Chapter 6

আগুন - বিজন ভট্টাচার্য

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর


প্রশ্নঃ ১'আগুন' নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।


উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।


প্রশ্নঃ ২ 'আগুন নাটকটি কোন্ পটভূমিতে রচিত? নাটকটির মূল বিষয়বস্তু আলোচনা করা। 


উত্তরঃ পটভূমি: ১৯৪৩ সালে তথা ১৩৫০ বঙ্গাব্দে বাংলায় যে মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল সেই খাদ্যসংকটের পটভূমিতে বিজন ভট্টাচার্যের 'আগুন' নাটকটি রচিত।


বিষয়বস্তু: 'আগুন' নাটকটির মূল বিষয়বস্তু তেতাল্লিশের মন্বন্তর এবং তার ফলে সৃষ্ট খাদ্যাভাব। সেই সময়ে বঙ্গদেশে অনাবৃষ্টির কারণে পর্যাপ্ত ফসল ফলেনি। খেতের শস্য খেতেই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে, খোলা বাজারে চাল-ডাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দেয়। মজুতদাররা মজুত খাদ্য কালোবাজারের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি করে মুনাফা করা শুরু করে আর হাজার হাজার মানুষ অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাতে থাকে।


রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো কোনো দোকান থেকে বেশি দামে স্বল্প পরিমাণে চাল দেওয়া হয়। সবাই লাইনে দাঁড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কেউ কেউ চাল পায় না। দরিদ্র - হতদরিদ্র - মধ্যবিত্ত, কৃষক - শ্রমিক - কেরানি, হিন্দু - মুসলমান, বাঙালি-ওড়িয়া সকলেই এক সারিতে এসে দাঁড়ায় একটু চালের আশায়। খিদে সব বিভাজন, সব ভেদাভেদ ভুলিয়ে সবাইকে এক করে দেয়। শেষ দৃশ্যে ওড়িয়া ব্যক্তি বলে, খাওয়ার জন্য সবারই চাল দরকার। তাই তৃতীয় পুরুষ বলে, 'এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে ব্যাস।'- এই বার্তা এবং মন্বন্তরক্লিষ্ট সময়ের প্রতিচ্ছবি আলোচ্য নাটকের উপজীব্য।


প্রশ্নঃ ৩ 'আগুন' নাটকটি কবে, কোথায় প্রথম অভিনীত হয়? এই নাটকের সংলাপ রচনায় নাট্যকারের কৃতিত্ব আলোচনা করো। 


উত্তরঃ প্রথম অভিনয়: বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'আগুন' নাটকটি ১৯৮৩ সালের মে মাসে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের উদ্যোগে কলকাতার 'নাট্যভারতী' রঙ্গমঞ্চে প্রথম অভিনীত হয়।


সংলাপ রচনায় কৃতিত্ব: মঞ্চসজ্জা, পরিবেশরচনা-সহ কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া নাট্যকার যা বলতে চান, তা নাট্যচরিত্রের সংলাপের মাধ্যমেই বলেন। সংলাপেই ফুটে ওঠে চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাত।


বিজন ভট্টাচার্য 'আগুন' নাটকে এক-একটি চরিত্রের শ্রেণি, জীবিকা, আর্থসামাজিক অবস্থান অনুযায়ী সংলাপ রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে চরিত্রগুলি বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। কৃষক তার স্ত্রীকে বলে “কলেকষ্টে এই চৈতেলির ফসলগুলো মাচায় তুলতি পারলি হয়, কিছুদিনের মত নিশ্চিন্দি, কী বলিস।” কারখানার শ্রমিক সতীশ বলে-"শালা খিধে পেটে লিয়ে কি কাজে যেতে মন লাগে।” কেরানি হরেকর ও তার স্ত্রী মনোরমার সংলাপ এদের তুলনায় তথাকথিত মার্জিত, আঞ্চলিকতা বর্জিত, শহুরে- মনোরমা কেন, অফিস থেকে যে চাল ডাল দেবার কথা ছিল।


হরেকৃষ্ণঃ থাক্' আর অফিসের কথা তুলো না বাপু।


সিভিক গার্ড বলে- "চালাকি পেয়েছ! লুটের মাল, না!" ওড়িশাবাসী ওড়িয়া ভাষায় কথা বলেছে। দোকানি বলেছে তার নিজের ভঙ্গিতে-“... বাব্বা! লুঙ্গি, টিকি, পৈতে, টুপি সব একাকার হয়ে গেছে।” নেত্যর মা, ক্ষিরি, মনোরমা- এই নারীচরিত্রগুলি তাদের শিক্ষাদীক্ষা ও পারিবারিক অবস্থান অনুযায়ী উপযুক্ত ঘরোয়া সংলাপ প্রকাশ করেছে। এইভাবে পরিবেশ, ঘটনা ও চরিত্রানুযায়ী উপযুক্ত সংলাপ প্রয়োগে নাট্যকারের কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।


প্রশ্নঃ ৪ 'আগুন' নাটকটিতে মোট কয়টি দৃশ্য আছে এবং নাটকের দৃশ্য পরিকল্পনায় নাট্যকারের মুনশিয়ানার পরিচয় দাও।


উত্তরঃ দৃশ্য সংখ্যা: বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'আগুন' নাটকটিতে মোট পাঁচটি দৃশ্য আছে।


দৃশ্য কল্পনায় মুনশিয়ানা: 'আগুন' নাটকের দৃশ্যগুলি একটির সঙ্গে অন্যটি আপাতভাবে সংযোগহীন হলেও নাট্যকার পরিকল্পিতভাবে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মানুষের জীনবযাপনচিত্র নাটকের এক-একটি দৃশ্যে তুলে ধরেছেন। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের অভিঘাত এদের সবার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সবাই একই সমস্যার সম্মুখীন। সবার পেটে জ্বলছে খিদের আগুন, সবার ঘরেই খাদ্যাভাব। আসলে, খিদে তো কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বৃত্তি মানে না।


প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, হতদরিদ্র পরিবারের গৃহকর্তা অভুক্ত পেটে কাজের সন্ধানে বের হয়। আর তার স্ত্রী কলমি শাক, কলা, দাঁতনকাঠি বিক্রি। করবে তারপর চাল কেনার লাইনে দাঁড়াবে। দ্বিতীয় দৃশ্যে, গরিব কৃষককে চৈতালি ফসলটুকু ভালোয় ভালোয় ঘরে তোলার আশায় বুক বাঁধতে দেখা যায়। স্ত্রীকে সে বলে আগেভাগে সবার প্রথমে গিয়ে চালের লাইনে দাঁড়াতে। নাহলে চাল পাওয়া দুষ্কর। তৃতীয় দৃশ্যে, শ্রমিককে ভুখা পেটে কারখানায় কাজে যেতে হয়। খাবার জোগাড় করতে না পারায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাগারাগি হয়। চতুর্থ দৃশ্যে মধ্যবিত্ত কেরানির পরিবারেও "চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা। তাও আবার কয়লার অভাব।” এই সব শ্রেণির লোকেরা সবাই একত্রে এসে মিলিত হয় পঞ্চম দৃশ্যে- চালের লাইনে। আগের চারটি ধারাকে নাট্যকার চমৎকারভাবে মিশিয়ে দেন পঞ্চমে। প্রতিটি দৃশ্যের স্বতন্ত্র পারিবারিক ছবি, চরিত্রগুলির আচরণ, সংলাপ ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এইভাবে, আরও অনেক ছোটো ছোটো বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দ্বারা দৃশ্য পরিকল্পনায় নাট্যকার মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।


প্রশ্নঃ ৫ একাঙ্ক নাটক কাকে বলে? একাঙ্ক নাটক হিসেবে 'আগুন' নাটকটির সার্থকতা আলোচনা করো। 


অথবা, "সমগ্র নাট্যকাহিনিতে পরস্পর-বিচ্ছিন্ন দৃশ্যগুলির মধ্যে যেন সংযোগসূত্র হয়ে উঠেছে রেশনের দোকানের লাইন।"-মন্তব্যটির যথার্থতা আলোচনা করো।


উত্তরঃ সংজ্ঞা: আঙ্গিক বিচারে নাটকের দুটি ভাগ- একাঙ্ক এবং পূর্ণাঙ্গ। যে নাটকে একটি অঙ্কের অন্তর্গত এক বা একাধিক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নাট্যবস্তু নির্দিষ্ট ও একমুখী পরিণতির দিকে ধাবিত হয়, তাকে একাঙ্ক নাটক বলে। একাঙ্ক নাটকের ঘটনা একমুখী ও গতিশীল হয়, চরিত্রসংখ্যা ও নাট্যঘটনায় জটিলতা কম থাকে। পরিসর বা আয়তন দীর্ঘ না হওয়া সত্ত্বেও বিন্দুতে সিধুদর্শনের মতো সমগ্রতার স্বাদ পাওয়া যায়।


সার্থকতা: বিজন ভট্টাচার্যের 'আগুন' নাটকের বিষয়বস্তু হল তেতাল্লিশের মন্বন্তরের কারণে খাদ্যবঞ্চিত অসহায় মানুষের দুর্দশা ও খাদ্যশস্যের জন্য সারিবদ্ধ দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ভুক্তভোগীরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-ধর্ম-বৃত্তির খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এই নাট্যবস্তুকে নাট্যকার একটি মাত্র অঙ্কের অন্তর্গত পাঁচটি দৃশ্যে প্রবাহিত করেছেন। নাট্যঘটনা একমুখী, জটিলতাও বিশেষ নেই। চরিত্রসংখ্যা খুব বেশি নয়, আবার খুব কমও বলা ঠিক হবে না। কিন্তু তারা ঘটনাকে ভারাক্রান্ত করেনি, বরং গতিশীল করেছে। প্রথম চারটি দৃশ্য যেন চারটি ভিন্ন ধারা, সব এসে মিলেছে পঞ্চম দৃশ্যে। কৃষক - শ্রমিক - কেরানি - ওড়িয়া - মুসলমান - সংখ্যাচিহ্নিত ক্ষুধার্ত জনতা একাকার হয়ে গিয়েছে চালের লাইনে এসে। সবার পরিণতি একই। নাট্যকার এই পরিণতির অভিমুখে নাট্যঘটনাকে অতি দ্রুত নিয়ে গিয়েছেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত সময় এবং অসহায় জনতার করুণ অবস্থা সামগ্রিকভাবে ফুটে উঠেছে। একাঙ্ক নাটক হিসেবে এখানেই 'আগুন' নাটকটির সার্থকতা।


প্রশ্নঃ ৬ 'আগুন' নাটকের চরিত্রচিত্রণে নাট্যকারের দক্ষতার পরিচয় দাও।


উত্তরঃ ভূমিকা: বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'আগুন' নাটকের মূল চরিত্র প্রকৃতপক্ষে মন্বন্তরগ্রস্ত সময় এবং অনাহারক্লিষ্ট জনতা। এই গণসমষ্টি বা জনগোষ্ঠী আপাতভাবে জীবিকার অবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিনামে চিহ্নিত। কয়েক জনের ব্যক্তিনাম নাট্যকার উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে 'পুরুষ', '১ম পুরুষ', '২য় পুরুষ', '৩য় পুরুষ', '৪র্থ পুরুষ' নামে অনাহারী জনতাকে চিহ্নিত করেছেন। আবার জীবিকা অনুসারে নামাঙ্কিত 'কৃষাণ-কৃষাণি', 'সিভিক গার্ড', 'দোকানি'-কে পাই। বয়সচিহ্নিত নামে 'যুবক' চরিত্রটি স্বল্পমেয়াদি, ধর্মচিহ্নিত নামে 'মুসলমান ভাই' এবং প্রদেশ বা ভাষাভিত্তিক নামে 'ওড়িয়া' চরিত্রটি নাটকের ঘটনাপ্রবাহে নিজস্ব ভূমিকা পালন করেছে।


চরিত্রের স্বরূপ: জীবিকাকেন্দ্রিক চরিত্রগুলিতে তাদের আচরণ ও কথাবার্তায় পেশাগত স্বরূপ প্রকাশিত। সিভিক গার্ড চালের লাইনে নিরীহ লোকের উপর হম্বিতম্বি, দুর্ব্যবহার করেছে। দোকানি তার দোকান, ব্যাবসা নিয়েই ভাবিত- "ব্যবসার সুখ এই গেল।” কৃষক ও শ্রমিক পরিবারের চরিত্রচিত্রণে তাদের উপযুক্ত করেই নির্মাণ করেছেন নাট্যকার।


চরিত্রচিত্রণে দক্ষতার পরিচয়: নাট্যকার ওড়িয়া চরিত্রটির মুখে ওড়িয়া ভাষার সংলাপ প্রয়োগ করে চরিত্রটিকে আলাদাভাবে বিশিষ্ট করে তুলেছেন। তার কথায় সমসময়ের জীবনদর্শন প্রকাশ পেয়েছে।


নেত্যর মা, ক্ষিরি, মনোরমা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের পারিবারিক বধূরূপে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে।


সতীশ, জুড়োন, বিশেষত হরেকৃয় চরিত্রটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।


মুসলমান ভাই চরিত্রটি ভদ্র-নম্র-প্রতিবাদী। আবার কিছু চরিত্র একই গোত্রের বলেই হয়তো নাট্যকার তাদের ব্যক্তিনাম বা বৃত্তিনাম দেননি।


'যুবক' স্বল্পমেয়াদি চরিত্র হলেও সে জনতার বিবেককে জাগায় ও নবীন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনার বাহক হয়ে ওঠে।


আলোচ্য নাটকের চরিত্রচিত্রণে এভাবেই নাট্যকার অতুলনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।


প্রশ্নঃ ৭ আগুন' নাটকের প্রথম দৃশ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিজের ভাষায় লেখো।


উত্তরঃ ঘটনাপ্রবাহ: বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'আগুন' নাটকের প্রথম দৃশ্যে ভোরের অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায়, এক দরিদ্র পরিবারের ঘরে রয়েছে কিছু সাংসারিক প্রয়োজনের জিনিস। মেঝের উপর ঘুমন্ত তিনটি মানুষ। প্রথমে পরিবারের কর্তার ঘুম ভাঙে। শুয়ে শুয়ে বিড়ি ধরায় সে। ভাবে তাড়াতাড়ি উঠে চালের লাইনে দাঁড়াতে না পারলে চাল পাওয়া যাবে না। সে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রীর গায়ে ঠেলা দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করে। কলমি শাক, দাঁতনকাঠি, কলা ইত্যাদি ঘরে রাখা আছে। ওগুলো বাজারে বিক্রি করে সেই পয়সা নিয়ে তার স্ত্রী চালের লাইনে দাঁড়াবে। সে যত আগে লাইন দিতে পারবে, চাল পাওয়ার নিশ্চয়তা তত বেশি। তাই স্ত্রীকে ঘুম থেকে উঠতে বলে গামছা কাঁধে লোকটি বেরিয়ে যায়। পরক্ষণেই গৃহকর্ত্রী উঠে পড়ে। ছেলে নেত্য ওরফে নিতাইকে ঘুম থেকে উঠতে বললে ছেলে বিরক্ত হয়। সে বলে, এই এক জ্বালা হয়েছে রোজ চালের লাইনে দাঁড়ানো, একটু ঘুমোনোর উপায় নেই। মা তাকে বলে যে দুপুরে ঘুমোনো যাবে, কিন্তু এখন যেতে হবে চালের লাইনে। বিক্রির জিনিসগুলি নিয়ে মা ও ছেলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।


প্রশ্নঃ ৮ "আর শুয়ে থাকলি ওদিকি আবার সব গোলমাল হয়ে যাবেনে।"-বক্তা কে এবং এখানে 'ওদিকি' বলতে কোন্ দিকের কথা বলা হয়েছে? 'গোলমাল' হয়ে যাওয়ার কারণ কী? 


উত্তরঃ বক্তা: নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য বিরচিত 'আগুন' নাটকের প্রথম দৃশ্যে উল্লিখিত উদ্ধৃতিটির বক্তা ১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষপীড়িত জনৈক পুরুষ।


যে দিক: দুর্ভিক্ষকালীন পরিস্থিতিতে লাইনে দাঁড়িয়ে চাল সংগ্রহ করা বহু মানুষের নিত্যদিনের কর্মসূচি ছিল। আলোচ্য উদ্ধৃতাংশে 'ওদিকি' বলতে চাল যেখান থেকে সংগ্রহ করতে হবে, সেদিকের কথা বলা হয়েছে।


কারণ: ১৩৫০ বঙ্গাব্দের আকালে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত, ক্ষুধার অন্ন জোগাড় করতে সকলেরই অবস্থা হিমসিম। কাকভোরে খাদ্যের লাইনে অপেক্ষারত বহু ক্ষুধার্ত মানুষ। তাই সকাল সকাল যদি নেত্য কিংবা নেত্যর মা খাদ্যের লাইনে না দাঁড়ায়, তাহলে বেলা বাড়লে চাল নাও পেতে পারে। সবসময়ই তাদের একটাই চিন্তা- 'চাল পাবা কি পাবা না।'


মণিচাঁদ আগের দিন দেরিতে গিয়ে একদম লাইনের পিছনে দাঁড়ানোয় চাল পায়নি। জনৈক পুরুষটি কুড়োনের মাকেও খালি হাতে বাড়ি ফিরে আসতে দেখেছে। তাই এমন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছে সকাল সকাল লাইনে না দাঁড়িয়ে শুয়ে থাকলে সব গোলমাল হয়ে যাবে, অর্থাৎ অভুক্ত অবস্থায় দিন যাপন করতে হবে। উদ্ধৃতাংশে ক্ষুধার্ত মানুষের জীবনযন্ত্রণার এইরূপ করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।


প্রশ্নঃ ৯ "অস্পষ্ট আলোয় বিড়ির আগুনের আনাগোনা বেশ সুস্পষ্ট।"-আলো অস্পষ্ট কেন? 'বিড়ির আগুনের আনাগোনা' অংশের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য লেখো।


উত্তরঃ অস্পষ্ট আলো: নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য বিরচিত 'আগুন' নাটকটির সূচনা ১৩৫০ বঙ্গাব্দের আকালের এক সকালে, যখন চারদিক ফরসা হয়ে ওঠেনি, অর্থাৎ উষাকালের পূর্বসময় বলেই আলো অস্পষ্ট। আলোচ্য অংশে যার বিড়ি ধরানোর কথা বলা হয়েছে সে জনৈক পুরুষ।


অন্তর্নিহিত তাৎপর্য: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ্রাসনের মাঝেই ১৯৪২ সালের ১৬ অক্টোবর এক সাইক্লোন ও আনুষঙ্গিক বান পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর ওড়িশার সমগ্র পটভূমিজুড়ে আছড়ে পড়লে মেদিনীপুর ও পাশাপাশি অন্যান্য জেলা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফল স্বরূপ, উপকূলবর্তী বহু মানুষই খাদ্যসংকটের কবলে পড়ে দিন কাটাতে থাকে; কেউ কেউ কলকাতা শহরের দিকে পা বাড়ায়। প্রচন্ড ক্ষুধা তাদের উদরে যেন আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আলোচ্য নাটকে 'বিড়ির আগুন' হল সেই আগুনেরই রূপক, এ যেন ক্ষুধারই আগুন। অস্পষ্ট আলোয় বিড়ির আগুন যেমন দীপ্তিমান ক্ষুধাও তেমনই বারবার যেন আনাগোনা করে। কোনো অবস্থাই পেটের ক্ষুধাকে ভুলিয়ে দিতে পারে না, পরিমিত খাদ্য কেবল কিছুসময়ের জন্য ক্ষুধার আগুনকে নির্বাপিত করতে পারে।