Chapter 3


ভাব সম্মিলন- বিদ্যাপতি


রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর


প্রশ্নঃ ১ ভাব সম্মিলন' কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।


উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।


প্রশ্নঃ ২ আলোচ্য 'ভাব সম্মিলন পদটির মূলভাবটি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দাও। 


উত্তরঃ 'বিষয়সংক্ষেপ' অনুসরণে লেখো।


প্রশ্নঃ ৩ 'ভাব সম্মিলন' কাকে বলে? আলোেচ্য পদটিতে রাধার আনন্দের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।


অথবা, বৈষুব পদাবলি সাহিত্যে 'ভাব সম্মিলন' পর্যায়টির বিশেষত্ব কী? পাঠ্যাংশের অন্তর্গত 'ভাব সম্মিলন' পর্যায়ের পদটিতে শ্রীরাধার ভাবতন্ময়তার যে রূপ প্রকাশ পেয়েছে তার পরিচয় দাও।


উত্তরঃ ভাৰসম্মিলন: বৈয়ব পদাবলিতে শ্রীকৃষ্ণ মথুরা চলে যাওয়ার পরেও শ্রীরাধিকার ভাবলোকে রাধাকৃষ্ণের মিলনচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। রাধার অনুভবে শ্যাম আবার ব্রজধামে ফিরে এসেছেন শ্রীরাধিকার কাছে। তাঁর এই ফিরে আসার সুখের অনুভূতিতে শ্রীরাধিকা উল্লসিত হয়েছেন। একে ভাবোল্লাস বা ভাবসম্মিলন বলে।


শ্রীরাধিকার আনন্দের চিত্র: আমাদের পাঠ্য 'ভাব সম্মিলন' পদে শ্রীরাধিকা তাঁর সখীকে জানিয়েছেন, তাঁর আনন্দের কোনো সীমা নেই। কারণ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভাবলোকে আবার ফিরে এসেছেন। প্রাণনাথ শ্রীকৃষ্ণ চিরদিন তাঁর মনের মন্দিরে বসবাস করবেন। ফলে, শ্রীরাধিকার তাঁকে আর হারিয়ে ফেলার কোনো ভয় নেই। দূরে থাকার সময় পাপী চাঁদ তাঁকে যতটা দুঃখ দিয়েছে, এখন প্রিয়তম কৃষ্ণের মুখদর্শনে তাঁর ততটাই সুখ অনুভূত হয়েছে। দীর্ঘ বিরহ পর্যায়ে শ্রীরাধিকা অনুভব করেছেন কৃষ্ণই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাই মহামূল্যবান ধনরত্ন পেলেও তিনি আর কৃষ্ণকে দূরদেশে পাঠাবেন না। তাই শ্রীরাধিকার ভাবজগতে পুনরায় শ্রীকৃষ্ণের মিলনে মনের আনন্দ প্রকাশিত হয়েছিল।


প্রশ্নঃ ৪ "কি কহব বে সখি আনন্দ ওর।"- পঙ্ক্তিটি কার লেখা, কোন্ পর্যায়ের পদ? এই পদে নায়িকা রাধা কীভাবে মিলন সুখ অনুভব করেছেন তা নিজের ভাষায় লেখো।


অথবা, "কি কহব বে সখি আনন্দ ওর।"- এই পদটি কোন্ পর্যায়ের পদ এবং এখানে 'ওর' শব্দটির অর্থ লেখো। আলোচ্য পদে বক্তার আনন্দ কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে লেখো। 


উত্তরঃ পর্যায়: "কি কহব রে সখি আনন্দ ওর"-আলোচ্য কবিতাটি প্রাক্-চৈতন্য পর্বের বৈয়ব পদসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদকর্তা বিদ্যাপতির রচিত। এটি ভাবোল্লাস ও মিলন পর্যায়ের পদ।


অর্থ: এখানে 'ওর' শব্দটির অর্থ হল সীমা বা শেষ। শ্রীরাধিকার আনন্দের শেষ নেই আলোচ্য উক্তিতে এই বিষয়টিই পরিস্ফুট।


বক্তার আনন্দের প্রকাশ: ৩নং প্রশ্নোত্তরের 'শ্রীরাধিকার আনন্দের চিত্র' অংশটি দ্রষ্টব্য।


প্রশ্নঃ ৫ "চিরদিনে মাধব মন্দিরে মোর"- কে, কাকে মাধব বলেছেন? উক্তিটির তাৎপর্য কী?


উত্তরঃ যে বলেছেন: কবি বিদ্যাপতি রচিত 'ভাব সম্মিলন' কবিতায় উদ্ধৃত উক্তিটি শ্রীরাধিকার।


যাকে বলেছেন: আলোচ্য উদ্ধৃতিতে রাধিকা শ্রীকৃয়কে মাধব বলে উল্লেখ করেছেন।


উক্তিটির তাৎপর্য: ভাব সম্মিলনের পদে আমরা দেখি বিরহ-বিচ্ছেদে জর্জরিত শ্রীরাধিকা তাঁর মনে মাধব অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি উপলব্ধি করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ছেড়ে গিয়েছিলেন মথুরায়। শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতি প্রতি মুহূর্তে তাঁকে দগ্ধ করেছে। কিন্তু শ্রীরাধিকা এতদিন পর উপলব্ধি করেছেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর শারীরিক বিচ্ছেদই সম্ভব। মানসলোকে তাঁরা অভিন্ন সত্তা। তাই রাধিকার ভাবলোকে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁর প্রাণনাথ। আর সেই মুহূর্তেই তাঁর বিরহ-বেদনা দূর হয়ে গিয়েছে। এখন তাঁর মনোজগৎ কৃষ্ণময়। তিনি ভাবছেন চিরদিন কৃষ্ণ তাঁর মনের মন্দিরে বিরাজ করবেন। অর্থাৎ, কৃষ্ণ চিরদিন শ্রীরাধিকার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকবেন।


প্রশ্নঃ ৬ "পাপ সুধাকর যত দুখ দেল।


পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।।"- কার, কখন এই উপলব্ধি ঘটে? তাঁর এই মন্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করো। 


উত্তরঃ যাঁর উপলবিধ: বিদ্যাপতির লেখা আলোচ্য 'ভাব সম্মিলন' কবিতায় এই উপলব্ধি শ্রীরাধিকার।


যখন এই উপলব্ধি: কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে, প্রেমময় চাঁদের আলো রাধাকে কৃষ্ণের কথা মনে করাত। কিন্তু শ্রীরাধিকা কৃষ্ণকে কাছে পেতেন না। তাই দীর্ঘ বিরহ শেষে ভাবলোকে কৃল্পকে কাছে পেলে শ্রীরাধিকার এই উপলব্ধি হয়।


মন্তব্যের কারণ: শ্রীরাধা যখন প্রিয় কৃষ্ণের বিরহে কাতর, তখন চাঁদের মায়াবী জ্যোৎস্না যেন কৃষ্ণের কথা মনে করিয়ে রাধার বিরহ যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলত। চাঁদের জ্যোৎস্নালোক শ্রীরাধাকে আরও বেশি কৃষ্ণের কথা মনে করাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাধিকার এই বিরহ যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে। শ্রীরাধিকা পরম প্রিয়ের সন্ধান পেয়েছেন ভাবলোকে। তাই তাঁর দুঃখের অবসান ঘটেছে।


বৃন্দাবন ছেড়ে শ্রীকৃয় চিরতরে মথুরায় চলে যাওয়ায় রাধার বিরহ গভীরতর হয়ে উঠেছিল। বৈয়ব পদকর্তা বিদ্যাপতি রাধার এই হৃদয়যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু শ্রীরাধার এই বিরহজনিত দুঃখ বেদনাকেই একমাত্র সত্য বলে মেনে নিতে রাজি নন বৈয়ব কবি বিদ্যাপতি। কৃষ্ণের মথুরা গমনের সত্যতাকে মেনে নিয়ে, শ্রীরাধার তীব্রতর হৃদয়বেদনা অনুভব করে, বিদ্যাপতি ভাবলোকে তাঁদের মিলন সম্পন্ন করিয়েছেন।


কৃষ্ণের ধ্যানে তন্ময় হয়ে রাধা মানসলোকে মিলিত হয়েছেন প্রিয়ের সঙ্গে। মনের মন্দিরে কৃষ্ণকে পেয়ে আর হারানোর ভয় নেই তাঁর। তাই অপরিসীম আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছেন রাধা। বিরহকালে পাপী চাঁদের আলো তাঁকে যত দুঃখ দিয়েছিল, ভাবলোকে প্রিয়কে চিরতরে পেয়ে ঠিক ততখানিই সুখের অনুভূতি হয়েছে রাধার।


প্রশ্নঃ ৭ "পাপ সুধাকর যত দুখ দেল।"- 'সুধাকর' শব্দের অর্থ কী ও সুধাকরকে 'পাপী' বলা হয়েছে কেন? 'যত দুখ' বলতে এখানে কীসের ইঙ্গিত করা হয়েছে?


অথবা, "পাপ সুধাকর যত দুখ দেল।"- পাপ সুধাকর কাকে, কেন বলা হয়েছে? উক্তিটির তাৎপর্য আলোচনা করো।


উত্তরঃ সুধাকর শব্দের অর্থ: 'সুধাকর' শব্দের অর্থ হল চাঁদ বা চন্দ্র। 


সুধাকরকে পাপী বলার কারণ: বিদ্যাপতির লেখা 'ভাব সম্মিলন' কবিতায় আমরা দেখি প্রিয়তম কৃষ্ণের বিরহে রাধিকা যখন কাতর, তখন চাঁদের মায়াবী জ্যোৎস্না যেন আরও বেশি করে তাঁকে কৃষ্ণের কথা মনে করাচ্ছে। অথচ তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে যেতে পারছেন না। শ্রীরাধিকার বিচ্ছেদবেদনা দ্বিগুণ করে তোলার জন্য সুধাকরকে পাপী বলা হয়েছে। 


যত দুখ প্রসঙ্গ: শ্রীরাধিকাকে ফেলে রেখে প্রিয় কৃষ্ণ গিয়েছেন মথুরায়। সমগ্র বৃন্দাবন আকুল হয়ে উঠেছে রাধিকার বিরহ-কাতরতায়। বৃন্দাবনের বক্ষে নেমে আসা মায়াবী চাঁদের জ্যোৎস্নালোক সেই বেদনাকে দ্বিগুণ করেছে। চাঁদের প্রতি তাই শ্রীরাধিকার মনে বড়োই আক্রোশ জন্মেছে। প্রিয়-বিচ্ছেদে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। প্রিয়-মিলনের পূর্বে রাধার এরূপ অবস্থার বর্ণনাতেই 'যতদুখ' শব্দবন্ধটির অবতারণা।


প্রশ্নঃ ৮ "পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।।"- 'পিয়া-মুখ' কার ও তা দেখে কে সুখ লাভ করেছে? তাঁকে দেখে কীভাবে সুখ পাওয়া গেল?


উত্তরঃ পিয়া-মুখ যাঁর: 'পিয়া-মুখ' বলতে পাঠ্য 'ভাব সম্মিলন' পদটিতে শ্রীকৃষ্ণের মুখশ্রীর কথা বলা হয়েছে।


যে সুখলাভ করেছে: 'পিয়া-মুখ' দর্শন করে স্বয়ং শ্রীরাধিকা সুখ লাভকরেছেন।


যেভাবে সুখ পাওয়া গেল: বৃন্দাবন ছেড়ে কৃষ্ণ বহুদিন যাবৎ মথুরায় অবস্থান করছেন। তাঁর শূন্যতা বৃন্দাবনকে মলিন করেছে। বৃন্দাবনবাসী দীর্ঘদিন কৃষ্ণকে না দেখতে পেয়ে আকুল হয়ে উঠেছে। আর তাঁর প্রাণাধিক প্রিয়া শ্রীরাধিকার অবস্থা বড়োই করুণ! দুষ্ট চন্দ্র বারবার কৃষ্ণের কথা মনে করিয়ে তাঁকে আরও বেশি জর্জরিত করছে। দীর্ঘ অদর্শনে রাধার মনে কৃষ্ণের জন্য প্রবল বিরহযন্ত্রণা জেগে উঠেছে। কিন্তু হঠাৎই ভাবসম্মিলনের অনুভূতিতে শ্রীরাধিকা দেখেন, তাঁর মানসপটে শ্রীকৃষ্ণ যেন সর্বত্র, সর্বক্ষণ বিরাজ করছেন। তাই শ্রীরাধিকার মনে কৃষ্ণকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখ মুহূর্তে মুছে গিয়েছে। তাই মনোজগতের ভাবনায়, কৃষ্ণকে কাছে পেয়ে শ্রীরাধিকা সুখ লাভ করেছেন।


প্রশ্নঃ ৯ "আঁচর ভরিয়া যদি মহানিধি পাই


তব হাম পিয়া দূর দেশে না পাঠাই" কে, কেন পিয়াকে দূরদেশে পাঠাবেন না? এই উক্তির আলোকে বক্তার মানসিকতা ব্যাখ্যা করো।


উত্তরঃ যে, যেই কারণে: বিদ্যাপতির লেখা পাঠ্য 'ভাব সম্মিলন' কবিতা থেকে গৃহীত আলোচ্য উক্তিতে আমরা দেখি শ্রীরাধিকা, তাঁর প্রিয় কৃষ্ণকে দূরদেশে পাঠাবেন না। কারণ শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সুদীর্ঘ বিচ্ছেদের পর মানসলোকে শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করে রাধিকার মনে সবেমাত্র দুঃখের অবসান ঘটেছে। তাই তিনি পুনরায় তাঁর প্রাণাধিক প্রিয়কে হারিয়ে ফেলতে চান না।


বক্তার মানসিকতা: প্রিয়তম কৃষ্ণ দূরদেশে চলে গেলে শ্রীরাধিকা প্রিয়বিরহে কাতর হয়ে পড়েন। শ্রীকৃয় তাঁর প্রাণনাথ, তাঁরা অভিন্ন সত্তা। তাই শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতি রাধিকাকে মৃতবৎ করে তুলেছে। মণিহারা ফণীর ন্যায় তিনি ছটফট করছেন। তাই নিঃসঙ্গ রাধা এরপর যখন কৃষ্ণকে নিজের ভাবজগতে পুনরায় ফিরে পান, তখন তিনি অনুভব করেন কৃষ্ণই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাই কোনো কিছুর বিনিময়ে শ্রীরাধিকা অমূল্য কৃষ্ণকে দূরদেশে পাঠাতে রাজি নন। কারণ প্রিয়বিরহ তাঁর পক্ষে পুনরায় সহ্য করা অসম্ভব, মৃত্যুর সমান। আঁচল ভরে মূল্যবান ধনরত্ন পেলেও রাধা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ শ্রীকৃষ্ণকে আর দূরে যেতে দেবেন না।