্যের উদ্ভবের সময় তা মৌখিকভাবেই আত্মপ্রকাশ করে, লিখিতরূপে এর প্রকাশ ঘটে না। পরবর্তীতে লোকসাহিত্য লিখিত হলে তার একটি প্রামাণ্য রূপ সৃষ্টি হয় মাত্র।
লোকসাহিত্যের বিষয় সাধারণত পল্লিসমাজ ও সংহত সমাজভুক্ত জনগোষ্ঠীর 'লোক' বা 'ফোক' - দের জীবনযাপন, তাদের প্রাত্যহিক জীবনযুদ্ধ, আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস এসব কিছুকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। তবে লোকসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তা ভৌগোলিক মানচিত্রকে মান্যতা দেয় না-লোক সাহিত্য যে গ্রামেই রচিত হতে হবে এরূপ কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, গ্রাম বা পল্লিসমাজকে ঘিরে সৃষ্ট হলেই তা লৌকিক সাহিত্যের উপাদানরূপে স্বীকৃতি পায়।
লোকসাহিত্যে স্রষ্টার পরিচয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যায়। কারণ লোকসাহিত্যে সৃষ্টিই মুখ্য, স্রষ্টা গৌণ।
লোকসাহিত্য কোনো ব্যক্তি-বিশেষের রচনা নয়, সংহত সমাজের সৃষ্টি। তবে সমাজের অন্তর্ভুক্ত 'লোক'-এরা যে একত্রিত হয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে তা নয়, কোনো একটি লোকসাহিত্য প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি-বিশেষ দ্বারাই সৃষ্ট হয় কিন্তু পরে তা সমষ্টির দ্বারা পরিমার্জন-পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ লাভ করে। তাই লোকসাহিত্য সংহত সমাজের সৃষ্টি বলেই গণ্য হয়। পল্লিসমাজের নিরক্ষর, ঐতিহ্যমুখী লোকেরাই লোকসাহিত্যের মূল স্রষ্টা।
লোকসাহিত্যের প্রচার কার্যত স্মৃতি এবং শ্রুতিনির্ভর। সংহত সমাজের মানুষেরা তাদের শুনে, মনে রাখা লোকসাহিত্যের স্মৃতিবিজড়িত রূপটিই আর-এক জনের কাছে ব্যক্ত করে-সেও সেটা শোনে, স্মৃতিতে রাখে। সুতরাং সংহত সমাজের জনগোষ্ঠীই লোকসাহিত্যের প্রধান ধারক ও বাহক।
স্মৃতি এবং শ্রুতিজাত বলেই লোকসাহিত্য সদাপরিবর্তনশীল। 'লোক'-এর মুখে মুখে প্রচারিত হতে হতে লোকসাহিত্যের রূপটি পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হতে হতে এগিয়ে চলে। যদিও লোকসাহিত্যের লিখিত রূপ প্রকাশ পেলে এই পরিবর্তনশীলতা বহুলাংশে ব্যাহত হয়। লিখিত রূপটিকেই মান্যরূপে বিবেচনা করা হয়।
লোকসাহিত্যের একই বিভাগের অন্তর্গত বিভিন্ন রচনার মধ্যে আঙ্গিকগত কোনো পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। যেমন দুটি উপন্যাস বা দুটি নাটকের মধ্যে আঙ্গিকগত পার্থক্য থাকা সম্ভব কিন্তু দুটি লোককথা-র মধ্যে বা লোকনাট্যের মধ্যে আঙ্গিকগত কোনো পার্থক্য দেখা যায় না।
ভাব ও প্রকরণের দিক থেকে লোকসাহিত্য অত্যন্ত সহজসরল এবং জটিলতার কোনো অবকাশ এতে নেই বললেই চলে।
প্রশ্নঃ ৭ আধুনিক সাহিত্যে লোকসাহিত্যের প্রভাব আলোচনা করো।
উত্তরঃ আধুনিক সাহিত্যে লোকসাহিত্য: গল্পের প্রতি মানুষের চিরকালীন আকর্ষণ থেকেই সাহিত্যের সৃষ্টি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং আদিতম মহাকাব্যগুলি তথা ইলিয়ড, ওডিসি, রামায়ণ, মহাভারত সমস্তই কাহিনিমূলক। এই আখ্যান বা কাহিনিই পরবর্তীতে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়- লিখিত গল্পকাহিনি বা আখ্যান এবং মৌখিক গল্পকাহিনির ধারা। এই লিখিত রূপটিই ক্রমবিকশিত হয়ে উপন্যাস বা ছোটোগল্পরূপে আখ্যায়িত হল, আর মৌখিক প্রকরণটি লোকসাহিত্যরূপে রূপকথা, ব্রতকথা, উপকথা, ইতিকথা, পুরাকথা নামে চিহ্নিত হল। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতের গল্পকাহিনিগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেগুলি বহু পূর্ব থেকেই জনশ্রুতিতে মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ আদি সাহিত্যের মধ্যেও শায়িত রয়েছে লোকসাহিত্যের প্রচ্ছন্ন রূপ। আধুনিক সাহিত্য ব্যক্তিমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি, আর লোকসাহিত্য সমষ্টিগত সৃষ্টি- তথাপি এই দুটিকে আলাদা করা যায় না।
আধুনিক এবং লোকসাহিত্য পরস্পর নির্ভরশীল। রবীন্দ্রনাথ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "নিম্নসাহিত্য এবং উচ্চ সাহিত্যের মধ্যে একটি ভেতরকার যোগ আছে।" এমনকি দেশীয় লোকসাহিত্যের সঙ্গে বিদেশীয় রূপকথার সাদৃশ্য আছে বলেও অনেকে মনে করেন। যেমন, আমাদের অতিপরিচিত 'সিন্ডেরিলা'র (Cinderella) রূপকথাটির মূল বিষয়টি হল-বিমাতার অত্যাচার, যা আমাদের দেশের 'শীত-বসন্তের রূপকথা'টিরও বিষয়মূল। কেবল আধুনিক লিখিত সাহিত্যগুলি সমাজ ও সময়ের তাগিদে নিজের রূপ পরিবর্তন করতে করতে বিবর্তিত হয় কিন্তু লোকসাহিত্যের বহিরাঙ্গের রূপটি আপাতভাবে সর্বদা অপরিবর্তনশীল-কেবল তার আদি সংস্করণটি মুখে মুখে প্রচারিত হওয়ার দরুন পালটে পালটে যেতে থাকে।
লোকসাহিত্যের অনেক প্রকরণ নিয়ে বহুলাংশে আধুনিক সাহিত্য রচিত হয়েছে। যেমন-লৌকিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রটিকে কেন্দ্র করেই বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন 'কপালকুণ্ডলা'। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত 'বিজয় বসন্ত'-র রূপকথাটি অবলম্বনে রচনা করেন 'কীর্তিবিলাস' নাটক। 'গুলেবকাওলি'-র রূপকথাধর্মী উপাখ্যানটি ঊনবিংশ শতকে গদ্য-নাটক-কাব্য-তিনটি ধারাতেই প্রচলিত ছিল। ১৮৬৩-তে প্রকাশিত 'পারিজাত কুসুম' গদ্যটিও লৌকিক রূপকথাজাত। এ ছাড়াও লৌকিক বহু উপাদান সমৃদ্ধ করেছে আধুনিক সাহিত্যকে এবং আজও করে চলেছে।
প্রশ্নঃ ৮ বাংলা আধুনিক উপন্যাসে বিভিন্ন লৌকিক উপাদান যেভাবে জায়গা করে নিয়েছে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তরঃ উপন্যাসে লৌকিক উপকরণ: গল্প শোনার প্রবৃত্তিই মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি। সেই তাগিদ থেকেই কথাসাহিত্যের সূচনা বলে মনে করা হয়। লিখিত কথাসাহিত্যে ঐতিহ্যের বেশ ধারণ করে ঢুকে পড়ে নানান লোকবিশ্বাস, লোককথা, লৌকিক সংস্কার। তারই কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হল-
কপালকুণ্ডলা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসে স্বামীকে বশীকরণের জন্য ওষুধ আনার প্রসঙ্গ রয়েছে। কপালকুণ্ডলাকে বলতে শোনা যায়, "শ্যামাসুন্দরী স্বামীকে বশ করিবার জন্য ঔষধ চাহে আমি ঔষধের সন্ধানে যাইতেছি”-এই প্রসঙ্গ সম্পূর্ণভাবেই লোকবিশ্বাসজাত। বিষবৃক্ষ: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিষবৃক্ষ' উপন্যাসে ব্যবহৃত গীত এবং ছড়াগুলিতে লৌকিক প্রভাব লক্ষ করা যায়-
"আয়রে চাঁদের কণা
তোরে খেতে দিব ফুলের মধু, পরতে দেব সোনা
আতর দিব শিশি ভোরে,
গোলাপ দিব কার্চ্চা করে
আর আপনি সেজে বাটা ভোরে
দিব পানের দোনা।"
কঙ্কাবতী: ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের 'কঙ্কাবতী' উপন্যাসটি যাদুবাস্তবতার জগৎকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এটি একটি ছকভাঙা উপন্যাস, যাতে ঔপন্যাসিক তাঁর পাঠকদের এক ফ্যান্টাসি-র জগতে নিয়ে যান। রূপকথা-র আঙ্গিকে মনে করিয়ে দেয় এই উপন্যাস। উপন্যাসের নামচরিত্র কঙ্কাবতীর বিবাহ হয় একটি বাঘের সঙ্গে-এ ছাড়াও সেখানে ব্যাং, মশা, হাতি, চাঁদ, নক্ষত্র, ভূতনি-সহ নানাপ্রকার চরিত্রের বিচিত্র কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। এসব আমাদের লৌকিক পশুকথা-র আভাস দেয়।
'গণদেবতা: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'গণদেবতা' উপন্যাসে অনিরুদ্ধ-পদ্মের নিঃসন্তান জীবনে সন্তানলাভের জন্য ঠাকুরের কাছে দোর ধরার প্রসঙ্গ এসেছে। জগন ডাক্তার বলেছেন, "সাপের স্বপ্ন দেখলে কী হয় জানিসতো? বংশবৃদ্ধি, ছেলে হয়..." লোকসমাজে এই ধরনের স্বপ্নভিত্তিক বিশ্বাসের প্রচলন রয়েছে।
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' উপন্যাসে বাঁশবনের অন্ধকারের যে বর্ণনা দিয়েছেন ঔপন্যাসিক, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে সেখানকার মানুষের অনেক লৌকিক বিশ্বাস ও কুসংস্কারের কাহিনি।
"বাঁশবনে দপদপিয়ে অর্থাৎ দপদপ করে জ্বলে বেড়ায় পেত্যা অর্থাৎ আলেয়া। মধ্যে মধ্যে শাঁকচুন্নির চিলের মতন ডাক শোনা যায় শ্যাওড়া, শিমূলের মাথা থেকে। বাঁশবনে ক্যাঁ-ক্যাক-ক্যাঁ ডাক ওঠে। কাহারেরা মনশ্চক্ষে স্পষ্ট দেখতে পায়-গেছো পেত্নী কি কোনো ছোকরাভূত বাঁশের ডগাটা একবার মাটিতে ঠেকছে আবার ছেড়ে দিচ্ছে সেটা উঠে যাচ্ছে উপরে।"
পুতুল নাচের ইতিকথা: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুল নাচের ইতিকথা' উপন্যাসে লৌকিক জীবনচর্যা, লোকসংস্কার, ট্যাবু ইত্যাদির প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটেছে। গ্রামের মানুষেরা যে আজও তাদের নিজস্ব লৌকিক বিশ্বাস, কুসংস্কার, আচার নিয়ে নিজেদের এক ভিন্ন জগৎ গড়ে তুলে প্রবাহিত হয়ে চলেছে-তারই প্রমাণ মেলে এই উপন্যাসে। শশী ডাক্তার যখন পঞ্চানন চক্রবর্তীকে ভুতোর মারা যাওয়ার খবর জানায় তখন তার প্রত্যুত্তর-"বটে? বাঁচল না বুঝি ছেলেটা? তবে তোমাকে বলি শোনো শশী, ভুতো যেদিন আছাড় খেলে, দিনটা ছিল বিষ্যুদবার। খবর পেয়ে মনে কেমন খটকা বাধল। বাড়ি গিয়ে দেখলাম পাঁজি-যা ভেবেছিলাম। ছেলেটাও পড়েছে বারবেলাও হয়েছে খতম। লোকে বলে বারবেলা কি সবটাই সর্বনেশে বাপু? বিপদ যত ওই খতম হবার বেলা।"-বৃহস্পতিবার বারবেলায় আঘাত পেলে মৃত্যু অবধারিত এমন লোকবিশ্বাসে বিশ্বাসী বহু লোকসমাজের মানুষ। লোকবিশ্বাসের এই রকম দেখে শশী ডাক্তারের মনে হয়েছিল-"এতগুলি মানুষের মনে মনে কি আশ্চর্য মিল। কারো স্বাতন্ত্র্য নাই, মৌলিকতা নাই, মনের তারগুলি একসুরে বাঁধা, সুখ দুঃখ এক, রসাভূতি এবং ভয় ও কুসংস্কারে এক, হীনতা ও উদারতার হিসাবে কেউ কারো চেয়ে এতটুকু ছোট অথবা বড় নয়।"-শশীর এই মনে হওয়া আদ্যন্ত একটি সংহত সমাজের পরিচয়কে বহন করে। এভাবেই আধুনিক সাহিত্যে মিশে থাকে লোকসংস্কৃতির সাবেকি উপকরণ।
প্রশ্নঃ ৯ কারা 'লোক' বা 'ফোক' নয়? লোকসাহিত্য লিখিত হলে তা কি জনশ্রুতির গুরুত্ব হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?-তোমার অভিমত জানাও।
উত্তরঃ যারা লোক বা ফোক নয়: শহুরে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, আর্থিকভাবে সম্পন্ন, শিক্ষিত, চাকুরিজীবী মানুষ যারা কোনো সমমনোভাবাপন্ন, সম-আচার পালনে বিশ্বাসী নয়, সমবর্ণের সংহত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদেরকে 'লোক' বা 'ফোক' বলা যায় না। এরা কর্ম-ধর্ম, জীবনযাত্রার মান ও জীবিকা সূত্রে একে অপরের থেকে আলাদা হয়।
প্রসঙ্গত, শহরে বাস করে নাগরিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে যারা লোকনৃত্য, লোকনাট্য বা লোকগান পরিবেশন করেন তারা কিন্তু 'লোক' বা 'ফোক' নন। আবার, শহরে বাস করেও যারা জীবনচর্চা ও মানসচর্চায় পল্লির শিকড়টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, বিশ্বায়নের যুগেও যারা ঐতিহ্যবিমুখ হয়নি তারা কিন্তু 'ফোক'-এরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ শহরে বাস করলেই কেউ 'লোক' নন, গ্রামে বাস করলেই তিনি 'লোক'-এই ভৌগোলিক মানচিত্রগত মানদণ্ড 'লোক' বা 'ফোক' মানে না। যেমন-পল্লি অঞ্চলে বসবাসকারী, আর্থিকভাবে সম্পন্ন, বিত্তবান, শিক্ষিত মানুষও 'ফোক' বা 'লোক' নন।
লোকসাহিত্যের লিখিত রূপ জনশ্রুতির অন্তরায়: লোকসাহিত্য কখনোই লিখে রচনা করা যায় না। লোকসাহিত্যের যখন উদ্ভব হয় তখন তা মুখে মুখেই রচিত হয় এবং মুখে মুখেই প্রচারিত হয়। কিন্তু বর্তমানে লোকসাহিত্যকে লিখিতরূপে সংরক্ষণ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত এবং আবশ্যক বলে মনে করেছেন বহু সমালোচক। কিন্তু সেই লিখন ও সংরক্ষণের কাজটি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষিত গবেষকের হাতে হওয়াই কাম্য। একজন অভিজ্ঞ গবেষক লোকসাহিত্য সংরক্ষণকালে, যে জনশ্রুতিটি যেরূপভাবে শুনেছেন সেটিকে সেরূপভাবেই লিপিবদ্ধ করে রাখেন-ফলত, এতে জনশ্রুতির গুরুত্ব হ্রাস পায় না। তবে লোকসাহিত্য লিখিতরূপে প্রকাশিত হলে 'লেখ্যরূপ'-টিই একটি মান্যরূপ হিসেবে গৃহীত হয়। তাই অনেকক্ষেত্রেই জনশ্রুতি-র মাধ্যমে, লোকসাহিত্যের প্রচার হতে হতে পরিবর্তিত হওয়ার ঝোঁকটি কমে যায়। লোকসাহিত্যের লিখিত রূপটি তার পরিবর্তনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং এটির একটি বিশিষ্ট রূপ সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ ১০ টোটেম' ও 'ট্যাবু কি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত?- সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তরঃ 'টোটেম' ও 'ট্যাবু': 'টোটেম' শব্দটির অর্থ হল- 'মান্য করা'। কোনো একটি বিশেষ গোত্র বা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা যদি কোনো প্রাণী, বৃক্ষ বা অপ্রাণীবাচক বস্তুকে তাদের জন্মের কারণ হিসেবে মান্য করে তখন সেই প্রাণী, বৃক্ষ বা অপ্রাণীবাচক বস্তুই হয় সেই জনগোষ্ঠীর টোটেম (Totem)।
আর, 'ট্যাবু' (Taboo) হল সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন বিশ্বাস ও কুসংস্কারজাত বিধিনিষেধ, যা ভীতি থেকে তৈরি হয়।
টোটেম' ও 'ট্যাবু'-র সম্পর্ক: সাঁওতাল জনজাতির হাঁসদা গোত্রের মানুষেরা মনে করে যে, পাতিহাঁসের মধ্যে তাদের আত্মা সঞ্চারিত হয়েছে। পাতিহাঁস থেকেই তাদের জন্ম এবং মৃত্যুর পর তারা পাতিহাঁসের মধ্যেই বিলীন হয়ে যাবে। এই বিশ্বাসের জেরে পাতিহাঁস হয়ে উঠেছে ওই নির্দিষ্ট সাঁওতাল জনজাতির 'টোটেম'।
এই 'টোটেম' প্রচলিত থাকার ফলে, প্রাণনাশের ভয়ে সাঁওতাল জনজাতির হাঁসদা গোত্রের লোকেরা পাতিহাঁস হত্যা করে না। বিশ্বাস থেকে জাত এই নিষেধটি হল একটি 'ট্যাবু'।