Chapter 12


ঊনবিংশ শতাব্দীর সামাজিক ধর্মীয় ও শিক্ষাসংস্কার আন্দোলন


প্রশ্নঃ ১ ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।


উত্তরঃ বাংলার নবজাগরণ: সমাজ ও ধর্মের শাসনে আবক্ষ জাতির জীবনে বিদ্রোহ সঞ্চারিত হলেই নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্পর্শে বাঙালি মানসে যে সার্বিক ভাববিপ্লব ঘটে, তারই প্রভাবে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এক নবতর চেতনায়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই ভাববিপ্লবই রেনেসাঁস বা নবজাগরণ নামে পরিচিত-যা বাংলার বুকে নবজাগরণের সূচনা করে। আর এই নবজাগরণের সঙ্গেই বাংলা তথা ভারতে শুরু হয় আধুনিক যুগ। বাংলার 'নবজাগরণের কাল' হল এখানকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের সময়পর্ব। প্রধানত রামমোহন রায়ের আবির্ভাবকাল থেকে রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসান পর্যন্ত সময়কেই নবজাগরণের সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।


বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে নবজাগরণের প্রভাব লক্ষ করা যায়। শিক্ষা-সংস্কারের উদ্দেশ্যে মুদ্রণযন্ত্র তথা ছাপাখানার আবির্ভাব ঘটে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে ভারতে প্রথম পুস্তক মুদ্রিত হয় পোর্তুগিজ মিশনারিদের উদ্যোগে। 'পর্তুগিজ বাংলা অভিধান' ও 'কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ' গ্রন্থ দুটি হল বাংলার প্রথম মুদ্রিত পুস্তিকা। এই মুদ্রণযন্ত্র কলকাতায় প্রথম স্থাপিত হয় ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী উইলিয়াম বেল্টেস্-এর হাত ধরে। ঔপনিবেশিক বাংলার শিক্ষাসংস্কারে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮০০)। এখান থেকেই আধুনিক যুগের বাংলা রচনার শুভারম্ভ। এরপর একে একে বিশপস্ কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়কে সুচিহ্নিত করে।


ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণ বাংলার সমাজজীবনকেও প্রভাবিত করে। তৎকালীন হিন্দুসমাজের প্রথানুযায়ী সতীদাহপ্রথা চিরতরে নির্মূল করা হয় রামমোহন রায় ও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের জোরালো যৌথ উদ্যোগে। এই প্রথা নিবারণের জন্য আইন প্রণীত হয়। শুধু তাই-ই নয়, বিধবাবিবাহ প্রথা আইনসিদ্ধ হয় সমাজসংস্কারক বিদ্যাসাগরের আন্তরিক প্রচেষ্টায়। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ ইত্যাদি কুপ্রথারও সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটে কেশবচন্দ্র সেনের বলিষ্ঠ বিরোধিতায়। রেনেসাঁসের প্রভাবে গড়ে ওঠে ইয়ং বেঙ্গল বা নব্যবঙ্গ দল-যার পুরোধা (প্রধান ব্যক্তি) ছিলেন তৎকালীন হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। এই নব্যবঙ্গ দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সমসাময়িক হিন্দুসমাজের কুসংস্কার ও অন্যায়কে তীব্র প্রতিবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে সমূলে উপড়ে ফেলা।


বাংলার ধর্মীয় ক্ষেত্রও এই ঔপনিবেশিক রেনেসাঁসের বাইরে ছিল না। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, কেবল মিশনারি ধর্ম প্রচারের উদ্যোগেই স্থাপিত হয় 'শ্রীরামপুর মিশন'। উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড-তিন মিশনারিই বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। এই উদ্দেশ্যে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় 'মঙ্গল সমাচার মতিউর' নামক এক প্রচারপুস্তিকা, যা ছিল খ্রিস্টধর্মের পরিপোষক। খ্রিস্টান মিশনারিদের এই ধর্মীয় আন্দোলন হিন্দুসমাজকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলত, রামমোহনের উদ্যোগে হিন্দুসমাজ তার রক্ষণশীলতার আবরণ থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। খ্রিস্টধর্মের বিরোধিতায় একে একে গড়ে ওঠে ব্রাহ্ম-সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, আর্যসমাজ, রামকৃয় মিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলি। রামমোহন রায়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্রাহ্মসমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল মূর্তিপূজাবিরোধী সংস্কারমুক্ত একেশ্বরবাদ। রামকৃয় মিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী প্রচার পেতে শুরু করল।


উনিশ শতকের নবচেতনার উন্মেষে বাংলা সাহিত্য শতধারায় বিকশিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যচর্চার সূত্রপাত ঘটে। বলা বাহুল্য, এই সময়ে বাংলা গদ্যের বিকাশে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিকদের অবদান চিরস্মরণীয়। এই কালপর্বে নবচেতনার উদ্বোধন ও প্রচারের এক বড়ো মাধ্যম ছিল সাময়িকপত্র। আর এই সাময়িকপত্রের মাধ্যমেই সেই সময়ের সাধারণ মানুষের জীবনধারা ও জ্ঞান - বিজ্ঞানচর্চার সামগ্রিক পরিচিত প্রকাশ পায়। এককথায়, সাময়িক - পত্রের দৌলতেই বাংলা গদ্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। গদ্যের পাশাপাশি কাব্য-কবিতাতেও আসে আমূল পরিবর্তন। কবি মধুসূদন দত্তের কলমে জেগে উঠল মহাকাব্যের ভারত। তিনি ভার্জিল, মিল্টন প্রমুখ ইউরোপের আদি মহাকবিদের অনুসরণ করে কাব্যরচনায় ব্রতী হলেন। তাঁরই সমসাময়িক ছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল কবিরা। পরের দিকে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকেরা।


উপসংহার: এভাবে উনিশ শতকের বাঙালি চিত্তে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে একট বৃহৎ পরিবর্তন সূচিত হয় এবং এরই পথ ধরে সাহিত্যচর্চাতে আসে অভিনবত্বের আস্বাদ-যা বাঙালি জাতির জীবনকে নানাভাবে উদ্দীপ্ত করে।


প্রশ্নঃ ২ আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য লেখো। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত আধুনিক যুগ বলতে কী বোঝো? 


উত্তরঃ বৈশিষ্ট্য: বাংলার আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-


  • যুক্তির নিরিখে সমস্ত কিছু বোঝা।

  • দেবতার পরিবর্তে মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া।

  • ও প্রমাণের বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয়।

  • অজানাকে জানার আগ্রহ।

  • প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের কৌতূহল।

  • প্রাচীনকে বর্জন করে নয়, বরং তার যুক্তিযুক্ত গ্রহণযোগ্যতার মধ্য দিয়ে বাংলার সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন।



বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগ: বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণ নিয়ে বিশিষ্টজনেরা সহমত পোষণ করলেও এর সূচনাকাল নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য বর্তমান। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার মনে করেন যে, ১৭৫৭-তে পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদ্‌দ্দৌলার পরাজয় ও ইংরেজ রাজত্বের সূচনা থেকেই আধুনিক যুগের শুরু। আবার, ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম জোন্সের উদ্যোগে 'এশিয়াটিক সোসাইটি'-র প্রতিষ্ঠাই যে রেনেসাঁ-র সূচনাকাল-এই ধারণা ডেভিড কফ-এর। অন্যদিকে, সুশীলকুমার গুপ্ত, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের মতে, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা থেকেই রেনেসাঁ-র সূচনা। অনেকে আবার কলকাতায় রামমোহনের স্থায়ীভাবে বসবাস কিংবা হিন্দু কলেজ স্থাপন, হিন্দু কলেজে ডিরোজিও-র শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি-এইসমস্ত বিষয়কেই বাংলার নবজাগরণ তথা আধুনিকতার নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায় 'বাংলার রেনেসাঁস' নামক গ্রন্থে বলেছেন-"আমাদের রেনেসাঁস ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঘটেছে। কিন্তু ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে ধারাবাহিকতার সূত্রে আসেনি। ইউরোপের ইতিহাস থেকে আবির্ভূত হয়েছে।"