কেন এল না

Chapter 5


1. "মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে/ বাবা এল"-"মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে" বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বাবা এলেন কীভাবে? ২+৩

উত্তরঃ 'মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে' অর্থ: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে পটভূমির ওপর 'কেন এল না' কবিতাটি লিখেছেন, সেই পটভূমিটি বর্তমান শহরের ক্ষেত্রে ছিল একটি দুঃসময়। অর্থাৎ রাজশাহী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চারিদিকে দাঙ্গার রক্তপাত, শহর উত্তপ্ত, প্রশাসন মরিয়া, জনগণ নিরুপায় ও নিরাপত্তাহীন। কাজে কর্মে রাস্তায় বেরোলে ঘরে ফিরে আসা ছিল একটা অনিশ্চয়তা। সড়কে যখন দাঙ্গা লাগে, পুলিশ যখন মরিয়া হয়ে গুলি চালায়, তখন শুধু দাঙ্গা সৃষ্টিকারীরা প্রাণ দেয় না, প্রাণ দেয় সাধারণ মানুষও। এইভাবে প্রতিনিয়ত শহরবাসীর মাথার ওপর ঝুলতে থাকে মৃত্যুর খাড়া। এই মৃত্যুকে উপেক্ষা করে বা এড়িয়ে মানুষকে ঘরে ফিরতে হয় প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে। 'মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে' বলতে কবি এ-কথাই বুঝিয়েছেন।


বাবা যেভাবে এলেন: আলোচ্য কবিতায় 'বাবা' বলে যাকে সম্বোধন করা হয়েছে, তিনি এই মৃত্যুর মুখ থেকে অতি কষ্টে ও সন্তর্পণে বাসায় ফিরেছেন। গভীর রাতে বাবুদের গন্ধে ভরা সড়ক পথ ছেড়ে দিয়ে অনেক অলিগলি ঘুরে শেষে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাঁকে। এইভাবে সাধারণের জীবন হয়ে উঠেছিল সংশয়গ্রস্ত দুর্বিষহ এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষতে হয়েছিল মানুষকে।


2. "ছেলে এল না।” -উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গসহ তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: প্রসঙ্গঃ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'কেন এল না' কবিতায় কবি যে বালকটির কথা বলেছেন, সে তার বাবার প্রত্যাবর্তনের পথ চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু, তার বাবা যখন নিতান্তই ফেরেননি, তখন সে দরজা খুলে গলির রাস্তায় পা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য, রাস্তাতেই বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ। অনেক রাত্তিরে উগ্র বারুদের ঝাঁজ উপেক্ষা করে অলিগলি দিয়ে ঘুরে বাবা ফিরে এসেছেন বাড়িতে। কিন্তু ছেলেটি, যে বাবাকে আনতে গিয়েছিল, সে আর ফিরল না। এই করুণ মর্মন্তুদ কাহিনির বর্ণনা দিতে গিয়েই কবি এই কথাগুলি বলেছেন।


তাৎপর্য: সময় ছিল ভয়ংকর। দিনগুলি ছিল আশঙ্কার। অপেক্ষা ছিল নিরন্তর। আবেগ ছিল দুর্নিবার। অর্থাৎ যে সময়ের কথা কবি এখানে উল্লেখ করেছেন, তখন শহরে দাঙ্গা পরিস্থিতি। উৎসবে যেমন বাজি ফোটে, তেমনই বোমাবাজি আর গুলির শব্দে শহরের প্রাণ ছিল থরহরি কম্প। জীবিকার জন্য রাস্তায় বেরোতে পারত না সাধারণ মানুষ। আর বেরোলেও ফেরার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কখন মরণ আসে কে বা জানে। এর মধ্যেই নিয়মিতভাবে কাছে এসেছে শারদীয়া পুজো। ছেলেদের মন মানছে না। বাবা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নতুন জামা কিনে দেবার। কিন্তু তিনি ফিরছেন না। অধীর আগ্রহে ছেলেটি বাবাকে খুঁজতে গেছে রাস্তায়, আর

রাস্তাতেই হারিয়ে গেছে তার প্রাণ। ভয়ংকর বর্তমান যেন অনপেক্ষিত ভবিষ্যতের সমস্ত রক্তটুকু শুষে নিয়েছে। রক্তের হোলিখেলায় আত্মাহুতি দিয়েছে দুই জাতিগোষ্ঠী। মায়েদের কোল শূন্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি বোঝানোর জন্যই কবি আলোচ্য কবিতায় একটি ছোট্ট ট্র্যাজিক কাহিনি উপহার দিয়েছেন।


3. "যে কবির কলমে একদিন ঝরেছিল অফুরন্ত দৃপ্ততা, সময় সেই কলমকেই সংশয়ের কালো মেঘে আচ্ছন্ন করে দিল।" -পাঠ্য 'কেন এল না' কবিতা অবলম্বনে উদ্ধৃত উক্তিটির ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: ব্যাখ্যাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় পদাতিক কবি। তিনি আন্দোলনের কবি, তিনি প্রতিবাদের কবি। তাঁর কলমে সমস্ত বৈষম্য ধ্বংস হয়ে যায়। সমাজ সুস্থির হয় অনাগত বিপ্লবের আশায়।


কিন্তু সমকালকে কবি এড়াতে পারেন না। 'কেন এল না' কবিতাটি লেখা হয়েছিল শহরের একটি দাঙ্গা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের রাজশাহী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যখন বাংলার দুই, বৃহৎ জনগোষ্ঠী একে অপরের বিরুদ্ধে মার মুখি, শহরের রাজপথে যখন রক্তের হোলিখেলা, শহরের ঘরে ঘরেই যখন আতঙ্কের ঘন ছায়া, সেইসময়ে একটি নিষ্পাপ বালকের নিরপরাধ মৃত্যুকে ঘিরে আলোচ্য কবিতাটি লেখা হয়েছে। যে কবি একদিন লিখতে পেরেছিলেন, "ফুল ফুটুক, না ফুটুক, আজ বসন্ত", সেই কবির কলমেই সংশয়বিদ্ধ এক জিজ্ঞাসা উঠে এল, 'কেন এল না'।


সময় চলেছে নিজের তালে। সেখানে মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই। পাতার পর পাতা ইতিহাস লেখা হয়েছে। কিন্তু যে মানুষগুলি মারা গিয়েছে, তারা আজকে ইতিহাসের পাতায় মুখ লুকিয়েছে। দাঙ্গাবিধ্বস্ততা, নিরাপত্তাহীনতা, নৈরাশ্য-হতাশা-সংশয়-এই সমস্ত কিছুই যুগের অবদান। বর্তমান এখানে পচে গেছে। ভবিষ্যৎ এখানে থেমে গেছে। শিশুকেও বলি করেছে সময়। এইভাবে একটা জাতি সর্বনাশের রসাতলে তলিয়ে যেতে বসেছে। কবি এ কথা জানেন এবং মানেন। তাই আলোচ্য কবিতায় আমরা আশার কোনো উজ্জ্বল আলো দেখতে পাই না, শুধু অন্ধকার খুঁড়ে সর্বনাশের চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে পারি। আলোচ্য কবিতায় কবি জাতিসত্তার এই পরিণতির কথাই দেখিয়েছেন।


4. কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'কেন এল না' কবিতায় দেখানো হয়েছে যে, নিষ্ঠুর বর্তমানের কাছে ভবিষ্যৎ আত্মসমর্পণ করেছে।"-আলোচনা করো।

উত্তর: আলোচনাঃ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'কেন এল না' কবিতায় যে ক্ষুদ্র মর্মন্তুদ কাহিনিটি বর্ণিত হয়েছে, সেটি আসলে একটি সাংকেতিক বর্ণনা।


এখানে পিতা হলেন বর্তমান, পুত্র হল ভবিষ্যৎ। বর্তমানে শহরে চলেছে দাঙ্গা পরিস্থিতি। রাজপথে চলেছে রক্তের হোলি খেলা। বোমাবাজি আর গুলির শব্দে শহরের রাত্রি মুখর। উৎসবে যেমন বাজি পোড়ে, তেমনি শহর আজকে আগুনে পুড়ছে।


অথচ জীবিকার তাড়নায় মানুষকে বেরোতেই হয় পথে। আর তখনই পরিবারের ওপর নেমে আসে সংশয়ের গভীর ছায়া। পরিবারের ছোটো থেকে বড়ো সকলেই উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে কখন বাড়ির মানুষটা ফিরবেন-এই ভেবে। অবশেষে কবিতায় আমরা দেখতে পাই যে, বাবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য বালকটি রাস্তায় নেমে পড়েছে। উদ্দেশ্য বাবাকে খুঁজে আনা। কিন্তু কবিতায় স্পষ্টত উল্লেখ না থাকলেও এ কথা বোঝা যায় যে, দাঙ্গার মধ্যে পড়ে বালকটি প্রাণ হারিয়েছে।


আসলে 'কেন এল না'-র জবাব দেবে সময়।

5. "ফ্যান গালতে গিয়ে/ পা-টা পুড়ে গেল।"—কখন এমন ঘটনা ঘটেছিল? এই দুর্ঘটনার কারণ কী বলে তোমার মনে হয়

উত্তর: ঘটনার সময়: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'কেন এল না' কবিতায় ছেলেটির মায়ের এরকম দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তা স্বামী কথা দিয়ে গিয়েছিলেন যে, অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে পুজোর কেনাকাটা করতে বেরোবেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তিনি বাড়ি ফেরেননি। ছেলেটির মায়ের মন পড়েছিল তার স্বামীর প্রতি। অজানা আশঙ্কায় তিনি অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত ছিলেন। যে নিত্যকর্মে তিনি সদা অভ্যস্ত ছিলেন, সেখানেই হঠাৎ নিপুণতা ও সতর্কতার অভাব ঘটেছিল। এইজন্য, ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে তার পা-টা পুড়ে গিয়েছিল।


ঘটনার কারণ : ছেলেটির মায়ের এই দুর্ঘটনার পিছনে অনেকটাই মানসিক কারণ জড়িয়ে ছিল। আসলে সেই সময় শহরের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। হানাদারি উত্ত মৌলবাদ সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছিল বিপর্যন্ত। হঠাৎ করে শহরের রাজপথে লেগে যেত দাঙ্গা। চলত রক্তের হোলি খেলা। প্রশাসন কঠোর হাতে এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে আরো কিছুটা রক্ত ঝরিয়ে ফেলেছিল। তবুও মধ্যবিত্ত মানুষকে একটু উপার্জনের জন্য জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজে বেরোতে হত। নিরাপত্তাহীন পরিবেশে প্রত্যাবর্তনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ছেলেটির মা এই পরিস্থিতি জানতেন। এই জন্য, তার স্বামী নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে না আসায় তিনি অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলেন। মানসিক উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠায় অন্যমনস্ক হয়ে তিনি অসতর্ক হয়ে পড়েছিলেন নিত্যকর্মে। এইজন্যই যে কাজে তিনি অত্যন্ত অভ্যস্ত সেই কাজেও ভুল হয়ে যেতে থাকে। এইজন্য ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে তার পা পুড়ে গিয়েছিল।


6. "ছেলেটা বই নিয়ে বসল মাদুরে"-প্রসঙ্গ নির্দেশ করো। ছেলেটির মানসিক অবস্থার পরিচয় দাও। ২+৩

উত্তর: প্রসঙ্গঃ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'যত দূরেই যাই' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'কেন এল না' কবিতায় কবি যে ছেলেটির কথা বলেছেন, সে বাবার সঙ্গে পুজোর কেনাকাটা করতে যাবে বলে, বাবার প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন তার বাবা ফেরেননি, তখন উপায়ান্তর না দেখে সে নিত্যদিনের মতো বই নিয়ে মাদুরে পড়তে বসেছিল।


ছেলেটির মানসিক ভাবস্থা: ছেলেটির বাবা যখন তাকে কথা দিয়ে গিয়েছিল যে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে পুজোর কেনাকাটা করতে যাবে, তখন ছেলেটির মনে এক অফুরন্ত আনন্দের সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় বেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরেও যখন তার বাবা ফিরে আসেননি তখন ছেলেটির মন ভেঙে গিয়েছিল। আশাহত হয়েছিল সে। তাই অগত্যা তাকে পড়তে বসতে হয়েছিল। কিন্তু মনের মধ্যে চলছিল তার উদ্‌দ্বিগ্নতা ও আশঙ্কার ঝড়। পড়াশোনায় মনোসংযোগ করা তার দ্বারা সম্ভব ছিল না। তাই ইতিহাসের পাতা খোলা থাকলেও তার বিন্দু-বিসর্গ তার মাথায় ঢোকেনি। অপেক্ষা পরিণত হয়েছিল উৎকণ্ঠায়।


7. "ঘড়িতে টিকটিক শব্দ।"-প্রসঙ্গ নির্দেশ করে তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।

উত্তরঃ প্রসঙ্গঃ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'কেন এল না' কবিতায় বালকটি তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার বাবা অফিস যাবার আগেই বলেছিলেন যে, তিনি তাড়াতাড়ি

ফিরবেন। কিন্তু তাঁর ফিরতে দেরি হয়েছে। তাই পড়াশোনায় শিশুটির মন নেই। ইতিহাস বই সামনে খোলা পড়ে আছে। এই প্রসঙ্গেই উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির অবতারণা করা হয়েছে।


তাৎপর্যঃ ঘড়ি হল সময়ের সূচক। সময় কাউকে ক্ষমা করে না, কিছুকে প্রশ্রয় দেয় না। সকলকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়, বিলীন করে দেয়। সময় অন্তহীন, শুধু চিহ্ন রেখে যায় ক্ষণিকের। ছেলেটির বাবার আশার কথা ছিল নির্ধারিত সময়ে। কিন্তু তিনি এলেন না। অপেক্ষা করতে করতে সময় যেন আরও দীর্ঘ মনে হতে লাগল ছেলেটির। অথচ এইটুকু সময়েই শহরে কত ক্ষতি হয়ে গেল অর্থাৎ কত প্রাণ চলে গেল কেউ জানে না, কেউ গোণে না। সময় শুধু তার চিহ্ন রেখে যায়। বর্তমানকে ইতিহাস করে। আর সেই ইতিহাসের কাহিনি পড়েই আমরা অতীতকে জানি।


8. "হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে/অবাধ্য-” 'হিজিবিজি অক্ষর' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? সেগুলোকে একগুঁয়ে বলার তাৎপর্য কী? ২+৩

উত্তর: 'হিজিবিজি অক্ষর': 'হিজিবিজি' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল-অর্থহীন আঁকিবুকি। আসলে ছেলেটির মন ভালো নেই। তার বাবা অফিস যাবার সময় তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি অফিসে গিয়ে মাইনে নিয়েই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবেন এবং পুজোর কেনাকাটা করবেন। এটা নিয়ে ছেলের মনে একটা অগাধ বিশ্বাস এবং অপার্থিব আনন্দ কাজ করছিল। কিন্তু বাবা ফিরতে দেরি হওয়ায় তার সমস্ত আশা উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়েছে। অভিভাবকের নির্দেশ অনুসারে সে পড়তে বসেছে ঠিকই, কিন্তু তার মন কিছুতেই পড়ায় বসছে না। হাতের লেখাও তাই নিছক আঁকি-ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গেই উদ্ধৃত কথাটি বলা হয়েছে।


একগুঁয়ের অর্থঃ একগুঁয়ে আসলেই অক্ষর গুলো নয়। একগুঁয়ে হল শিশুটির মন। শিশুটি আশার ওপর ভর করেছিল যে, বাবা অফিস থেকে ফিরেই পুজোর নতুন জামা কিনে দেবেন। কিন্তু বাবা আসতে দেরি করায় তার সেই আশা ভঙ্গ হয়ে গেছে। আশাহত বেদনায় সে কোনো কাজ করতে পারছে না। হয়তো বা অভিভাবকের নজরদারিতে তাকে পড়তে বসতে হয়েছে, হোম টাস্কের খাতার ওপর লিখতে হচ্ছে। কিন্তু তার মানে সে নিজেও বুঝছে না, অপরেরও বোঝার মতো নয়। নিছক অর্থহীন হিজিবিজি অক্ষরের সমষ্টি। এটা স্পষ্ট যে, বালকটির দ্বারা মনোজ সংযোগ করা সম্ভব ছিল না, উৎকণ্ঠা তাকে গ্রাস করেছিল।


9. "যতক্ষণ পুজোর জামা কেনা না হচ্ছে। নড়বে না।"- প্রসঙ্গ নির্দেশ করো। উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ২+৩

উত্তর: প্রসঙ্গ: পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'কেন এল না' কবিতায় কবি যে বালক চরিত্রটি এঁকেছেন, তার মনোগত ইচ্ছার ওপর খাতার পাতায় অক্ষরগুলি আন্দোলিত হয়েছে। বালকটির পিতা পুজোর জামা-কাপড় কিনে দেবে বলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তিনি তার কথা রাখতে পারেননি। বালকটি এতে মর্মাহত। হয়তোবা মায়ের ইচ্ছায় সে পড়তে বসতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু, খাতার পাতায় যে অক্ষরগুলি সে লিখেছিল সেগুলো ছিল নিছক হিজিবিজি আর আঁকিবুকি। অক্ষরগুলো যেন জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই প্রসঙ্গেই মন্তব্যটি করা হয়েছে।


তাৎপর্যঃ উদ্ধৃত মন্তব্যের আলোকে আমরা একটি বালকের মনস্তত্ব সম্পর্কে জানতে পারি। শারদীয় পূজা বালকটির মনে এক অপূর্ব কল্পনার জন্ম দিয়েছিল।


এই কল্পনার পাখায় ভর করেই বালকটি ছিল অপেক্ষারত। কিন্তু বাবা ফিরতে দেরি করায় এই আনন্দের প্রাথমিক শর্ত যে নতুন জামা কেনার কথা ছিল তার সম্ভাবনা হারিয়ে গেছে। বালকটি এতে মর্মাহত। তাই খাতার পাতার অক্ষরগুলি তার মনের দর্পণ হয়ে উঠেছে, যেখানে ক্ষোভ, আশাহত ব্যর্থতা, প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, এবং সর্বোপরি বিরূপতা ফুটে উঠেছে। বালকটি জিদ ধরেছিল যে নতুন জামা না হলে সে ঠিকমতো লেখা পড়া করবে না। তাই তার হাতের অক্ষরগুলো নড়তে চায় না, নিছক আকিবুকি হয়ে ওঠে।


10. "মা এখন বুনতে ব'সে কেবলি ঘর ভুল করছে।"-প্রসঙ্গসহ তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। ২+৩

উত্তর: প্রসঙ্গঃ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'কেন এল না' কবিতায় উদ্ধৃত অংশটির মধ্য দিয়ে বালকটির মায়ের মনের অবস্থার কথা বোঝানো হয়েছে। তার স্বামী অফিস থেকে

তাড়াতাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরেননি। তাই তার পুত্র "বাবা কেন এল না?”- এই রূপ প্রশ্নে তাকে জর্জরিত করে তুলেছে, যার প্রকৃত উত্তর তারও জানা নেই। ছেলের এই প্রশ্নে তিনি যথেষ্ট বিব্রত অনুভব করছেন। এই প্রসঙ্গেই তার কাজে ভুল হয়ে যাচ্ছে। তাই এ কথা বলা হয়েছে।


তাৎপর্যঃ উদ্ধৃত পঙক্তিটির মধ্য দিয়ে বালকটির মায়ের মনের অবস্থার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানসিক অস্থিরতা, অজানা আশঙ্কা এবং আতঙ্কগ্রস্ততা বালকটির মাকে সাধারণ কাজের ছন্দ থেকে পতিত করেছিল। শহরের পরিস্থিতি অনুকূল নয়। শহরের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বালকটির মা-ও এর ব্যতিক্রম নন। কাজের মধ্যে ডুবে গিয়ে তিনি তার চিন্তার বোঝা নামিয়ে ফেলতে চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কাজই বারে বারে ভুল হয়ে যাচ্ছে, আর চিন্তার পাহাড় জমছে বুকের ওপর।


বালকটির প্রশ্ন তার মায়ের মনে দ্বিধা সংশয় ও অজানা আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল। বালকটির প্রশ্ন হয়তো অবোধ ছিল। কিন্তু মা শহরের তথা দেশের পরিস্থিতি জানেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই শহরে। যে-কোনো মুহূর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে যেতে পারে যে-কোনো মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই এই আতঙ্ক তার স্বামীর ফেরাকে ঘিরে। আলোচ্য উক্তিটির মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি।