তিমিরহননের গান

Chapter 4


১. "কোনো হ্রদে। কোথাও নদীর ঢেউয়ে। কোনো এক সমুদ্রের জলে"-কী ঘটেছিল তার বিবরণ দাও।

উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'সাতটি তারার তিমির' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'তিমিরহননের গান' কবিতায় উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছেন।


কী ঘটেছিল? : যখন এই পৃথিবীতে প্রকৃতির ছিল একাধিপত্য, মানুষ ছিল তারই আশ্রয়ে লালিত, তখন প্রকৃতির মধ্যে বিরাজ করত এক অভিনব স্বাধীনতা। মানুষের বিচরণ ছিল অবাধ, অগাধ। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠেছিল মানুষ। হ্রদে, নদীর ঢেউয়ে, অশান্ত সমুদ্র তরঙ্গে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে নেচে উঠেছিল, মেতে উঠেছিল। ভোরের সূর্য আলো দিত জীবনকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। প্রকৃতির কাছ থেকে মানুষ সম্মতি পেয়েছিল বেঁচে থাকার, বংশবৃদ্ধি করার। প্রকৃতির মধ্যে ঈশ্বরের যে সৃষ্টিলীলা লুকিয়ে আছে, তার সন্ধান পেয়েছিল মানুষ। পরস্পরের সঙ্গে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে জীবনের আলোড়ন শিখে নিতে চেয়েছিল পৃথিবীতে নবাগত শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ। অফুরন্ত আনন্দে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল তারা। ভবিষ্যতের জন্য রেখে গিয়েছিল স্বপ্ন। অপত্য জীবনকে ভাসিয়ে দিয়েছিল সেই আত্মিক স্বপ্নে। কোনো গ্লানি বোধ করেনি সেদিন সে। ভালোবাসা ছিল নিখুঁত অটুট। আকাশ তাকে আলোয় ভরেছিল। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সভ্যতার প্রাক লগ্নে মানুষের জীবনে ছিল অকুণ্ঠ স্বাধীনতা, প্রেম ও ঈশ্বর।


২. "লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে/মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে"-লঙ্গরখানায় অন্ন খাবার প্রসঙ্গ এল কেন? মধ্যবিত্ত মানুষের যে অবস্থার কথা কবি এখানে বর্ণনা করেছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো। ২+৩

উত্তর: প্রসঙ্কা: লঙ্গরখানার প্রসঙ্গ আসা মাত্রই আমরা বুঝতে পারি যে, সাধারণ মানুষের অন্ন-সংস্থান নেই। দুটি বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবী তথা ভারতের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে। আজ ঘরেতে অভাব, পৃথিবীটা তার মনে হয় কালো ধোঁয়া। তবুও বেঁচে থাকার জন্য তাকে লঙ্গরখানায় লাইন দিতেই হবে। কারণ তার নিজের উপার্জনের কোনো ক্ষমতা নেই, পথও নেই। বেদনার অশ্রু-মাখা অন্ন সে গ্রহণ করতে বাধ্য। এই প্রসঙ্গেই কবি এ কথা বলেছেন।


মধ্যবিত্ত মানুষের তাবস্থা: কবির মতে, মধ্যবিত্ত সমাজ অত্যন্ত ভদ্র সাধারণ। জীবন সম্পর্কে তাদের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, তাই বিদ্রোহ বিপ্লবও নেই। সে আলগোছে একপেশে বাঁচতে চায়। তাই তাকে গ্রহণ করতে হয় লঙ্গরখানার অন্ন। বিষাদের কালো ছায়া নেমে আসে তার জীবনে। সে সহ্য করে। এই ভগ্নচিত্রের মধ্যেই সে দেখে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কোনো ভিত্তি নেই। নিরাশার অনধকারে ডুবে যাওয়াই অনিবার্য সত্য। সে ডুবে যায়। জীবনের হিসাব সে মেলাতে পারে না, মেলাতে শেখেনি কোনোদিন। অত্যধিক কষ্ট সহ্য করে বাঁচার আশার বদলে সে মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। কষ্ট তার কাছে মোহ। এই মোহ তার মধ্যবিত্ত সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে। কোনো উত্তরণ নেই, নতুন সৃষ্টি নেই, চোখে নেই স্বপ্নের কাজল। মধ্যবিত্ত মানুষের এই অবস্থার কথাই কবি উল্লেখ করেছেন।


৩. জীবনানন্দ দাশের 'তিমিরহননের গান' কবিতাটিতে মানবজীবনের বেদনা ও আশার যে দ্বান্দ্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বিশদভাবে আলোচনা করো।

উত্তর: 'তিমিরহননের গান' কবিতায় জীবনানন্দ দাশ মানবজীবনের এক অন্তহীন বেদনার ছবি এঁকেছেন, কিন্তু তার গভীরে আশার ক্ষীণ আলোও জ্বলতে দেখা যায়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনই কবিতাটিকে এক বিশেষ মাত্রা দান করেছে।


বেদনার চিত্র: মধ্যবিত্ত জীবনের ক্লান্তি: "মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে”-এই পঙক্তিতে সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণার এক নিরাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। লঙ্গরখানার অন্ন খেয়েও তাদের জীবনে যে অতৃপ্তি ও বিষাদ রয়ে যায়, তা কবির ব্যথিত দৃষ্টি এড়ায়নি।


অস্তিত্বের শূন্যতাঃ "কিছু নেই-তবু এই জের টেনে খেলি;" -এই উক্তির মধ্য দিয়ে জীবনের এক অনর্থকতা ও শূন্যতা প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের এই নিরর্থকতা গভীর বেদনার সৃষ্টি করে।


স্মৃতি ও বিচ্ছেদঃ "স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে। একদিন ভালোবেসে গেছি।। সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু-তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক।"-এখানে অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানের বিচ্ছিন্নতা, ভালোবাসার স্মৃতিচারণ কিন্তু বর্তমানের নিরালোক অবস্থা-সবই এক গভীর বেদনাকে বহন করে।

আশার দ্যোতনা:


তিমিরবিনাশীর স্বপ্ন : কবিতার প্রধান বিষয়ই হল তিমির বা অন্ধকারের বিনাশ। "আমরা তো তিমিরবিনাশী । হ'তে চাই।"-এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা হল মুক্তির আর্তি, যা অন্ধকারের মধ্যে থেকেও আশার সঞ্চার করে।


সূর্যের প্রতীকঃ "সূর্যালোক মনোরম মনে হ'লে হাসি"-যদিও এই হাসি বেদনার্ত, তবুও সূর্যালোকে এক শুভ্রতা ও আশার ধারণা নিহিত। এই আলোই যেন অন্ধকার দূর করার ইঙ্গিত দেয়।


চেতনার জাগরণ : অন্ধকারের মাঝেও মানুষ যখন আলোর সন্ধান করে, তখন তা এক ধরনের চেতনার উন্মোচন। এই অন্বেষণই আশার জন্ম দেয়।


জীবনানন্দীয় আশাবাদ: জীবনানন্দের অনেক কবিতায় একটি নির্বাক, অন্তর্মুখী আশাবাদ দেখা যায়। 'তিমিরহননের গান' কবিতাতেও জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা ও বেদনার মাঝেও কবি এক ধরনের অদম্য স্পৃহা জাগিয়ে তোলেন, যা জীবনের প্রতি এক নিবিড় ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার তাগিদ দেয়।


সুতরাং, 'তিমিরহননের গান' কবিতাটি কেবল নিরাশার ছবি নয়, বরং বেদনার গভীরে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন আশা ও মুক্তির অন্বেষণের এক সার্থক প্রয়াস।


৪. "স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে"-'স্মরণীয় উত্তরাধিকারে' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? গ্লানির প্রসঙ্গ এসেছে কেন? ২+৩

উত্তর: 'স্মরণীয় উত্তরাধিকারে': 'স্মরণীয়' অর্থাৎ যা কিছু মনে থাকে বা মনে থাকার মতো। আর 'উত্তরাধিকার' হল বংশানুক্রমে প্রাপ্ত বিষয় সম্পত্তি। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, যে পূর্বপুরুষেরা বংশপরম্পরায় বর্তমান পৃথিবীর মানুষের জন্ম দিয়েছিল, তাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত আশাপ্রদ। তাই সৃষ্টিলীলায় মাতোয়ারা হয়ে তারা নিজেরা কোনো গ্লানি অনুভব করেনি। নরনারী ভালোবেসেছিল একে অপরকে অনায়াসে। সৃষ্টির মধ্যে ছিল সততা ও প্রেম, আর সত্য-শিব ও সুন্দর। সেইজন্যই এই উত্তরাধিকার স্মরণীয় তাদের কাছে এবং আমাদের কাছে।


গ্লানির প্রসজ্ঞাঃ মানুষ যখন কোনো অপরাধ করে, তখন তার মনের মধ্যে গ্লানি জন্মায়। আত্মদংশনে পীড়িত হতে থাকে তার হৃদয়। কিন্তু, পৃথিবীতে যে আদিম মানুষেরা তাদের সন্তানকে এনেছিল অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে, তাতে কোনো আত্মগ্লানি ছিল না। কারণ, সেসব সৃষ্টিতে ছিল মহত্ব। আর আজ, সেই অপত্যরাই পৃথিবীকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছে। সমাজে এসেছে বৈষম্য, মানুষ হয়েছে অত্যাচারিত, নিরন্নের হাহাকার জেগে উঠেছে, জীবিত মানুষ আজ জীবস্মৃত হয়ে পড়েছে। তিমিরবিলাসী হয়েছে সে। এই ভবিষ্যৎ প্রত্যাশিত ছিল না। সেই সব মানুষেরা আজকে মৃত। নক্ষত্রের আলোর দিকে চেয়ে তারা নিরালোক। হেমন্তের প্রান্তরের বিষন্নতা বিরাজ করছে সারা পৃথিবীতে। এইভাবেই তাদের সৃষ্টিতে লেগেছে গ্লানি। ভবিষ্যৎ হয়েছে কলঙ্কিত। কবি আলোচ্য পঙক্তিতে এই জন্যই গ্লানির প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন।


৫. "মধ্যবিত্তমদির জগতে/আমরা বেদনাহীন-অন্তহীন বেদনার পথে।"-'মধ্যবিত্তমদির জগতে' বলতে কী বোঝো? অন্তহীন বেদনার পথে কারা কেন ছুটে চলেছে? ২+৩

উত্তরঃ 'মধ্যবিত্তমদির জগতে: মধ্যবিত্ত জগৎ এমন একটি জগৎ, যারা নিজের আভিজাত্য খুইয়ে নীচু তলার মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে না। আবার স্বভাবগত কৌলিন্যে উচ্চতর কোনো আদর্শেও প্লাবিত হয় না। তাদের এই মধ্যবিত্ত জীবন একটা মোহের মতো। তারা এই জীবনে শান্তি পায় না, অথচ জীবনকে ছাড়তেও পারে না। এই জীবনে বেদনার পর বেদনার ঝড় আসে, অথচ তারা বেদনা মুক্তির স্বপ্ন দেখে। জীবনের এই অকৃত্রিম মোহ তাদের মিথ্যা জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মোহগ্রস্ত করে তোলে। একেই কবি মধ্যবিত্তমদির জগৎ বলেছেন।


অন্তহীন বেদনার পথঃ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ সকলেই অন্তহীন বেদনার পথে পাড়ি দেয়। এটাই তাদের জীবনের শেষ পরিণতি।


অনন্ত বেদনা আসলে মৃত্যু। নিয়ত টুকরো টুকরো বেদনার সীমারেখা পার করে অন্তহীন বেদনার পথ হল মৃত্যু। তাদের জীবনে কোনো উচ্চাশা নেই, তার পরিকল্পনাও নেই, শুধু দিনযাপনের শুধু প্রাণ ধারনের গ্লানি তারা বহন করে চলে। কোনো দাবি নেই, প্রতিবাদের ভাষাও নেই। দুর্বিষহভাবে তারা বাঁচতে শিখেছে, মরতেও শিখেছে। দুঃখে তারা বেদনার্ত হয় না, মৃত্যুতে অনন্ত বেদনাকে পায়। এই ভাবেই তারা জীবনের শেষ দিকে ছুটে চলে। কবি মধ্যবিত্তদের এই মোহের কথাই উল্লেখ করেছেন।


৬. 'তিমিরহননের গান' কবিতায় সমাজ ও সভ্যতার যে অবক্ষয় চিত্রিত হয়েছে, তা কীভাবে কবির ব্যক্তিগত যন্ত্রণার সঙ্গে মিশে গেছে? আলোচনা করো।

উত্তর: সমাজ ও সভ্যতার অবক্ষয় এবং কবির ব্যক্তিগত মন্ত্রণা : 'তিমিরহননের গান' কবিতায় জীবনানন্দ দাশ কেবল সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রই তুলে ধরেননি, বরং সেই অবক্ষয়কে নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম করে দেখিয়েছেন। এই কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মন্বন্তরের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রচিত। সমাজের উচ্চবিত্তের লোভ এবং মধ্যবিত্তের অসহায়তা, লঙ্গরখানার করুণ চিত্র এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়-এসবই কবির ব্যক্তিগত বেদনার বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু বাইরের দৃশ্য বর্ণনা করেননি, বরং সেই দৃশ্যের মাধ্যমে নিজের ভিতরের শূন্যতা ও হতাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। কবিতার প্রধান সুর বিষাদ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ। "নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে” বা 'জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে' মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসার মতো পঙক্তিগুলি ব্যক্তিগত জীবনের যন্ত্রণা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক মিশ্র ছবি তৈরি করে। কবির কাছে নগরীর অন্ধকার ও তার ভিতরের মানুষের নৈতিক অন্ধকার একাকার হয়ে গেছে। চাকরি হারানো, আর্থিক দুরবস্থা এবং সমসাময়িক সমালোচকদের কটাক্ষ-এই সবকিছুই কবির ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তাঁর কাব্যে হতাশা ও অবসাদ হিসেবে ফুটে উঠেছে। এই কারণে, 'তিমিরহননের গান' নিছক সামাজিক কবিতা নয়, বরং এটি কবির ব্যক্তিগত বেদনার এক শৈল্পিক দলিল হয়ে উঠেছে, যেখানে সমাজ ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। কবি যেন সমাজের অন্ধকারকে নিজের অন্তরের অন্ধকার হিসেবে অনুভব করেছেন এবং সেখান থেকেই মুক্তির পথ খুঁজেছেন।


৭. "সেই জের টেনে আজো খেলি।"-কবি কোন্ খেলার কথা বলেছেন? উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ২+৩

উত্তর: খেলার কথাঃ খেলা বলতে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর নানা প্রয়াসকে বোঝানো হয়েছে। এই খেলা জীবনের খেলা, জীবনের জন্য খেলা। এই খেলা অতীতকে অনুসরণ করে অন্ধভাবে। অন্ধকারময় বর্তমানে জীবনকে ক্ষণিকের আলোর সুখ দেওয়ার জন্য নিরন্তর প্রয়াসই হল খেলা।


তাৎপর্যঃ অতীত মৃত। অতীত আর ফিরে আসবে না। তবুও আমরা অতীত ঐতিহ্যের গর্ব অনুভব করি। অতীতে মানুষ বেঁচেছে, ভালোবেসেছে, হেসেছে-খেলেছে; তারপর ভবিষ্যতের হাতে নিজের সৃষ্টিকে সমর্পণ করে চলে গেছে। তারার আলো যেমন নিষ্প্রভ, হেমন্তের প্রান্তর যেমন রিক্ত, তেমনি অতীত এখন শূন্যময়। বর্তমানে সূর্য নিভে গেছে। প্রাণ এখন অস্তিত্বের সংকটে। মানুষের জীবন আঁধারপূর্ণ। তবুও সে অতীতের স্বপ্নগুলো মনে রেখে, সেই জের টেনে আজও খেলতে চায়, হাসতে চায়, বেঁচে থাকতে চায়। সূর্যালোককে মাঝে মাঝে মনোরম মনে করে সে। ঐতিহ্যলাঞ্ছিত এই বিলাস ক্ষণভঙ্গুর। মানুষ এ কথা বোঝে না। কবি এই সত্যই উদ্‌ঘাটিত করতে চেয়েছেন।


৮. "জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে-"-উদ্ধৃত পত্তিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: তাৎপর্যঃ পৃথিবীর সমস্ত বড়ো সভ্যতার পিছনেই রয়েছে নারীর জীবন। নারীর অধিকার নিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিল। নারীর মুক্তি সাধনা করতে গিয়ে রামায়ণে রাবণ রাজ ধ্বংস হয়েছিল, দ্রৌপদীর মতো নারীর অপমান রুখতে গিয়ে মহাভারতের যুদ্ধে পাণ্ডবরা কৌরবদের হারিয়ে দিয়েছিল। তাই সভ্যতার অন্তরে নারী সত্তার প্রভাব অনিবার্য।


কবি এখানে জীবিত বা মৃত রমণীর কথা বলেছেন। পুরুষের ভাবনাও গড়ে ওঠে নারীকে কেন্দ্র করে।


জীবিত নারী শৌর্যের প্রতীক, আর মৃত নারী ধ্বংসের। নারী এইভাবে হয়ে ওঠে সর্বস্ব ও সর্বনাশ। কবি বলতে চেয়েছেন যে, তিমির হননের প্রয়াসে পুরুষ তিমির বরণ করে নেয়। তার মূলে থাকে নারী।


কবি এখানে প্রেম এবং অপ্রেমের কথা বলেন। প্রেমের সৌন্দর্য এবং অপ্রেমের কামোদ্দীপনা উভয়ই জীবনমোহ। এই মোহগ্রস্থতাই মধ্যবিত্ত জীবনের পরিচয়। এর মধ্যেই আছে অন্ধকার এবং মৃত্যু।



৯. "সূর্যালোক মনোরম মনে হলে হাসি।"-সূর্যালোক 'মনোরম' মনে হওয়া বা না-হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: সূর্যালোক মনোরম হওয়া বা না-হওয়াঃ সূর্যই সকল শক্তির উৎস। প্রাণের বিকাশ লুকিয়ে রয়েছে সেই জবাকুসুমসঙ্কাশ সূর্যের মধ্যে। আলোয় জীবন, অন্ধকার মৃত্যু। আজকের পৃথিবীতে অদ্ভুত এক আঁধার এসেছে। মানুষ তাই জীবনকে খুঁজে পাচ্ছে না। জীবিত মানুষও তাই মৃত্যুমুখী হয়ে উঠেছে।


মানুষ যে জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে, সেই জীবনকে সে ভালোবাসে। তাই সে বেঁচে থাকতে চায়। বাঁচার সম্মতি এবং সমর্থন সে সংগ্রহ করে পরিপার্শ্ব থেকে। কিন্তু আজ, পরিপার্শ্বের অন্ধকার তাকে ঢেকে ফেলেছে। সে জীবনের রসদ খুঁজে পাচ্ছে না। খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, আস্থা নেই, বিশ্বাস নেই, ভালোবাসা নেই। সে এই নেই-রাজ্যের বাসিন্দা। তবুও জীবনের বৈশিষ্ট্য তো বেঁচে থাকা। রাত্রি শেষে প্রভাত সূর্যের উদয় আজও হয়। তখন মানুষ আশার স্বপ্ন দেখে। সেই মুহূর্তে সূর্যালোক তার কাছে মনোরম মনে হয়। সে বাঁচতে চায়, বাঁচতে শেখে। কবি এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।





১০. "স্বতই বিমর্ষ হ'য়ে ভদ্র সাধারণ চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে। আরো বেশি কালো-কালো ছায়া"-মধ্যবিত্ত স্বতই বিমর্ষ হওয়ার কারণ কী? কালো কালো ছায়া দেখার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ২+৩

উত্তরঃ স্বতই বিমর্ষ হওয়ার কারণ: 'ঘরেও নহে, পাড়েও নহে, যে-জন আছে মাঝখানে' তারাই হলেন মধ্যবিত্ত। ইচ্ছা আছে, ইচ্ছাপূরণ নেই, স্বপ্ন আছে, স্বপ্নসুখ নেই, আশা আছে নৈরাশ্যের আঁধারে ঘেরা-এই হল মধ্যবিত্ত জীবনের ভাগ্যলিপি। শুধু দিনযাপনের, শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি বহন করে সময় চলে যায় মৃত্যুর দিকে। জীবন জুড়ে বিষাদের মরা কান্না, দারিদ্রের কষাঘাত, আপনার রচিত ভুবনে আপনি চক্রাকারে আবর্তিত হওয়ার অভিশাপ বয়ে চলে মধ্যবিত্ত। এইজন্য সে বিষাদগ্রস্ত।


কালো কালো ছায়ার তাৎপর্য: মধ্যবিত্তের জীবন আলোকলাঞ্ছিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যে আর্থসামাজিক কাঠামোর মধ্যে সে অবগাহন করেছে, তাকে তার জীবনে শান্তি সুখ আসেনি, আসার সম্ভাবনাও ছিল না। প্রতিদিনের সূর্য উঠেছে, অস্ত গেছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের জীবনে চিরঅন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল। অভাবের তাড়নায় লঙ্গরখানায় বা রেশনের দোকানে লাইন দিতে হয়েছে তাকে। বাসস্থানের অভাবে ফুটপাতে দিন ও রাত কাটাতে হয়েছে। রাতের জ্যোৎস্না কোনো ফুলের সুগন্ধ এনে দেয়নি, মৃত্যুর নেশা ধরিয়েছে মাত্র। বিষাদ তাকে শুধু বিষন্ন করে না, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও কেড়ে নেয়। তাই আরো বেশি কালো কালো ছায়া সে দেখে, জীবনে পায় মৃত্যুর স্পর্শ। তাই কবি এ কথা বলেছেন।