রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' গীতিকাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তরঃ 'নামকরণ' অংশ অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ২ লালন শাহ্ কে ছিলেন? পাঠ্য লালন-গীতিকা অবলম্বনে মূল বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ লালন শাহ্-র পরিচয়: 'টাকাটিপ্পনী' অংশে প্রদত্ত 'লালন' টাকাটি অনুসরণে লেখো।
মূলভাব: লালন শাহ্ রচিত 'লালন-গীতিকা'র পাঠ্য ৩৯১ নং পদ-এ আমরা দেখি সাধক বাউল লালন ফকির তাঁর একান্ত চিন্তা-চেতনায়, ভাবে ও ভাবনায়, বিশ্বাসে মানুষকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। মানুষের ভিতরেই শক্তি-ভক্তি এবং সেখানেই পরমপুরুষের অবস্থান। মানবদেহেই রয়েছে মনের মানুষের বিকাশের সর্বোত্তম স্তর। সিদ্ধিসাধনে পূর্ণতালাভের বাসনায় লালন প্রকৃত মানুষের সন্ধানে মানুষের প্রেমে মজেছেন। মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অধরা পরমাত্মারূপে বিরাজমান মনের মানুষকেই তিনি সন্ধান করেছেন এবং সাধন-ভজনের জন্য মানুষ-গুরুর কৃপায় মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন।
লালন বলেছেন জগতে মানুষকে ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায়। মানুষ ভজার মধ্য দিয়েই সিদ্ধিলাভ সম্ভব। সত্যমনের সাধনে মনের মানুষকে লাভ করতে হবে, নইলে মূল হারাতে হবে- 'মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।' জগৎসংসারে মানুষই সব। মানুষকে ঘিরেই মনুষ্যত্ব আলোকিত হয়। লালন গাইলেন-
"মানুষ ছাড়া মন আমার
পড়বি রে তুই শূন্যকার।"
সর্বপ্রকার সাধনসিন্ধির জন্য তিনি মানুষ ভজনার কথা বলেছেন।
প্রশ্নঃ ৩ লালন শাহ্ ফকিরের গান'- এই রচনাটিতে লালন শাহের কবিপ্রতিভার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তার মূল্যায়ন করো।
উত্তরঃ ভূমিকা: লালন সাঁই ছিলেন বাংলার বহুজনবিদিত বাউল সাধক। তাঁর সাধনার অবলম্বন ছিল তাঁর গান। লালন শাহ্ তাঁর গানে সহজ ভাষার মোড়কে, রূপক-প্রতীকের ব্যবহারে গভীর জীবনবোধে মানবপ্রেমের সুর সঞ্চার করেছেন।
কবিপ্রতিভার মূল্যায়ন: স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন লালন শাহের গুণমুগ্ধ ভক্ত। 'প্রবাসী' পত্রিকায় তাঁর গান প্রকাশ করে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। আমাদের আলোচ্য 'লালন শাহ্ ফকিরের গান'-এ দেহবাদী সাধক মানুষের মধ্যে ঈশ্বরপ্রাপ্তির সুলুকসন্ধান দিয়ে মানুষ ভজনার কথা বলেছেন বারংবার। আলোচ্য গানে মানুষের দুটি সত্তা। এক মানুষ চর্মচক্ষুতেই ধরা পড়ে, আর-এক মানুষ 'অধরা মাধুরী'। অথচ অধরা সেই আলেক সাঁইকে মানুষ খুঁজতে থাকে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে। চক্রে বিভাজিত মানবদেহের ভূযুগলের মাঝে ষষ্ঠ চক্রে, যাকে সাধক বলছেন 'দ্বি-দলের মৃণালে'-তাতেই প্রকট হন সেই আরাধ্য জন। মনকে নির্দেশিত পথে সেই আজ্ঞাচক্রে নিয়ে যেতে পারলে জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটে। মানুষ সাক্ষাৎ পায় 'সোনার মানুষ'-এর। 'মানুষ সত্তা'-র স্বরূপ বর্ণনায় কবি যেমন এনেছেন 'সোনার মানুষ', মানুষ গুরু-র মতো চিত্রকল্প বা অলংকারের ব্যবহার তেমনই কাব্যগুণসমৃদ্ধ প্রতীকী শব্দবন্ধ 'দ্বি-দলের মৃণাল,' 'আলেক লতা' ইত্যাদিরও প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তবে এ গানের মূল যে বিষয়টি, ভাবের ব্যঞ্জনা, যেমন- 'এই মানুষে মানুষ গাথা' বা 'দ্বি-দলের মৃণালে। সোনার মানুষ উজ্জ্বলে'- তা-ই গানটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। মানুষ ভজনাই যে মোক্ষলাভের একমাত্র পথ-এই সাধনসত্যের স্বরূপ বর্ণনায় কবির কবিত্বশক্তি আলোচ্য কবিতাটিকে বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তন সম্পদে পরিণত করেছে।
প্রশ্নঃ ৪ লালন শাহ ফকিরের গান' গীতিকাটিতে বারংবার 'মানুষ' শব্দ ৫ ব্যবহারের তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
অথবা, লালনের মানবতত্ত্বের প্রকৃত স্বরূপ কী এবং তিনি মানবসত্তাকে কীভাবে নির্ণয় করতে চেয়েছেন? 'লালন শাহ ফকিরের গান' গীতিকায় মানবতাবাদের যে সুরটি লক্ষ করা যায়, তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
অথবা 'লালন শাহ ফকিরের গান' গীতিকাটির মধ্যে রচয়িতার যে মনোভাব ফুটে উঠেছে, তা তোমার ভাষায় সংক্ষেপে লেখো।
উত্তরঃ মানবতত্ত্বের স্বরূপ: লালন শাহের মত অনুসারে মানবতত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল দেহতত্ত্ব। সহজিয়া বাউলসাধনায় যাবতীয় পার্থিব কামনা-বাসনাকে অবদমিত করে রচিত হয়েছে মুক্তিপথের সাধনা। কিন্তু এই সাধনা দেহকে কেন্দ্র করেই, মানবদেহ ছেড়ে অন্যত্র পরমাত্মার অনুসন্ধান নিরর্থক-সেই পথে পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করা যায় না।
মানবসত্তার স্বরূপ: ক্ষিতি-অপ্-তেজ-মরুৎ-ব্যোম-এই পঞ্চভূতে জগৎ সৃষ্ট। আবার মানবদেহেও নিহিত আছে পঞ্চভূত। আর স্রষ্টা যিনি, অর্থাৎ পরমাত্মা ঈশ্বরও নিহিত আছেন এই পঞ্চভূতে। তাইতো সব কিছু তাঁর মধ্যে মিশে আছে, তিনিও মিশে আছেন সর্বত্র। লালন সাঁই তাকেই বলেছেন-
'এই মানুষে মানুষ গাথা'। গীতিকার এভাবেই মানবসত্তার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন।
আলোচ্য গানে মানবতার সুর: 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' গীতিকাটি মূলত মানবতাবাদের মুল সুরে ঋদ্ধ। আলোচ্য পাঠ্যের চারটি স্তবকে 'মানুষ' প্রসঙ্গ এসেছে মোট নয়বার। আসলে সাধক লালন আজীবন জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ হওয়ার যে সাধনা তার মূল উপকরণ-মানুষ। তাঁর গভীর বিশ্বাস, মানুষকে উপাসনা করলে যথার্থ মানুষ হওয়া যায়। মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মনুষ্যত্বও ছিন্ন হয়ে যায়। মানুষ-গুরুর ভজনা করলে তাঁর কৃপায় দ্বি-দল পদ্মচক্রে অর্থাৎ আজ্ঞাচক্রে আলোকিত মানুষের আবির্ভাব ঘটে। বৃক্ষের সঙ্গে আলেক লতার অথবা স্বর্ণলতার অঙ্গীভূত থাকার ন্যায় মানুষের মধ্যেও আর-এক আলোকিত মানুষ, অর্থাৎ অন্তরাত্মা উজ্জ্বল হয়ে আছেন। এই আলোকিত অন্তরাত্মাতেই রয়েছে মহাশূন্যতায় তলিয়ে যাওয়া। থেকে উত্তরণের দিশা। তাই গীতিকাটির নিবিড় পাঠে মানবতার মূল সুর। 'সবার উপরে মানুষ সত্য' ধ্বনিত হয়ে ওঠে, যা রচয়িতা মহাত্মা লালনের মনোগত অভিপ্রায়কে তুলে ধরেছে।
প্রশ্নঃ ৫ লালন শাহ কী ধরনের গানের জন্য কেন স্মরণীয়? পাঠ্য কবিতাটিতে 'মানুষ' কীভাবে কবির কাছে ধরা পড়েছে?
উত্তরঃ যে কারণে স্মরণীয়: 'কবি পরিচিতি'-র 'রচনাবৈশিষ্ট্য' অনুসরণে লেখো।
মানুষ-এর চরিত্রচিত্রণ: ৪ নং প্রশ্নোত্তর অনুসরণে লেখো।
প্রশ্নঃ ৬ লালন ফকির রচিত 'লালন শাহ ফকিরের গান' নামক পাঠ্য গীতিটিতে ব্যবহৃত 'মানুষ ভজলে' ও 'মানুষ ছেড়ে' বাক্যাংশ দুটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তরঃ মানুষ ভজলে: লালন শাহ্ রচিত পাঠ্য 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' গীতিকায় এই শব্দবন্ধ দুটির উল্লেখ পাওয়া যায়। বাউলের সাধনা নরনারায়ণের সাধনা। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে ও মানুষের শ্রেণি-জাতি-ও ধর্মভেদে তাঁরা বিশ্বাসী নন। তাঁদের বিশ্বাস পরমাত্মার আবাসস্থল মানবদেহে। লালন বলছেন-
"ওই ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে
শুনি ভাঙেও তা আছে।”
বাউলতত্ত্ব ভাণ্ডে ব্রহ্মাণ্ড তত্ত্ব। বাউল সাধক বিশ্বাস করেন, 'আত্মানাং বিদ্ধি'। নিজেকে জানলেই পরমকে জানা হয়। তাঁর কাছে মানুষ মাত্রেই 'মানবরতন'। তাই গুরুমুখী বাউলতত্ত্ব বিশ্বাস করে গুরু নির্দেশিত পথে মানুষকে ভজনা করে পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করাই মুক্তি। মানব ভজনাতেই নিহিত মানবের মোক্ষলাভের পথ।
মানুষ ছেড়ে: বাউলের বিশ্বাস, দেহ হল দেহতরি। মানবজীবন নদীপ্রবাহ। নদীর এক তীরে ক্ষণস্থায়ী মানবদেহ, অন্য তীরে পরমসত্তা, মনের মানুষ-যিনি অনন্ত, অসীম, অপার। এ দুইয়ের মাঝে লক্ষ যোজন ফাঁক। মানুষ, মানুষ ছেড়ে ভ্রান্ত পথে চালিত হয় পরমাত্মার সান্নিধ্য পাবে বলে। কিন্তু মানুষ ছেড়ে দিলে মনের মানুষের সান্নিধ্য মেলে না। বরং মানুষ। তার সত্তাই হারিয়ে ফ্যালে। মানুষ ভজনা ছাড়া মানবজীবনই বৃথা। তাই লালন সাঁই বলছেন 'মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।'
প্রশ্নঃ ৭ "মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি'- কে, কাকে এ কথা বলেছেন? উদ্ধৃতিটির মর্মার্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তরঃ বক্তা: আলোচ্য অংশটি লালন শাহ্ রচিত 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' পাঠ্য গীতিকার অন্তর্গত। উদ্ধৃতাংশের বক্তা মানবপ্রেমিক, মহাত্মা লালন শাহ।
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: উদ্ধৃতাংশের বক্তা লালন এ কথা যেমন বুঝিয়েছেন নিজেকে, আবার পরবর্তী প্রজন্মের ভক্ত-সাধকদের প্রতিও তিনি এই নির্দেশ রেখেছেন।
মর্মার্থ: 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' গীতিকায় উল্লিখিত পঙ্ক্তিটি বাউল দর্শনের এক মহান সত্যের প্রকাশক। বাউলরা মানুষের শ্রেণি-জাতি-ধর্মভেদে বিশ্বাসী নয়। তারা ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান, কঠোর রীতিনীতি পালনের কথা বলে না। দেহই তাদের দেবতার মন্দির। পরমাত্মাকে তারা মানবদেহেই খুঁজে পায়।
"ওই ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে
শুনি ভান্ডেও তা আছে।"
-লালন
বাউলতত্ত্ব তাই ভান্ডে ব্রহ্মাণ্ড তত্ত্ব। মানবদেহই পরমাত্মার আবাসস্থল। তিনিই বাউলের মনের মানুষ, অলখ-নিরঞ্জন। তিনি জীবদেহেই বিরাজ করেন। গুরুর দেখানো পথে সাধনা করে তাঁকে পাওয়ার মধ্য দিয়েই মানুষের মুক্তিলাভ। মানুষের তাই উচিত মানুষ ভজনা করা। মনের মানুষের সাধনা ছেড়ে দিলে মানবজীবনই বৃথা।
প্রশ্নঃ ৮ পাঠ্য গীতিকায় মানুষ ভজার কথা কেন উল্লিখিত হয়েছে? মানুষ ছেড়ে দিলে কী হবে?
অথবা, 'মানুষ ভজলে কী কী ঘটবে? মানুষ ছাড়লে কী হতে পারে?
উত্তরঃ মানুষ ভজনায় যা ঘটবে: লালন ফকির রচিত 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' শীর্ষক পাঠ্য গীতিকাটি মানবপ্রেমের বন্দনাগীতি। প্রকৃত ঈশ্বর বিরাজ করেন মানুষের অন্তরে। তাই মানুষকে ভালোবাসার অর্থ ঈশ্বরকে ভালোবাসা। সুতরাং, 'মানুষ ভজলে' সোনার মানুষ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হওয়া সম্ভব। মানুষের অন্তরে বসবাসকারী ঈশ্বরকে একবার চিনতে পারলে, তাঁর স্পর্শ পেলে তবেই ভক্ত-সাধক 'সোনার মানুষ'-এ পরিণত হবেন। মানুষের মধ্যে প্রস্ফুটিত দ্বি-দল চক্রে অর্থাৎ আজ্ঞাচক্রে মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনে সোনার মানুষের স্বর্ণপ্রভা লাভ করা যায়।
মানুষ ছাড়া-র পরিণতি: মানুষের মধ্যেই বিরাজ করেন পরম আরাধ্য মনের মানুষ। অথচ মানুষ আপন ঘরে তাঁর সন্ধান না করে অন্যত্র তাঁকে খুঁজে বেড়ায়। সাধনপথের এই ভ্রান্তিই সমাজে কুসংস্কার, বৈষম্য, ভেদাভেদ, জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিচার তৈরি করে। সমাজ কলুষিত হয়। ফলত, মানবতাবোধের অবক্ষয় ঘটে। কিন্তু ঈশ্বরপ্রাপ্তি অধরাই থেকে যায়।
মানুষ ভজনা তথা মানবপ্রেম ব্যতীত সাধকের উত্তরণের অন্য কোনো পথ নেই। লালন ব্যাকুল সাধককে সতর্ক করেছেন, মানুষের সান্নিধ্য ত্যাগ করলে আপন সত্তা তথা মনুষ্যত্ব হারাবে বাউল। মনের মানুষ ঈশ্বর নিহিত আছেন মানুষেরই মধ্যে, তাই তাঁকে নিজের মধ্যে না খুঁজে অন্যত্র খুঁজতে যাওয়া বৃথা। মানুষ-গুরুর কৃপাদৃষ্টিতেই সিদ্ধিলাভ সম্ভব। মানুষকে অবহেলা করলে বাউল সাধকের সকল সাধনাই শূন্য, নিষ্ফল।
প্রশ্নঃ ৯ "মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।।"-কাকে, কেন 'ক্ষ্যাপা' বলে সম্বোধন করা হয়েছে? 'মূল' কী এবং তা কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে?
উত্তরঃ লালন ফকির রচিত পাঠ্য 'লালন শাহ্ ফকিরের গান' আলোচ্য গীতিকায় এই উদ্ধৃতিটির উল্লেখ আমরা পাই।
'ক্ষ্যাপা' যে: 'বাউল' শব্দের উৎস বাতুল শব্দ, যার অর্থ উন্মাদ বা ভাবে উন্মত্ত ব্যক্তি। বাউল সাধকগণ দিব্যোন্মাদ অবস্থায় বা ভাবে ব্যাকুল হয়ে 'মনের মানুষ'-এর সন্ধান করেন। আত্মতত্ত্বের গভীর অর্থকে জানতে মন রূপসাগরে ডুব দিতে এমন উন্মত্ত ভাব ধারণ করে-লালন সেই মনকেই 'ক্ষ্যাপা' বলেছেন।
'ক্ষ্যাপা বলার কারণ: 'ক্ষ্যাপা' শব্দের প্রতিশব্দ হল ক্ষিপ্ত, জ্ঞানশূন্য, পাগল ইত্যাদি। আবার, 'বাউল' শব্দটি এসেছে 'বাতুল' থেকে; যার অর্থ পাগল বা খ্যাপা। তবে মনে রাখতে হবে, বাউল সাধকদের মন সর্বদা পাগল থাকে মনের মানুষের জন্য। এই মনের মানুষের অনুসন্ধান এবং তাঁকে উপলব্ধি করাই হচ্ছে বাউলসাধনার মূল ভিত্তি। কিন্তু এই সাধনার পথ মোটেই সহজ নয়। গুরুর কৃপাধন্য হয়েই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দেহতাত্ত্বিক সাধনার মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত মনের মানুষকে উপলব্ধির সীমায় বাঁধতে পারেন। যেহেতু মনের মানুষের অনুসন্ধানের জন্য বাউল সাধকদের মন সবসময় পাগলপারা থাকে, তাই তাদের মনকে 'ক্ষ্যাপা' বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
'মূল-এর অর্থ: 'মূল' বলতে এখানে ভিত্তি, মানুষের মূলসত্তা, সেটা যে আসলে মনুষ্যত্ব সেই কথাই বলা হয়েছে। মানুষরূপে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষের অন্তরাত্মাকে জাগ্রত করে মনের মানুষের সন্ধান করতে হয়। মনের মানুষ মানবদেহের মাঝেই বিরাজ করেন। তাই মানবপ্রেমের জাগরণে, মানবতাবোধের বিকাশেই প্রকৃত 'মানুষ' হয়ে ওঠা। মানুষের প্রতি অবহেলা সেই মূল তথা মনুষ্য পরিচয় থেকে ছিন্ন হওয়া।
যেভাবে হারাতে পারে: বাউলের ঈশ্বরসাধনা দেহবাদী সাধনা। তাই লালন সাঁই বারে বারে বলেছেন মানুষ ভজনার কথা। ভক্তিতে উন্মত্ত যে জন আপন ঘরে অর্থাৎ নিজের মধ্যে বা মানুষের মধ্যে পরমাত্মা পরমপুরুষের সন্ধান না করে বহির্জগতে তাঁকে খুঁজে ফেরেন, তার কাছে ঈশ্বর অধরাই থেকে যান। উপরন্তু, মানুষ ভজনা না করলে মানুষ তার মূলসত্তা বা মনুষ্য পরিচয় হারিয়ে মনুষ্যেতর হয়ে পড়ে যা কাম্য নয়।