Chapter 6
নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্ব
বিশ্লেষনধর্মী প্রশ্নোক্তর
1. ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থা বা সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি কী? উদাহরণ-সহ ব্যাখ্যা করো।*
উঃ সংজ্ঞা বা ধারণা: ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থা হল একপ্রকার নির্বাচনি ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় কেবলমাত্র একজন প্রার্থী বা একটি রাজনৈতিক দল বিজয়ী হতে পারে। এই পদ্ধতিতে ভোটাররা একজন মাত্র প্রার্থীকে ভোট প্রদান করে এবং অনেক প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সবথেকে বেশি ভোটে এগিয়ে থাকেন তিনিই নির্বাচনে বিজয়ী হন। এজন্য ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থাটি সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবস্থা হিসেবেও পরিচিত। এই ভোটপদ্ধতিতে একটি নির্বাচনি এলাকায় সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এক্ষেত্রে প্রার্থীর - সংখ্যা দুই বা ততোধিক হলে মোট ভোটের অর্ধেকের চেয়ে কম ভোট পেয়েও প্রার্থী বিজয়ী হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রার্থীকে জয়লাভের জন্য অর্ধেকের বেশি ভোট বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয় না।
উদাহরণ: কোনো নির্বাচন কেন্দ্রে যদি ১ লক্ষ ভোট পড়ে, তাহলে নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য প্রার্থীকে ৫০ হাজার বা তার বেশি ভোট পেতে হয় না, শুধু ওই নির্দিষ্ট কেন্দ্রের অন্য সকল প্রার্থীর থেকে বিজয়ী প্রার্থীকে বেশি ভোট পেতে হয়। এমনকি এক্ষেত্রে একজন প্রার্থী যদি অন্য প্রার্থী বা প্রার্থীদের চেয়ে একটি ভোটও বেশি পায় তাকেই জয়ী ঘোষণা - করা হয়। এ ধরনের ভোটদান পদ্ধতিকে সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি বা First Past the Post System (FPTP) বলা হয়। একে আবার সিঙ্গেল মেম্বার প্লুরালিটি সিস্টেম (Single-Member Plurality System)-ও বলা হয়ে থাকে।
2. ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থা বা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতির প্রকৃতি আলোচনা করো।*
উত্তরঃ প্রকৃতি: ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেমের প্রকৃতি নিম্নে আলোচিত হল-
★ সহজ সরল: ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেম বা সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অন্যান্য নির্বাচন পদ্ধতিগুলির তুলনায় অনেকটাই সহজ সরল। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে দেশকে কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, যিনি আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন।
★ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে মোট ভোটের ৫০ শতাংশের কম ভোট লাভ করেও প্রার্থী জয়ী হতে পারেন। নির্বাচনে কোনো প্রার্থী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী জয়ী ঘোষিত হন।
উদাহরণ: কোনো একটি নির্বাচনি কেন্দ্রে তিনটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে একজন করে প্রতিনিধি ভোটে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একজন প্রার্থী মোট ভোটের ৩৬ শতাংশ পেয়েছেন, অন্যদিকে বাকি দুইজন প্রার্থী যথাক্রমে ৩৩ শতাংশ ও ৩১ শতাংশ করে ভোট পেয়েছেন। সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসারে, যে প্রার্থী সব থেকে বেশি ভোট পেয়েছেন অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন সেই প্রার্থীকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হবে। অন্যদিকে, বাকি দুই প্রার্থী পরাজিত বলে ঘোষিত হবেন।। উক্ত নির্বাচনে ভোটের হার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, যে প্রার্থী জয়লাভ করেছেন তার প্রাপ্ত ভোট অপেক্ষা } তার বিপক্ষে ভোটের সংখ্যা অধিক। কিন্তু তার বিপক্ষের ভোট যেহেতু ভাগাভাগি বা বিভাজিত হয়ে গেছে সেহেতু ভোট বিভাজনের সুযোগে মোট ভোটের ৩৬ শতাংশ পেয়েই তিনি জয়লাভকরেছেন।
3. ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতি বা সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য লেখো।**
উঃ ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যসমূহ : ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থার যে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করা যায় সেগুলি হল-
(1) একক প্রার্থী নির্বাচন: সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা বা কেন্দ্র থেকে একজন প্রতিনিধিকেই নির্বাচিত করা হয়ে থাকে।
(2) সহজবোধ্য ফলাফল লাভ: এই ব্যবস্থাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ফলাফল লাভের সহজবোধ্যতা। কারণ একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান তিনিই জয়ী ঘোষিত হন।
(3) সিথতিশীল এবং শক্তিশালী সরকার গঠন: এই ব্যবস্থায় যেহেতু একটি রাজনৈতিক দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে, সেহেতু এই ব্যবস্থা একটি স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী সরকার গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
(4) স্পষ্ট নির্বাচনি প্রার্থীর সুনিশ্চিতকরণ: সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবস্থাতে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা থেকে একজন করে স্পষ্ট প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। যার ফলে ভোটাররা প্রার্থী সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন।
(5) সরলতা: এইরূপ পদ্ধতিতে কোনোরূপ জটিলতা নেই। এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে গোপন ভোটদানের মাধ্যমে নিজস্ব নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে হয় এবং যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট লাভ করেন তিনিই জয়ী ঘোষিত হন। ফলত নির্বাচন সম্পর্কে যাদের কোন গভীর জ্ঞান নেই, তারাও এটি খুব সহজেই বুঝতে পারে।
(6) জনগণ ও জয়ীপ্রার্থীর মধ্যে সম্পর্ক সহাপন: এই পদ্ধতিতে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনের সুযোগ পান বলে জয়ী প্রার্থী ও জনগণের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক সমস্যাগুলি সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। স্থাপিত হয় এবং জয়ী প্রার্থী জনগণের আঞ্চলিক
4. ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থার সুবিধাগা আলোচনা করো।**
উঃ ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থার বিবিধ সুবিধাগুলি প্রতার ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থার সুবিধাসমূহ হল-
(1) সরলতা: এইরূপ ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিক ফলাফলকে বুঝতে পারেন। একটি করে গোপন ভোট প্রদানের মাধ্যমে একজনমাত্র প্রার্থীকে নির্বাচন করেন। তাই এই পদ্ধতির সরলতার জন্য যাদের রাজনীতি বা নির্বাচন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নেই, তারাও সহজে নির্বাচনি
(2) ফলাফলের সহজবোধ্যতা: এই পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটার একজন প্রার্থীর জন্য ভোট প্রদান করে এবং যে প্রার্থী সবথেকে বেশি সংখ্যক ভোট লাভ করে, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও এই পদ্ধতির সরলতার জন্য ভোটগণনা করাও কর্তৃপক্ষের জন্য সহজ হয়।
(3) শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল সরকার: এই পদ্ধতি প্রায়শই একদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করে জোট সরকার গঠনের প্রবণতা বা সম্ভাবনাকে হ্রাস করে, যা একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের পথকে প্রশস্ত করে।
(4) পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন: সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিটি প্রার্থীকেন্দ্রিক ভোটিং ব্যবস্থা হওয়ায় ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সহজেই নির্বাচন করতে পারে। দলীয় প্রতীক, চিহ্ন বা দলের নাম দেখে নাগরিকরা সহজেই ভোট প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দসই প্রার্থীকে নির্বাচন করতে পারে এবং প্রার্থীর কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতা মূল্যায়ন করার সুযোগ পায়।
(5) আদর্শ ব্যবসথা: অনেকে মনে করেন, পদ্ধতিটির সরলতার জন্য বৃহৎ জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশে সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসরণ করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সহজ।
5. ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোেস্ট ভোটদান ব্যবস্থার ত্রুটি বা অসুবিধা লেখো।*
অথবা, ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেমের সমালোচনাগুলি আলোচনা করো।
উত্তরঃ ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোেস্ট ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ: সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিটি অত্যন্ত সহজ সরল এবং রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত হলেও, এই ব্যবস্থাটি বিবিধ সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। এগুলি হল-
1. সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজন: সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসৃত নির্বাচন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণ ভোটার অপেক্ষা সম্প্রদায় বা জাতিভিত্তিক ভোট ব্যাংক (Vote Bank) গড়ে তোলার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। ফলস্বরূপ, সম্প্রদায় ও জাতিভিত্তিক বিভাজন এবং তোষণের রাজনীতির উদ্ভব ঘটেছে, যা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে অশুভ বলে বিবেচিত হয়।
2. অগণতান্ত্রিক ব্যবসথা: এই পদ্ধতিতে একজন প্রার্থী খুব কম সংখ্যক ভোটারদের সমর্থন লাভ করেই জয়ী ঘোষিত হন, কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে সাধারণভাবে বহুদলীয় ব্যবস্থা স্বীকৃত হওয়ায় দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে খুব কম ভোটেও প্রার্থী জয়ী হতে পারেন, যা অগণতান্ত্রিক।
3. বিপক্ষ ভোটের অবহেলা: এই পদ্ধতি অনুসারে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হারানোর জন্য বা একজন প্রার্থীর জয়ী হওয়ার জন্য যে পরিমাণ ভোটের প্রয়োজন, তার থেকে বেশি ভোেট নির্বাচনি ফলাফলকে প্রভাবিত করে না, ফলে বিপুল সংখ্যক ভোট নষ্ট হয়। কারণ, এই পদ্ধতি অনুযায়ী যেসকল প্রার্থী নির্বাচনে কম ভোট পেয়ে থাকেন, তাদের ভোটের কোনো মূল্য থাকে না।
4. ছোটো ও সংখ্যালঘু দলগুলির পক্ষে অনুপমুক্ত: ছোটো ও সংখ্যালঘু দলগুলির জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। কারণ দলগুলিকে প্রায়শই প্রতিনিধিত্ব লাভের জন্য কঠোর প্রতিযোগিতা করতে হয়। কারণ, ক্ষুদ্র দলগুলি নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট লাভ করে আইনসভায় সেই অনুযায়ী সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করার সুযোগ পায় না, ফলে এই রাজনৈতিক দলগুলি বৃহৎ দলগুলির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে
না। উদাহরণস্বরূপ বহুজন সমাজ পার্টি (BSP) বা আম আদমি পার্টি (AAP)-এর মতো ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলগুলির কথা বলা যায়।
মূল্যায়ন: এই ত্রুটির প্রেক্ষিতে পরিশেষে বলা যায়, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতির সঙ্গে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার সংমিশ্রণে এক মিশ্র ব্যবস্থা গড়ে তুললে যথার্থ জনপ্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে।