বাঙালির চলচ্চিত্রের ইতিহাস : সংক্ষিপ্ত রূপরেখা


Chapter 9



১. বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্বাক যুগের বিশিষ্টতা সংক্ষেপে উল্লেখ করো এবং বাংলা সিনেমার নির্বাক যুগের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। ২+৩

উত্তর: নির্বাক মুগের বিশিষ্টতা: বাংলা সিনেমার নির্বাক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলি হল- পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি প্রেম ও মানবিকতা এই যুগের চলচ্চিত্রের বিষয় ছিল। এই সময়ে বাংলা নাটকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের গভীর যোগসূত্র গড়ে ওঠে। নাটকের শুধু কাহিনিই নয়, নাটকের পরিচালকরাও বাংলা সিনেমায় যোগ দিয়েছিলেন। নির্বাক যুগের সিনেমা ছিল বিনোদনকেন্দ্রিক, সমকালীন রাজনীতির কোনো প্রভাব সিনেমায় দেখা যায় না। এই সময়ে জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা তৈরির প্রবণতা লক্ষ করা যায়।


নির্বাক যুগের বৈশিষ্ট্য: বাংলা সিনেমার সূচনা হয়েছিল নির্বাক সিনেমার মাধ্যমে। ভারতীয় সিনেমার সূচনায় যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন হীরালাল সেন এবং তাঁর 'রয়‍্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি।' ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে হীরালাল সেন ও তাঁর ভাই মতিলাল সেন এই কোম্পানিটি গড়ে তোলেন। বায়োস্কোপ দেখানো ছাড়াও হীরালাল সেন কয়েকটি ছবি ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তথ্যচিত্র দুটি হল-দিল্লি দরবার এবং স্বদেশি ও বঙ্গভঙ্গ বিষয়ক। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে বায়োস্কোপ দেখিয়ে গিয়েছিল। জে. এফ. ম্যাডান প্রতিষ্ঠিত 'ম্যাডান থিয়েটার' প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিনেমা দেখাতে শুরু করে। এই থিয়েটারে প্রথম হিন্দি ছবি 'রাজা হরিশ্চন্দ্র' এবং এঁদের প্রযোজিত বাংলা ছবি 'সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র' দেখানো হয়েছিল। প্রথম বাংলা কাহিনিচিত্র 'বিল্বমঙ্গল' এই কোম্পানির উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল। মোট ৬২টি ছবি এঁদের প্রযোজনায় তৈরি হয়। এককথায় ম্যাডান থিয়েটার সমস্ত দিক দিয়ে সফল হয়েছিল। বাংলা সিনেমায় এঁদের অবদান অবিস্মরণীয়। নির্বাক যুগের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কোম্পানি হল-ধীরেন গাঙ্গুলির 'ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি', শিশির ভাদুড়ির 'তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি', অনাদি বসুর 'অরোরা ফিল্ম কোম্পানি' প্রভৃতি।


২. লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়কে বিশ্ব সিনেমার জনক বলা হয় কেন? সিনেমার জন্ম ইতিহাসে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমিকা সম্পর্কে যা জানো লেখো। ২+৩

উত্তর: লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়কে বিশ্ব সিনেমার জনক বলার কারণ : ফরাসি নাগরিক লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়কে বিশ্ব সিনেমার জনক বলা হয়। অর্থাৎ সিনেমার উদ্‌দ্গাতা হিসেবে সুপরিচিত হলেন এই ভাতৃদ্বয়-অগস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিস শহরে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে সিনেমা বা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। ৭ জুলাই, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে লুমিয়ের ভাইদের ছবি দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সূচনা হয়।


লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় অগাস্ট এবং লুই সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই ব্যক্তিত্ব হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে তাদের উদ্ভাবনী কাজ আধুনিক চলচ্চিত্রের বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। ফ্রান্সের বেসানকনে তাদের বিনয়ী সূচনা থেকে শুরু করে প্যারিসে তাদের প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন পর্যন্ত, লুমিয়ের ভাইদের অসাধারণ যাত্রা সিনেমা এবং ভিজ্যুয়াল আর্টে তাদের অমোচনীয় চিহ্নের প্রমাণ।


অবদানঃ লুমিয়ের পরিবারের ছবির জগতে যাত্রা শুরু হয় অগাস্ট এবং লুইয়ের পিতা আঁতোয়েন লুমিয়েরের মাধ্যমে। আঁতোয়েন একজন সফল চিত্রশিল্পী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে আলোকচিত্রের অভিনবত্ব এবং সম্ভাবনার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন।


লুমিয়ের ভাইয়েরা এই পরিবেশে নিমজ্জিত হয়ে বেড়ে ওঠেন, ছবি এবং তার পিছনের প্রযুক্তির প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি করেন।


১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় বিশ্বকে সিনেমাটোগ্রাফের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যন্ত্রটি, একটি মোশন-পিকচার ক্যামেরা, প্রজেক্টর এবং প্রিন্টারের সংমিশ্রণে তৈরি। টমাস এডিসনের কাইনেটোস্কোপের থেকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের আবিষ্কারটি বহনযোগ্য ছিল, উচ্চমানের ছবি তৈরি করত এবং একই সঙ্গে অসংখ্য দর্শকের কাছে তুলে ধরার ক্ষমতা ছিল।


যে বছর তারা সিনেমাটোগ্রাফ প্রকাশ করে, সেই বছরই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথম ছবি 'ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি' তৈরি করে। ৪৬ সেকেন্ডের এই ছবিতে শ্রমিকদের কারখানা থেকে বেরিয়ে আসার দৃশ্য দেখানো হয়, যা দৃশ্যত গল্প বলার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করে।


৩. বাংলা চলচ্চিত্র ধারায় ঋত্বিক ঘটকের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: ঋত্বিক ঘটকের অবদান: বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তাঁর পরিচালিত ছবিগুলি একেকটি ইতিহাস হয়ে আছে। ইনি ঋত্বিক ঘটক নামে সমধিক পরিচিত। ভারতবর্ষের মননশীল জীবনবাদী ছবির জগতে যাঁদের নাম আলোচিত হয়, তাঁদের অন্যতম হচ্ছে ঋত্বিক ঘটক।


তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি 'নাগরিক' এবং প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি 'অযান্ত্রিক'। বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে তিনি সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেনের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর কর্ম ও সৃজনক্ষেত্রের পরিধি কেবল চিত্র পরিচালনা ও কথাসাহিত্যে নয়, এসবের পাশাপাশি ভারতের পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘকাল। প্রথম জীবনে কবি ও গল্পকার তারপর নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, অবশেষে চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।


১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সিনেমা 'ছিন্নমূল' এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক ঘটে ঋত্বিক ঘটকের। চলচ্চিত্রটিতে তিনি একইসঙ্গে সহকারী পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন। বাংলা সিনেমায় বাস্তবতা প্রদর্শনের চলচ্চিত্রিক ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা।


১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ঋত্বিক ঘটকের 'অযান্ত্রিক' ছবিটি মুক্তি পায়। সুবোধ ঘোষের একটি ছোটোগল্প থেকে তিনি এটি নির্মাণ করেন। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্ক নিয়েই তৈরি এই সিনেমাটি। সে সময় পুরো ভারত জুড়েই অন্যরকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সিনেমাটি।


তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল-'বাড়ি থেকে পালিয়ে' (১৯৫৮), 'মেঘে ঢাকা তারা' (১৯৬০), 'কোমল-গাধার' (১৯৬১), 'সুবর্ণরেখা' (১৯৬২), 'তিতাস একটি নদীর নাম' (১৯৭৩), 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' (১৯৭৭), 'আমার লেনিন' (১৯৭০, তথ্যচিত্র), 'পুরুলিয়া ছৌ' (১৯৭০, তথ্যচিত্র) প্রভৃতি। এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, তাঁর বামপন্থী আদর্শ ও মানবতাবাদের প্রতিফলন ঘটেছে প্রায় প্রতিটি সিনেমায়। তাঁর ছবির বিষয়, ভাষা, বক্তব্য, সুর ও আবহে নানা সময় সমাজজীবনের গ্লানিময়তা, দুর্দশা, অভাব, জ্বালার দৃশ্য সুনিপুণ দক্ষতায় চিত্ররূপ লাভ করেছে। সিনেমার বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে তিনি প্রভৃত মাত্রায় পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন।

৪. বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মৃণাল সেনের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর: চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মৃণাল সেনঃ বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতারা আপন প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে মৃণাল সেন অন্যতম। মৃণাল সেনের অসাধারণ প্রযোজনার শৈল্পিক দক্ষতায় বাংলা সিনেমার অভিনয় শিল্প উৎকর্ষ লাভ করে। বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে মৃণাল সেনের ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি বাংলা ছবির ভাষায় নিয়ে এলেন সারল্য। অত্যন্ত সহজ সরল ভঙ্গিতে তিনি সিনেমার ভাষাকে দর্শককুলের সম্মুখে উপস্থাপন করেন। মৃণাল সেন সর্বদা সময়ের দাবিকে মান্যতা দিয়েছেন ও সময়োপযোগী নানা সজীব চরিত্রের সমাগম ঘটিয়েছেন চলচ্চিত্রের প্রাঙ্গণে। মৃণাল সেনের সিনেমায় মার্কসবাদী প্রভাবও লক্ষ করা যায়।


১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত ছবি 'রাত ভোর' মুক্তি পায়। তবে এই ছবিটি বেশি সাফল্য না পেলেও তাঁর দ্বিতীয় ছবি 'নীল আকাশের নীচে' তাঁকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়। আর তাঁর তৃতীয় ছবি 'বাইশে শ্রাবণ' থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ছবি 'ভুবন সোম', অনেকের মতে এই ছবিটি মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তৎকালীন অন্যান্য বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মতো মৃণাল সেনের ছবিতেও ধরা পড়েছিল শহর কলকাতা। তিনটি ছবি 'সাক্ষাৎকার', 'কলকাতা-৭১' এবং 'পদাতিক' বিভিন্ন কলকাতাকেন্দ্রিক ছবিগুলির মধ্যে সেরা ছবি হিসেবে পরিগণিত হয়। মৃণাল সেন মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে তুলে ধরেন তাঁর 'একদিন প্রতিদিন' এবং 'খারিজ' এই দুটি ছবির মাধ্যমে। 'আকালের সন্ধানে' এই ছবিটি ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসেবে রূপোর ভালুক জয় করে। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'মহাপৃথিবী' (১৯৯২) এবং 'অন্তরীণ' (১৯৯৪)। এখনও অবধি তার শেষ ছবি 'আমার ভুবন' মুক্তি পায় ২০০২ খ্রিস্টাব্দে। এ ছাড়া মৃণাল সেন বেশ কিছু ডকুমেন্টারি ও শর্ট ফিল্ম তৈরি করেছিলেন, যেগুলি বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নিয়েছিল।


৫. বাংলা সিনেমার নির্বাক যুগে 'ম্যাডান থিয়েটার'-এর অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: ম্যাডান থিয়েটারের অবদানঃ জামশেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান, সংক্ষেপে জে. এফ. ম্যাডান ছিলেন একজন পারসি ব্যবসায়ী এবং কলকাতায় পারসি থিয়েটারের জনক। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ম্যাডানের অবদান প্রচুর।


জামসেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ময়দানে করিখিয়ান হলে 'পাথে প্রোডাকশনস' কোম্পানির নির্মিত ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করেন। সে সময় এইসব বায়োস্কোপ প্রদর্শন হতো এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানির নামে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জামসেদজি তাঁর সকল ব্যবসাকে ম্যাডান থিয়েটারস লিমিটেড নামে একটি যৌথ স্টক সংস্থার অধীনে আনেন। ফলে এই কোম্পানির অধীনে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলি ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রযোজনা হিসেবে বাজারজাত হয়েছিল।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কলকাতায় নাট্যচর্চা দৈন্যদশায় পড়ে যায়। এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে, জামসেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান ম্যাডান কোম্পানির অধীনে কর্ণওয়ালিস থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে শিশির কুমার ভাদুড়ি এই

কোম্পানিতে এক হাজার টাকা মাসিক চুক্তিতে পেশাদার অভিনেতা রূপে নিযুক্ত হন। এই বছরের ১০ ডিসেম্বর তিনি 'আলমগীর' নাটকে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।


১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ম্যাডান কোম্পানির প্রযোজনায় প্রথম বাংলা নির্বাক কাহিনিচিত্র 'বিশ্বমঙ্গল' তৈরি হয়। এদের প্রযোজনায় ৬২টি ছবি তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 'মহাভারত', 'নল-দময়ন্তী', 'ধ্রুব চরিত্র', 'বেহুলা', 'মা দুর্গা', 'অশোক', 'বিষবৃক্ষ', 'সাবিত্রী-সত্যবান', 'সতী', 'নুরজাহান' প্রভৃতি।


৬. ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আলোচনা করো। ২+৩

উত্তর: ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনকঃ দাদাসাহেব ফালকের পূর্বনাম ছিল ধুন্দিরাজ গোবিন্দ ফালকে। তিনি ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান মহারাষ্ট্র) ত্রিম্বকেশ্বরে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম তৈরি করার জন্য, তিনি 'ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক' নামে পরিচিত। 'রাজা হরিশ্চন্দ্র' নীরব ভারতীয় চলচ্চিত্রের শিরোনাম (১৯১৩)। দাদাসাহেব তার প্রথম চলচ্চিত্রে পরিচালনা, বিতরণ এবং সেট নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি হরিশ্চন্দ্রের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।


অবদানঃ ভারতবর্ষে চলচ্চিত্রের রূপবৈচিত্র্যের ধারাকে প্রবহমান রাখতে যাঁদের ভূমিকা ছিল অনন্য, তাঁদের মধ্যে একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন দাদাসাহেব ফালকে।


দাদাসাহেব ফালকে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম নীরব চলচ্চিত্র 'দ্য লাইফ অফ ক্রাইস্ট' মুক্তি দেন। এই চলচ্চিত্রটি দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, ফালকে ভারতীয় সবকিছুকে চলমান ছবির পর্দায় তুলে ধরাকে তাঁর লক্ষ হিসেবে দেখেন। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত 'রাজা হরিশ্চন্দ্র'। ফালকে কর্তৃক রচিত, প্রযোজিত, পরিচালিত এবং পরিবেশিত এই চলচ্চিত্রটি ছিল বিশাল সাফল্য এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি তার ছবিতে একজন মহিলা অভিনেত্রীকে প্রধান ভূমিকায় পরিচয় করিয়েছিলেন। 'ভষ্মাসুর মোহিনী' (১৯১৩) এমন এক সময়ে যখন পেশাদার অভিনয় মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।


ফালকে বেশ কয়েকজন অংশীদারের সহায়তায় ১৯১৭খ্রিস্টাব্দে হিন্দুস্তান ফিল্ম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। তাঁর অন্যান্য সফল চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে ছিল 'লঙ্কা দহন', 'শ্রীকৃষ্ণ জন্ম', 'সাবিত্রী' এবং 'শকুন্তলা'। এই সমস্ত চলচ্চিত্রে একাধারে মনোরঞ্জনের দিকটি যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে ধর্মের অপরূপ মেলবন্ধনও ঘটেছে, যা সাংস্কৃতিক বাণিজ্যের প্রসার ও শ্রীবৃদ্ধিতে বিশেষরূপে সাহায্য করে।


৭. পাঁচের দশকে বাংলা সিনেমার যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে, সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: পাঁচের দশকে বাংলা সিনেমা: পাঁচের দশকে বাংলা সিনেমায় যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তা পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। নির্মল দের পরিচালনায় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে তৈরি 'সাড়ে চুয়াত্তর' সিনেমাটির মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় সমৃদ্ধি ঘটে ও যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। কলকাতার মেস জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ছবিটি কাহিনির বুনোটে, মেজাজে, রসবোধে আদ্যন্ত বাঙালিয়ানায় ভরা। চিত্রনাট্যে, পরিকল্পনায় ও প্রয়োগে পরিচালক নির্মল দের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, দর্শকরা এই সিনেমায় তুলসী চক্রবর্তী, মলিনা দেবী ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাদের লাভ করে। পরবর্তীকালে জহর রায়, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত প্রমুখদের মতো প্রতিভাবান চরিত্রাভিনেতাকে আমরা এই ধারার উত্তরসূরি হিসেবে পেয়েছি। এ ছাড়া এই সিনেমাতেই নায়ক-নায়িকা জুটি হিসেবে প্রথম দেখা যায় উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনকে। উত্তম, সুচিত্রা রোমান্টিক জুটি হিসেবে এরপর একে একে তিরিশটি ছবিতে কাজ করেছেন। আজ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন রোমান্টিক জুটি আর তৈরি হয়নি। 'সাড়ে চুয়াত্তর' এর মতো নির্মল দের 'বসু পরিবার' ও 'চাপা ডাঙার বৌ' সিনেমা দুটিও এই ধারার উল্লেখযোগ্য ছবি। এই সময়েই নিজেদের মতো করে সিনেমা বানানোর জন্য কয়েকজন পরিচালক একসঙ্গে মিলে কয়েকটি দল গঠন করেন। এক্ষেত্রে 'অগ্রগামী', 'অগ্রদূত' ও 'যাত্রিক' এই তিনটি দল প্রধান। এরা অনেক জনপ্রিয় ও বাণিজ্যসফল ছবি তৈরি করেন। এই দশকেই নির্মিত হয় 'অপরাজিত' ও 'অপুর সংসার' (১৯৫৯)। ঋত্বিক ঘটকের 'নাগরিক' (১৯৫২), 'অযান্ত্রিক' (১৯৫৮), মৃণাল সেনের 'রাতভোর' (১৯৫৬), 'নীল আকাশের নীচে' (১৯৫৯), রাজেন তরফদারের 'অন্তরীক্ষ' (১৯৫৭), 'গঙ্গা' (১৯৬০), তপন সিংহের 'কাবুলিওয়ালা' এই সময়ের অনবদ্য ছবি।


পাঁচের দশকে বাংলা সিনেমায় যে সাবালকত্ব আসে এবং একই সঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের ছবি তৈরি হয়, যা বিশ্ববাসীকে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমা সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে।


৮. তথ্যচিত্র বলতে কী বোঝো এবং বাংলা তথ্যচিত্রের ধারা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো। উত্তরঃ তথ্যচিত্র: তথ্যচিত্র হল বাস্তব তথ্য নির্ভর অ-কাহিনিচিত্র। কোনো কাল্পনিক বিষয়ের এখানে স্থান নেই। তবে তথ্যচিত্র নানা ধরনের হতে পারে। যেমন-প্রামাণিক (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিষয়ের বিশ্লেষণ নির্ভর), প্রাসঙ্গিক (সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নির্ভর), অবস্থানগত (বিভিন্ন সংবাদচিত্র যা মূলত ঘটনা নির্ভর), তথ্যমূলক (শিক্ষামূলক, প্রয়োগিক, অ্যাডভেঞ্চারকেন্দ্রিক তথ্যনির্ভর উপস্থাপনা), জীবনীকেন্দ্রিক (বিশিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও জীবনের নানা দিক), ব্যক্তিগত (একেবারে ঘরোয়া বিষয় বা কোনো গোপন কর্মকান্ড নির্ভর) এবং ভ্রমণমূলক (অভিযান বা অনুসন্ধানকেন্দ্রিক রোমহর্ষক বিবরণ)।


বাংলা তথ্যচিত্রের জনক হীরালাল সেন। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্রের নাম 'দিল্লি দরবার'। বাংলা তথ্যচিত্রে হীরালাল সেন-এর দিল্লি দরবার দিয়ে যাত্রা আরম্ভ হলেও এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে রয়েছেন হরিসাধন দাশগুপ্ত। তাঁর নির্মিত উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র হল-Konark, Acharya Nandalal। তবে তথ্যচিত্রের গৌরবের দিন এসেছে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্রের সংখ্যা দুটি। যথা- (ক) 'Rabindranath Tago-re, 'The Inner eye, 'Bala' সুকুমার রায় এবং সিকিম। ঋত্বিক ঘটক নির্মিত তথ্যচিত্র হল-'Adivasiyon Ka Jeeban Short (১৯৫৫)। এই সময়েই তৈরি আর একটি তথ্যচিত্র হল 'Bihar Ke Darshaniya Sthan' (১৯৫৫)। এর বেশ কয়েকবছর পরে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি তৈরি করেন 'Scientists of Tomor-row' এবং ১৯৭০-এ 'Chhau Dance of Purulia'। এই তিনি একে একে 'আমার লেনিন' ও 'ইয়ে কিউ' বা 'Why' নামে আরও দুটি তথ্যচিত্র করেন। এ ছাড়া ১৯৭১-এ 'দুর্বার গতি পদ্মা' নামক তথ্যচিত্রের পরে ইন্দিরা গান্ধিকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রের কাজ শুরু করলেও কিছুদূর এগিয়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাঁর শেষ তথ্যচিত্রটি হল 'রামকিঙ্কর'। এর কাজ অসমাপ্ত রেখেই তিনি মারা যান। বাংলা তথ্যচিত্রের ধারায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন চিদানন্দ দাশগুপ্ত। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্র হল 'Portrait of a City' (১৯৬১), 'বিরজু মহারাজ' (১৯৭২)। চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন নির্মিত তথ্যচিত্র হল 'Moving Perspective' (১৯৬৭), বিমল রায় নির্মিত একটি উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র হল-'Immortal Stupa' (১৯৬১), 'Life and message of Swami Vivekananda' (১৯৬৪), শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রীর 'অবনীন্দ্রনাথ' (১৯৭৬), 'পাটা চিত্র' (১৯৭৭), 'কালীঘাট পট' (১৯৮১) উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র নির্মাতা তরুন মজুমদারের 'অরণ্য আমার' বাংলা তথ্যচিত্রের ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।


৯. বাংলার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে 'নিউ থিয়েটার্স'-এর অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: নিউ থিয়েটার্সের অবদানঃ নিউ থিয়েটার্স একটি ভারতীয় চলচ্চিত্র স্টুডিও। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রাপ্ত প্রযোজক বীরেন্দ্রনাথ সরকার দ্বারা এই স্টুডিওটি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখে কলকাতায় স্থাপিত হয়। বীরেন্দ্রনাথ নিজের শেখা জ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন কাজে লাগান তেমনি আমেরিকা থেকে দক্ষ কারিগর এনে কর্মী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।


প্রেমাঙ্কুর আতর্থী দ্বারা নির্দেশিত 'দেনা-পাওনা' নামক বাংলা চলচ্চিত্রটি বাংলার প্রথম দীর্ঘ সবাক চলচ্চিত্র, যা ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে নিউ থিয়েটার্স দ্বারা প্রযোজিত হয়েছিল। এই ছবির জন্য সংগীত পরিচালনা করেছিলেন বিখ্যাত সংগীতকার রাইচাঁদ বড়াল।


নিউ থিয়েটার্স নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের 'নটীর পূজা', দেবকী কুমার বসুর 'চন্ডীদাস' এবং 'পুরাণ ভগবৎ' যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত 'বিদ্যাপতি' চলচ্চিত্রে প্রথম ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে হিন্দি ও বাংলা 'দেবদাস' 'নিউ থিয়েটার্স'কে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। এ ছবিতে দু-ভাষাতেই নায়িক যমুনা বড়ুয়া। বাংলায় নায়ক-


পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়া, হিন্দিতে নায়ক কে. এল, সায়গল। সে বছরই 'ভাগ্যচক্র' সিনেমায় প্রথম প্লে-ব্যাক প্রচলন করেন নীতিন বসু। শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধন নয়, একাধিক গুণী ও দক্ষ মানুষকে একই ছাতার তলায় আনে এই প্রতিষ্ঠান।


নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ছবিগুলিতে, তারকা অভিনেত্রীদের মধ্যে প্রথম কানন দেবী বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। কুন্দনলাল সায়গল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পৃথ্বীরাজ কাপুর, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, বসন্ত চৌধুরির মতন বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য অভিনেতাও নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, নরেন্দ্র দেব, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র এই কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।


১০. বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী প্রমথেশ বড়ুয়ার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর: প্রমথেশ বড়ুয়ার ভূমিকাঃ প্রমথেশ বড়ুয়া ভারতের একজন বিখ্যাত অভিনেতা, চলচ্চিত্র-পরিচালক ও চিত্রনাট্য লেখক ছিলেন। আসামের গৌরিপুরে জন্মগ্রহণ করা প্রমথেশ বড়ুয়া বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন। 'অপরাধী' চলচ্চিত্রে তিনি সর্বপ্রথম কৃত্রিম আলোর ব্যবহার করেন এবং এটাই ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম কৃত্রিম আলোর ব্যবহার। ভারতীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনি 'দেবদাস' চলচ্চিত্রে ফ্লাসব্যাক মন্তাজ, টেলিপ্যাথি শট এবং সাবজেকটিভ ক্যামেরার ব্যবহার করেন। তিনি মোট ১৪টি বাংলা ও সাতটি হিন্দি ছবি পরিচালনা করেন।


প্রমথেশ বড়ুয়া কলকাতার ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির 'দ্য ব্রিটিশ ডমিনিয়ান ফিল্ম লিমিটেড'-এ মনোনিবেশ করেছিলেন ও তিনি এই প্রতিষ্ঠানে অভিনয় করেছিলেন। প্যারিস থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রী কিনে এনে তিনি ভারতে 'বড়ুয়া পিকচার্স' নামে স্টুডিও স্থাপন করেছিলেন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে এই স্টুডিওর প্রথম চলচ্চিত্র 'অপরাধী' মুক্তি পেয়েছিল। কালীপ্রসাদ ঘোষ পরিচালিত 'ভাগ্যলক্ষ্মী' চলচ্চিত্রে তিনি খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি, প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকী বসু একত্রিত হয়ে নিউ থিয়েটার্স নামক চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। এই থিয়েটারে থাকার সময় তিনি 'দেবদাস' চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাসের আধারে এই চলচ্চিত্র প্রথমে বাংলা ভাষায় নির্মাণ করা হয়েছিল এবং ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিন্দি ভাষায় 'দেবদাস' চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন 'মঞ্জিল', 'রজত জয়ন্তী', 'জিন্দেগি', 'শেষ উত্তর', 'গৃহদাহ', 'উত্তরায়ন'-এর মতো ছায়াছবি। সিনেমায় সামাজিক, পারিবারিক ও রোমান্টিক বিষয়কে কেন্দ্র করে জনপ্রিয় তথা বাণিজ্যসফল ছায়াছবি নির্মাণের মাধ্যমে তিনি নতুন ধারার প্রবর্তন ঘটান। প্রাক্ স্বাধীনতা যুগের এই পরিচালক ও প্রযোজক এবং অভিনেতা প্রকৃতপক্ষে বাংলা সিনেমার প্রথম স্টার। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে 'মেলোড্রামা' প্রথম সূচনা করেন।