Chapter 8
বই কেনা
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'বই কেনা' প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ২ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'বই কেনা' প্রবন্ধের ভাববস্তু বিচার করো।
উত্তরঃ 'বিষয়সংক্ষেপ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ৩ "মাছি-মারা-কেরানি নিয়ে যত ঠাট্টা-রসিকতাই করি না কেন..."-মাছি-মারা-কেরানি নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতার কারণ কী? প্রাবন্ধিক এই প্রবাদবাক্যটি দিয়ে প্রবন্ধ শুরু করলেন কেন?
উত্তরঃ ঠাট্টা-রসিকতার কারণ: বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'পঞ্চতন্ত্র' প্রবন্ধগ্রন্থ থেকে 'বই কেনা' রচনাটি সংগৃহীত।
রচনার শুরুতেই আছে 'মাছি-মারা-কেরানি'-কে নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতা করার প্রসঙ্গ। পরাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজ প্রভুর দপ্তরে কেরানিগিরির কাজ জোটাতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করত ঘরকুনো বাঙালিদের সিংহভাগ। কেরানির চাকরিতে আলাদা করে জ্ঞান-বিজ্ঞান বা মেধার প্রয়োজন ছিল না। একই কাজের অন্ধ অনুকরণে রুটিরুজি জোগাড় করা বাঙালির পক্ষে সহজসাধ্য ছিল। জনশ্রুতি আছে, ইংরেজ আমলে এক বাঙালি কেরানি একটি দলিল কপি করতে গিয়ে তার কাজের প্রতি একনিষ্ঠভাব এবং তার অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তার চূড়ান্ত প্রমাণ দেন। দলিলের শেষ পাতায়, এক কোনায় একটি মরা মাছি আটকে আছে দেখে তিনি নিজের খাতাতেও প্রমাণ আকারের একটি মাছি খুঁজে লাগিয়ে দেন।
যে কারণে এই প্রবাদের প্রয়োগ: এই ঘটনা থেকেই নাকি মাছি-মারা-কেরানি প্রবাদবাক্যটির সূত্রপাত। বাঙালি কারও অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তা লক্ষ করলেই তার নামের সঙ্গে উক্ত প্রবাদটি জুড়ে ঠাট্টা-রসিকতা করে। প্রাবন্ধিক বাঙালি কেরানির এই অনুকরণপ্রিয়তাকে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বংশপরম্পরায় বাঙালির বই কেনার প্রতি অনীহা প্রসঙ্গে। এ ব্যাপারেও বাঙালি চূড়ান্ত অনুকরণপ্রিয় বলে রসিকতা করে 'মাছি-মারা-কেরানি' দিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধের সূচনা।
প্রশ্ন: ৪ "সে কথা পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করে নিয়েছেন”-পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তিরা কোন্ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং কেন? প্রসঙ্গ-সহ লেখো।
উত্তরঃ প্রসঙ্গ: বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' গ্রন্থের 'বই কেনা' প্রবন্ধটি শুরুই করেছেন 'মাছি-মারা-কেরানি' প্রবাদবাক্যটি দিয়ে। আসলে প্রবন্ধটির মূল যে ভাববস্তু অর্থাৎ বাঙালির বংশপরম্পরায় বই কেনার প্রতি অনীহা- এই অনুকরণপ্রিয়তাকে ব্যক্ত করতেই তিনি 'মাছি-মারা-কেরানি' প্রবাদবাক্যটির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ লেখনী-ভাবের ভার লাঘব করতে প্রবন্ধটির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং ব্যস্ত হয়ে পড়েছে 'মাছি ধরা বা মাছি মারা অতীব শক্ত কাজ এবং কেন'- এই আলোচনায়। আর 'মাছি মারা' সত্যিই যে সহজ কাজ নয়, এ কথাই পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তি মাত্রেই স্বীকার করে নিয়েছেন।
কারণ: মাছি-মারা-কেরানি কথাটি বহুলপ্রচলিত হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় মাছি ধরা এবং মারা কোনোটিই সহজসাধ্য নয়। মাহি স্বভাবত চঞ্চল প্রকৃতির। এ ছাড়া, তার মাথার চারপাশে অসংখ্য চোখ বসানো থাকে। তাই একই সময়ে, একই সঙ্গে মাছি তার চতুর্দিক দেখতে পায়। ফলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা তৈরির সঙ্গে সঙ্গেই সে উড়ে পালায়। প্রাবন্ধিক মনে করেন, শুধু শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্যই মাছি নিজের অগণিত চোখ ব্যবহার করে এমন নয়। অপরূপা পৃথিবীর সতত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সে একই সময়ে উপভোগ করতে পারে। মানুষের মতো তার দৃষ্টি কেবল সম্মুখভাগেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশ্নঃ ৫ "কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গিয়েছে”- কীসের কারণ অনুসন্ধান করে কী দেখা গিয়েছে?
অথবা, "সে একই সময়ে সমস্ত পৃথিবীটা দেখতে পায়"- কে, কীভাবে একই সময়ে সমগ্র পৃথিবীটা দেখতে পায়? আমরা মানুষরা তা পারি না কেন?
উত্তরঃ যে, যেভাবে: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'বই কেনা' প্রবন্ধটি 'মাছি-মারা-কেরানি'-র প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করলেও তিনি একবাক্যে স্বীকার করেছেন- মাছি মারা মোটেই সহজ কাজ নয়। আর সেই প্রসঙ্গেই এসেছে মাছির অভিনব দৃষ্টিশক্তির কথা। মাছি ধরা যে সহজ নয়, মাছিকে ধরতে গেলেই সে যে মুহূর্তে উড়ে পালায়- এ সবের কারণ তার পুঞ্জাক্ষি। হ্যাঁ, মাছির মাথার চতুর্দিকে অসংখ্য চক্ষুর অবস্থান। ফলে সে সর্বদা সর্বত্র তার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারে। শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রেখে সহজেই আক্রমণের হাত থেক আত্মরক্ষায় সমর্থ হয়। শুধু আত্মরক্ষাই নয়, মাছির এই পুঞ্জাক্ষি সতত পরিবর্তনশীল বিপুলা এই পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-এরও আস্বাদ পায় সর্বক্ষণ, সর্বদিক দিয়ে- যা পৃথিবীর অন্যান্য জীবেদের কাছে অধরাই থেকে যায়।
না পারার কারণ: মানুষের চক্ষু মাত্র দুটি। সেই দুটি মাত্র চোখও আবার অবস্থান করে মাথার সামনের দিকে। তাই মানুষ কেবল তার সম্মুখভাগের পৃথিবীটুকুকেই দেখতে পায়। এখানেই মানুষ আর মাছির দৃষ্টিশক্তির পার্থক্য।
প্রশ্নঃ ৬ "গুণী ও জ্ঞানী আনাতোল ফাঁস দুঃখ করে বলেছেন..."-আনাতোল ফাঁস কে এবং তাঁর দুঃখের কারণ কী? এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিকের অভিমতটি সংক্ষেপে বিবৃত করো।
অথবা, "কথাটা যে খাঁটি ..."- কার, কোন্ কথাটি খাঁটি কথা বলা হয়েছে এবং কেন?
উত্তরঃ আনাতোল ফ্রাঁস: সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'বই কেনা' প্রবন্ধে মাছির অসংখ্য চোখ থাকার সুবিধা প্রসঙ্গে জ্ঞানী ও গুণী আনাতোল ফ্রাঁসের কথা আলোচিত হয়েছে। প্রখ্যাত ফরাসি সাংবাদিক, কবি, ঔপন্যাসিক এবং বিদগ্ধ সমালোচক হিসেবে আনাতোল ফাঁস বিশ্বের দরবারে সমাদৃত।
দুঃখের কারণ: আনাতোল ফ্রাঁস প্রবল জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। প্রতিমুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে শিক্ষা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর প্রবল ছিল। নিত্যপরিবর্তনশীল জগৎসংসারের সমস্ত রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ আকণ্ঠ পান করার মনোবাসনা আনাতোলের মধ্যে নিহিত ছিল। তবে ফ্রাঁসের দুঃখ এই যে, মাছির মতো মানুষের মাথার চারপাশে যদি অসংখ্য চোখ থাকত (অন্তত তাঁর নিজের) তাহলে দিগন্তবিস্তৃত মনোমোহিনী সুন্দরী পৃথিবীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্য তিনি একই সঙ্গে দেখতে পেতেন।
আনাতোল ফ্রাঁসের এই আকাঙ্ক্ষা কেবল প্রকৃতির রূপসুধাপানের নয়, জ্ঞানতৃয়া নিবারণেরও সুপ্ত অভিলাষ মাত্র।
প্রাবন্ধিকের অভিমত: আনাতোল ফ্রাঁসের আক্ষেপের বিষয় ছিল এই যে, দুই নেত্রধারী মানবসন্তানদিগের দৃষ্টিশক্তি বড়োই সীমাবদ্ধ। তাই পুঞ্জাক্ষি মক্ষিকার (মাছি) ন্যায় তার পক্ষে বিশ্বদর্শন অধরাই থেকে যায়। মানুষেরও যদি মাথার চতুর্দিকে সহস্র চোখ থাকত তাহলে মানুষও হয়তো দিগন্তবিস্তৃত? প্রকৃতির সৌন্দর্য একই সঙ্গে একই মুহূর্তে উপভোগ করতে পারত। সৌন্দর্যের পূজারি প্রাবন্ধিকও ফ্রাঁসের এই ভাবনাটির সঙ্গে সহমত। তাই তিনি ফ্রাঁসের এই আক্ষেপের কথাটিকে খাঁটি বলেছেন। আবার ফ্রাঁসের সমাধানসূত্রটি, অর্থাৎ মানুষের মনের চোখ দিয়েই সেই অধরা পূর্ণ হয়-এই কথাটির প্রতিও সহমত প্রদর্শন করেছেন।
প্রশ্নঃ ৭ "ফাঁস সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন"- ফাঁস সান্ত্বনা দিয়ে কী বলেছেন? সেই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ফাঁসের কোন্ পার্থক্য লক্ষণীয়?
উত্তরঃ সান্ত্বনার ভাষা: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী 'বই কেনা' প্রবন্ধে বলেছেন ফরাসি লেখক ও দার্শনিক আনাতোল ফ্রাঁস মাত্র দুটো চোখ দিয়ে পৃথিবীর খন্ড খন্ড সৌন্দর্য দেখে তৃপ্ত হননি। কিন্তু একসঙ্গে অনেকগুলি চোখ না থাকার দুঃখ ভুলতে 'মনের চোখ' অর্থাৎ মানসদৃষ্টি বাড়িয়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে 'মনের চোখ' সৃষ্টি করতে পারলেই একটা নিজস্ব জগৎ সৃষ্টি করা যায়।
পার্থক্য: পাঠ্য প্রবন্ধ থেকে জানা যায় আনাতোল ফ্রাঁস ছিলেন জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সাধক। মানুষের যে কেন মাছির মতো অনেকগুলি চক্ষু নেই, এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর চূড়ান্ত আক্ষেপ ছিল। কারণ তা থাকলে এই ধরণির সম্পূর্ণ সৌন্দর্য তিনি একসঙ্গে দেখতে পেতেন।
সাধারণ মানুষও ফ্রাঁসের মন্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে আপশোশ করে। কিন্তু ফ্রাঁস মাথার উপরে অসংখ্য চোখ না পেলেও, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মনের চোখ বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়াসী হন। কিন্তু সাধারণ মানুষ সে বিষয়ে উদাসীন থাকে। সাধারণের সঙ্গে এখানেই তাঁর তফাত। কারণ তিনি জানতেন যে, মনের চোখ বাড়ানো-কমানো তাঁর হাতেই। তাঁর বক্তব্য হল, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জ্ঞানচর্চা করতে থাকলে আমাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। এর ফলে আমরা নানা অজানা বিষয়কে জানতে পারি। অর্থাৎ ভিন্নার্থে, অজস্র চোখের অধিকারী হওয়া যায়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এখানেই ফ্রাঁসের তফাত।
প্রশ্নঃ ৮ "মনের চোখ বাড়ানো-কমানো তো সম্পূর্ণ আমার হাতে।"- 'মনের চোখ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? মনের চোখ কীভাবে বাড়ানো-কমানো যায়?
উত্তরঃ মনের চোখ: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'বই কেনা' প্রবন্ধে আলোচ্য উক্তিটির বক্তা বিশ্ববরেণ্য ফরাসি পণ্ডিত আনাতোল ফ্রাঁস। মনের চোখ বলতে বোঝায় অন্তর্দৃষ্টি। জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তি তার কৌতূহল মেটাতে এই পৃথিবীর ভাণ্ডার থেকে যত বেশি করে অভিজ্ঞতা, নানাবিধ বিষয় সংগ্রহ করতে থাকে, ততই তার একটি করে মনের চোখ উন্মীলিত হতে থাকে, তার অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিত হতে থাকে।
কীভাবে: আকণ্ঠ জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে আজীবন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করেছেন আনাতোল ফাঁস। তবুও পরিতৃপ্তি আসেনি। প্রতিমুহূর্তে অনুভব করেছেন মানুষ হওয়ার কারণে অনেকগুলি চর্মচক্ষু না থাকার অভাব। মাছির মাথার চারপাশে অসংখ্য চোখ বসানো থাকে। তাই একই সময়ে সে পুরো পৃথিবীটা দেখতে পায়। ফ্রাঁস মাছির মতো অগণিত চোখ কামনা করেছেন তবে তা 'চর্মচক্ষু' নয়- জ্ঞানচক্ষু।
আসলে ফাঁস নানা বিষয়ের চর্চার মধ্য দিয়ে একই সময়ে, একই সঙ্গে প্রকৃতির সমস্ত রহস্য উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন, উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। মানুষের মাত্র দুটি চোখ দিয়ে যে কাজ অসম্ভব বলেই তিনি মনে করেছেন। পৃথিবী ভান্ডারের জ্ঞানরত্ন সংগ্রহে সর্বত্র ছুটে বেড়ানো সম্ভব নয়। এর বিকল্প উপায় তাই বই। বই পড়ার অভ্যাস আয়ত্ত করলে একটি করে মনের চোখ সৃষ্টি হয়। যে যত বেশি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করে, তার তত বেশি মনের চোখ ফুটতে থাকে। মানুষের অন্তরে নিহিত জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হলেই মনের চোখের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, জ্ঞানের চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলে মনের চোখের সংখ্যা কমতে শুরু করে- অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ ৯ "পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই..." 'আমরা' কী করি এবং আমাদের এইরূপ কর্মকান্ডের কারণ কী? চক্ষুবৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক কোন্ পন্থার কথা বলেছেন?
অথবা, "চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই।"- কারা চোখ রাঙায় এবং কেন? 'চক্ষু বাড়াবার পন্থাটা কী?
উত্তরঃ আমরা যা করি: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী 'বই কেনা' প্রবন্ধে বলেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেসব জাতি উন্নত, জীবনের সবদিকে যারা শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করেছে, তাদের মনের চোখ নিঃসন্দেহে অসংখ্য। এটি স্বীকার করে নিয়ে লেখক জানাচ্ছেন, আমরা অর্থাৎ এদেশীয়রা কিন্তু এখনও জ্ঞান অর্জনের প্রসঙ্গ উঠলেই আরব্য উপন্যাসের একচোখা দৈত্যের মতো কেবলই ঘোঁৎ ঘোঁৎ করি এবং মনশ্চক্ষু উন্মীলনের কথায় 'চোখ রাঙাই।'
কর্মকাণ্ডের কারণ: জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে বিশ্বের সমস্ত সভ্য জাতি নিজেদের মনের চোখ অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টির জাগরণে মগ্ন। অথচ এমন নবজাগরণের কালেও বাঙালি বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি ঘটানোর কথা শুনলেই অসন্তোষ প্রকাশ করে। আসলে বাঙালি জাতি জ্ঞানপিপাসু হলেও বই কিনে, বই পড়ে জ্ঞানার্জনে তার প্রবল অনীহা, তাই জ্ঞানচর্চা করে মনশ্চক্ষু উন্মীলনের প্রসঙ্গ এলেই সে চোখ রাঙায়।
চক্ষু বৃদ্ধির পন্থা: পৃথিবী ভাণ্ডারের জ্ঞানরত্ন সংগ্রহে সর্বত্র ছুটে বেড়ানো সম্ভব নয়। এর বিকল্প উপায় তাই বই। বই পড়ার অভ্যাস আয়ত্ত করলে একটি করে মনের চোখ সৃষ্টি হয়। যে যত বেশি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করে, তার তত বেশি মনের চোখ ফুটতে থাকে। মানুষের অন্তরে নিহিত জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হলেই মনের চোখের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, জ্ঞানের চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলে মনের চোখের সংখ্যা কমতে শুরু করে অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে যায়।