হলুদ পোড়া

Chapter 1


বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর (DAQ)



১. "চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল বটে কিন্তু লোকে খুব বিস্মিত হল না।"-চারিদিকে হইচই পড়ে গেল কেন এবং লোকের বিস্মিত না হওয়ার কারণটি কী?


উত্তরঃ হইচই পড়ার কারণঃ কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হলুদ পোড়া' গল্পে একটি গ্রামের সমাজচিত্র অনাবৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। গ্রামের পরিবেশ শান্ত। গ্রামীণ সমাজের মানুষেরাও ততোধিক শান্ত ও সাদাসিধে। গ্রামে ২০-৩০ বছরের মধ্যে খুন তো দূরের কথা, তেমনভাবে কেউ জখম হয়েছে, এরকমটি শোনা যায়নি। সেই জায়গায় বলাই চক্রবর্তী খুন হয়। বলাই চক্রবর্তীর মাথাটা তার আট চির হয়ে ফেটে গিয়েছিল সম্ভবত লাঠির আঘাতে। এরকম হিংসাত্মক ঘটনা গ্রামেতে ইতোপূর্বে ঘটেনি। এই খুনের কুলকিনারা করতে না পেরে সরল গ্রামবাসীদের মধ্যে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।


লোকের বিস্মিত না হওয়ার কারণ: গল্পকথকের বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, বলাই চক্রবর্ত্তী মানুষ হিসেবে খুব সুবিধার ছিলেন না। তিনি অগাধ সম্পত্তির মালিক ছিলেন। আর সেই সম্পত্তি খুব-একটা সৎভাবে বা সোজা পথে অর্জিত হয়নি। তাই গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকেই তাকে পছন্দ করত না। এমনকি তার মৃত্যুকামনা করতেও তারা ইতস্তত করেননি। গ্রামবাসীদের চোখে বলাই চক্রবর্তী ছিলেন এক দুষ্ট ব্যাধির মতো। সুতরাং, তার মৃত্যু প্রত্যাশিত ছিল। এইজন্য তার মৃত্যুতে লোকে বিস্মিত হয়নি।


. "ভয় সকলে ভুলে গেছে।"-সকলের ভয় পাওয়ার কারণ কী ছিল এবং তারা ভয় ভুলে যায় কেন?

উত্তরঃ ভয় পাওয়ার কারণঃ 'হলুদ পোড়া' গল্পে খুন হয়ে যাওয়া বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো-বউ দামিনী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ঘোষাল মশাইয়ের কথায় কুঞ্জ ওঝাকে ডাকা হয় এবং কুঞ্জ ওঝা সন্দেহ করে যে, দামিনীকে ভূতে পেয়েছে। তাই সে দামিনীকে শক্ত করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে, মন্ত্র পড়ে, জলের ছিটে দিয়ে, পোড়া হলুদের গন্ধ শুকিয়ে ঝাড়ফুঁক করেছে। এতে দামিনীর প্রচণ্ড কষ্ট হয় এবং সে পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রাণঘাতী চিৎকার করতে থাকে। উপস্থিত গ্রামবাসীর এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, দামিনীর ভেতর থেকে আসলে সেই অপদেবতা কুঞ্জ ওঝার মন্ত্রের চাপে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অপদেবতার প্রভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কীভাবে মুহূর্তে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ দামিনী নিজে। অপদেবতার এই ভয়ংকর ক্রিয়াকলাপে সংস্কারবদ্ধ অশিক্ষিত গ্রামবাসীর স্বাভাবিকভাবেই ভয়ের উদ্রেক হয়।


ভয় না পাওয়ার কারণ: গ্রামবাসীর কাছে দামিনী কোনো আকর্ষণ নয়। দামিনীর মধ্যে যে অপদেবতা ভর করেছে, সে কুঞ্জ ওঝার ঝাড়ফুঁকে কীরকম প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটা দেখার জন্য তাদের কৌতূহল উত্তরোত্তর বারছিল। তারা মনে করেছিল কুঞ্জ ওঝাই তাদের ত্রাণকর্তা। সে উপস্থিত থাকলে কোনো অপদেবতা ধারে-কাছে আসতে পারবে না। কুঞ্জ ওঝার প্রতিটি কাজ তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এটা তাদের আগ্রহ, কৌতূহল বাড়িয়ে দেয় এবং এইজন্য তাদের আর ভয়ও করে না।


. "এতক্ষণ খেয়াল হয়নি, এখন সে বুঝতে পেরেছে,..."--সে কী বুঝতে পেরেছিল? এইরূপ বোঝার ফলাফল কী হয়েছিল? ২+৩

উত্তরঃ বোঝার বিষয়ঃ গ্রামের ধীরেন মাস্টার মানসিক দৃঢ়তার সঙ্গে তার বোনের মৃত্যুর সত্যিকারের ব্যাখ্যা খুঁজতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অন্যান্য গ্রামবাসীদের সংস্কার প্রবণতার ঢেউয়ে তার সেই প্রচেষ্টা হারিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, শুভ্রার মৃত্যু নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে যায়, যেগুলো তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একদিকে বোনের মৃত্যুশোক, অন্যদিকে প্রথাভিত্তিক বদনাম-এই দুইয়ের চাপে তার স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা হারিয়ে যায়। তাকে স্কুলের হেডমাস্টারমশাই এক মাসের ছুটি দিয়ে দেন। এটা তার প্রাথমিকভাবে খারাপ লাগলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, ছাত্রদের সামনে গিয়ে পড়ানো তার দ্বারা সম্ভব নয়।


ফলশ্রুতি: ধীরেন মাস্টার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্কুলের ছেলেরা তাকে ভয় পায় অথবা এড়িয়ে চলে। সহকর্মী বন্ধুরা সমালোচনায় মুখর হয়েছে। গ্রামীণ সংস্কারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি একরকম একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন। বলা যেতে পারে, নিজের কাছেই নিজে হেরে যাচ্ছিলেন ধীরেন মাস্টার। চেনা মানুষের সঙ্গে তার দেখা করতে ভয় হচ্ছিল, স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছিল না, লুকিয়ে লুকিয়ে মাঠের পথ ধরে বাড়ি ফিরছিল, আর ক্লান্ত অবসন্ন দেহ নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ছিলেন। এইভাবে মানসিকভাবে তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন।


৪. “মানুষের মধ্যে সংস্কার এত ভয়ংকর সংক্রামক ব্যাধির মত কাজ করে।"-'হলুদ পোড়া' গল্পে এই সত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তরঃ 'হলুদ পোড়া' গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেখাতে চেয়েছেন যে কী গ্রামীণ, কী নাগরিক-মানুষের মধ্যে সংস্কার ভয়ংকর সংক্রামক ব্যাধির মত কাজ করে। এই সংস্কার সমস্ত রকম গুজবের অতীত এক বিষয়। কুসংস্কার মানুষের অস্থিমজ্জায়। তা অক্টোপাসের মত মানুষকে বাঁধে। একবার একটা জট পাকায়, আবার সেই জট ছাড়িয়ে নতুন জট শুরু করে। এ যেন একটা বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের জটিলতম ঘেরাটোপ।


আলোচ্য গল্পে ধীরেন হল কেন্দ্রীয় চরিত্র, বলা যেতে পারে, সে-ই হল এই গল্পের নায়ক। তার সঙ্গে গ্রামের মানুষের নিবিড় যোগ আছে। কারণ একদিকে সে মাস্টার মহাশয়, তার ওপর আবার চিকিৎসক। তরুণ মহলেও তার জনপ্রিয়তা যথেষ্ট। তরুণ সমিতি গঠনের পেছনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। যদিও সেই ভূমিকা ক্রমশ ক্ষিণ হয়ে গেছে সংসারী হবার তাগিদে।


নবীন চক্রবর্তীর স্ত্রী দামিনী অসুস্থ হওয়ার পর ধীরেনের কথা অনুযায়ী নবীন কৈলাশ ডাক্তারকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু কুঞ্জ ওঝা এসে ঝাড়ফুঁক করে দামিনীকে দিয়ে বলিয়ে নেয় যে, ধীরেনের বোন শুভ্রাকে খুন করেছে বলাই চক্রবর্তীর আত্মা। এই কথা গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কৈলাশ ডাক্তারের চিকিৎসা এখানে গৌণ হয়ে যায়। ক্রমশ গল্পের শেষাংশের দেখি, স্বয়ং ধীরেন ভূতগ্রস্ত। সেও বলে, সে নাকি বলাই চক্রবর্তী এবং সে-ই নাকি শুভ্রাকে খুন করেছে। এইভাবে গ্রামীণ সংস্কারগ্রস্ত পরিবেশে দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়ে গেছে। অন্য কারো ক্ষেত্রে এই সংস্কার চেপে বসলে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু এখানে বিষয়টি হল একজন বিজ্ঞান-জানা শিক্ষিত ব্যক্তি, যিনি আবার চিকিৎসক, তার এরূপ বিভ্রান্তি খুব শোচনীয়। লেখক নিরাসক্তভাবে এই শোচনীয় পরিণতি দেখিয়েছেন তাঁর গল্পে।


৫. "...দামিনী আওয়াজ করতে লাগল সেই রকম।"- দামিনীর এরূপ আচরণের বিবরণ দাও।

উত্তর: আচরণের বিবরণ: কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হলুদ পোড়া' গল্পের কাহিনি অনুসারে, বলাই চক্রবর্তী খুন হয়ে যাওয়ার ঠিক ২১ দিনের মাথায় বলাইয়ের ভাইপো নবীনের স্ত্রী দামিনী হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। বিষয়টা হল, দামিনী সন্ধ্যাবেলা লণ্ঠন হাতে রান্নাঘর থেকে উঠোন পার হয়ে শোবার ঘরের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক সেইসময় একটি মৃদু দমকা বাতাস বাড়ির পূর্ব কোণের তেঁতুলগাছের পাতাকে নাড়া দিয়ে তার গায়ে এসে লাগে। সঙ্গে সঙ্গেই দামিনীর হাতের লণ্ঠন ছিটকে পড়ে গেল দক্ষিণের ঘরের দাওয়ায়। আর দামিনী উঠোনে আছাড় খেয়ে হাত-পা ছুড়তে লাগে তার দাঁতকপাটি লেগে যায়। দালানের আনাচেকানাচে ঝোড়ো হাওয়া যেমন গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে, দামিনী সেইরকম কাঁদতে লাগল। এইভাবে একজন সুস্থ -স্বাভাবিক গৃহবধূ হঠাৎই বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। গ্রামবাসী এ থেকেই ধারণা করে নিয়েছিল যে, কোনো অপদেবতার আত্মা. বা দুষ্টু আত্মা দামিনীর ওপর ভর করেছে। অর্থাৎ, তাকে ভূতে পেয়েছে।


. "...যার ফলে অবিশ্বাসীর মনে পর্য্যন্ত খটকা বাধা সম্ভব হয়ে উঠল।" কোন্ কথা, কাদের অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছিল? তাদের মনে খটকা থাকার কারণ কী? ২+৩

উত্তরঃ ভঅবিশ্বাস্য ঘটনা: দামিনী যখন কুঞ্জ ওঝার সামনে নিজেকে শুভ্রা বলে পরিচয় দিয়েছে এবং আরও জানিয়েছে যে বলাই কাকাই তাকে খুন করেছে, তখন উপস্থিত গ্রামবাসীর মনে একটা খটকা লেগেছিল। কারণ, শুভ্রার মৃত্যুর তিন দিন আগেই বলাই খুড়োর মৃত্যু ঘটেছিল। সেইজন্য বলাই খুড়ো শুভ্রাকে হত্যা করতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য। তাই ঘোষাল মহাশয় বুঝতে পেরেছিলেন যে, কুঞ্জ ওঝার কথা ধ্রুবসত্য বলে কেউ মেনে নেবে না। এক্ষেত্রে উপস্থিত গ্রামবাসীর মনে বিশ্বাস জন্মানোর জন্য তিনি সদা সচেষ্ট ছিলেন।


খটকা দূরীকরণঃ প্রবীণ বৃদ্ধ ঘোষাল মহাশয় খুব ভালো করেই জানতেন যে, গ্রামবাসীর মনে কী করে বিশ্বাস আনা যায়। যখন গ্রামবাসীরা মৃত বলাই চক্রবর্তী যে শুভ্রাকে খুন করেছে, এ কথা অবিশ্বাস করছিল তখন ঘোষাল মশাই বলেন যে, শুধু জীবন্ত মানুষই গলা টিপে হত্যা করতে পারে, তা নয়, মৃত মানুষও ভূত হয়ে গলা টেপে মানুষের। বিশেষত, মরার এক বছরের মধ্যে যদি শ্রাদ্ধ-শান্তি না হয়, তাহলে সেই আত্মার সোজাসুজি মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতা জন্মায়। তখন সেই আত্মা অন্য কোনো মানুষের ওপর ভর করে তাকে দিয়ে হত্যা করায়। যেমন, এখানে বলাই চক্রবর্তী একজনকে ভর করে তার মধ্যস্থতায় শুভ্রাকে খুন করেছে সেই ব্যক্তির রক্তমাংসের হাত দিয়ে। বলা বাহুল্য, ভূতপ্রেত-সংস্কারে বিশ্বাসী গ্রামবাসী এ কথা গ্রহণ করেছিল। আর সেইজন্যই তাদের মনে প্রথমে যে খটকা দানা বেঁধেছিল তা আর থাকতে পারেনি।


৭. 'হলুদ পোড়া' গল্পানুসারে ধীরেনের চরিত্রটি আলোচনা করো।

উত্তর: ধীরেনের চরিত্র:


চরিত্রের প্রাথমিক পরিচয়: ধীরেন মাস্টারমশাই। গ্রামের স্কুলে তিনি ভূগোল পড়ান। কিন্তু তার পড়াশোনার বিষয় ছিল আলাদা। অর্থাৎ, পদার্থবিদ্যায় তিনি অনার্স পাস করেছেন। গ্রামের মানুষের সেবায় তিনি বই পড়ে চিকিৎসা করেন, তবে দুরারোগ্য রোগের নয়। গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি একটি লাইব্রেরি খুলেছিলেন এবং 'তরুণ সমিতি' গঠন করেছিলেন। কিন্তু গ্রামের একটি মেয়েকে বিবাহ করার পর সংসার জীবনে লিপ্ত হয়ে সেই সমস্ত উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে যায়।


চরিত্রে অসংগতি: ধীরেন চরিত্রটি শিক্ষিত, বিজ্ঞান সচেতন হলেও চরিত্রটির মধ্যে অসংগতি লক্ষণীয়। প্রথম অসংগতি হল, পদার্থবিদ্যায় পাস করে তিনি ভূগোল পড়ান। দ্বিতীয় অসংগতি হল, বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও তিনি জীববিজ্ঞানের চর্চা করেন, অর্থাৎ বই পড়ে চিকিৎসা করেন। তৃতীয় অসংগতি হল, তার মতো একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, যে কিনা শিক্ষার আলো প্রচার করতে চান, তরুণ সমিতি গঠন করেন, লাইব্রেরি গঠন করেন, তিনি বিবাহ করেছেন একজন গ্রামের সাধারণ মেয়েকে। এইসব কারণে তাকে অস্থিরচিত্ত যুবক বললে অত্যুক্তি হয় না।

নবীন চক্রবর্তীর স্ত্রী দামিনী যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন তিনি কৈলাশ ডাক্তারকে ডাকিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তারই চরিত্রে আবার ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে অন্ধ সংস্কার। শুভ্রাকে বলাই চক্রবর্তী খুন করেছে-এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বা হাস্যকর হলেও ধীরে ধীরে তিনি তা মানতে বাধ্য হয়েছেন। সংস্কারের কাছে নতিস্বীকার করেছেন।


পরিণতিঃ লেখক তার পরিণতিতে তিনি যে ভূতগ্রস্ত হবেন, এটা দেখিয়ে কোনো কাকতালীয় ঘটনা পরিবেশন করেননি। এটা স্বাভাবিকই ছিল।

একদিক থেকে মানবিক, সচেতন, যুক্তিশীল একজন যুবক ক্রমশ যেন দশচক্রে ভগবান ভূত হওয়ার মতো নিদারুন ও ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছেন।


. "...তারা প্রায় সকলেই বুড়ো ঘোষালের কথায় সায় দিল।"-কোন বিষয়ে, কারা সায় দেয়? তাদের এই সম্মতি দেওয়ার পিছনে কী কারণ ছিল বলে তুমি মনে করো? ২+৩

উত্তরঃ সম্মতি প্রদানের বিষয়: নবীনের স্ত্রী দামিনী যখন ফিট হয়ে গেল, তার দাঁতকপাটি লেগে গেল এবং গোঁঙাতে লাগল, তখন গ্রামের লোকে ধরে নিল যে তাকে ভূতে পেয়েছে। তারা তখন কৈলাশ ডাক্তারের চেয়ে কুন্তু ওঝার ওপর বেশি ভরসা দেখাল এবং তাকে ডেকে পাঠানোর ব্যাপারে সায় দেয়।


কারণ: আসলে গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ বিজ্ঞান চিন্তায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কুসংস্কার ছিল তাদের অস্থিমজ্জায়। ধীরেন মাস্টার যা চিকিৎসা করতেন, তার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। কৈলাশ ডাক্তারও বহু দূরারোগ্য রোগ সারিয়েছেন। তা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে তারা কেউই গ্রামের মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। তাদের অন্তরে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস এতটাই দৃঢ়মূল ছিল যে বৃদ্ধ ঘোষালমশাই যখন কুন্তু ওঝাকে ডাকতে বলে তখন সকলেই তা মেনে নিয়েছিল। গ্রামীণ সমাজে এইভাবে বৈজ্ঞানিক সত্যের সঙ্গে অন্ধ সংস্কারের নিত্য সংঘাত চলমান রয়েছে।


৯. "আমার কিন্তু মনে হয় তাই হবে।"-বক্তার এরূপ মনে হয়েছিল কেন? এতে উদ্দিষ্ট শ্রোতার প্রতিক্রিয়া কীরূপ হয়েছিল? ২+৩

উত্তর: বক্তার মনের ভাবনাঃ বক্তার অর্থাৎ, ধীরেনের স্ত্রীর কাছে অজ্ঞাত ছিল না যে, গ্রামের লোকেরা বলাবলি করছে যে, তার ননদের হত্যা অশরীরীর দ্বারা হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত বলাই খুড়োর আত্মা শুভ্রাকে হত্যা করেছে। এ কথাকে তিনি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিতে পারেননি। আসলে তিনিও গ্রামীণ সংস্কারের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। আলোচ্য উক্তিতে তার এই মনের ভ্রান্তি বা ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে।


শ্রোতার প্রতিক্রিয়া: এখানে শ্রোতা হলেন ধীরেন মাস্টার। তার বোনের মৃত্যুকে নিয়ে গ্রামের লোকের যে কলঙ্কলেপন এবং কাকতালীয় সংযোগসূত্র নির্ণয়ের চেষ্টা চলছিল, তার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ ছিলেন না। নিজের বোনকে নিয়ে এরূপ সমালোচনা তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি স্বাভাবিকভাবেই। তার ওপর যখন তাঁর স্ত্রী তার কাছে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছে, তখন তিনি তার মেজাজকে ধরে রাখতে পারেননি। ধমক দিয়ে স্ত্রীকে চুপ করতে বলেছেন। আর এই বিষয়ে তাকে কিছু বলতেও নিষেধ করেছেন। কেন-না, তার বোনকে নিয়ে এই কাল্পনিক কেলেঙ্কারি শুনতে তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।


১০. "এবার সে আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না।"- কখন, কার ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটেছিল? সে ধৈর্য রাখতে পারল না কেন? ২+৩

উত্তরঃ ঘটনা: আলোচ্য অংশে দেখা যায়, নবীনের স্ত্রী দামিনী যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তখন তাকে ভূতে পেয়েছে এই সন্দেহে কুঞ্জ ওঝা এসে ঝাড়ফুক করছিল। সে প্রথমে দাওয়ায় জল ছিটিয়ে। দামিনীর চুল একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে থাকে। বন্দি দশায় দামিনী আর্তনাদ করে ওঠে, কিন্তু কুন্তু ওঝা, গ্রামের অন্যান্য দর্শকবৃন্দের মধ্যে কোনো অনুকম্পা দেখা যায়নি। এমন সময় কুঞ্জ টিটকারি দিয়ে, "এখনি হয়েছে কি। মজাটি টের পাওয়াচ্ছি তোমায়।" বলে চিৎকার করে উঠলে ধীরেন মাস্টার দামিনীর ওপর আরও বেশি অত্যাচারের আশঙ্কায় ধৈর্যচ্যুত হন। এই ঘটনার কথাই এখানে বলা হয়েছে।


ধৈর্ম না রাখতে পারার কারণঃ ধীরেন মাস্টার শিক্ষিত। তিনি ফিজিক্সে অনার্স পাস করেছেন। গ্রামের স্কুলে তিনি ভূগোল পড়ান। গ্রামের মানুষদের সাধারণ রোগের তিনি চিকিৎসাও করেন। বিজ্ঞানচেতনা তার মধ্যে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বিজ্ঞানের যুগে এরকম ঝাড়ফুঁক, খুঁজে পাওয়া-এসব অন্য সংস্কার বাস্তবিকই অর্থহীন। কিন্তু অশিক্ষিত গ্রামবাসী সেগুলোকেই ধ্রুব সত্য বলে মনে করে। ধীরেন মাস্টার তাদের এই অজ্ঞতা দূর করতে পারে নি। কিন্তু দামিনীর ওপর যখন চূড়ান্ত অত্যাচার শুরু হয়েছে, তখন মানবিকতার খাতিরে তিনি সহ্য করতে পারেননি। নবীনকে দিয়ে তিনি এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন।