শিখন
1. শিখন ও পরিণমনের মধ্যে সম্পর্ক কীরূপ? শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের ভূমিকা আলোচনা করো। [WBCHSE '16]
উত্তব়ঃ শিখন ও পরিণমনের সম্পর্ক:
(1) পারস্পরিক সম্পর্কঃ শিখন ও পরিণমন দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। পরিণমনের অর্থ স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ, যা শিখনের উপর নির্ভর করে না, কিন্তু শিখন পরিণমনের উপর নির্ভরশীল। শিখন তখনই হয়, যখন পরিণমনের উপযোগী বয়সে শিশু পৌঁছোয়।
[2] বিকাশমূলক প্রক্রিয়া: পরিণমন ও শিখন উভয়ই বিকাশমূলক প্রক্রিয়া। পরিণমন শিখন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, কিন্তু শিখন পরিণমন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে শিশুর বিকাশে সহায়তা করে।
(3) শিক্ষাবিদদের সতামতঃ শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুর শিক্ষাদানে নতুন শিখনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিণমনের দরকার।
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের ভূমিকা:
(1) দৈহিক ও মানসিক প্রক্রিয়াঃ শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশের দ্বারা তার পরিণমনের প্রকাশ ঘটে। এর ফলে শিশুর ভাষার বিকাশ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ঘটে। শিশু পাঠগ্রহণে সক্ষম হয়।
(2) শিখানর গতি ও সীমা নির্ধারণ: শিখনের গতি ও সীমা নির্ধারণে পরিণমনের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। নির্দিষ্ট পরিণমনের পর শিশুর শিখন শুরু হয় এবং তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতে থাকে। পরিণমনই ঠিক করে দেয় কোন্ সময়ে কোন্ ধরনের শিখন সার্থক ও সফল হবে।
(3) ভাষাবিকাশঃ শিক্ষার্থীর ভাষাবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পরিণমন। উপযুক্ত পরিণমন ছাড়া কখনোই শিক্ষার্থীর ভাষাবিকাশ সম্ভব নয়।
(4) জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কার্মন্দ্রিয়ের সমন্বয়ঃ শিক্ষার্থীর সার্থক বিকাশের উপর নির্ভর করে জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়ের সমন্বয়সাধন, যা শিক্ষার্থীকে যে-কোনো বিষয় শিখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
(5) পরিণমানর ধরন নির্ধারণঃ অনেকক্ষেত্রে শিখন পরিণমনের ধরন নির্ধারণ করে। যেমন- কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাঠ্যের বিষয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে শিশুদের ইন্দ্রিয়সমূহকে পরিমার্জনের শিক্ষা দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে পরিণমন শিখন দ্বারা নির্ধারিত হয়।
(6) জীবনবিকাশঃ শিক্ষার্থীদের জীবনবিকাশে শিখন গুরুত্বপূর্ণ। আর শিখনকে ফলপ্রসূ করতে পরিণমনের বিকাশ আবশ্যক।
(7) পরিকল্পনামাফিক পাঠ ও শিক্ষা পরিকল্পনাঃ সঠিক পরিণমন না হলে শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণে সমস্যা হয়। তাই উপযুক্ত পরিণমনের উপর নির্ভর করে পাঠক্রম রচনা ও শিক্ষা পরিকল্পনা করা হয়।
(৪) পরিণमনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা: শৈশব, বয়ঃসন্ধি এইসব পর্যায়ে সঠিক পাঠক্রম রচনার জন্য পরিণমনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন।
2. স্মৃতি বলতে কী বোঝো? স্মৃতির চারটি স্তরের বর্ণনা করো।
উত্তব়ঃ স্মৃতি: "পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়। ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।”
চোখের দেখা, আমাদের জানা পুরানো জিনিসকে আমাদের মনের ঝুলি থেকে বের করে আনতে পারাই হল না ভোলা তথা স্মৃতি। অর্থাৎ অতীত বিষয়কে মনে করতে পারা। মনোবিদ Woodworth-এর মতে, অতীতে শেখা কোনো কাজকে অনুরূপভাবে সমাধান করতে পারার প্রক্রিয়াই হল স্মৃতি।
স্মৃতি বলতে জীবের তথ্য অর্জন, সঞ্চয়, ধরে রাখা এবং প্রয়োজনে পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতাকে বোঝায়।
স্মৃতির পর্যায়: স্মৃতির পর্যায়গুলি হল— শিখন (Learning), সংরক্ষণ (Retention) এবং পুনরুত্থাপন (Reproduction)।
(1) শিখন (Learning): স্মরণের প্রথম স্তর হল শিখন। কোনো বিষয় বা বস্তু স্মরণ করতে হলে প্রথমে তার শিখন হওয়া প্রয়োজন। এই শিখন হল পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আচরণধারার পরিবর্তন। আর এই অভিজ্ঞতাকে মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে হলে তাকে বারবার উপস্থাপন করতে হয় এবং প্রত্যেক উপস্থাপনে অভিজ্ঞতাটি একটু একটু করে সংরক্ষিত হয়। এইভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটলে একসময় সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটি মনে স্থান পায়। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উপস্থাপনের শিখনের পরিমাপকে ছক কাগজে স্থাপন করলে যে লেখচিত্র পাওয়া যায়, তাকে শিখনের লেখচিত্র বলে।
স্মৃতির স্তর
প্রত্যক্ষ পুনরুদ্রেক
পরোক্ষ পুনরুদ্রেক
শিখন
ধারণ
পুনরুত্থাপন
পুনরুদ্রেক
প্রত্যভিজ্ঞা
(2) সংরক্ষণ (Retention): স্মরণের দ্বিতীয় স্তর হল সংরক্ষণ বা ধারণ। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যার দ্বারা মনের নানাপ্রকার অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিবর্তিত হয়। বাস্তবে মানুষ শিখন প্রচেষ্টার দ্বারা যে-সমস্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করে, নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অনেকাংশই তা স্মৃতি থেকে মুছে যায়। কিছু অংশ স্মৃতিতে থেকে যায়- যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সংরক্ষণ বলে।
(3) পুনরুত্থাপন (Reproduction): অর্জিত অভিজ্ঞতাকে বা সংরক্ষিত ধারণাকে পুনরায় স্মরণের মাধ্যমে উপস্থাপনকে বলে পুনরুত্থাপন। এটি দু-প্রকার- পুনরুদ্রেক ও প্রত্যভিজ্ঞা।
পুনরুদ্রেক (Recall): স্মরণের তৃতীয় স্তর হল পুনরুদ্রেক। এর অর্থ হল মনে করা। সংরক্ষণের ভান্ডার থেকে শিখনলব্ধ অভিজ্ঞতাকে সক্রিয় চেতন - মনে পুনরুত্থাপিত করার প্রক্রিয়াই হল পুনরুদ্রেক।এটি দু-প্রকার, যথাক্রমে- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পুনরুদ্রেক। পুনরুদ্রেক প্রক্রিয়ার তিনটি সূত্র হল–
1. সান্নিধ্যের সূত্র: পুনরুদ্রেকের ক্ষেত্রে যখন একটি ঘটনা অপর একটি ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় তখন তাকে সান্নিধ্যের সূত্র বলে।
2. সাদৃশ্যের সূত্র: দুটি বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্য থাকলে প্রথম বিষয়টি মনে পড়তেই দ্বিতীয় বিষয়টিও সহজে মনে পড়ে যায়।
3. বৈসাদৃশ্যের সূত্র: এক্ষেত্রে অনেকসময় দুটি বিষয়ের মধ্যে অমিল থাকলেও তা সহজেই মনে পড়ে।
প্রভাতিজ্ঞা (Recognition): স্মরণের সর্বশেষ স্তর হল প্রত্যভিজ্ঞা। প্রত্যভিজ্ঞা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্রেকের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যভিজ্ঞা কথার অর্থ হল চিনে নেওয়া। পূর্বে প্রত্যক্ষণ করা কোনো অভিজ্ঞতাকে বর্তমানে চিনে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে প্রত্যভিজ্ঞা। এটি ছাড়া স্মবণক্রিয়া অসফল হয়।
3. প্রাচীন অনুবর্তন কাকে বলে? অথবা, প্রাচীন অনুবর্তনের ধারণাটি ব্যাখ্যা করো। প্রাচীন অনুবর্তন সংক্রান্ত প্যাভলভের পরীক্ষাটি বর্ণনা করো।
উত্তব়ঃ প্রাচীন অনুবর্তন: রাশিয়ান শারীরতত্ত্ববিদ আইভান প্যাভলভের (Ivan Pavlov) মতানুযায়ী প্রাণীর স্বাভাবিক উদ্দীপকের উপস্থিতিতে বা কৃত্রিম উদ্দীপকের দ্বারা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে প্রাচীন অনুবর্তন বলে।
প্যাডলডের পরীক্ষা: প্রাচীন অনুবর্তনের পরীক্ষাটি করার আগে প্যাভলভ একটি কুকুরকে কয়েক সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দেন। পরীক্ষাটি করার সময় ওই ক্ষুধার্ত কুকুরটির সামনে কিছু খাবার রেখে প্যাভলভ দেখেন কুকুরটির লালাক্ষরণ হচ্ছে। এখানে খাদ্যবস্তুটি হল স্বাভাবিক উদ্দীপক আর লালাক্ষরণ হল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এরপর প্রতিদিন প্যাভলভখাদ্যবস্তু উপস্থাপনের পূর্বে কিছু সময় ধরে ঘণ্টাধ্বনি করেন এবং শেষ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে খাদ্যবস্তু উপস্থাপন করেন। এখানে ঘণ্টাধ্বনি কৃত্রিম উদ্দীপক।
প্রথম দিকে দেখা যায় ঘণ্টাধ্বনি কুকুরটিকে সজাগ করছে। এই সজাগভাবটি হল ঘণ্টাধ্বনির প্রতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্যাভলভ আরও দেখেন ঘণ্টাধ্বনি শেষ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে খাদ্যবস্তু দেওয়ার ফলে কুকুরের লালাক্ষরণ হচ্ছে। এই লালাক্ষরণের পরিমাণটি প্যাভলভ কাইমোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করেন। এই ঘটনাটির পুনরাবৃত্তির ফলে খাদ্যবস্তু উপস্থাপনের পূর্বে ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটির লালাক্ষরণ হতে দেখা যায়।
সিদ্ধান্ত: এ থেকে প্যাভলভ সিদ্ধান্ত নেন যে স্বাভাবিক উদ্দীপক (S₁) খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে ঘণ্টাধ্বনিরূপ কৃত্রিম উদ্দীপকের (S2) দ্বারা স্বাভাবিক ঘণ্টাধ্বনিকে অনুবর্তিত প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ লালাক্ষরণ ঘটেছে। এই কৃত্রিম উদ্দীপকের দ্বারা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিকেই প্যাভলভ অনুবর্তন বলেছেন এবং ঘণ্টাধ্বনিকে অনুবর্তিত উদ্দীপক ও লালাক্ষরণকে অনুবর্তিত প্রতিক্রিয়া বলেছেন। অন্যদিকে খাদ্যবস্তু হল অনাবর্তিত উদ্দীপক আর সজাগভাব হল অনাবর্তিত প্রতিক্রিয়া।
প্রাচীন অনুবর্তন কৌশলের সাংগঠনিক রূপটি নিম্নরূপ—
ঘণ্টাধ্বনি (S₁) সজাগভাব (R₁)
খাদ্যবস্তু (S2) লালাক্ষরণ (R₂)
4. থর্নডাইকের শিখনের সূত্রগুলিকে কয়টি ভাগে মুখ্য সূত্রগুলি লেখো। ভাগ করা যায় ও কী কী? থর্নডাইকের শিখনের সূত্রগুলি লেখো।
উত্তরঃ আমেরিকান মনোবিদ এডওয়ার্ড লি থর্নডাইক (Edward Lee Thorndike) তাঁর শিখনের সূত্রগুলিকে 3 টি মুখ্য সূত্র ও 5 টি গৌণ সূত্রে ভাগ করেছেন। সূত্রগুলি হল–
থর্নডাইকের শিখনের সূত্র
মুখ্য সূত্র
① প্রস্তুতির সূত্র
② অনুশীলনের সূত্র
③ ফললাভের সূত্র
গৌণ সূত্র
① মানসিক প্রস্তুতির সূত্র
② বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার সূত্র
ও আংশিক প্রতিক্রিয়ার সূত্র
④ উপমানের সূত্র
⑤ অনুষঙ্গমূলক সঞ্চালনের সূত্র
থর্নডাইকের শিখনের মুখ্য সূত্র:
[1] প্রস্তুতির সূত্র (Law of Readiness): থর্নডাইক শিখনের মুখ্য সূত্রে দৈহিক প্রস্তুতির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, উদ্দীপক ও তার উপযোগী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগস্থাপনের জন্য ব্যক্তির দৈহিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। সংযোগস্থাপনের জন্য যদি ব্যক্তি প্রস্তুত থাকে, তাহলে সংযোগস্থাপন করতে দিলে সে তৃপ্তিবোধ করবে। ব্যক্তির যদি প্রস্তুতি না থাকে, সেক্ষেত্রে জোর করে সংযোগস্থাপন করতে দিলে সে বিরক্তিবোধ করবে।
[2] অনুশীলনের সূত্র (Law of Exercise):
থর্নডাইক উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগস্থাপনের জন্য বারবার অনুশীলন বা চর্চার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অনুশীলনের সূত্রকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়— (i) ব্যবহারের সূত্র (ii) অব্যবহারের সূত্র।
(i) ব্যাবহারের সূত্র (Law of use)): ব্যবহারের সূত্রে বলা হয়েছে, যখন সবকিছুই ঠিক থাকে, উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার সংযোগস্থাপনের পর যদি বারবার অনুশীলন করা হয়, তখন সংযোগের শক্তি বাড়বে এবং শিখন শক্তিশালী হবে।
(ii) অব্যবহারের সূত্র (Law of Disuse): অব্যবহারের সূত্রে বলা হয়েছে, যখন উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সাফল্যের সঙ্গে সংযোগস্থাপনের পর যদি দীর্ঘদিন অনুশীলন না করা হয়, তখন সেই সংযোগের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
[3] ফললাভের সূত্র (Law of Effect): উদ্দীপক (S) ও প্রতিক্রিয়া (R)-র সংশোধনযোগ্য সংযোগের ফল যদি শিক্ষার্থীর কাছে সুখকর বা আনন্দদায়ক হয়, তবে সংযোগটি শক্তিশালী হয় অর্থাৎ S-R বন্ধন দৃঢ় হয়। অপরপক্ষে সংযোগের ফল যদি অতৃপ্তিকর বা বিরক্তিকর হয়, তবে সংযোগটি (S-R বন্ধন) দুর্বল হয়।
5. ব্রুুনারের (Bruner's) বৌদ্ধিক বিকাশ তত্ত্বটি আলোচনা করো।
উত্তরঃ আমেরিকার প্রজ্ঞাবাদী মনোবিদ জেরোম সাইমোর ব্রুনারের জন্ম 1915 সালে আর তাঁর মৃত্যু হয় 2016 সালে। ব্রুনার উদ্ভাবনমূলক শিখনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ব্রুনার তাঁর
Process of Education, Towards a theory of Instruction, The Relevance of Education-এই তিনটি গ্রন্থে উদ্ভাবনীমূলক শিখনের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। ব্রুনারের মতে, প্রত্যেকটি বিষয়ের কেন্দ্রে একটি ধারণা আছে। যা বাক্যে, চিত্রে বা সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। এটিকেই বলা হয় মূল ধারণা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মনস্তত্ত্বে উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার বন্ধন ধারণা, জ্যামিতিতে ত্রিভুজের তিনটি কোণ দুই সমকোণের সমান, পাটিগণিতে ঐকিক নিয়ম-এ সবই মূল ধরাণা।
তিনি মূলত মানসিক ক্ষমতাগুলির বিকাশগত দিক নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। মনোবিজ্ঞানকে তিনি সমন্বয়ধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখেছেন। অর্থাৎ সমস্ত দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্বগুলি থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে তিনি তার বক্তব্য রেখেছেন। তিনি শিক্ষার্থীকে প্রতিক্রিয়াসম্পন্ন একটি জীব হিসেবে বিবেচনা করেছেন যে, শিখনের জন্য তথ্যকে সক্রিয়ভাবে নির্বাচন করে, ধরে রেখে বা পরিবর্তন করে যে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা যায়, এই লক্ষ্যই তাকে শিখনে সাহায্য করে।
ব্রুুনারের তত্ত্বের পর্যায়: বুনার তিনটি পর্যায় বা তন্ত্র বা System-এর মাধ্যমে শিক্ষার লক্ষ্য স্থির করেছেন। যথা—
[1] সক্রিয়ভাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব বা Enactive Representation: মনোবিদ পিয়াজে যে বৌদ্ধিক
বিকাশকে সঞ্চালনমূলক স্তরে শিশুর অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাকেই ব্রুনার সক্রিয়তাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রত্যেক শিশু সঞ্চালনমূলক প্রতিক্রিয়া (Sensori-motor activity) করে। যেমন- শিশু সরীসৃপ প্রাণী দেখে, পরে সেটিকে বোঝানোর জন্য নিজের হাতকে এঁকে-বেঁকে দেখায়। হাতের নাড়াচাড়ায় দৈহিক
সক্রিয়তাভিত্তিক সংকেতের মাধ্যমে বিষয়টি স্থায়ী স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়।
শৈশবকালের শিখন এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত তিন বছর পর্যন্ত শিশুরা এইভাবে শিখন প্রাপ্ত হয় নিজে নিজেই। বিভিন্ন দ্রব্য দিয়ে নাড়াচাড়া করে শিশুরা নিজে নিজে সক্রিয়তার মাধ্যমে শেখে। এইরকম শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়-শিক্ষক-পুস্তক প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থী হাতে-কলমে কাজ করে সক্রিয় থেকে জ্ঞান অর্জন করে।
[2] আইকনিক প্রতিনিধিত্ব বা Iconic Representation: আইকনিক প্রতিনিধিত্ব বলতে কল্পের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার সাংকেতিককরণকে বোঝায়। Bruner বলেছেন- "The Course of cognitive of growth American Psychologist." একজন শিল্পী যেমন তাঁর ছবিতে বিশেষ বস্তু বা ঘটনার নির্বাচিত মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটিয়ে তোলেন তেমনই, কোনো বস্তু বা ঘটনার কল্পও সেই বস্তু বা ঘটনার বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে, কোনো বস্তুগত বা বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলে, তার কল্পকে সহজে চেনা যায়। এই জাতীয় কল্পের মাধ্যমে শিশু তার বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলি সংরক্ষণ করতে পারে। শৈশবের পর প্রাক্-বাল্যকালের যে বয়সকাল অর্থাৎ তিনের পর থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় এই পর্যায়ভুক্ত। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিষয়ের মূর্ত রূপের মাধ্যমে শেখে।
[3] সাংকেতিক প্রতিনিধিত্ব বা Symbolic Representation: সাংকেতিককরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বস্তুর সম্পর্ক থাকে। সক্রিয়তাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব সবসময় বাস্তব বস্তুর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, ব্রুনারের মতে, সাংকেতিক প্রতিনিধিত্ব মূলত ভাষাভিত্তিক ও বিমূর্ত প্রকৃতির। যেমন-ছাতা শব্দটি তার সঙ্গে ছাতার আকৃতি বা গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ভাষা সংকেতের মাধ্যমে ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী স্মৃতিতে ধারণ করে বৌদ্ধিক সংগঠনকে দৃঢ় করতে পারে। বাল্য ও কৈশোরকালের সীমানা এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ছয় বা সাত বছর বয়স থেকে 20 বছর বয়স পর্যন্ত এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষার্থী এইসময় যুক্তি, বুদ্ধি, বিচার দিয়ে শেখে, বিমূর্ত চিন্তা করতে পারে।
মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে তিন ধরনের সাংকেতিককরণের ক্ষমতা সহাবস্থান করে। অর্থাৎ শিখনের তিন ধরনের প্রতিনিধিমূলক সাংকেতিককরণ প্রয়োজন হয় এবং অভিজ্ঞ পুনরুত্থাপনের জন্য শিক্ষার্থী প্রয়োজন অনুযায়ী যে-কোনো একটি কৌশল ব্যবহার করতে পারে। ব্রুনারের মতে, ব্যক্তির বৌদ্ধিক বিকাশ তথা শিখন কৌশল নির্ভর করে ভাষার দক্ষতা বা ক্ষমতা বিকাশের উপর। ভাষা ক্ষমতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিশু ক্রমপর্যায়ে উচ্চস্তরের প্রতিনিধিমূলক তন্ত্রকে আয়ত্ত করে।
6. স্পিয়ারম্যানের দ্বি-উপাদান তত্ত্বটি আলোচনা করো। [WBCHSE '23, '15, '08, '04, '03, '01] অথবা, বুদ্ধির যে-কোনো একটি তত্ত্ব আলোচনা করো। [WBCHSE Mock Test (Set-13)]
উত্তব়ঃ স্পিয়ারম্যানের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব : মনোবিদ স্পিয়ারম্যান 1904 সালে American Journal of Psychology-তে "General Intelligence Objectively Determined and Measured"-প্রবন্ধে তাঁর দ্বি-উপাদান তত্ত্বটি - প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন, যে-কোনো বৌদ্ধিক কাজের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন জাতীয় ক্ষমতার প্রয়োজন। সেগুলি হল— (i) সাধারণ মানসিক ক্ষমতা (G factor) এবং(ii) বিশেষ মানসিক ক্ষমতা (S factor)।
জ্যামিতিক ব্যাখ্যা: স্পিয়ারম্যানের দ্বি-উপাদান তত্ত্বটির জ্যামিতিক চিত্রের বৃত্তটিতে G হল সাধারণ উপাদান। S₁, S₂ ও S3 হল বিশেষ W₁ উপাদান। W₁, W2, W3 হল তিনটি কাজ। G₁, G2, G3 গুণগতভাবে এক কিন্তু পরিমাণগতভাবে ভিন্ন। অন্যদিকে, বিশেষ উপাদান S1, S2, S3 গুণগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ ক্ষমতাকে বলে বুদ্ধি। দুটি কাজের মধ্যে G-এর পরিমাণ যত বেশি থাকবে, ততই কাজ দুটির মধ্যে সহগতির মান বেশি হবে। জটিল কাজের জন্য সাধারণ মানসিক ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা বেশি।
শাণিতিক ব্যাখ্যা:
[1] সহগতির বিভিন্ন রূপ: স্পিয়ারম্যানের মতে, বিভিন্ন বৌদ্ধিক কাজের ক্ষেত্রে সাধারণ উপাদান ও বিশেষ উপাদানের মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কেকে তিনি নাম দেন সহগতি (Correlation), যা তিন ধরনের হয়। যথা—
i/ বন্যাত্মক সহগাজি: একটি উপাদানের পরিবর্তনের ফলে আর-একটি উপাদানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে, ধনাত্মক সহগতির সৃষ্টি হয়।
ii/ খালাত্মক সহগাতি: একটি উপাদানের পরিবর্তনের ফলে অপরটির নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে, তাকে ঋণাত্মক সহগতি বলে।
iii / শূন্য সহযাতি: কিছু বিষয় থাকে, যাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ক্ষেত্রে শূন্য সহগতি দেখা যায়।
টেট্রাড সমীকরণ: স্পিয়ারম্যান সহগতির পরিমাণকে বোঝানোর জন্য একটি সাংখ্যমান ব্যবহার করেন, যা সহগতির সহগাঙ্ক (Co-efficient of correlation) নামে পরিচিত, যা ইংরেজি 'r'-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। স্পিয়ারম্যান সহগতির সম্পর্কের দৃঢ়তাকে একটি রাশিবৈজ্ঞানিক সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
সূত্রটি হল- 'ap × 'bg - Faq x bp = 0 এখানে ৮-এর অর্থ সহগতির সহগাঙ্ক।
a-এর অর্থ Opposite বা বিপরীত।
b-এর অর্থ Discrimination বা পৃথক্করণ। p-এর অর্থ Completion বা সম্পূর্ণকরণ। ৭-এর অর্থ Cancellation বা বাতিলকরণ।
এখানে rap হল বিপরীত ও সম্পূর্ণকরণের মধ্যে সম্পর্ক, 'ba হল পৃথক্করণ এবং বাতিলকরণের মধ্যে সম্পর্ক; rag হল বিপরীত ও বাতিলকরণের মধ্যে সম্পর্ক; bp হল পৃথক্করণ এবং সম্পূর্ণকরণের মধ্যে সম্পর্ক।
স্পিয়ারম্যানের এই নিয়মকে বলে টেট্রাড সমীকরণ (Tetrad equation) এবং পার্থক্যকে বলে টেট্রাড অন্তর (Tetrad difference)।
উদাহরণ:
বৈপরীত্য (a)
.60
.50
.30.30
সম্পূর্ণতা (p)
.60
45.16.16
পার্থক্য (b)
a P m b
.30
.16
.15
.08
বর্জন (৭)
.30
.16
.15
08
rapbq-raq x bp = .60 x.08.30 x .16 = .048-.048 = 01