Chapter 2


জাতি এবং জাতীয়তাবাদ

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর


1. জাতীয় জনসমাজের উপাদানগুলি আলোচনা করো।** [WBCHSE (XI) 23, 20, '15] 

অথবা, জাতীয় জনসমাজের উৎপত্তির প্রধান উপাদানসমূহ আলোচনা করো।" (WBCHSE (XI) '11]

অথবা, জাতীয় জনসমাজের বাহ্যিক ও ভাবগত উপাদানের উল্লেখ করো। [Uluberia High School (HS) '24]
উত্তর: জাতীয় জনসমাজ কথাটি এসেছে ইংরেজি শব্দ ন্যাশনালিটি থেকে। এটি হল জনসমাজ এবং জাতির মধ্যবর্তী পর্যায়। যখন কোনো জনসমষ্টির মধ্যে গভীর স্বাতন্ত্র্যবোধ দেখা দেয় এবং সেই জনগোষ্ঠী, অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলে মনে করে, তখন তাকে জাতীয় জনসমাজ বলে।


জাতীয় জনসমাজের উপাদানসমূহ: জনসমাজকে জাতীয় জনসমাজে পরিণত করার পশ্চাতে যে বিভিন্ন উপাদানগুলি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা-


1. বস্তুগত বা বাহ্যিক উপাদানসমূহ: উল্লেখযোগ্য বাহ্যিক উপাদানগুলি হল-


ভৌগোলিক ঐক্য: একই ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করার ফলে মানুষের মধ্যে যে গভীর একাত্মবোধ গড়ে ওঠে, তা জনসমাজকে প্রথমে জাতীয় জনসমাজে এবং পরে জাতিতে রূপান্তরিত করে তাদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম সঞ্চারিত করে।


বংশগত ঐক্য: কোনো সংঘবদ্ধ জনসমষ্টি যখন নিজেদেরকে একই পূর্বপুরুষের বংশধর বলে মনে করে, তখন তাদের মধ্যে সুদৃঢ় একাত্মবোধ ও স্বজনপ্রীতির মনোভাব লক্ষ করা যায়, যা জাতীয় জনসমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।


ভাষাগত ঐক্য: জাতীয় জনসমাজ গঠনে ভাষাগত ঐক্য একটি অপরিহার্য উপাদান। কারণ

ভাষার মধ্য দিয়েই মানুষ একে অপরের সলো ভাব বিনিময় করে।


ধর্মীয় ঐক্য: ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে তথা একই ধর্মাবলম্বী জনগণ নিজেদের বিশ্বাসের ঐক্যে খুব সহজেই পরস্পরের নিকট এসে একাত্মতা লাভকরতে পারে, যা জাতীয় জননসমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা: জাতীয় জনসমাজ হল সেই গোষ্ঠী, যা একই আইনের অধীনে বসবাস করার ইচ্ছায় রাষ্ট্র গঠন করে। জাতীয় জনসমাজ একদিকে যেমন রাষ্ট্র গঠনে প্রেরণা জোগায়, তেমনই রাষ্ট্রীয় সংগঠনও জাতি গঠনে সহায়তা করে।

অর্থনৈতিক সনস্বার্থ : সমজাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের মাধ্যমেই কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ঐক্যের পরিবেশ গড়ে ওঠে। এটি ছাড়া একটি জাতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

2. ভাবগত উপাদানসমূহ: জাতীয় জনসমাজ গঠনে ভাবগত উপাদানের গুরুত্বকে প্রায় সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্বীকার করে নিয়েছেন কারণ, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। ভাবগত উপাদান প্রধানত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, যথা- অতীতের স্মৃতি এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা। তবে এক্ষেত্রে মার্কসবাদীরা ভাবগত উপাদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন না।


উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বাহ্যিক উপাদানগুলি থাকুক বা না থাকুক- এই ভাবগত উপাদানই একটি জনসমাজকে জাতীয় জনসমাজে উত্তীর্ণ করতে পারে।


2. জাতির সংজ্ঞা দাও। (Sarada Prasad Institution (HS) '19)

উত্তরঃ জাতির সংজ্ঞা: জাতি হল সাধারণভাবে জনসমাজের একটি চূড়ান্ত বিকশিত রূপ। ঐক্যবদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী যখন অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মনে করে, তখন জাতীয় জনসমাজ গঠিত হয়। পরে জাতীয় জনসমাজের মধ্যে সুগভীর রাজনৈতিক চেতনার জন্ম হলে জাতীয় জনসমাজ জাতিতে রূপান্তরিত হয় এবং স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র গঠনের ভিতর দিয়ে জাতির পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটে। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জাতির সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যথা-


বার্জেস: বার্জেস-এর মতে, জাতি হল একই ভৌগোলিক ভূখণ্ডে অধ্যুষিত এবং একই উদ্ভবগত ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ জনসমাজ। উদ্ভবগত ঐক্য বলতে বার্জেস শুধুমাত্র কুলগত সাদৃশ্যকেই বোঝাননি, সেইসঙ্গে সেই জনসমাজের সাধারণ ভাষা, সাহিত্য, রীতিনীতি, ঐতিহ্য, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সাধারণ চেতনাকেও বুঝিয়েছেন।


রেনী: রেনা-র মতে, জাতি হল একটি আধ্যাত্মিক ধারণার মূর্ত প্রতিরূপ। অতীতের যে-

কোনো রকমের গৌরবোজ্জ্বল কিংবা ব্যর্থতার স্মৃতির বন্ধনকে আত্মস্থ করে একটিমাত্র রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডে ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাসের আগ্রহই একটি জনসমাজকে জাতির মর্যাদায় উন্নীত করে।


র‍্যামসে ম্যুর: র‍্যামসে ম্যুর-এর মতে, যখন কোনো জনসমাজ কতকগুলি সাধারণ বন্ধনের সূত্রের দ্বারা নিজেদের ঐক্য অনুভব করে এবং ঐক্যের অভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্বতন্ত্র কোনো জনসমাজের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে পারে না, তখন তারা জাতি হিসেবে অভিহিত হয়।


গার্নার: গার্নার বলেছেন, জাতি বলতে কেবল সাংস্কৃতিক ও আত্মিকসূত্রে ঐক্যবদ্ধ কোনো সংগঠনকে বোঝায় না। জাতি বলতে রাজনৈতিক দিক থেকে সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায়।


লর্ড ব্রাইস: লর্ড ব্রাইস-এর মতে, "জাতি হল রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত এবং বহিঃশাসন থেকে মুক্ত কিংবা মুক্তিকামী একটি জাতীয় জনসমাজ।"


উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, যখন একটি জনসমাজের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি জনগণের মধ্যে ঐক্যবোধ একটি পৃথক রাষ্ট্রগঠনের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপায়িত করে, তখন তাকে জাতি বলে অভিহিত করা হয়।


3. জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো। 

অথবা, জাতি ও রাষ্ট্র কি এক? ব্যাখ্যা করো।

উত্তরঃ পুঁজিবাদের বিকাশের প্রথম পর্যায়ে পুঁজিপতি শ্রেণি বাজার দখলের তাগিদে জাতিরাষ্ট্র গঠনে উদ্যোগী হয়েছিল। সেই সময় থেকেই জাতি ও রাষ্ট্রের ধারণাকে অভিন্ন বলে মনে করার প্রবণতা দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে বার্কার বলেছিলেন, আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্রের প্রভাব পড়ার মধ্য দিয়ে জাতি, জাতীয় জনগোষ্ঠী এবং রাষ্ট্র- সবকিছুর সংমিশ্রণে জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। তবে বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে 'এক জাতি এক রাষ্ট্র' তত্ত্বের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে জাতি ও রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যে পার্থক্য গড়ে ওঠে। অনেকসময় জাতি ও রাষ্ট্রের ধারণাকে অভিন্ন বলে মনে করা হলেও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, এগুলি হল-

বিষয়

জাতি

রাষ্ট্র

ধারণা

জাতি হল একটি ভাবগত ধারণা। যা মনস্তাত্ত্বিক এবং আত্মিক অনুভূতি দ্বারা উজ্জীবিত ঐক্যের চেতনাকে বোঝায়।

রাষ্ট্র হল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আইনগতভাবে সংগঠিত জনসমাজ। তাই রাষ্ট্র হল আইনগত এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা।

উপাদান

জাতি গঠনের মুখ্য উপাদান হল জনসমাজের মধ্যেকার নিবিড় ঐক্য। 

রাষ্ট্র মূলত চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত। যথা- জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমিকতা


4. জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
উত্তরঃ জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ : জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-


পরিবর্তনশীল চরিত্র: জাতীয়তাবাদ একটি পরিবর্তনশীল ধারণা। আদিম সমাজের গোষ্ঠীগত চেতনাই ক্রমে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহায্য করেছে। রেনেসাঁস, সার্বভৌম তত্ত্বের উদ্ভব, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ফরাসি বিপ্লব, শিল্পবিপ্লব ইত্যাদি উৎকৃষ্ট ফল হিসেবে জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে।


রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান: জোসেফ ফ্র্যাঙ্কেল -এর মতে, রাষ্ট্রের সৃষ্টি ও গঠনে জাতীয়তাবাদ একটি মুখ্য উপাদান, যা নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনে অনুপ্রেরণা জোগায়। ফলে জাতীয়তাবাদ পরাধীন দেশগুলির কাছে মুক্তির দিশারিরূপে কাজ করে।


জাতীয়তাবাদের গঠনশীল ভূমিকা: জাতীয়তাবাদ গণসার্বভৌমিকতা, জাতির অধিকারবোধ প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের সৃষ্টি ও গঠন, পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে নতুন কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানকে রূপ দেওয়া, প্রতিকূল শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে বজায় রাখা গঠনশীল ভূমিকার অন্তর্গত।


উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জাতীয়তাবাদ হল এমন একটি মহান আদর্শ, যা একদিকে মুক্তির কথা বলে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে জাত্যভিমান সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষের মনের মধ্যে অন্য জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য বিদ্বেষী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। 


5. জাতীয়তাবাদের সপক্ষে মূল যুক্তিগুলি নির্দেশ করো। [WBCHSE (XI) '07]

উত্তরঃ জাতীয়তাবাদের সপক্ষে মূল যুক্তি: জাতীয়তাবাদ একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবিকে বাস্তবায়িত করে। জাতীয়তাবোধের সঙ্গে দেশপ্রেম মিলিত হলে জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তাঁদের আলোচনায় জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরেছেন, যথা-


1. একটি মহান আদর্শ: জাতীয়তাবাদ সমগ্র জাতিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে দেশের জন্য আত্মত্যাগে অনুপ্রেরণা জোগায়, যা সামগ্রিকভাবে সারা বিশ্বের মানবসভ্যতার দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটাতে পারে।


2. পরাধীন জাতির কাছে মুক্তির অগ্রদূত : জাতীয়তাবাদ পরাধীন জাতিসমূহের কাছে মুক্তির অগ্রদূত কারণ, জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনের আপ্রাণ সংগ্রাম চালায়। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশগুলির মুক্তিসংগ্রাম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।


3. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক : জাতীয়তাবাদের আদর্শ কালক্রমে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার আদর্শের জন্মদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করে, যা বিভিন্ন জাতিকে নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে। অপরদিকে তাদের গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্টও করে তোলে।


4. মানবসভ্যতার অগ্রগতির সূচক: জাতীয়তাবাদ মানবসভ্যতার বিকাশের সহায়ক, কারণ এর মাধ্যমেই পরাধীন জাতির মুক্তির মন্ত্র ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতীয়তাবাদই তৃতীয় বিশ্বের জাতিগুলিকে নতুন চেতনা ও শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করে মানবসভ্যতার উন্নতিতে সাহায্য করেছে।


5. সুশাসনে সহায়ক: জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ জনসমাজ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ফলে দেশে শাসক-শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেই আইনের নির্দেশ ও আইন মান্য করার মধ্যে সমতা বজায় থাকে।


পরিশেষে বলা যায়, জাতীয়তাবাদের পক্ষে যুক্তিগুলি মানবসভ্যতার কাছে আশীর্বাদরূপে বিবেচিত হয়।


6. জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে যুক্তিগুলি আলোচনা করো। [Maharani Indiradevi Balika Vidyalaya '19]

উত্তর: জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে যুক্তি: জাতীয়তাবাদ একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবিকে বাস্তবায়িত করলেও জাতীয়তাবাদের বিপক্ষেও নানা যুক্তি আছে। এগুলি হল-


1. জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেয়: অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক অসহিষ্ণুতা, সন্দেহ, হিংসা ও বিরোধ জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস সাক্ষী জাতির সংকীর্ণতা থেকে উগ্রতা এবং আধিপত্যের মনোভাব এসেছে যা বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা, হিংসা ও হানাহানির সৃষ্টি করেছে।


2. সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ সভ্যতার সংকট: সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ সভ্যতার পক্ষে বিপজ্জনক। কারণ এইরূপ জাতীয়তাবাদের নীতি হল- অন্য জাতির সংস্কৃতিকে দমন করা এবং শুধুমাত্র নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্বের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করা।


3. গণতন্ত্রের বিরোধী: অ্যান্ড্রু হেউড বলেন, জাতীয়তাবাদের আড়ালে ব্যক্তির স্বতন্ত্র অবস্থান ও

চেতনাকে নিজেদের অধীনে এনে রাজনৈতিক নেতারা জনসাধারণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে বিভিন্ন জাতির মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়।


4. সাম্রাজ্যবাদের জন্মদাতা: উগ্র জাতীয়তাবাদের দ্বারা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে হেয় করে তাদের উপর প্রভুত্ব কায়েমের চেষ্টা করে। যেমন-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার জার্মান জাতিকে উগ্র ও বিকৃত জাতীয়তাবাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ করে তার সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে বাস্তবে রূপায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন।


5. বিশ্বশান্তি বিঘ্নকারী: জাতীয়তাবাদের উগ্ররূপ যুদ্ধবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে বিশ্বশান্তি বিঘ্নকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এরা ন্যায়-অন্যায়, আলাপ-আলোচনা প্রভৃতিকে অবজ্ঞা করে যুদ্ধকে একমাত্র পথ হিসেবে গণ্য করে।


জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে উপরোক্ত যুক্তিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদ মানবসভ্যতার শত্রু বলে বিবেচিত হয়।


7. প্রজাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারটি ব্যাখ্যা করো। ** [WBCHSE (XI) '15]

উত্তর: স্বকীয়তা রক্ষার জন্য যখন জাতি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের দাবি করে বা একটি জাতি যখন একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে তার আত্মপ্রতিষ্ঠার বা স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়, তখন তাকে জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (Right of Self-Determination) বলে। জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে একজাতি একরাষ্ট্র (One Nation One State)-তত্ত্বকে কেন্দ্র করেই জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তত্ত্বটি গড়ে উঠেছে।


বৈশিষ্ট্য: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বৈশিষ্ট্যসমূহ হল-


1. জাতির আত্মপ্রকাশে সহায়ক: আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের মাধ্যমে জাতির সুষ্ঠু গুণাবলি, চেতনা, ভাবধারা, আদর্শ, নিজস্ব সংগঠন প্রভৃতির আত্মপ্রকাশ ঘটে।


2. গণতন্ত্রের সহায়ক: গণতন্ত্রের উন্মেষ ও প্রচার এবং সংখ্যালঘু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবেও এই অধিকারটির গুরুত্ব অপরিসীম।

3. বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: আন্তর্জাতিকতার লক্ষ্যকে কার্যকর করার বৃহত্তর হত্তর স্বার্থেও এই অধিকার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।


জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বক্তব্যসমূহ: মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন শাস্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার একটি সত্তা হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে গ্রহণ করার আহবান জানান। তাঁর এই প্রস্তাবকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের শাস্তি সম্মেলনে মেনে নেওয়া হয়।


জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিপক্ষে বক্তব্যসমূহ: লর্ড অ্যাক্টন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি ও রূপায়ণকে অবাস্তব বলে - চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সমাজে মানুষের সমবায় যেমন সভ্য জীবনযাপনের শর্ত তেমনি বিভিন্ন জাতির এক রাষ্ট্রে মিলেমিশে থাকার বিষয়টি সভ্যতার অপরিহার্য শর্ত।


মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা, জাতীয় জনসমাজের দাবির প্রতি জনসমর্থন, মানবসভ্যতার সার্বিক উন্নতি সবকিছুকে বিচার করেই এই অধিকারের যথার্থতা বিচার করা উচিত।


8. জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সপক্ষে যুক্তি দাও।** (HS Model Question 24]

উত্তরে: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সপক্ষে যুক্তি: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সপক্ষে যুক্তিগুলি হল-


1. জাতীয় গুণাবলি বিকাশে সহায়ক: প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রতিভা বর্তমান। একজাতি নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রে এইসব জাতীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা থাকে।


2. বিশ্বশান্তির সহায়ক: মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন-এর মতে, প্রতিটি জাতিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করলে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণসমূহকে সমূলে উৎপাটিত করা সম্ভব হবে। * তাঁর মতে, প্রতিটি জাতীয় জনসমাজের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের স্বাভাবিক অধিকার বিশ্বজনীনভাবে মেনে নেওয়া প্রয়োজন। তাহলেই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে।


3. ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা: একটিমাত্র জাতির দ্বারা একটি সরকার যখন নির্বাচিত হয়, তখন সেই সরকার জনস্বার্থে আইন প্রণয়নে সচেষ্ট থাকে, যা জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার প্রহরীস্বরূপ। ফলত ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সমন্বয়সাধন করা সম্ভব হয়।


4. ন্যায়সংগত: কোনো একটি বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের শাসনাধীনে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপর একটি জনসমাজের স্বকীয়তাকে মিশিয়ে দেওয়ার অর্থই হল পরাধীনতা। তাই বলা যায়, স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে জাতীয় জনসমাজের স্বাধীনতার সর্বোচ্চ প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়।


পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বসভ্যতায় বৈচিত্র্যময় মানবজীবন এবং সভ্যতার অগ্রগতির জন্য, বিশ্বসংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারটি যথেষ্ট প্রয়োজন।


9. জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিপক্ষে মতামতগুলি আলোচনা করো।*

উত্তর: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিপক্ষে যুক্তি: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিপক্ষে যুক্তিগুলি হল-


1. বাস্তব রূপায়ণ অসম্ভব: এই নীতিটি তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে কার্যকর করা কষ্টকর। কারণ, একই ভৌগোলিক পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতির মানুষ পাশাপাশি বাস করার ফলে পরস্পরের মধ্যে এমন এক মেলবন্ধন তৈরি হয় যে, তাদের পক্ষে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।


2. অবাস্তব নীতি: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সবসময় সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ সব জাতীয় জনসমাজকে ক্রমাগত স্বাধীনতা প্রদান করা হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং নীতিটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে পৃথিবীর মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে।


3. ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সমস্যা বৃদ্ধি: একজাতি একরাষ্ট্র' নীতি কার্যকর হলে পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য ছোটো ছোটো রাষ্ট্রের উদ্ভব হবে। এর ফলে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির তো কোনো সুবিধা হবেই না, বরং তা হবে শান্তি ও কল্যাণের প্রতিবন্ধক। 


4. গণতান্ত্রিক আদর্শের মুক্তি ভিত্তিহীন: গণতন্ত্রের সাফল্যের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রয়োজন এই যুক্তিটি হল ভ্রান্ত, কারণ- গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষিত নাগরিক এবং তাদের সক্রিয় সহযোগিতা। 'একজাতি একরাষ্ট্রের' সঙ্গে গণতন্ত্রের সফলতার কোনো সম্পর্ক নেই।


5. আন্তর্জাতিক শান্তি বিপন্ন হবে: জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিলেই যে পৃথিবীতে যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকবে না, এই ধারণাটি ভুল। কারণ বৃহৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য সর্বদা সংগ্রামে লিপ্ত থাকবে।


মূল্যায়ন: আদর্শ অবস্থায় বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের সুযোগসুবিধা বেশি হলেও, যেখানে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একটি জাতিসত্তাকে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে নীতিগতভাবে সমর্থন করা আবশ্যক। তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি স্বীকার করলেও সমস্যা, আবার না করলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।


10. জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধ্যানধারণাটি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করো। **  [HS Model Question 24]

উত্তর: জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা: জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা মূলত পাশ্চাত্য জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রভাবনার তিনটি ধারা স্পষ্ট- ইংরেজ শাসনের অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার আদর্শগত বিরোধকে তুলে ধরা হয়েছে তাঁর ন্যাশনালিজম গ্রন্থে (১৯১৭ খ্রি.)। তিনি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা প্রকাশিত এবং স্বাদেশিকতার গঠনমূলক ভাবনা প্রকাশ করা। প্রধানত জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমি জাতীয়তাবাদ, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে বলেছেন, জাতীয়তাবাদ (উগ্র) মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মনুষ্যত্বকে অবরুদ্ধ করে।


ইউরোপীয় উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা: ইউরোপীয় রাষ্ট্রদার্শনিকগণ যখন জাতীয়তাবাদকে মহান আদর্শ হিসেবে সাদরে গ্রহণ করেছেন ও জাতীয় রাষ্ট্রকে শ্রেষ্ঠ মানবিক সংস্থা হিসেবে পুজো করার পরামর্শ দিয়েছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর তত্ত্বে জাতীয়তাবাদী আদর্শের নগ্ন-বীভৎস ও অন্যায় রূপটিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কারণ জাতীয়তাবাদের নামে পাশ্চাত্যে যে সংঘবদ্ধ দানব শক্তি প্রদর্শিত হয়, তার প্রতি রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার জানান। তিনি পশ্চিমি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব ও তার তাগিদে পররাজ্যগ্রাসের প্রবৃত্তির বিরোধিতা করেছিলেন।


মানুষের শুভসত্তার বিনাশ: রবীন্দ্রনাথ-এর মতে, জাতীয়তাবাদ মানুষের শুভসত্তাকে খর্ব করে তাকে হাতের পুতুলে পরিণত করেছে। তাই মানুষের শুভবুদ্ধির জাগরণের জন্য জাতীয়তাবাদী যন্ত্রদানবের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রামের আহবান জানিয়েছেন। এ ছাড়া জাত্যভিমানের বদলে তিনি মানুষকে এক অখন্ড রাজ্যের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।


উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনাগুলি থেকে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশ্বমানবতাবাদী, আন্তর্জাতিকতাবাদী, বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্ব।


11. জাতীয়তাবাদ মানবসভ্যতার শত্রু- আলোচনা করো। 

অথবা, জাতীয়তাবাদ কি সভ্যতার শত্রু? আলোচনা করো।

উত্তর: ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে ধারণাটি উপনিবেশগুলিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রেরণা দান করেছিল, সেই জাতীয়তাবাদই উগ্রমূর্তি ধারণ করে বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকে সমগ্র পৃথিবীকে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে। এই কারণে জাতীয়তাবাদকে মানবসভ্যতার শত্রুরূপে অনেকে অভিহিত করেছেন। উক্ত উক্তিটির বিশ্লেষণ করলে - যেসকল যুক্তিসমূহের অবতারণা করা হয়, তা হল-


1. সাম্রাজ্যবাদের আশঙ্কা: ঐতিহাসিকভাবে উদীয়মান মধ্যবিত্ত এবং বুর্জোয়া শ্রেণির অভ্যন্তরীণ বাজার দখল সুনিশ্চিত করার জন্য, জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীকালে, ধনতন্ত্রের পরবর্তী স্তরে উদবৃত্ত পণ্য বিক্রি করা যাচ্ছিল না বলেই জাতীয়তাবাদ পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদে।


2. অগণতান্ত্রিক: জাতীয়তাবাদের উগ্র, হিংস্র, বীভৎস প্রকাশ গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণার ও সমস্ত মানবিক চেতনার পরিপন্থী।


3. সভ্যতার সংকটস্বরূপ: জাতীয়তাবাদ স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি গভীর অনুরাগের ভিত্তিতে জাত্যভিমানে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে জাতির মনে নিজের সম্পর্কে গর্ববোধ এবং অপর জাতির প্রতি ঘৃণা জন্মায়। এইভাবে জাতীয়তাবাদ বিকৃত রূপ ধারণ ধারণ করে বিভিন্ন জাতির মধ্যে হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের সম্পর্ক সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ মানবসভ্যতা সংকটের সম্মুখীন হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, 'জাতীয়তাবাদ হল সভ্যতার সংকটস্বরূপ'।


4. বিশ্বশান্তির বিরোধী: উগ্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক শাস্তির পক্ষে ক্ষতিকর। কারণ, এইরূপ জাতীয়তাবাদ সর্বক্ষেত্রে স্বদেশ ও স্বজনের দাবিকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে ন্যায়, অন্যায়, যুক্তি ও আলাপ-আলোচনাকে অস্বীকার করা হয় এবং সর্বপ্রকার বিরোধ-মীমাংসার জন্য যুদ্ধের পথ গ্রহণ করা হয়। এই যুদ্ধবাদী প্রবণতাই বিশ্বশান্তির ঘোরতর শত্রু।


মূল্যায়ন: তবে পরিশেষে বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদ মানবসভ্যতার শত্রু না কি মানবসভ্যতার কাছে আশীর্বাদস্বরূপ-সেটা মূলত নির্ভর করে জাতীয়তাবাদকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার উপর। যেমন- জাতীয়তাবাদ যদি উগ্ররূপ ধারণ করে তবে সমগ্র জাতির কাছেই তা হয়ে ওঠে বিভীষিকার মতো। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদ যদি দেশপ্রেমের সমার্থক হয়ে ওঠে তবে তা মানবজাতির কাছে আশীর্বাদস্বরূপ।