Chapter 2
ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া
বিশ্লেষণধর্মী উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলি
1. আবহবিকার ও পুঞ্জিত ক্ষয়ের ধারণা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ আবহবিকারের ধারণা
আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান (বৃষ্টিপাত, উন্নতা, আর্দ্রতা, বায়ুর চাপ, তুষারপাত প্রভৃতি)-এর মাধ্যমে ভূত্বকের
উপরিভাগের শিলাসমূহের ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন হয় এবং তার ফলে শিলাস্তর ক্রমশ শিথিল হতে হতে
ছোটো ( শিলাখণ্ডে ও শিলাচূর্ণে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে আবহবিকার বলে।
(1)নামকরণঃ আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান দ্বারা শিলার 'বিকার' বা 'পরিবর্তন' ঘটে বলে প্রক্রিয়াটির নামকরণ করা হয়েছে
আবহবিকার।
[2]নিয়ন্ত্রকঃ আবহবিকারের প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি হল-জলবায়ু, উদ্ভিদ, ভূপ্রকৃতি, আদি শিলার প্রকৃতি, সময়, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী
প্রভৃতি।
[3]প্রকারভেদঃ আবহবিকার মূলত তিন প্রকার। যথা- (ii) যান্ত্রিক আবহবিকার (শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়), (ii) রাসায়নিক আবহবিকার
(শিলার বিয়োজন হয়) এবং (ⅲ) জৈবিক আবহবিকার (উদ্ভিদ ও প্রাণীর দ্বারা শিলার পরিবর্তন হয়)।
[4] বৈশিষ্ট্যঃ (i) আবহবিকারে শিলার বিচূর্ণন ও বিয়োজন ঘটে, (ii) এটি একটি স্থৈতিক বা স্থিতিশীল প্রক্রিয়া,
(ⅲ) এর মাধ্যমে শিলাচূর্ণের অপসারণ হয় না, (iv) আবহবিকারের শক্তি শিলার গঠন, শিলার প্রকৃতি ও আবহাওয়ার
ওপর নির্ভরশীল, (v) এটি অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়া।
[5] প্রভাবঃ (1) আবহবিকারের ফলে গোলাকৃতি পাহাড়, ইনসেলবার্জ, স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট, সিঙ্কহোল,
গুহা প্রভৃতি ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, (৫) মৃত্তিকা সৃষ্টিতেও আবহবিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, (জ) আবহবিকারের ফলে
শিলাস্তূপের উচ্চতা কমে যায় এবং তাই ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বাড়ে। (iv) আবহবিকারের অবশিষ্টাংশ হিসেবে ভূপৃষ্ঠে
প্রচুর পরিমাণে অদ্রবীভূত সিলিকা বা বালি পাওয়া যায়।
পুস্থিত ক্ষয়ের ধারণা—
কোনো উচ্চভূমির ঢাল বরাবর আবহবিকারজাত নুড়ি, পাথর প্রভৃতি যখন অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে নীচের দিকে
নামতে থাকে তখন তাকে পুঞ্জিত ক্ষয় (Mass wasting) বলে।
[1] নামকরণঃ উচ্চভূমির ঢাল বরাবর আবহবিকারসৃষ্ট শিলাচূর্ণ 'স্তূপ' বা 'পুঞ্জ' আকারে নেমে আসে বলে এরূপ
নামকরণ হয়েছে।
[2]নিয়ন্ত্রকঃ পুঞ্জিত ক্ষয়ের নিয়ন্ত্রকগুলি হল-ভূমির ঢাল, উচ্চতা, আবহবিকারসৃষ্ট পদার্থের আকৃতি ও পরিমাণ, উদ্ভিদের উপস্থিতি,
উন্নতা, বৃষ্টিপাত, অভিকর্ষজ বল প্রভৃতি। এ ছাড়া জল, বায়ু, বরফ প্রভৃতিও পুঞ্জিত ক্ষয়কে প্রভাবিত করে।
[3] প্রকারভেদঃ পুঞ্জিত ক্ষয় মূলত চারপ্রকার (i) ধীর প্রবাহ, (ii) দ্রুত প্রবাহ, (iiii) ধস ও (iv) অবনমন। আবার,
প্রকৃতি অনুসারে পুঞ্জিত ক্ষয় বিভিন্ন প্রকার হয়-(১) মৃত্তিকা প্রবাহ, (1) কর্দম প্রবাহ, (iii) ভূমিধস।
[4] বৈশিষ্ট্যঃ (i) পুঞ্জিত ক্ষয় ঢালযুক্ত ভূমিভাগে দেখা যায়, (ii) অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে পুঞ্জিত ক্ষয় সক্রিয় হয়,
(ii) পুঞ্জিত ক্ষয় ধীর বা দ্রুতগতিতে হতে পারে, (iv) এই প্রক্রিয়ায় ক্ষয়িত পদার্থ প্রাকৃতিক বহনকারী শক্তির
(নদী, বায়ু, হিমবাহ প্রভৃতি) দ্বারা বাহিত হয় না।
[5] প্রভাবঃ (i) পাহাড়ি অঞ্চলে পুঞ্জিত ক্ষয়ের ফলে ধস নামে, (ii) পুঞ্জিত ক্ষয়ের ফলে জীবন ও সম্পদহানি ঘটে,
(ii) পুঞ্জিত ক্ষয়ের ফলে খাড়া ঢাল, ভূমিঢালে ক্ষয়, ট্যালাস, শঙ্কু প্রভূতি ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।
2. ক্ষয়ীভবন ও নগ্নীভবনের ধারণা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ ক্ষরীভবনের ধারণা
আবহবিকারজাত পদার্থসমূহ নদী, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা স্থানান্তরিত বা অপসারিত হলে, তাকে
ক্ষয়ীভবন (Erosion) বলে।
[1] প্রক্রিয়াঃ ক্ষয়ীভবনের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল-অবঘর্ষ, ঘর্ষণ, উৎপাটন, অপসারণ প্রভৃতি।
[2]মাধ্যমঃ জলপ্রবাহ, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তির মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাচূর্ণ স্থানান্তরিত হয়।
[3]বৈশিষ্ট্যঃ (i) ক্ষয়ীভবনের ফলে শিলার অপসারণ ঘটে, (ii) ক্ষয়ীভবনের ফলে নীচের শিলাস্তর ভূপৃষ্ঠে উন্মুক্ত হয়,
(iii) আবহবিকারের ওপর ক্ষয়ীভবন নির্ভরশীল, (iv) এটি দ্রুতগতিসম্পন্ন প্রক্রিয়া।
[4] উদাহরণঃ মরুভূমি অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে শিথিল বালুরাশি ও শিলাচূর্ণ অন্যত্র অপসারিত হয়।
নগ্নীভবনের ধারণা
আবহবিকার, পুঞ্জিত স্খলন এবং ক্ষয়ীভবন-এই তিনটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত কার্যে ভূত্বকের উপরিভাগের
শিলাস্তর উন্মুক্ত বা নগ্ন হয়ে যায়। এজন্য এই তিনটি প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে নগ্নীভবন (Denudation) বলে।
[1] প্রক্রিয়াঃ নগ্নীভবনের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল-আবহবিকার, পুঞ্চিত স্খলন এবং ক্ষয়ীভবন।
[2]বৈশিষ্ট্যঃ (i) আবহবিকার, ক্ষয়ীভবন ও পুঞ্জিত ক্ষয়ের ওপর নগ্নীভবন নির্ভরশীল, (ii) শিলার প্রকৃতি, ভূমির উচ্চতা, জলবায়ু
ইত্যাদি নগ্নীভবনকে প্রভাবিত করে, (iii) নগ্নীভবনের মাধ্যমে ভূমিভাগের উচ্চতা ক্রমশ কমতে থাকে এবং ভূমি
উঁচুনীচু অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে মসৃণ হয়, (iv) এটি একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, (v) এর ফলে নীচের শিলাস্তর
ভূপৃষ্ঠে দৃশ্যমান হয়।
[3] স্থানিক তারতম্যঃ উষ্ণ মরু অঞ্চলে নগ্নীভবনের হার কম কিন্তু হিমবাহ অধ্যুষিত অঞ্চল ও নদীবহুল উষ্ণ-আর্দ্র
জলবায়ু অঞ্চলে নগ্নীভবনের হার বেশি।
[4] গুরুত্বঃ নগ্নীভবন প্রক্রিয়া ভূমিরূপের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ এর মাধ্যমে ভূমিভাগের
উচ্চতা ক্রমশ কমতে থাকে এবং ভূমি উঁচুনীচু অবস্থা থেেকে ক্রমান্বয়ে মসৃণ ও পর্যায়িত হয়।
3. ছকের সাহায্যে আবহবিকারের শ্রেণিবিভাগ করো।
উত্তরঃ আবহবিকারের শ্রেণিবিভাগ একটি তালিকার মাধ্যম দেখানো হল—
4. যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ যান্ত্রিক আবহবিকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়া
যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল—
[1]প্রস্তরচাঁই-খন্ডীকরণঃ উষ্ণতার প্রভাবে শিলা যখন চাঁই বা ব্লকের মতো বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত হয়, তখন তাকে প্রস্তরচাঁই খন্ডীকরণ
(Block disintegration) বলে।
(i)পদ্ধতিঃ শিলা তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় উদ্বুতার তারতম্যের ফলে শিলার বাইরের এবং ভেতরের স্তরের মধ্যে প্রসারণ ও
সংকোচনের পার্থক্য ঘটে। এই অসম সংকোচন-প্রসারণের ফলে শিলাস্তরে একাধিক অনুভূমিক ও উল্লম্ব ফাটল সৃষ্টি
হয়। এই ফাটল বরাবর একাধিক খণ্ডে শিলাস্তর ভাগ হয়ে যায়।
(ii) বৈশিষ্ট্যঃ যান্ত্রিক আবহবিকারের বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [a] ব্যাসল্ট শিলায় যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি দেখা যায়।
[b] এই আবহবিকারের ফলে শিলায় অনুভূমিক ও উল্লম্বভাবে একাধিক ফাটল সৃষ্টি হয়।
[c] এই ধরনের আবহবিকারের ফলে শিলার চৌকাকারে বিচূর্ণন ঘটে এবং [d] চাঁইয়ের আকারে শিলা বিভক্ত হয়।
(iii) অবস্থানঃ অধিক উষ্ণতাযুক্ত অঞ্চলে বিশেষত উন্ন মরুভূমিতে এই আবহবিকার দেখা যায়।
[2]শঙ্কমোচনঃ 'শল্প' শব্দের অর্থ বাকল (গাছের ছাল)। উয়তার প্রভাবে শিলাস্তর বাকলের মতো খুলে যায় ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
এই প্রক্রিয়াকে শল্কমোচন (Exfoliation) বলে।
(i) পদ্ধতিঃ সমসত্ত্ব শিলার ভেতর ও বাইরের অংশের মধ্যে উন্নতার প্রভাবে প্রসারণ (দিনের বেলায়) ও সংকোচন
(রাত্রিবেলায়) সমহারে হয় না। তাই ওপরের শিলাস্তর পেঁয়াজের খোসার মতো মূল শিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
চূর্ণবিচূর্ণ হয়। এজন্য এইপ্রকার আবহবিকারকে Onion Weathering-ও বলা হয়।
(ii) বৈশিষ্ট্যঃ শল্কমোচনের বৈশিষ্ট্য-গুলি হল-[a] এই আবহবিকার যায়।
চিত্র ➧ শল্কমোচন
[b] এই ধরনের আবহবিকারের ফলে উচ্চভূমির মাথাগুলি গোলাকার হয় এবং [c] সমসত্ত্ব শিলায় এই ধরনের
আবহবিকার ঘটে।
(iii) অবস্থানঃ সাহারা, ঘর প্রভৃতি উন্ন মরুভূমিতে শল্কমোচন প্রক্রিয়া বেশি দেখা যায়।
[3] ক্ষুদ্রকণা বিসরণঃ উন্নতার হ্রাসবৃদ্ধির ফলে অসম চরিত্রের খনিজে পঠিত শিলাগুলির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় বিভক্ত
হওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্ষুদ্রকণা বিসরণ (Granular disintegration) বলা হয়।
(i)পদ্ধতিঃ অসমসত্ত্ব শিলার খনিজগুলির তাপ গ্রহণ ও বর্জনের হার আলাদা হওয়ায় অসম প্রসারণ ও সংকোচনের কারণে
শিলাটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
(ii)বৈশিষ্ট্যঃ ক্ষুদ্রকণা বিসরণের বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [a] অসমসত্ত্ব শিলায় এই আবহবিকারের প্রক্রিয়া ঘটে থাকে। [b] শিলাগুলি
ফাটলে বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার মতো শব্দ হয় এবং (c) এই আবহবিকারের মাধ্যমে কালক্রমে বালুকণা সৃষ্টি হয়।
(iii) অবস্থানঃ উষ্ণ মরুভূমি অঞ্চলে যেখানে দৈনিক উন্নতার প্রসর বেশি, সেখানে এই প্রক্রিয়া বেশি দেখা যায়।
[4] তুষারের কার্যঃ শীতল জলবায়ুতে তুষারের কেলাস গঠনের দ্বারা যান্ত্রিক উপায়ে শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
(i) পদ্ধতিঃ তুন্দ্রা ও মেরু অঞ্চল এবং শীতল পার্বত্য অঞ্চলে শিলাস্তরের ফাটলে জমা জল তুষার কেলাসে পরিণত
হলে আয়তনে বেড়ে যায় এবং তখন শিলাগাত্রে চাপ পড়ে ও শিলা বিচূর্ণ হয়।
(ii)বৈশিষ্ট্যঃ তুষারের কেলাস গঠনের ফলে সৃষ্ট আবহবিকারের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-(a) তুষারের কেলাস গঠনের মাধ্যমে এই
আবহবিকার ঘটে। [b] পর্বতের পাদদেশে ও ঢালে শঙ্কু আকৃতির টুকরো টুকরো শিলা বা শিলাখণ্ড জমে নুড়িক্ষেত্র
সৃষ্টি হয়। এর নাম স্ক্রী বা ট্যালাস।
(iii) অবস্থানঃ শীতল জলবায়ু অঞ্চলে এই ধরনের আবহবিকার দেখা যায়।
[5]অন্যান্য-প্রক্রিয়াঃ যান্ত্রিক আবহবিকারের অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে লবণ কেলাস গঠন, ডার্ট ব্র্যাকিং, বোল্ডার ক্লিভিং, ভারমুক্ত হয়ে
শিলার প্রসারণ, কলয়েড উৎপাটন, বৃষ্টির ফোটার আঘাতের ফলে ক্ষয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
5. তাপের তারতম্যজনিত যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রক্রিয়াসমূহ আলোচনা করো।
উত্তরঃ তাগের তারতম্যজনিত যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রক্রিয়াসমূহ
বিশ্লেষণধর্মী 4 নং প্রশ্নের 1,2 এবং 3 নং পয়েন্ট দ্যাখো।
6. উষ্ণতার তারতম্য ব্যতীত যান্ত্রিক আবহবিকারের অন্যান্য পদ্ধতিগুলি আলোচনা করো।
উত্তরঃ উচ্চার অরতম্য ব্যতীত যান্ত্রিক আবহবিকারের পদ্ধতিসমূহ
বিশ্লেষণধর্মী 4 নং প্রশ্নের 4 এবং 5 নং পয়েন্ট দ্যাখো।
7. রাসায়নিক আবহবিকার বলতে কী বোঝ? এর প্রধান প্রক্রিয়াগুলি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ রাসায়নিক আবহবিকার
বায়ুমন্ডলে উপস্থিত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প প্রভৃতি গ্যাসীয় উপাদান এবং জল ও অম্ল যখন
রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শিলাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, তখন তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে। এর ফলে শিলার
খনিজ মৌলের পরিবর্তন ঘটে এবং শিলার প্রধান খনিজগুলি গৌণ খনিজকণায় পরিণত হয়।
রাসায়নিক আবহবিকারের প্রক্রিয়াসমূহ
রাসায়নিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল—
[1]জারণঃ জল বা জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিতে শিলার খনিজের সঙ্গে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন (০₂) সংযুক্ত হলে তাকে
জারণ বা অক্সিডেশন বলে।
(i)পদ্ধতিঃ লৌহ অক্সাইডযুক্ত শিলার সঙ্গে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নতুন খনিজের সৃষ্টি হয় ও শিলার
বিয়োজন ঘটে।
(ii) বিক্রিয়াঃ 4 FeO+3H2O+O22Fe2O3,3H2O
(ফেরাস (জল) (অক্সিজেন) (সোদক ফেরিক অক্সাইড)
অক্সাইড)
(iii)বৈশিষ্ট্যঃ জারণের বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [a] জারণের প্রভাবে লৌহযুক্ত শিলায় মরচে পড়ে। [b] এই পদ্ধতিতে ল্যাটেরাইট
মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
[2] অঙ্গারয়োজনঃ বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলের সংযোগে উৎপন্ন কার্বনিক অ্যাসিড দ্বারা শিলা মধ্যস্থিত
খনিজের পরিবর্তন হওয়ার রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে অঙ্গারযোজন (Carbonation) বলে।
(i) পদ্ধতিঃ বৃষ্টির জল, বাতাসের CO₂ গ্যাসের সঙ্গে মিশে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে (CO2+H2O→ H₂CO₃), যা চুনাপাথর-জাতীয় শিলার সঙ্গে বিক্রিয়া করে শিলার বিয়োজন ঘটায়।
(ii) বিক্রিয়াঃ CaCO3+ H₂CO₃ Ca (HCO3)2
(ক্যালশিয়াম কার্বনেট (ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট)
কার্বনিক) অ্যাসিড)
(iii)বৈশিষ্ট্যঃ [a] বৃষ্টির জলের দ্বারা এই আবহবিকার বেশি ঘটে। [b] চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে এই আবহবিকার বেশি সক্রিয়।
[3]জলযোজনঃ শিলা মধ্যস্থিত খনিজের সাথে জলের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শিলার বিয়োজন ঘটলে তাকে বলে জলযোজন
(Hydration)
(i)পদ্ধতিঃ কতকগুলি খনিজের জল শোষণ করার ক্ষমতা বেশি। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলা মধ্যস্থিত খনিজের সাথে জলের
অণু যুক্ত হলে খনিজগুলি স্ফীত হয়ে যায় ও শিলার বিয়োজন ঘটে।
(ii) বিক্রিয়াঃ 2Fe2O3+3H2O 2Fe2O3, 3H2O
(হেমাটাইট) (জল) (লিমোনাইট)
(iii)বৈশিষ্ট্যঃ জলযোজনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [a] এই আবহবিকারের ফলে শিলাগঠনকারী খনিজগুলি আয়তনে বৃদ্ধি পায়।
[b] এই প্রক্রিয়ায় জল শোষণের ফলে শিলা নমনীয় হয়। [c] এই আবহবিকারের ফলে সমধর্মী খনিজের সৃষ্টি হয়।
[4] আর্দ্রবিশ্লেষণঃ শিলা মধ্যস্থিত খনিজের সাথে আয়নিত জলের বিক্রিয়ার মাধ্যমে শিলার বিয়োজন ঘটলে তাকে
বলে আর্দ্রবিশ্লেষণ (Hydrolysis)।
(ii) বিক্রিয়াঃ H2O H+ + OH-
KAISi3O8+H++OH- HAISi3O8+ KOH
(অর্থোক্রেজ (আয়নিত জল) (অ্যালুমিনো পটাশিয়াম)
ফেলস্পার) সিলিসিক অ্যাসিড) হাইড্রক্সাইড)
(iii)বৈশিষ্ট্যঃ আর্দ্রবিশ্লেষণের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-[a] তড়িবিশ্লিষ্ট বা আয়নিত জলের সাহায্যে এই বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া ঘটে।
(b) এই প্রক্রিয়ায় নতুন খনিজের সৃষ্টি হয়। [c] এই প্রক্রিয়া সংঘটনে নির্দিষ্ট উন্নতার প্রয়োজন হয়।
[5] দ্রবণঃ দ্রবণ (Solution) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জিপসাম, সৈন্ধব লবণ প্রভৃতি জলে দ্রবীভূত হয় ও শিলার বিয়োজন
ঘটে। এটিও রাসায়নিক আবহবিকারের একটি প্রক্রিয়া।
8. জৈবিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি উল্লেখ করো।
উত্তরঃ জৈবিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াসূমহ
জৈবিক আবহবিকার প্রধানত দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়— [1] জৈব-যান্ত্রিক আবহবিকার এবং
(2) জৈব-বাসায়নিক আবহবিকার।
[1] জৈব-যান্ত্রিক আবহবিকারঃ জৈব-যান্ত্রিক আবহবিকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলি হল—
(i)প্রাণীর-সাহায্যেঃমাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী যেমন— কেঁচো, ইঁদুর, প্রেইরি কুকুর, শিয়াল, খরগোশ, উইপোকা, বিভিন্ন মুষিক-
জাতীয় প্রাণী শিলাস্তরের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে জৈব-যান্ত্রিক আবহবিকারে সাহায্য করে। এই সকল প্রাণীরা শিলাস্তরে এবং
শিথিল পদার্থের মধ্যে গর্ত ও গুহা তৈরি করে। উইপোকা মাটি খুঁড়ে ভূপৃষ্ঠের নীচের স্তরের মাটি ও শিলা ভূপৃষ্ঠের
ওপরের স্তরে নিয়ে এসে শিলার আবহবিকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মাটিতে বসবাসকারী প্রাণীরা তাদের নিশ্বাসের
সাথে যে CO₂ ত্যাগ করে তা মাটির অভ্যন্তরস্থ শিলা ও মাটির প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে মৃত্তিকার আবহবিকার ঘটায়।
মানুষ খনিজ দ্রব্য উত্তোলন, কৃষিকাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, অবিবেচনাপ্রসূত কার্যকলাপ প্রভৃতির মাধ্যমে দ্রুত শিলার
আবহবিকার ঘটাতে সাহায্য করে।
(ii)উদ্ভিদের-সাহায্যেঃ উদ্ভিদের শিকড় মাটির মধ্যে প্রবেশ করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে মাটিতে ফাটল সৃষ্টি হয় ও শিলাসমূহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়। উদ্ভিদের
শিকড় প্রায় 175 ফুট পর্যন্ত মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এর সাহায্যে শিলার যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটে।
(2)জৈব-রাসায়নিক-আবহবিকারঃ জৈব-রাসায়নিক আবহবিকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলি হল-(i) শিলাস্তরের ওপরে জন্মানো শ্যাওলা-জাতীয় উদ্ভিদ
পচে গিয়ে হিউমাস তৈরি করে। ওই হিউমাস মৃত্তিকায় অবস্থিত জলের সঙ্গে মিশে হিউমিক অ্যাসিডে পরিণত হয়,
যা দ্রুত রাসায়নিক আবহবিকার ঘটায়। (ii) চুনাপাথর-জাতীয় শিলাস্তরের মধ্যে যেসব প্রাণী বাস করে তাদের
নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত CO₂ জলের সাথে মিশে কার্বনিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। ওই অ্যাসিড চুনাপাথরের সাথে
বিক্রিয়া করে এবং শিলার বিয়োজন ঘটায়। (iii) উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফল, শিকড়, ডালপালা প্রভৃতি মাটিতে পচে
গিয়ে যে অ্যাসিড তৈরি করে, তা থেকে শিলার আবহবিকার ত্বরান্বিত হয়। (iv) উদ্ভিদের শিকড় প্রস্বেদনের সময়
CO₂ ত্যাগ করে, যা মাটিতে অবস্থিত জলে দ্রবীভূত হয়ে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে এবং শিলার বিয়োজন ঘটায়।
9. জৈব আবহবিকারে মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর ভূমিকা উল্লেখ করো।
উত্তরঃ জৈব আবহবিকারে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভূমিকা
জৈব আবহবিকারে মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর ভূমিকা আলোচনা করা হল—
10. যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আবহবিকারের মধ্যে তুলনা করো।
উত্তরঃ যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আবহবিকারের তুলনা
যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আবহবিকারের মধ্যে তুলনাগুলি হল—