Chapter 15
আধুনিক বাংলা কাব্য-কবিতার ধারা
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নঃ ১ বাংলা কাব্য-কবিতার ধারায় কবিগান ও টপ্পা গানের ইতিহাস পর্যালোচনা করো।
উত্তরঃ কবিগান: আধুনিক বাংলা কাব্য-কবিতার প্রারম্ভিক পর্যায়ে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম পর্যায় পর্যন্ত সময়পর্বে কলকাতা শহরের অকস্মাৎ ধনী হয়ে ওঠা অনভিজাত ও স্থূল রুচির ধনবান মানুষদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাৎক্ষণিক আমোদ-উত্তেজনার জন্য কবিগানের উদ্ভব। অশিক্ষিত অথচ দক্ষ স্বভাবকবিদের কবিয়াল গায়ক বলা হয়। কবিগানে দুজন কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে পদ রচনা করে একে অপরকে প্রশ্নোত্তরের ঢঙে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করেন। উভয় পক্ষের গায়কই ঢোল, করতাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র সহকারে নিজ দোসর নিয়ে গান পরিবেশন করেন। কবিগানের আসরে ভবানী বিষয়, সখী সংবাদ এবং বিরহ অংশের পর সবশেষে খেউড় বা লহর গাওয়ার নিয়ম প্রচলিত ছিল। গোঁজলা গুঁই, হরু ঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, ভোলা ময়রা, রাম বসু, কেষ্টা মুচি, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি প্রমুখ কবিয়ালগণ ছিলেন উল্লেখযোগ্য।
টপ্পা গান: টপ্পা গানের বিশেষ উৎকর্ষসাধনে রামনিধি গুপ্ত এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। 'টপ্পা' শব্দের অর্থ 'লাফ'। এককথায় বলা যায়, ধ্রুপদ খেয়ালের সংক্ষিপ্ততর বা তুলনায় লঘু সুরের গানই হল টপ্পা। নিধুবাবু কর্মসূত্রে বিহারের ছাপরা জেলায় থাকাকালীন তাঁর হিন্দুস্থানি সংগীত শিক্ষার তালিমকে কাজে লাগিয়ে টপ্পার প্রবর্তন করেন। নিধুবাবুর পর শ্রীধর কথক, কালী মির্জা, রূপচাঁদ পক্ষী প্রমুখ ছিলেন বিখ্যাত সব টপ্পা গায়ক।
আজ যুগধর্মের প্রভাবে মানুষের রুচি, কবিতার আকৃতি ও প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। কবিগান তাই এখন অতীতের সামগ্রী। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয় কবিগানকে রূপ দিয়েছেন তাঁর 'কবি' উপন্যাসে।
প্রশ্নঃ ২ কবিয়াল কারা? বাংলা কবিগানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তরঃ কবিয়াল: কবিগান বাংলা লোকসংগীতের একটি বিশেষ ধারা। এই ধারায় লোককবিরা প্রতিযোগিতামূলক গানের আসরে অংশগ্রহণ করেন। এখানে গায়ক-কবি তাৎক্ষণিক পদ রচনা করে সুরারোপ করে গেয়ে থাকেন। কবিগান পরিবেশনকারীদের কবিয়াল বলা হয়।
কবিগান: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে উনিশ শতকের সূচনায় বাংলায় এক ধরনের লঘুরীতির গীতিবাদ্যের প্রসার ঘটেছিল, একেই কবিগান বলা হয়। কবিগানে গানই মুখ্য। কাহিনির বৃত্তে এর কোনো অংশই সম্পূর্ণতা লাভ করে না। রাধাকৃয় বা শিব-দুর্গার বিচিত্র জীবননাট্য ও সংবাদের খণ্ডচিত্র এগুলির রসবস্তু ছিল।
কবিয়াল ও কবিগানের বিষয়বস্তু: কবিগান যাঁরা রচনা করতেন তাঁদের কবিওয়ালা বা কবিয়াল বলা হত। কলকাতার একদল অর্থবান ও প্রতাপশালী ব্যক্তিদের ক্ষণকালীন আমোদ-প্রমোদের জন্য এই কবিগানের সৃষ্টি হয়েছিল। এই ব্যক্তিরা সদলবলে কবির লড়াই উপভোগ করতেন। দু-দলই প্রথমে ঠাকুরদেবতার গান দিয়ে লড়াই শুরু করতেন, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের প্রদীপশিখা যত ম্লান হয়ে আসত কবিয়ালরা ততই নিজ নিজ মূর্তি ধারণ করতেন এবং প্রকাশ্য আসরে অনুপ্রাস-যমকের চমক লাগিয়ে পরস্পরকে কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করতেন। প্রতিভার স্ফুরণ না ঘটলেও উপস্থিত বুদ্ধি, ছন্দ, পুরাণের জ্ঞান, ভাষা ও সংগীতের অসাধারণ দখলের জন্য সাহিত্যে এনারা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বিখ্যাত কবিয়ালদের নাম: বাংলা কবিগানের ইতিহাসে নিতাই বৈরাগী সবুজ পাখি, ভোলা ময়রা, বলরাম বৈয়ব, নীলমণি পাটনী, কেষ্টা মুচি অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি প্রমুখ কবিয়ালগণ স্মরণীয় হয়ে আছেন।
প্রশ্নঃ ৩ যুগসন্ধিক্ষণের কবি কাকে বলা হয় ও কেন? বাংলা কাব্যসাহিত্যে তাঁর অবদান আলোচনা করো। অথবা, ঈশ্বর গুপ্তের কবিপ্রতিভা আলোচনা করো।
উত্তরঃ যুগসন্ধিক্ষণের কবি: ঈশ্বর গুপ্তকে 'যুগসন্ধিক্ষণের কবি' বলা হয়। কারণ: ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মৃত্যুর পর বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে। ঈশ্বর গুপ্তের জন্ম ১৮১২ সালে। সময়টা হল, প্রাচীন যুগ ও আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণ। ঈশ্বর গুপ্ত মধ্যযুগের দেবদেবীর কাহিনি বর্জন করে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছোটো ছোটো কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর রচনাশৈলীর মধ্যে মধ্যযুগের কাব্যবৈশিষ্ট্য ও আধুনিক যুগের প্রারম্ভিক বৈশিষ্ট্য সমানভাবে লক্ষ করা যায় বলে তাঁকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়।
স্বদেশপ্রেমমূলক রচনা: ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় ঈশ্বরচেতনা, সামাজিক বিষয়, স্বদেশপ্রেম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঈশ্বর গুপ্তের স্বদেশপ্রেমের কবিতাগুলিতেই জননী ভারতভূমির বন্দনা বর্তমান- "মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা
তুমি তার সেবা কর সুখে।"
তাঁর লেখনীতে আদর্শবাদী মনের ভাব প্রকাশ পেলেও আবেগপ্রবণতা স্থান পায়নি। ঈশ্বর গুপ্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংঘর্ষ যুগের কবি। তাই তাঁর কবিতায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরোধের চিত্রই প্রধান হয়েছে। যেমন মেমসাহেবের বর্ণনায়-
"বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মুখে গন্ধ ছুটে।
আহা তায় রোজ রোজ কত রোজ ফুটে।”
মেয়েদের বিরুদ্ধে রচনা: মেয়েদের উগ্র স্বাধীনতা এবং তার পাশাপাশি ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী বা বিধবাবিবাহের প্রচার ঈশ্বর গুপ্তের লেখনীর আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি। তাই ইংরেজি শেখা মেয়েদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন-
"আগে মেয়েগুলো ছিল ভালো ব্রতধর্ম কর্তো সবে।
একা বেথুন এসে শেষ করেছে আর কী তাদের তেমন পাবে।”
অন্যান্য রচনা: পুরাণনির্ভর দেববাদ থেকে সরে এসে তিনিই প্রথম সমকালীন বাস্তবকে স্থান দিয়েছেন কবিতায়। তাঁর কিছু কিছু কবিতায় বিষয়বস্তু হয়েছে প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত অতিতুচ্ছ বস্তুসমূহ যেমন-'আনারস', 'নারকেল', 'পিঠেপুলি', 'তপসে মাছ' ইত্যাদি।
উপসংহার: ঈশ্বর গুপ্ত আধুনিক যুগের কবি। তাঁর কাব্য বিশ্লেষণে দেখা যায় তিনি গীতিকবি নন, খণ্ডকবিতায় তাঁর নিজস্ব একটা রীতি ছিল। নব্য মানবতাবোধকে গ্রহণ করেও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর কবিতা স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী।