হারুন সালেমের
Chapter 2
১. 'শাক-পাতা-গুগলি তুলতে হারার মা-র ওপরই ওর নির্ভর।' -বক্তার এ কথা বলার কারণ কী?
উত্তর: বক্তব্যের কারণ: আলোচ্য উদ্ধৃতিটি মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। সমাজে দরিদ্র, অসহায়, খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন যন্ত্রণা উপরোক্ত উদ্ধতিটির মাধ্যমে লেখিকা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হল গৌরবি। অজপাড়াগাঁয়ে, জীর্ণ এক কুঁড়ে ঘরে গৌরবির বাস। তার ছেলের অবস্থা ভালো হওয়া সত্ত্বেও সে তার মাকে দেখে না। মেয়ে দরিদ্র হওয়ার কারণে সেখানেও ঠাঁই হয়নি গৌরবির। ফলে দিন রাত তাকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। এই অবস্থায় হারার মা-ই তার একমাত্র বন্ধু। তারা দু-জনে নিড়ানি নিয়ে বিলের ধারে, খালপাড়ে থানকুনি পাতা তোলে, কচুশাক কাটে। যজ্ঞডুমুরের ডাল, দূর্বাঘাস, বেলপাতা, যা পায় সব ওরা বেচে দেয় যশোদের কাছে। যশোদারা রোজ সকালের গাড়িতে কলকাতা যায়, দুপুরে ফেরে। গৌরবি ওদের সঙ্গে যেতে পারে না, কারণ গৌরবির একখানা পা জন্ম থেকে খোঁড়া। গোড়ালি আর পাতা বাঁকা। আঙুলগুলো পেছনে বাঁকানো, গৌরবি তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না, তাই শাক-পাতা-গুগলি তুলতে হারার মা-র ওপরই গৌরবিকে নির্ভর করতে হয়।
২. 'বাপ ছেলেতে খুব বেধেছিল।'-বাপ-ছেলেতে বেধে যাওয়ার কারণ কী? এই ঘটনায় নিবারণের মানসিকতার কী পরিচয় পাওয়া যায়? ২+৩
উত্তর: বাপ-ছেলেতে বেধে যাওয়ার কারণ: মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে নিবারণের বাবা মেয়ে পুঁটির বিয়ের ব্যবস্থা করতে গিয়ে জামাইকে যৌতুক দেওয়ার জন্য প্রচুর খরচ করে ফেলে। এটা দেখে নিবারণ তার মাকে বলে, তার কি একটাই সন্তান যে সব তাকেই দেবে। এই কারণের জন্যই বাপ-ছেলেতে খুব বেধেছিল।
নিবারণের মানসিকতা: এই ঘটনা থেকে নিবারণের মানসিকতার যে পরিচয় পাওয়া যায় তা হল-নিবারণ স্বার্থপর ও ঈর্ষাপরায়ণ। তার বয়স তখন কম হলেও সে তখনই বুঝে গিয়েছিল বাবা-মা তার বোনের বিয়ের যৌতুকের জন্য সব টাকা খরচ করে ফেললে তার নিজের জন্য বরাদ্দ কমে যাবে। সেই জন্য সে বাবার সঙ্গে ঝগড়াও করে। সে মাকে বলে পুঁটিই যেন তাকে পরবর্তীকালে দেখে। এটা যে কতটা সত্য তা আমরা দেখতে পাই, যখন সে রেললাইনের ধারে বড়ো পাকা বাড়ি করলেও মাকে আশ্রয় দেয়নি। এখান থেকে আমরা নিবারণের নীচ মানসিকতার পরিচয় পাই।
৩. 'বড়ো দুঃখ হল গৌরবির। তারপর মনে হল তার চেয়ে হারার মা ভাগ্যবতী।'-গৌরবির দুঃখের কারণ কী? গৌরবির কেন মনে হয়েছে হারার মা ভাগ্যবতী? ২+৩
উত্তরঃ গৌরবির দুঃখের কারণঃ মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে দেখা যায় গৌরবির সঙ্গে হারার মায়ের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। গৌরবির দুঃখের দিনে হারার মা তাকে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছে। আজ একজন চলে যায় আর একজনকে ছেড়ে। তাই গৌরবির দুঃখ হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক।
গৌরবির হারার মা-কে ভাগ্যবতী মনে হওয়ার কারণ : গৌরবির মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। ধারণাটি হল হারার মা তার থেকে অনেক ভাগ্যবতী। কারণ আয়েষার নিজের ঘর আছে, একমাত্র সন্তান হারা আছে। রোগযন্ত্রণা ভোগ না করেই সে মারা গেছে। সব মানুষেরই একটা শেষ ইচ্ছা থাকে, মৃত্যুর পর সে যেন ছেলের হাতের আগুন পায়। এদিক থেকে, হারার মা ভাগ্যবতী। কারণ সে ছেলের হাতের মাটি পেয়েছে। গৌরবির জীবনে এসবই অনিশ্চিত।
৪. 'গৌরবি কি ছেলের হাতের আগুন পাবে না? ভেবে গৌরবির চোখ জলে ভরে গেল।'-গৌরবির এরকম ভাবনার কারণ আলোচনা করো।
উত্তর: ভাবনার কারণ: মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে গৌরবি নিঃসন্তান নয় যে, সে ছেলের হাতের আগুন পাবে না। কিন্তু আগুন না পাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। তার নিজের ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছে গৌরবির ঠাঁই হয়নি। আট বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে যৌতুক হিসেবে প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যায়। এর ফলে ছেলে নিবারণ বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। ছেলে জানায় তাদের কি একটা সন্তান যে সবকিছু মেয়েকেই দিতে হবে। গৌরবি এই সময় জানিয়ে দেয়, মেয়েই তাকে দেখবে। নিবারণ জানায় সময়ে বোঝা যাবে। পরবর্তীকালে ছেলের অবস্থা ভালো হওয়া সত্ত্বেও মাকে আশ্রয় দেয়নি। মেয়ের কাছে কিছুদিন থাকলেও তার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য সেখান থেকেও গৌরবিকে চলে আসতে হয়। এই অবস্থায় মুকুন্দ তার পিসি গৌরবিকে নিয়ে এসে তোলে তার একখানি পরিত্যক্ত ঘরে। এখানে একবেলা আধপেটা খেয়ে কোনো রকমে জীবনধারণ করতে থাকে। কিছুদিন পরে বিকেলের পড়ন্ত রোদে যজ্ঞডুমুরের ডাল ভাঙতে ভাঙতে গৌরবির মনটা নিজের পরিণতির কথা ভেবে কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। তার মনে হয় আয়েষার ভাগ্য ভালো নিজের ঘরে মরেছে, ছেলের হাতে মাটিও পেয়েছে। কিন্তু গৌরবি বাস করে পরের ভিটেতে এবং ছেলেমেয়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে জানে না কোথায় মরবে এবং মৃত্যুর পর মুখে কে আগুন দেবে।
এদিকে মুসলমান সন্তান হারাকে আশ্রয় দেওয়ায় গৌরবিকে সতর্ক করে দিয়ে যশি বলে, হারাকে যদি সে দূর করে না দেয়, তবে তার শেষ আশ্রয়টুকুও মুকুন্দবাবু কেড়ে নেবে। গৌরবি ভাবে তার ভাগ্য এত ভালো নয় যে, নিবারণ একটা বুদ্ধি দেবে বা বলবে তার কাছে এসে থাকতে। গৌরবি ছেলের হাতের আগুন পাবে কিনা এই ভেবে তার দু-চোখ জলে ভরে যায়।
৫. 'আমার মা হয়ে ওই অজ গাঁয়ে পড়ে থাকবে সেটা ভালো দেখায় না বটে।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ উক্তির ব্যাখ্যা: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে গৌরবির ছেলে নিবারণ আলোচ্য কথাগুলি বলেছে।
হারার কোনো সঠিক গতি করতে না পেরে, গৌরবির হঠাৎ মনে পড়ে যায়, নিজের ছেলে নিবারণের কথা। সেখানে গেলে যদি থাকার সুযোগ হয়, তাহলে হারার একটা গতি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ছেলে কী সত্যিই মায়ের অনুরোধ শুনবে? যে ছেলে মাকে খাওয়াতে পরাতে পারে না, সে দুজনের দায়িত্ব নেবে বলে গৌরবির মনে হয় না।
বাস্তবে ব্যাপারটা হলও তাই। গৌরবি যখন তার পরিকল্পনার কথাটা নিবারণকে বলে, তখন নিবারণ ব্যঙ্গের সুরে উত্তর দেয়, সে এখন জমিদার তাই তার কাছে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা। নিবারণের অবস্থার এখন বিপুল পরিবর্তন হয়েছে। খানিকটা সামলে নিয়েই সে বলে, অবশ্য তার সমাজে এখন প্রচুর নাম ডাক, তাই তার মা পাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকবে, এটা তার সম্মানের পক্ষে বড্ড বেমানান। তবে তার মা ছেলের কাছে আসতে পারে কিন্তু হারাকে আনা চলবে না। কারণ ও মুসলমান সন্তান। শেষে সহজ পথটা নিবারণই বাতলে দেয়। ওপার থেকে প্রচুর লোক যুদ্ধের ভয়ে এপারে শরণার্থী শিবিরে উঠছে। হারাকে নিয়ে গিয়ে তাদের দলেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। তার সব দায়দায়িত্ব তখন সরকারই নেবে। এই ব্যবস্থার কথা বলে দিয়ে নিবারণ উদ্ধৃত কথাগুলি বলেছে।
৬. 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে হারা ও গৌরবির সম্পর্কের মূল্যায়ন করো।
উত্তরঃ হারা ও গৌরবির সম্পর্কে মূল্যায়ন: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে দেখা যায়, হারা এক মাতৃহারা মুসলিম ধর্মাবলম্বী জড়বুদ্ধি সম্পন্ন বালক। শৈশব থেকে রোগে ভুগে জিভের দোষে তার কথা জড়িয়ে যায়, স্মৃতি হয়ে যায় দুর্বল। ঘটনাচক্রে মাকে হারিয়ে তার এক পরিচিত মহিলা গৌরবির কাছে সে আশ্রয়ে নেয়। গৌরবি জাতে হিন্দু। সে ছিল হারার মায়ের বান্ধবী। সেই পরিচয়ের সূত্রে হারা গৌরবিকে 'মাসি' বলে ডাকে। হারার মায়ের মতো সেও চূড়ান্ত দরিদ্র। দুজনে একসঙ্গে জঙ্গল থেকে শাকপাতা তুলে পেট চালায়। সদ্য মাকে হারিয়ে হারা গৌরবির কাছে এসে উঠলে সে দুটি কারণে চরম বিপদে পড়ে। প্রথম কারণটি ছিল অর্থনৈতিক এবং দ্বিতীয় কারণটি ছিল সামাজিক, যেটা প্রথমটির থেকেও গুরুতর। কারণ এক হিন্দু মহিলার ঘরে মুসলমান বালকের ওঠাবসা কেউ মেনে নেবে না।
অন্যদিকে, গৌরবিও সন্তান পরিত্যক্তা এক বিধবা রমণী। তার নিজের ছেলে নিবারণ যথেষ্ট সচ্ছল, তবু নিজের মাকে আশ্রয় দিতে তীব্র আপত্তি। গৌরবি তাই তার অতৃপ্ত পুত্র স্নেহ চরিতার্থ করার জন্য সমাজের ভয় উপেক্ষা করে হারাকে তার কাছে আশ্রয় দেয়।
প্রতিবেশী যশোদা গৌরবিকে এই বলে সাবধান করে দেয় যে, মুসলমান হারাকে ত্যাগ না করলে মুকুন্দবাবু তাকে ভিটে ছাড়া করবে। গৌরবির সচ্ছল ছেলে নিবারণ মাকে আশ্রয় দিতে চায় এই শর্তে যে, হারাকে ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু গৌরবি সেই শর্ত উপেক্ষা করেছে, কারণ তার মন তাতে সায় দেয়নি।
তাই গৌরবি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়-হারাকে ত্যাগ না করে, তারা দুজনে শহরে চলে যাবে। শহরে জাতপাতের সম্পর্ক নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না-সেখানে ভিক্ষে করে খাবে, ফুটপাতে
শোবে, তবু হারাকে ত্যাগ করতে পারবে না। গৌরবি এত দিনের সমাজ, সংসার, সন্তানদের আকর্ষণ সব কিছু ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে হারাকে নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। এখানেই সমস্ত দারিদ্র্য, বিভেদ আর স্বার্থপরতার ওপর মানবিক মূল্যবোধের জয়কে সূচিত করেছেন লেখিকা। এইভাবেই হারা ও গৌরবির সম্পর্ক সব হারিয়েও জয়ী হয়েছে এই গল্পে।
৭. "বিকেলে যশি এসে উঠোনে বসল।"-গৌরবির যশিকে ডাকার কারণ কী? যশিদের সংসার জীবনের কোন কথা গল্পে তুলে ধরা হয়েছে? ২+৩
উত্তরঃ সৌরবির যশীকে ডাকার কারণ: মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে গৌরবি হারাকে নিয়ে কী করবে তা ভেবে পায় না। কারণ হারা মুসলমান সন্তান। একমাত্র যশিই পারে তার একটা ব্যবস্থা করে দিতে। যশি যেহেতু শহরে যায় তাই সেখানে হারার মতো ছেলেদের কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা তা জানতে গৌরবি যশিকে ডেকে পাঠায়।
মশির সংসারের কথা: গৌরবি হারাকে নিয়ে যে সমস্যায় পড়েছে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে হারাকে দিয়ে যশিকে ডেকে পাঠায় তার মতামত নেওয়ার জন্য। বিকেলে যশি এলে তার সম্বন্ধে গৌরবি যা কিছু ভাবে তা থেকেই তাদের সংসারজীবন সম্বন্ধে জানা যায়। তাদের পুরুষরা কোনোদিন ভাতকাপড় দেয় না। যশির বরও দেয় না। তাদের মেয়েরা আশা করে না, পুরুষরা ভাতকাপড় দেবে, যশিও করে না। যশিরা শরীরে খেটে সংসার বেঁধে তোলে। ছেলেপিলেকে জন্তুর মতো জাপটে ভালোবাসে আর স্বামীদের খুব তোয়াজ করে ভুলিয়ে রাখে।
৮. 'আর দেখ, যদি কেউ বলে রাতে কোথায় ছিলি, বলিস মাসির উঠোনে।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ ব্যাখ্যা: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে প্রশ্নোদ্ভূত উক্তিটির বক্তা গৌরবি। সে হারাকে এই কথা বলেছে।
ধর্ম ও জাতপাতের সমাজে গৌরবি খুবই সতর্ক। সে গরিব, নিরক্ষর ও বিধবা, কিন্তু এক মমতাময়ী মা। তার হতদরিদ্র জীবনে, সে হারার মায়ের কাছ থেকেই বেঁচে থাকার সব রকম সহযোগিতা পেয়েছে। হারার কাছ থেকে গৌরবি শুনেছে 'মাসি' সম্বোধন। মৃত্যুর পরে হারার মা তাকে এক কঠিন দায়িত্ব দিয়ে যায়-সেটি হারাকে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। গৌরবি পড়ে যায় মহা সংকটে। নিজের যেখানে একবেলা অন্ন জোটে না, সেখানে হারাকে খাওয়াবে কী? তার ওপরে হারা মুসলমান। এখন জাত বা কেমন করে থাকে, ধর্মের বা কী হবে। তাই সমাজের মানুষের কাছ থেকে হারাকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারটি গোপন রাখার জন্য গৌরবিকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, হতে হয় সতর্ক। উদ্ধৃত বাক্যটি ওই সতর্কতার নমুনা। রাতে গৌরবির কাছে শুয়ে থাকলেও, হারাকে বলতে শেখানো হয়, সে গৌরবির কাছে নয়, শুয়েছিল উঠোনে। অর্থাৎ সে মাসির উঠোনে শুয়েছিল, তার ঘরে প্রবেশ করেনি।
৯. 'হারা কী তার ধর্মের মানুষ, না সমাজের?'-উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তরঃ তাৎপর্য: মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে আলোচ্য উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে তৎকালীন সমাজে জাতপাত অর্থাৎ ধর্মবৈষম্য কতটা প্রবল ছিল, সেই দিকটিকেই সুন্দরভাবে উপস্থাপিত করেছেন লেখিকা।
গল্পের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, হারা মুসলমান সন্তান এবং মাতৃহারা। তার আত্মীয় বলতে কেউ নেই। একমাত্র হিন্দু বিধবা রমণী গৌরবির সঙ্গেই হারার মায়ের বন্ধুত্ব। দুজনেই হতদরিদ্র। জলাজঙ্গল থেকে শাকপাতা, গুগলি তুলে যশোদার মাধ্যমে বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চালায়। গৌরবির জন্ম থেকে একটি পা খোঁড়া হওয়ায় হারার মায়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয় তাকে।
এই হারার মায়ের অকালমৃত্যুতে হারা আশ্রয়চ্যুত হয়ে গৌরবির কাছে আশ্রয় নিতে আসে। আর এখানেই গণ্ডগোল দেখা দেয়। ধর্ম ও জাতপাতের ভেদাভেদের সমাজে গৌরবি ছিল বড়োই সতর্ক। সে হারার মায়ের কাছ থেকে বেঁচে থাকার সবরকম সহযোগিতা পেয়েছে। হারার কাছ থেকে গৌরবি শুনেছে 'মাসি' সম্বোধন। গৌরবির ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও সেখানে তার ঠাঁই হয়নি। ফলে হারাকে তার মন সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে তা অত সহজ নয়। নিজের যেখানে একবেলা অন্ন জোটে না, সেখানে হারাকে সে কী খেতে দেবে? তার ওপরে একটা মুসলমান ছেলেকে ঘরে তোলা খুবই কঠিন ব্যাপার। সমাজ ভালো চোখে এটা দেখবে না, জানতে পারলে তাকে ভিটে ছাড়া করে দেবে। এই ভয়ে অসম্ভব দুশ্চিন্তা হয় গৌরবির।
১০. 'হারার মা ছেলের হাতের মাটি পেল, ভাগ্যে ছিল।'-কোন্ প্রসঙ্গে বক্তা এ কথা বলেছে? বক্তার এ কথা বলার কারণ কী? ২+৩
উত্তরঃ প্রসঙ্গঃ মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে বক্তা অর্থাৎ গৌরবি নিজের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করেছে। গৌরবির ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছে তার ঠাঁই হয়নি। দূরসম্পর্কের এক ভাইপোর দেওয়া ভিটেতে সে একা থাকে। তার দিন কাটে অর্ধাহারে, অনাহারে, তাই তার চিন্তা, মৃত্যুর পর কে তার মুখাগ্নি করবে? এই প্রসঙ্গেই গৌরবি আলোচ্য কথাগুলি উচ্চারণ করেছে।
বক্তব্যের কারণ: গৌরবির সঙ্গে প্রতিবেশী আয়েষা বিবির অনেকদিন ধরেই একটা আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। তারা দুজনে ভিন্ন ধর্মের হলেও তাদের এই সম্পর্কে কখনও ভাটা পড়েনি। গৌরবির একখানা পা জন্ম থেকে খোঁড়া বলে শাকপাতা, গুগলি তুলতে হারার মায়ের ওপরই সে নির্ভর করত। সেই হারার মায়ের মৃত্যু হলে পাড়ার কয়েকজন লোকের সঙ্গে হারাও তার মাকে মাটি দিতে যায়। এটা ইসলাম ধর্মের কর্তব্য। গৌরবি মনে করে ছেলের হাতে মাটি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এই দিক থেকে হারার মা ভাগ্যবতী।