Chapter 14
বাংলা গদ্য-প্রবন্ধের ধারা
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ বাংলা গদ্যের উন্মেষ পর্বটি সংক্ষেপে বিবৃত করো।
উত্তরঃ ভূমিকা: আধুনিক যুগের অন্যতম সাহিত্যিক মাধ্যম হল গদ্য। বিশ্বসাহিত্যের সব ভাষাতেই দেখা যায় পদ্যের আগমন আগে এবং গদ্যের আগমন বেশ পরে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে পয়ার জাতীয় ছন্দের নমনীয়তার জন্যই গদ্যের প্রকাশ বিলম্বিত হয়। আধুনিক কাল ও তার বিচিত্র জটিল জীবনযাত্রার বাস্তবতা, যুক্তিবোধ বাংলা গদ্যের উদ্ভবকে ত্বরান্বিত করেছিল।
বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন: বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে লিখিত কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের একটি পত্র উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী পর্যায়ে অষ্টাদশ শতকে দোম আন্তোনিও রচিত 'ব্রাহ্মণ রোমান-ক্যাথলিক সংবাদ' ও মনো-এল-দা-আসুম্পসাঁও রচিত 'কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ' রোমান হরফে লিসবন শহর থেকে মুদ্রিত হয়। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হ্যালহেডের 'আ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ' গ্রন্থে বাংলা গদ্যের কিছু নমুনা থাকলেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বাংলা গদ্যের অনুশীলন শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আনুকূল্যে।
অনুবাদ সাহিত্যের সৃষ্টি ও তার প্রভাব: বাংলা গদ্যের উন্মেষ পর্বে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন ও শ্রীরামপুর প্রেসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শ্রীরামপুর মিশন থেকে উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্শম্যানের নেতৃত্বে বাংলা-সহ অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষায় বাইবেল অনূদিত ও প্রচারিত হতে থাকে। বাইবেলের অনুবাদ 'ধর্মপুস্তক' নামে মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়। এর পাশাপাশি 'কৃত্তিবাসী রামায়ণ' (১৮০১) ও 'কাশীদাসী মহাভারত' (১৮০২) মুদ্রিত হয়ে আপামর বাঙালি জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
বাংলা গদ্যের বিকাশ: ঔপনিবেশিক ভারতে লর্ড ওয়েলেসলি গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্য নির্বাহ করার জন্য। ব্রিটিশ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষার সঙ্গে পরিচিতি করানোর জন্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার লালবাজারে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজেরই বাংলা বিভাগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন উইলিয়াম কেরি। তিনি ও তাঁর তত্ত্বাবধানে বাংলার পন্ডিতবর্গের হাতে বাংলা গদ্য প্রাণ পায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের সূত্রেই বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিকাশ পর্ব শুরু হয়। তাই বাংলা গদ্যবিকাশের ক্ষেত্রে প্রথম গৌরব ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও তার লেখকগোষ্ঠীরই প্রাপ্য।
প্রশ্নঃ ২ শ্রীরামপুর মিশনের প্রতিষ্ঠাকাল উল্লেখ করে এই কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য লেখো। বাংলা গদ্যের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তরঃ প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড, জশুয়া মার্শম্যান-এই ত্রয়ী মিশনারির উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
উদ্দেশ্য: এদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্যই এই মিশন স্থাপিত হয়। বলা বাহুল্য, খ্রিস্টধর্মকে আপামর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বাংলা গদ্যচর্চা এবং বাইবেলের বাংলা অনুবাদ একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে।
অবদান: শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে পরেই বাংলা গদ্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগে সেখানে মুদ্রণযন্ত্র বসানো হয়। এখানকার ছাপাখানায় মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ হল 'মঙ্গল সমাচার মতিউর রচিত।' মিশন থেকে বাইবেলের অনুবাদ, জিশুর চরিতকাব্য-নিবন্ধ, বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার পাশাপাশি বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ, বাংলা হরফে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ব্যবস্থা করা হয়। ফলত, পুথিনির্ভর বাংলা গদ্য-পদ্য প্রসার লাভকরে। এই মিশনের উদ্যোগে হ্যালহেড সাহেবের 'বাঙ্গালা ব্যাকরণ' গ্রন্থে সর্বপ্রথম নতুন বাংলা হরফ ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্নঃ ৩ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগোষ্ঠী সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তরঃ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগোষ্ঠীঃ বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তিত হলে লর্ড ওয়েলেসলি গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে উপলব্ধি করলেন, এদেশীয় ভাষা না জানলে সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করা অসম্ভব। সেই উদ্দেশ্যে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠালাভ, যার সূত্র ধরেই বাংলা গদ্যরচনার সূচনা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগোষ্ঠী বাংলা গদ্যগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে গদ্যসাহিত্যের বিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-
এ ছাড়াও অন্যান্য লেখক ও তাঁদের রচনাগুলি হল যথাক্রমে
প্রশ্নঃ ৪ "বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী।" কাকে, কে আখ্যা দিয়েছিলেন? বাংলা গদ্যের বিকাশে 'যথার্থ শিল্পী'র অবদান আলোচনা করো।
অথবা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সর্বাধিক সফল গদ্যলেখক হিসেবে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের অবদান আলোচনা করো।
উত্তরঃ যিনি, যাঁকে: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গোষ্ঠীর সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক তথা প্রধান পণ্ডিত ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। তিনিই প্রথম সচেতন শিল্পীমন ও সুনির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে ছাত্রদের উপযোগী করে বাংলা গদ্যরচনায় আত্মেনিয়োগ করেছিলেন। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে 'বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী' আখ্যা দেন সজনীকান্ত দাস।
অবদান: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সকল পণ্ডিত তথা গদ্যলেখকের তুলনায় মৃত্যুঞ্জয় রচিত গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা যেমন ছিল অধিক পাশাপাশি সেগুলি লিখনশৈলীর দিক থেকেও ছিল শ্রেষ্ঠ স্থানাধিকারী। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি হল-'বত্রিশ সিংহাসন' (১৮০২), 'হিতোপদেশ' (১৮০৮), 'রাজাবলি' (১৮০৮), 'প্রবোধচন্দ্রিকা' (আনুমানিক রচনাকাল ১৮১৩) এবং 'বেদান্তচন্দ্রিকা' (১৮১৭)।
'বত্রিশ সিংহাসন' ও 'হিতোপদেশ' গ্রন্থটি সংস্কৃতের অনুবাদ। তাঁর অনূদিত 'হিতোপদেশ' গ্রন্থটির বিষয় গোলোকনাথ শর্মার 'হিতোপদেশ'-এর সমতুল্য হলেও মৃত্যুঞ্জয়ের গদ্যশৈলী ছিল অনেক উৎকৃষ্ট। পাশাপাশি 'রাজাবলি' গ্রন্থের বিষয়বস্তু কোনো বইয়ের হুবহু অনুকরণ নয়-এটি বিভিন্ন সূত্র থেকে সংকলিত। কলিযুগের সূচনাপর্ব থেকে শুরু করে ইংরেজরাজ পর্যন্ত ভারতের সকল রাজা ও সম্রাটের ইতিহাস বর্ণনাই এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য। অপরদিকে, 'প্রবোধচন্দ্রিকা' গ্রন্থটির বিষয় মূলত নীতিকথা, শাস্ত্রকথা, অলংকার, ব্যাকরণ প্রভৃতি সংক্রান্ত হলেও তা রূপকথাধর্মী উদাহরণের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে-যা উপস্থাপনগুণে সমৃদ্ধ। শুধু তাই-ই নয়, গ্রন্থটি সেকালে পাঠ্যপুস্তক হিসেবেও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। আবার, 'বেদান্তচন্দ্রিকা'য় লেখকের দর্শনতত্ত্ব, তীক্ষ্ণ ও গভীর বুদ্ধি এবং তার্কিক বিচারবোধ প্রকাশ পেয়েছে-যা তিনি আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর 'বেদান্তচন্দ্রিকা' গ্রন্থটি মূলত রামমোহনের 'বেদান্তগ্রন্থ'-এর প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে রচিত।
ভাষারীতি: বলা বাহুল্য, বিদ্যাসাগরের সফল গদ্যশৈলীর কিছুটা মৃত্যুঞ্জয়ের আভাস প্রথম লক্ষ করা যায় মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের রচনায়। রচনারীতি সংস্কৃত-ঘেঁষা হলেও অনেকক্ষেত্রে তা বাংলা গদ্যভঙ্গিকে অনুসরণ করে সফলতা পায়। ভাষা রচনার ক্ষেত্রে যে প্রয়োজনবোধের আবশ্যকতা রয়েছে, তা তাঁর গদ্যরীতিতে পরিলক্ষিত হয়। তিনি কেবল নিজস্ব প্রতিভার গুণে তাঁর রচনার ভাষাকে বিভিন্ন বিষয় - অবলম্বী করে তুলতে পেরেছিলেন-যা ছিল বাংলা গদ্যের ধারায় এক নতুন উদ্ভাবন।
সবমিলিয়ে বাংলা গদ্যের উদ্ভব পর্বে তাঁর গদ্যরীতি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠা পায়।
প্রশ্নঃ ৫ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? বাংলা গদ্যের বিকাশে রামরাম বসু ও উইলিয়াম কেরি কতটা অবদান রেখেছেন?
উত্তরঃ উদ্দেশ্য: বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তিত হলে লর্ড ওয়েলেসলি গর্ভনর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, ইংল্যান্ড থেকে আগত সিভিলিয়ানদের এদেশীয় ভাষা ও সাহিত্য জানা জরুরি। তাই তাদের সেই সংক্রান্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যেই ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
রামরাম বসুর অবদান: রামরাম বসু রচিত 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রথম বাংলা গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় রচিত বাংলা দেশের প্রথম ইতিহাসের মর্যাদার অধিকারী। এ ছাড়াও তিনি রচনা করেন 'লিপিমালা' নামে আর একটি গ্রন্থ। এই মৌলিক রচনা দুটির প্রথমটিতে আরবি-ফারসির প্রয়োগ বেশি থাকলেও দ্বিতীয়টিতে সেসবের প্রয়োগ কম এবং ভাষাও সহজসরল।
উইলিয়াম কেরির অবদান: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে উইলিয়াম কেরি সেখানে সংস্কৃত ও বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। বাইবেলের বাংলা অনুবাদ, 'ইতিহাসমালা' ও 'কথোপকথন'-এর মাধ্যমে তিনি গদ্যরচনায় প্রয়াসী হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, কথ্যভাষায় গদ্যরচনার পথপ্রদর্শক তিনি। তাঁরই তত্ত্বাবধানে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারতের কিছু অংশ, বিষু শর্মার 'হিতোপদেশ' প্রভৃতি গ্রন এখান থেকে প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি কেরির নেতৃত্বে সংস্কৃত, মারাঠি, পাঞ্জাবি, কন্নড় ভাষায় অভিধান গ্রন্থ ও ব্যাকরণ রচিত হয়।