নানা রঙের দিন

Chapter 6


১. 'খালি আমার গলাটাই ঘুরেফিরে কানে বাজছে আমার'-কার কখন এই অবস্থা হয়? তাঁর এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ কী? ২+৩

উত্তর: বক্তা ও সময়: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রধান চরিত্র প্রৌঢ় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের এইরূপ অবস্থা হয়।


নাটক শেষ হয়ে গেলে অভিনেতা রজনীকান্তবাবু মদ্যপান করে নেশাচ্ছন্ন হয়ে গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। একটা জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে শাজাহান নাটকের দিলদারের পোশাক পরে তিনি অন্ধকার ফাঁকা মঞ্চে আসেন এবং প্রেক্ষাগৃহের দারোয়ান রামব্রীজের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহে তাঁর গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে তাঁর কানে বাজতে থাকে।


এরূপ অবস্থার কারণঃ রজনীকান্তবাবু পেশাদারি রঙ্গমঞ্চের একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে দর্শকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও ব্যক্তি জীবনে তিনি নিঃসঙ্গ। তাঁর স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই। নানারকম কাজের মধ্য দিয়ে সারাদিন কেটে গেলেও রাত্রিবেলা তাঁর কাছে যেন বিভীষিকা। সে সময় তিনি মদ্যপান করে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চান। তাঁর স্মরণে আসে, গতরাতে ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছিল। অভিনয় শেষে মদ খেয়ে গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, রামব্রীজ তাঁকে ঘুম থেকে তুলে ট্যাক্সিতে চাপিয়ে দিয়েছিল। রামব্রীজের উপকারে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে তিন টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন। আর এর ফলেই ঘটল আজ রাতের এই ঘটনা। রামব্রীজ সেই টাকায় ধেনো মদ কিনে নিজে মদ্যপান করে, আবার রজনীবাবুকেও দেড় বোতল মদ খাইয়ে যায়। যার ফলে নেশাচ্ছন্ন হয়ে তিনি গ্রিনরুমে পড়ে থাকেন।


২. গভীর রাতে রজনীবাবুর মঞ্চে প্রবেশ ও মঞ্চের পরিস্থিতির পরিচয় দাও। মঞ্চে দাঁড়িয়ে রজনীবাবুর একক সংলাপে তাঁর কোন্ অনুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়? ২+৩

উত্তর: রজনীবাবুর মঞ্চে প্রবেশ ও মঞ্চের অবস্থা : প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রৌঢ় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় শাজাহান নাটকের দিলদারের পোশাক পরে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রেক্ষাগৃহের ফাঁকা মঞ্চে উপস্থিত হন। মঞ্চে তখন রয়েছে রাতে অভিনীত নাটকের অবশিষ্ট দৃশ্যপট, জিনিসপত্র আর যন্ত্রপাতি। মঞ্চের মাঝখানে একটা টুল ওলটানো অবস্থায় রয়েছে। চারিদিক নিঃঝুম।


রজনীবাবুর অনুভূতি : অন্ধকারাবৃত মঞ্চে উপস্থিত হয়ে আটষট্টি বছরের বৃদ্ধ এই অভিনেতা কয়েকবার দারোয়ান রামব্রীজের নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু তাঁর কোনো সাড়া পেলেন না। কেবল নিজের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল তাঁর কাছে। ভয় হতে লাগল তাঁর। রামব্রীজের দেওয়া ধেনো মদ পান করে তাঁর বুকের ভিতরটা কাঁপছে, জিভ টানছে, শিরদাঁড়া সোজা রাখতে পারছেন না। মদ্যপান ছেড়ে দেওয়ার জন্য শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধের কথা মনে পড়ছে তাঁর, বুড়ো বয়সে নিজের শরীরে দিকে তাকানোর আত্মোপলব্ধিও তাঁকে বিচলিত করে। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলেন তিনি। তিনি বুঝতে পারছেন জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি পৌঁছেছেন, ইচ্ছা না থাকলেও লাস্ট সিনে প্লে করতে হবেই-মৃত্যুর হাতছানি উপেক্ষা করতে পারে না কেউই। নেশাচ্ছন্নতা তাঁর ভিতর এক দার্শনিক উপলব্ধি গড়ে তোলে। এ কারণেই আপন মনে তিনি নিজের জীবনের শূন্যতার মুখোমুখি হন।


৩. 'আমি লাস্ট সিনে প্লে করব না ভাই, আমাকে ছেড়ে দিন' কে, কখন এই স্বগতোক্তিটি করেন? উদ্ধৃতাংশটির মধ্য দিয়ে তাঁর যে মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে তাঁর পরিচয় দাও। 

উত্তরঃ বক্তা ও সময়: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রৌঢ় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় গভীর রাতে নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় অন্ধকারাবৃত নির্জন মঞ্চে উপস্থিত হন। তিনি বেশ কয়েকবার দারোয়ান রামব্রীজের নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু তাঁর কোনো সাড়া পেলেন না। কেবল নিজের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল তাঁর কাছে। ভয় হতে লাগল তাঁর। তিনি বুঝতে পারছেন চুলে কলপ লাগিয়ে যুবকদের মতো ঢং ঢাং করে বেড়ালেও জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি পৌঁছেছেন, ইচ্ছা না থাকলেও মৃত্যুর হাতছানি উপেক্ষা করতে পারবেন না। তখন তিনি এই স্বগতোক্তি করেন।


বন্ধুার মনোভাবঃ পেশাদার রঙ্গমঞ্চের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হলেন রজনীকান্ত বাবু। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিনয় জীবনে তাঁর প্রাপ্তির ভাঁড়ার বেশ পূর্ণ। নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় গভীর রাতে অনধকার প্রেক্ষাগৃহের শূন্য মঞ্চে নিজের আত্মসত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি নিজের প্রকৃত অবস্থার বিচার করতে থাকেন। তিনি মদ্যপায়ী, বৃদ্ধ বয়সে অতিরিক্ত মদ্যপানের পরিণতি কী হতে পারে তা তিনি জানেন। তিনি যে বৃদ্ধ হয়েছেন সেই সত্য অকপটে স্বীকার করতে এতটুকু কুণ্ঠিত নন তিনি-"কত বুড়ো হয়েছেন ভাবুন দিকিনি।" একাকিত্বকে চাপা দিতে জোর করে চুলে কলপ লাগিয়ে যুবকদের মতো ঢং ঢাং করলেও জীবন সায়াহ্নের ছোঁয়াচ এড়াতে পারবেন না তিনি। সকলের মতই জীবনের শেষ দৃশ্যে তাঁকে অভিনয় করতেই হবে।

৪. 'সেই রাত্রেই জীবনে প্রথম মোক্ষম বুঝলুম'-বক্তা কী বুঝেছিলেন? কারা কী ধরনের মিথ্যে ও বাজে কথা বলে? বক্তার এরূপ উপলব্ধির প্রেক্ষাপট আলোচনা করো। ২+৩

উত্তর: বক্তার উপলব্ধি: খ্যাতনামা অভিনেতা ও নাট্যকার অজিতেশ

বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকের মূল চরিত্র, অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁর জীবনের বিশেষ এক বিষাদময় অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন, যারা নাট্যাভিনয়কে পবিত্র শিল্প বলে থাকে, তারা কেউ সত্য কথা বলে না, মিথ্যে বলে, বাজে কথা বলে। বক্তার কাছে তারা একেকজন গাধা।


বক্তার এরূপ উপলব্ধির কারণঃ দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর পেশাদার রঙ্গমঞ্চের একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে আটষট্টি বছরের বৃদ্ধ রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নানা রকম অভিজ্ঞতায় জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝেছেন, চিনতে পেরেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন, অভিনেতাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা অন্তরের নয়, বাইরের। অভিনেতাদের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে মানুষ অবসর যাপনের জন্য থিয়েটার দেখতে আসেন। তাদেরকে খুশি করাই অভিনেতাদের কাজ। তারা যেন একেকটা জোকার, ক্লাউন বা ভাঁড়। মঞ্চে তাদের কার্যকলাপে মানুষ আনন্দ পেলেও বাস্তব জীবনে এদেরকে অস্পৃশ্য বলেই মনে করেন। যৌবনে রজনীকান্ত বাবু এরকম এক রূঢ় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। যুবক রজনীকান্তের অভিনীত আলমগিরের অভিনয় দেখে জনৈকা তন্বী তাঁর প্রেমে পড়ে যায়। কিছুদিন মেলামেশার পর রজনীকান্ত তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে মেয়েটি বিয়ের পূর্ব শর্ত হিসেবে তাঁকে থিয়েটার ছাড়তে বলে। রজনীকান্তবাবুর সারা জীবনের একাকিত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই বৃঢ় অভিজ্ঞতা।


৫. 'ওথেলোর সেই কথাগুলো মনে আছে তোমার।'- ওথেলোর পরিচয় দাও। বস্তা ওথেলোর যে কথাগুলি উদ্ধৃত করেছেন তা নিজের ভাষায় লেখো। ২+৩

উত্তর: ওথেলোর পরিচয়ঃ উইলিয়াম শেকসপিয়রের একটি বিখ্যাত বিয়োগান্তক নাটক হল 'ওথেলো'। ভেনিসের একজন মুরিশ সামরিক কমান্ডার ওথেলোকে নিয়ে লেখা এই নাটক। ওথেলো তাঁর লেফটেনেন্ট ইয়াগোর চক্রান্তে প্রতারিত হয়ে তাঁর স্ত্রী ডেসডেমোনাকে সন্দেহ করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত ওথেলো ডেসডেমোনাকে হত্যা করেন এবং পরে নিজের জীবনও শেষ করে দেন।


ওথেলোর কথা: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের একেবারে শেষ পর্যায়ে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় শেকসপিয়র রচিত 'ওথেলো' নাটকের এক বিশেষ মুহূর্তে ওথেলোর স্বগতোক্তি উল্লেখ করেছেন। ওথেলোর প্রতি হিংসা ও ক্রোধবশত ইয়াগো ওথেলোর মধ্যে তাঁর প্রেমিকা ও স্ত্রী ডেসডিমোনার প্রতি সন্দেহ দৃঢ়মূল করতে পেরেছিল। ওথেলো বিশ্বাস করেছিল, ডেসডিমোনা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত নয়, সে তাকে ভালোবাসে না। ওথেলোর অশান্ত মনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তাঁর সংলাপে, যেখানে তিনি বলেছেন যে তিনি চিরতরে বিদায় নিচ্ছেন। তাঁর মন শান্ত, তৃপ্ত যা উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে মহৎ করে তোলে সেই মহাযুদ্ধ ও শোভিত সৈন্যদলকে হ্রেষাধ্বনি করা অশ্ব, তীক্ষ্ণ তুর্যধ্বনি, প্রেরণাদায়ী ঢাকের শব্দকে বিদায় জানিয়েছেন। তিনি তাঁর সমগ্র রাজকীয় পরিচয়, গৌরব জাঁকজমক, তাঁর সকল অবস্থা ও সব গৌরবময় যুদ্ধগুলিকে বিদায় জানিয়েছেন।

৬. 'আপনার মনে পড়ছে না আপনার বাড়ি কোথায়?' শ্রোতা যে উত্তর -কে, কাকে, কখন এই উক্তিটি করেন? দিয়েছিলেন তাঁর মর্মার্থ ব্যাখ্যা করো। ৩+২

উত্তর: বক্তা, উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ও সময়: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রম্পটার চরিত্র কালীনাথ সেন এই নাটকের মুখ্য চরিত্র আটষট্টি বছরের প্রৌঢ় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে এই উক্তিটি করেন।


নেশাচ্ছন্ন রজনীবাবু মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে তিনি উপলব্ধি করেন নিবিড় অন্ধকার রঙ্গমঞ্চে তিনি একা। একটি জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে বার কয়েক দারোয়ান রামব্রীজের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকেন, কিন্তু কোনো সাড়া পান না, বরং তাঁর কণ্ঠস্বরই প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে তাঁর কাছে।


বাড়ি যাওয়ার জন্য উইংসের দিকে এগোলে বৃদ্ধ প্রম্পটার কালীনাথের মুখোমুখি হন তিনি। কালীনাথ সেন তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাইলে রজনীবাবু তাঁর বাড়ির অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। তখন কালীনাথ সেন এই উক্তিটি করেন।


রজনীবাবুর উত্তরের মর্মার্থ : কালিনাথের প্রশ্নের উত্তরে রজনীবাবু জানান, বাড়ির কথা মনে আছে তাঁর। কিন্তু বাড়ি যেতে তাঁর একেবারেই ভালো লাগে না। তাঁর আপনজন কেউ নেই, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, সঙ্গী-সাথি কেউ নেই তাঁর। এই পৃথিবীতে তিনি একা। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর অভিনয় জীবনে একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে দর্শকের অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। কিন্তু মঞ্চের বাইরে তাঁর যে সত্যিকারের জীবন, সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ। তিনি কোথায় থাকেন, কী অবস্থায় থাকেন সেই খোঁজটুকুও কেউ নেয় না। রজনীবাবুর এই উক্তিতে একজন নিঃসঙ্গ মানুষের হাহাকার প্রকাশ পেয়েছে।


৭. 'ধু ধু করা দুপুরে জ্বলন্ত মাঠে বাতাস যেমন একা- যেমন সঙ্গীহীন-তেমনি।"-কে, কাকে এই কথাগুলি বলেছেন? তাঁর এরূপ উক্তির কারণ বিশ্লেষণ করো। ২+৩

উত্তর: বক্তা ও শ্রোতা: প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র আটষট্টি বছরের প্রৌঢ় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় প্রম্পটার কালীনাথ সেনকে আলোচ্য কথাগুলি বলেছেন।


প্রসঙ্গ : পেশাদারি রঙ্গমঞ্চের একজন সফল অভিনেতা হওয়ার সত্ত্বেও রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত জীবনে একেবারেই নিঃসঙ্গ। মঞ্চে অভিনয় চলাকালীন মানুষের করতালি আর প্রশংসা উপভোগ করলেও রজনীবাবু জানেন, মঞ্চের বাইরের আসল জীবনে তিনি সম্পূর্ণ একা।


কেউ তাঁর খোঁজ রাখে না কেউ, কেউ তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে না। তাঁর স্ত্রী নেই, ছেলে-মেয়ে - সঙ্গী-সাথি কেউ নেই। আদর করে তাঁর সঙ্গে দুটো কথা বলবে, মরার সময় তাঁর মুখে দু-ফোঁটা জল দেবে এমন কেউ নেই তাঁর। এক গভীর অন্তর্বেদনা তাঁকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে।


প্রখর মধ্যাহ্নের তপ্ত রোদে জ্বলন্ত মাঠে বাতাস যেমন সমস্ত কষ্টকে বুকে চেপে একাকী প্রবাহিত হয়, রজনীবাবুকেও তেমনি একাকিত্বের যন্ত্রণাকে আপন অন্তরে স্থাপন করে একাকী চলতে হয় জীবনের পথে। তিনি বেশ উপলব্ধি করেন, জীবনের বর্ণময় অধ্যায়গুলি একে একে নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। যে-কোনো সময়ে শেষদৃশ্যে অভিনয় তাঁকে করতেই হবে।

৮. 'পুরোনো দিনের কথা ভুলে যান চাটুজ্জেমশাই'- কে, কার উদ্দেশ্যে এই উক্তিটি করেছেন? তিনি 'পুরোনো দিনের কথা' ভুলে যেতে বলেছেন কেন? ২+৩

উত্তর: বক্তা ও শ্রোতা : অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন' নাটকের আলোচ্য অংশটির বক্তা হলেন প্রম্পটার কালীনাথ সেন। তিনি 'চাটুজ্জেমশাই' অর্থাৎ, আটষট্টি বছরের বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে এই উক্তিটি করেছেন।


উক্তিটির কারণ: রজনীবাবু দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর থিয়েটারে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। এই দীর্ঘজীবন থিয়েটার ও দর্শক সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। কোনো এক গভীর রাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রেক্ষাগৃহের নিস্তব্ধ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি শোনাচ্ছিলেন প্রম্পটার কালীনাথ সেনকে। থিয়েটারকে জীবনের অঙ্গ করে নিতে চেয়ে তিনি পুলিশ ইনস্পেকটরের নিশ্চিত নিরাপদ আর্থিক জীবন ত্যাগ করেন। তাঁর অভিনয় নৈপুণ্য মানুষকে মুগ্ধ করলেও তিনি নিঃসঙ্গ। অভিনেতার সত্যিকারের কোনো সামাজিক সম্মান নেই। তাই যাঁরা নাট্যাভিনয়কে পবিত্র শিল্প বলেন, রজনীবাবুর মতে 'তারা সব গাধা-গাধা। তাঁরা সব মিথ্যে কথা-বাজে কথা বলে।' এরপর বয়স বাড়তে থাকলে রজনীবাবু বেশ বুঝতে পারেন ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিভার মৃত্যু ঘটছে।


কিন্তু কালীনাথ সেন প্রতিটা মুহূর্তে রজনীবাবুর অভিনয় দেখেন। তিনি জানেন রজনীবাবুর প্রতিভা এখনও অটুট। তিনি অদৃষ্টবাদী। তাই তিনি অদৃষ্টের হাতে জীবনকে সঁপে দিয়ে রজনীবাবুকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছেন।


৯. 'নানা রঙের দিন' নাটকে প্রম্পটার কালীনাথ সেনের উপস্থিতি নাটকটিকে কীভাবে গতি দান করেছে তা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দাও।


অথবা, কালীনাথ সেনের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।


উত্তরঃ প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নানা রঙের দিন 'নাটকের কালীনাথ সেন একজন প্রম্পটার। নাটকটি জুড়ে তিনি উপস্থিত থাকলেও তাঁর সংলাপ খুবই কম। তবু তাঁর মধ্য দিয়েই তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ পায়।


দায়িত্বশীলতাঃ কালীনাথ সেন একজন দায়িত্বশীল প্রম্পটার। প্রতিটি নাটকের খুঁটিনাটি তাঁর নখদর্পণে। প্রতিটি চরিত্রের সংলাপ তাঁর কণ্ঠস্থ। তাই রজনীবাবু আদেশ করার সঙ্গে সলো তিনি 'সাহাজান' নাটকে মোহম্মদের সংলাপগুলি উচ্চারণ করে রজনীবাবুকে ঔরঙ্গজেবের সংলাপ বলতে সাহায্য করেন।


আবেগপ্ৰৰণঃ কালীনাথ সেন খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। রজনীকান্তবাবুর একাকিত্ব তাঁকেও স্পর্শ করে যায়। রজনীকান্তবাবুর দীর্ঘশ্বাসে তাঁর চোখেও জল আসে। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের নিস্তব্ধ মঞ্চে রজনীকান্তবাবুর সংলাপ শুনে আপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, 'আপনার প্রতিভা এখনও মরেনি চাটুজ্জেমশাই। ঠিক পুরোনো দিনের মতোই আছেন আপনি।


দারিদ্র্যঃ নিদারুণ দারিদ্র্য কালীনাথের নিত্যসঙ্গী। দারিদ্র্য এমনই যে তাঁর নিজের থাকার মতে সামান্য ঘরটুকু নেই। তাই তিনি থিয়েটার হলের গ্রিনরুমে সকলের অলক্ষে রাত্রিযাপন করেন।

নিরাপত্তাহীনতা। চাকরির নিরাপত্তাহীনতায় কালীনাথ সেন


সবসময় আতঙ্কিতঃ একারণেই থিয়েটার হলে তাঁর রাঙ কাটানোর খবর হলের মালিককে না জানানোর কাতর অনুরোধ করেন রজনীকান্তবাবুকে।


কালীনাথ সেন এই নাটকে হতাশাগ্রস্ত, সুরাচ্ছন্ন বৃদ্ধ অভিনেতার একাকিত্বে সঙ্গাদান করেছেন। নাটকটিতে রজনীকান্তের আত্মবিকাশে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

১০. 'জানো কালীনাথ, একটি মেয়ে...'- মেয়েটির পরিচয় দাও। বস্তার জীবনে মেয়েটির প্রভাব আলোচনা করো। ২+৩

উত্তর: মেয়েটির পরিচয়ঃ নট, নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকের মূল চরিত্র রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের যৌবনে প্রেম এসেছিল। তাঁর আলমগিরের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে এক অভিজাত তন্বী তাঁর সঙ্গে আলাপ জমায়। সেই আলাপ থেকে ঘনিষ্ঠতা এবং ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে প্রেম। লম্বা, ফরসা, ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি ছিল বেশ সুন্দরী। আর মনটাও ছিল খুব ভালো, কোনো ঘোরপ্যাঁচ ছিল না। রজনীবাবুর জীবনের একটা ক্ষুদ্র সময়ে মেয়েটি ঝড় তুলে দিয়েছিল।


বন্ধুার জীবনে মেয়েটির প্রস্তাব: রজনীবাবুর জীবনের বাকি অধ্যায়গুলি সেই মেয়েটি যেন স্থির করে দিয়ে গেল। মেয়েটির গভীর টানাটানা কালো চোখ, অদ্ভুত হাসি, তাঁর ঢেউ খেলানো রাশিরাশি কালো চুলের মাদকতায় রজনীবাবুর যৌবন পরিপূর্ণতার আস্বাদ লাভ করে। তাঁর দিকে মেয়েটি এমন অদ্ভুত ভাবে চেয়ে থাকত যার স্মৃতি আটষট্টি বছরেও রজনীবাবুর মানসপটে অমলিন। অল্প সময়ের সেই ভালোবাসা তিনি ভুলতে পারেন না 'মরে যাব তবু ভুলব না, তাঁর সেই আশ্চর্য ভালোবাসা।'


যৌবনের প্রাণশক্তিতে উদ্দীপ্ত রজনীবাবু উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। অফুরন্ত আত্মবিশ্বাস তাঁর। কিছুদিন মেলামেশার পর তিনি মেয়েটিকে বিবাহের প্রস্তাব দেন, মেয়েটির বাবার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু মেয়েটির প্রতিক্রিয়া তাঁর সমস্ত বিশ্বাস, মানুষের প্রতি তাঁর সমস্ত আস্যাকে এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দেয়। বিয়ের আগে মেয়েটি রজনীবাবুকে থিয়েটার ছেড়ে দেওয়ার শর্ত আরোপ করে। অভিনয় অন্ত প্রাণ রজনীবাবুর পক্ষে এই শর্ত মানা সম্ভব ছিল না। তাই সেখানেই সেই সম্পর্কের ইতি পড়ে যায়। আর সমস্ত জীবন একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রজনীবাবুকে চলতে হয়।