ডাকঘর

Chapter 7


১. "একেবারে ভয়ানক হয়ে উঠেছি আমি" কে কাকে বলেছিলেন। বক্তার এমন উক্তির কারণ কী? ২+৩

উত্তরঃ বক্তাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকে আলোচ্য উক্তিটি ঠাকুরদা করেছিলেন।


উদ্দিষ্টঃ ঠাকুরদা খানিকটা মজার সুরেই নিজের সম্পর্কে এই কথাটি বলেছিলেন অমলের পিসেমশায় মাধব দত্তকে।


কারণঃ 'ডাকঘর' নাটকে ঠাকুরদা চরিত্রটি এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি বয়সে প্রবীণ হলেও মনের দিক থেকে নবীন। ছেলেদের দলের সঙ্গে খেলে, গল্প করে তিনি এমন মাতিয়ে রাখতে পারতেন যে ছেলেরা সবাই তার ভক্ত ছিল। জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞ অথচ সংসারের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত এ ধরনের মানুষ রবি ঠাকুরের প্রায় প্রতিটি তত্ত্বনাটকেই দেখা যায়। সমাজের পাকা বুদ্ধির দল এদের মনে মনে সমীহ করলেও যারপরনাই ভয় পায়। আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করাই যাদের একমাত্র পারমার্থিক লক্ষ্য, তারা এইরকম নিঃস্বার্থ মানুষদের এড়িয়ে চলবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। ঠাকুরদার মতো মানুষ নিজের কথায়, আচরণে এমন এক মহৎ আদর্শ সৃষ্টি করেন যে ক্ষুদ্রমনা মানুষদের বিবেক জাগ্রত হওয়ার পক্ষে তা যথেষ্ট।


প্রেক্ষিতঃ ছোটো ছোটো বালকেরা ঘরে দিনরাত বন্দি থাকলে তাদের মানসিক, শারীরিক কোনও বিকাশই হয় না। ঘরের বাইরে বেড়িয়ে, পরিচিত নিরাপদ গন্ডির বাইরে গিয়ে যদি তারা বাহ্যিক পৃথিবীর সংস্পর্শে আসে তবে তারা দ্রুত পরিণত হয়ে ওঠে। ঠাকুরদা তাই খেলার ছলে বালকদের বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতেন। অমলকে কবিরাজ বাইরে বেরোতে মানা করেছিলেন। তার পিসেমশায় মাধব দত্ত অমলের শুভাকাঙ্ক্ষায় সেই নিষেধাজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। ঠাকুরদার আসার অর্থই হল অমলকে তিনি বাকি বালকদের মতো টেনে বের করবেন। তাই তাকে দেখামাত্রই মাধব দত্ত শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তড়িঘড়ি করে ঠাকুরদাকে অমলের অসুস্থতার কথা বলে কবিরাজের নির্দেশের কথাও জানান। শরতের রৌদ্র ও বাতাস থেকে বাঁচিয়ে অমলকে ঘরে রাখতে হবে জানতে পেরেই ঠাকুরদা নিজের সম্পর্কে শ্লেষ করে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেন। এর মধ্যে অবশ্য আরও একটি সংকেত নাট্যকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শরতের রৌদ্র ও বাতাস নির্মল ও আনন্দদায়ক। তা সত্ত্বেও স্বল্পজ্ঞানী কবিরাজের কাছে তা ক্ষতিকর। ঠিক তেমনই ঠাকুরদা চরিত্রটিও সর্বতোভাবে মহৎ ও মজাদার মানুষ হয়েও মাধব দত্তের মতো নির্বোধ অভিভাবকদের কাছে ভয়ানক বলেই প্রতিপন্ন হয়েছেন।


২. "পরিহাস। কিসের পরিহাস। পরিহাস করেন, এমন সাধ্য আছে ওঁর।”- কে কার সম্পর্কে এ কথা বলেছেন? এরকম কথা বলার কারণ কী? ২+৩

উত্তরঃ বক্তাঃ 'ডাকঘর' নাটকে ঠাকুরদা এই কথা বলেছেন।


উদ্দিষ্টঃ মোড়লমশায় যখন সাদা পাতা এনে অমলকে পরিহাস করে বলে, রাজা তাকে চিঠি দিয়েছে তখন সহ্যের বাঁধ ভেঙে ঠাকুরদা তার সম্পর্কে এই কথা বলেন।


মোড়লের প্রবঞ্চনা : অসুস্থ অমল অধীর আগ্রহে রাজার চিঠির জন্য অপেক্ষা করছিল। মোড়লকে সে উদ্দীপনার বশে জানিয়েছিল সে কথা। সাধারণ ঘরের এক অতি সাধারণ বালকের মুখে রাজার থেকে চিঠি পাওয়ার বাসনা শুনে খল স্বভাবের মোড়ল প্রথম থেকেই মস্করা করছিলেন। অমলের পিসেমশায়ের বাড়িতে রাজা-মহারাজা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেটিই তার ধৃষ্টতা বলে মনে হয়েছিল। অমলের সঙ্গে কথা হলে প্রতি মুহূর্তে তিনি সেই বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত অমলকে দেখেও তার বিন্দুমাত্র করুণা হয়নি। সেখানেও তিনি বিদ্রূপ করে বলে গেছেন, রাজা তাদের বাড়িতে আসবেন। এসে মুড়ি মুড়কির ভোগ খাবেন। একটি সাদা পাতা এনে রাজার চিঠির জন্য অপেক্ষমান অমলকে বলেন, তার কাছে রাজার চিঠি এসেছে। নিষ্কলুষ, সরল মনের অমল সেই কথাই বিশ্বাস করে ফেলে। সে তো জানে না প্রবঞ্চনা কাকে বলে!


এরূপ উক্তির কারণ: মোড়লের এই ধরনের শঠতা, নিষ্ঠুরতা দেখে মাধব দত্ত আর্তনাদ করে ওঠেন। অনুরোধ করেন মোড়ল যেন এই নিয়ে পরিহাস না করেন। কিন্তু ঠাকুরদার ধৈর্যের বাঁধ ইতিমধ্যেই ভেঙে গিয়েছিল। তিনিও যেন এক সদর্থক ও পবিত্র মন নিয়ে আশা করেছিলেন যে অমলের কাছে সত্যিই রাজার চিঠি এসে পৌঁছোবে। তাই স্বার্থপর পৃথিবীর সংকীর্ণচিত্ত এক মোড়লের কথা তিনি বিশ্বাস না করলেও আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করেছিলেন। একটা চূড়ান্ত ইতিবাচকতা তার চরিত্রে লক্ষ করা যায়। তাই তিনি জোরের সঙ্গে বলতে পারেন, অমলের কাছে রাজার চিঠি বাস্তবিকই আসবে। মোড়লের বিকৃত পরিহাসকেও তাই তিনি পরিহাসের পর্যায়ে না ফেলে সত্য বলে ঘোষণা করতে পারেন।


৩. "আমি যদি তোমার সঙ্গে চলে যেতে পারতুম তো যেতুম।"-কে কার সঙ্গে কোথায় চলে যেতে চেয়েছিল? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনকালে বক্তার কল্পনাশক্তির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা 'ডাকঘর' নাটক অবলম্বনে আলোচনা করো। ২+৩

উত্তর: বক্তাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'ডাকঘর' নাটকের অন্তর্গত প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতিতে অমল এক দইওয়ালার সঙ্গে অজানা-অনির্দিষ্ট পথে পাড়ি দিতে চেয়েছিল।


উদ্দিষ্টঃ 'দই দই-ভালো দই।'- দইওয়ালার এই হাঁক যেন সুদূরের হাতছানি হয়ে এসে অমলকে ঘরছাড়া করতে চেয়েছিল।


অমলের কল্পনাশক্তি: অমল বাস্তবে কোনোদিন পাঁচমুড়া পাহাড়ের তলায় শ্যামলী নদীর ধারে অবস্থিত দইওয়ালার গ্রাম দেখেনি। কিন্তু তার শিশুমন সবসময় কল্পলোকে বিচরণ করে। সেই কল্পচোখেই সে না-দেখা সব গ্রাম, পাহাড়, ঝরনা, নদী, পথ দেখতে পায়। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরোনো দিনের খুব বড়ো বড়ো গাছের তলায় দইওয়ালার গ্রাম। সেখানে পাহাড়ের গায়ে গরু চরে বেড়ায়। লাল শাড়ি পরিহিত মেয়েরা নদী থেকে জল তুলে মাথায় কলসি করে নিয়ে যায়।


দইওয়ালার প্রতিক্রিয়া: দইওয়ালা সব শুনে অবাক হয়ে জানান, সব মেয়েই যে লাল শাড়ি পরে তা নয়; কিন্তু বাকি সব বর্ণনা নির্ভুল। ফলে অমল যে কখনও তাদের গ্রামে যায়নি, এটি যেন তার অবিশ্বাস্য লাগে। অমলের সঙ্গে কথা বলেই যেন তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে দই বিক্রি করেও অপার সুখ পাওয়া যেতে পারে। অমলকে তিনি ভালোবেসে বিনামুল্যে দই খাওয়ান। আলোচ্য অংশে অমলের চমৎকার কল্পনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তবে শুধু দইওয়ালার সঙ্গে কথোপকথনকালে নয়, সমগ্র নাটকেই অমল বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের কথা শুনে বাইরের অদৃষ্টপূর্ব পৃথিবীকে কল্পনায় নিজের মতো নির্মাণ করে নিয়েছে।

৪. 'ডাকঘর' নাটক অবলম্বনে পিসেমশায় চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ভামলের পিসেমশায় মাধব দত্তের চরিত্র: মাধব দত্ত ছিলেন অমলের গ্রাম সম্পর্কিত পিসেমশায়। নিঃসন্তান এই দম্পতি অমলকে পোষ্য নিয়েছিলেন। অমলকে তিনি যথেষ্ট ভালোবাসতেন এবং সাধ্য মতো আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।


মাধব দত্তের কার্পণ্যঃ তার সংলাপ থেকেই বোঝা যায় যে এককালে তিনি কিছুটা কৃপণ ছিলেন। বহু কষ্টে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তা পরের ছেলে এসে ভোগ করবে- এটা তিনি কিছুতেই মানতে পারতেন না। কিন্তু অমলকে বাড়িতে আনার পর তার প্রতি মায়া জন্মায় এবং মানসিকতাতেও বিরাট পার্থক্য সূচিত হয়।


ভীত্ব প্রকৃতিঃ মাধব দত্তের চরিত্রে সবাইকে, সব কিছুকে ভয় পাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি ঠাকুরদাকে ভয় পান, ঠাকুরদা ছেলেদের খেপিয়ে তোলেন বলে। মোড়লকে ভয় পান, মোড়ল অকারণে সকলের ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেন বলে। কবিরাজের কথা শুনতেও ভয় পান, কবিরাজ জটিল সব রোগের কথা বলেন বলে।


লোড এবং অবিশ্বাসঃ মাধব দত্ত কিছুটা লোভীও। অমলের কাছে রাজা আসছেন শুনে তিনি অমলকে বলেন রাজার কাছ থেকে কিছু চেয়ে নিতে। অমল তখন মৃত্যুশয্যায় থাকা সত্ত্বেও অমলকে তার এই কথা মনে করাতে বাধে না। অমল যখন জানায় যে সে রাজার কাছে চাইবে, তাকে যেন ডাকহরকরা করা হয়; তখন পিসেমশায় কপালে করাঘাত করে নিজের হতাশা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তিনি কিছুটা অবিশ্বাসীও। অধ এবং খোঁড়া ভিখারি ছিদাম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন- ছিদাম মিথ্যে কানা, মিথ্যে খোঁড়া। নাটকের শেষে ঠাকুরদাও তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, "চুপ করো অবিশ্বাসী!"

৫. "মোড়লমশায়, তুমি অমন করে কথা কচ্ছ কেন।" অমলের সঙ্গে মোড়লমশায়ের কী কথা হয়েছিল? মোড়লমশায়ের কথার ধরন থেকে তার চরিত্রের কোন্ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে? ২+৩

উত্তরঃ অমলের অনুরোধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকে প্রহরীর কাছ থেকে অমল জানতে পারে, রাজা ছোটো ছেলেমেয়েদের চিঠি লেখেন। এ কথা শুনে অমল রাজার

চিঠি পাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে ব্যগ্র হয়ে ওঠে। পথে মোড়লকে আসতে দেখে সে ডেকে অনুরোধ করে, তিনি যেন ডাকহরকরার কাছে অমলের পরিচয় দিয়ে রাখেন। জানলার পাশে অপেক্ষমান ছেলেটাই যে অমল, এ কথা জানা থাকলে ডাকহরকরা রাজার চিঠি সহজেই তার কাছে পৌঁছে দিতে পারবে। এই অপ্রত্যাশিত অনুরোধ শুনে মোড়ল ব্যঙ্গের হাসি হেসে জানায়, রাজা অমলের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় শুকিয়ে যাচ্ছেন কিনা, তাই খুব দ্রুতই চিঠি পাঠাবেন।


মোড়লের চরিত্র: মোড়লমশায়ের বিদ্রূপাত্মক কথার ধরন থেকেই তার চরিত্রটি স্পষ্ট বোঝা যায়। রাজা তাকে মোড়ল না করলেও সে গ্রামের স্বঘোষিত মোড়ল। যারা তাকে অগ্রাহ্য করত, তাদের ক্ষতি করতে সে বদ্ধপরিকর। অমল যখন রাজার চিঠির প্রত্যাশার কথা মোড়লকে জানায়, তখন সেই অসম্ভব কল্পনার কথা ভেবে সে ক্রমাগত ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে থাকে। শুধু তাই নয়, অমলের পিসেমশায় মাধব দত্তের বাড়িতে যে রাজাকে নিয়ে কথা হয়, তা রাজার কানে পৌঁছে দিয়ে মাধবকে বিপদে ফেলার পরিকল্পনায় উদ্যোগী হয় মোড়ল। ক্ষমতার দম্ভ জাহির করা এবং অপরের ক্ষতিসাধনই এই চরিত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

৬. "না ভুলব না। দেখো, মনে থাকবে।"- উক্তিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বক্তার পরিচয় দাও।

উত্তরঃ প্রসঙ্গঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটক থেকে গৃহীত আলোচ্য উক্তিটির বক্তা সুধা। সে শশী মালিনীর মেয়ে। সাজি ভরে ফুল তুলে এনে মালা গাঁথা তার কাজ। অমল তাকে বলে, গাছের উঁচু ডাল থেকে ফুল পেড়ে দেবে। সুধা কিন্তু এ কথা শুনে ব্যঙ্গ করে বলে, "ফুলের খবর আমার চেয়ে তুমি নাকি বেশি জানো!"


সুধার স্বপ্ন: অমলের কাছে যে ফুল তোলা, মালা গাঁথা আনন্দের কাজ, সুধার কাছে সেটাই যথেষ্ট পরিশ্রমের। পেশার তাগিদে রোজ ছুটে ছুটে তাকে যা করতে হয়, তাতে বালিকা মনের ভালোলাগার কোনো উপাদান থাকে না। তাই সুধা অকপটে অমলকে জানাতে পারে যে, সে যদি অমলের মতো সারাদিন অবসর যাপন করতে পারত, তাহলে খুব মজা হত। বেনে-বউ পুতুলের বিয়ে দিতে পারত, পোষা মেনিকে নিয়ে খেলতে পারত। এভাবে কল্পনার রাশ আলগা করতে করতেই কর্তব্যের টানে তাকে বাস্তবে ফিরে আসতে হয়।


অমল তার কাছে একটি ফুল চাইলে সে জানায়, ফুলের দাম দিতে হবে। সে বড়ো হয়ে ফুলের দাম দেবে জানালে সুধা রাজি হয় ও তাকে কথা দিয়ে যায়, যে সে অমলকে ভুলবে না। নাটকের শেষাংশে সুধা সত্যিই অমলের জন্য ফুল নিয়ে এসেছিল এবং রাজকবিরাজের হাতে দিয়ে তাকে জানাতে বলেছিল, "সুধা তোমাকে ভোলে নি"।


৭. 'ডাকঘর' নাটকে অমলের জীবনের পরিণতিতে প্রহরী চরিত্রটির ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর : প্রহরীর সঙ্গে প্রাথমিক কথোপকথন: প্রহরীকে আর সব বালক ভয় পায়। ভাবে প্রহরী তাদের ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু অমলের মনে কোনও ভয় নেই। যখন প্রহরী তাকে ভয় দেখিয়ে বলেন, 'যদি তোমাকে ধরে নিয়ে যাই? যদি রাজার কাছে নিয়ে যাই?' তখন অমল খুশি হয়ে জানায় যে, তাকে যেন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কবিরাজ তাকে বাইরে যেতে বারণ করেছে। অমলের অসুস্থতার কথা শুনে এবং তার চেহারায় রোগের চিহ্ন দেখে প্রহরীর মায়া হয়।


ঘণ্টা বাজানো ও সময় নিয়ে কথা: প্রহরীকে অমল জিজ্ঞাসা করে ঘণ্টা বাজাবে কিনা। তিনি জানান এখনও সময় হয়নি। অমলের ধারণা ছিল, প্রহরী ঘণ্টা বাজালেই সময় হয়। তাই সে কিছুটা অবাক হয় প্রহরীর এ হেন কথা শুনে। তবে সে ঘণ্টার শব্দ নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কথা গোপন করে না। বলে, দুপুরে যখন তার বাড়িতে সকলের খাওয়া হয়ে যায়, পিসেমশায় কাজে বেড়িয়ে যান, পিসিমা রামায়ণ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন, কুকুরটাও লেজে মুখ ডুবিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেয়, তখন প্রহরীর ঘণ্টা বেজে ওঠে। অমল প্রহরীর কাছে জানতে চায় ঘণ্টা কেন বাজে? প্রহরী উত্তরে জানান, ঘণ্টা সবাইকে এই কথা বলে যে সময় বসে নেই, সময় কেবলই বয়ে চলেছে। অমলের জিজ্ঞাসা- 'সময় কোথায় চলেছে? কোন দেশে?'

প্রহরী জানান, সে দেশে সবাইকে যেতে হবে। অমলের বাইরে যাওয়া বারণ শুনে তিনি বলেন, সবচেয়ে ভালো কবিরাজ এসে হাত ধরে তাকে সেই অজানা দেশে নিয়ে যাবেন।


ডাকঘর ও রাজার চিঠি নিয়ে ধারণা: অমলকে ডাকঘর সম্পর্কে প্রথম জানান প্রহরী। ডাকঘর কী, সেখানে কার চিঠি আসে, কাদের কাছে কারা সেইসব চিঠি বিলি করে, সব তথ্য অমল প্রহরীর কাছে জানতে পারে। অমল এটা জেনে যারপরনাই বিস্মিত হয় যে তার কাছেও রাজার চিঠি আসবে। রাজা নাকি ছেলেমানুষদের ছোটো ছোটো চিঠি লেখেন। সেই শোনা অবধি অমলের জীবনের খাত অন্যদিকে বয়ে যায়। বাড়িতে বন্দিদশা তার ভালো লাগত না। ধীরে ধীরে ঘরের কোণটিও তার ভালো লাগতে থাকে। রাজা ও রাজার চিঠির অপেক্ষায় তার সংক্ষিপ্ত জীবনের শেষ অধ্যায়টি অতিবাহিত হয়।


ডাকহরকরা হওয়ার স্বপ্নঃ রাজার চিঠির প্রতীক্ষা ছাড়াও যে বিষয়টি প্রহরী অমলের মনে গেঁথে দিতে সক্ষম হন, তা হল রাজার ডাকহরকরা হওয়ার বাসনা। সুদূরের পিয়াসি অমল যে মুহূর্তে শোনে ডাকহরকরারা রাজার চিঠি নিয়ে দেশে দেশে লোকের ঘরে ঘরে ঘুরে চিঠি বিলি করে বেড়ায়, সেই মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বড়ো হয়ে সে-ও রাজার ডাকহরকরা হবে। এমনকি পরেও অমল জানায়, রাজার কাছে ভিক্ষা চাইতে গেলে সে এই প্রার্থনাই করবে যে, তাকে যেন ডাকহরকরা করে দেওয়া হয়। ফলে এই নাটকে প্রহরী ভূমিকাটি ছোটো হলেও গুরুত্বের বিচারে তা অসীম।


৮. "আমি ক্রৌঞ্চদ্বীপে গিয়েছিলুম”-কে কাকে বলেছিল? ক্রৌঞ্চদ্বীপের বর্ণনা দাও। ২+৩

উত্তরঃ বক্তাঃ 'ডাকঘর' নাটকে অমলের শিশু মনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একমাত্র চরিত্র ঠাকুরদা আলোচ্য উক্তিটি করেছিলেন।


উদ্দিষ্টঃ ঠাকুরদা গৃহবন্দি অমলকে নানান দেশের গল্প বলতেন। তার মধ্যে কিছু হয়তো বাস্তব জায়গা, কিছু কাল্পনিক। ক্রৌঞদ্বীপে যাওয়ার কথাও তিনিই অমলকে বলেছিলেন।


ক্রৌঞদ্বীপ কোথায়: ক্রৌঞ্চদ্বীপ নামে আসলে কোনও জায়গা নেই। 'ক্রৌঞ্চ' শব্দের অর্থ কোঁচবক। দ্বীপ হল চতুর্দিকে জলবেষ্টিত স্থলভূমি। ঠাকুরদা অমলকে জানিয়েছিলেন, ক্রৌঞ্চদ্বীপ এক আশ্চর্য জায়গা। সেটি নাকি পাখিদের দেশ। সেখানে কোনো মানুষ থাকে না। পাখিরা কথা বলে না, চলেও না। তারা শুধু গান গায় আর ওড়ে।


ক্রৌঞদ্বীপের প্রকৃতি : শিশুর কল্পনা কোনো আগল মানে না, সীমায় আবদ্ধ হতে জানে না। অমল যখন ঠাকুরদার মুখে ক্রৌঞ্চদ্বীপের কথা শোনে, তখন সে-ও যেন কল্পনার উড়ান দিয়ে পৌঁছে যায় সেই না-দেখা স্বপ্নের দেশে। ঠাকুরদাকে জিজ্ঞাসা করে, সেই দ্বীপ কি সমুদ্রের ধারে। ঠাকুরদা হ্যাঁ-বাচক উত্তর দিলে তার পরবর্তী প্রশ্ন, সেখানে সব নীল রঙের পাহাড় আছে? ঠাকুরদা তার কল্পনাকে আরও উস্কে দিয়ে জানান, নীল পাহাড়েই তো তাদের বাসা। সন্ধের সময় সেই পাহাড়ের উপর সূর্যাস্তের আলো এসে পড়ে। তখন ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ রঙের পাখি তাদের নীড়ে ফিরে আসতে থাকে। সেই আকাশের রঙে, পাহাড়ের রঙে আর পাখিদের রং মিশে দেখার মতো এক দৃশ্য হয়। কৌতূহলী অমল পুরো দৃশ্যপট কল্পনা করে নিয়ে জানতে চায় সেখানে ঝরনা আছে কিনা! ঠাকুরদা তাকে আশ্বস্ত করে জানান, ঝরনা আছে বৈকি। একেবারে যেন হীরে গলিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। আর সেই জলের ধারার নৃত্য অতুলনীয়। নুড়িগুলোকে ঠুং ঠাং ঠুং ঠাং করে বাজাতে বাজাতে কল্ কল্ ঝর ঝর করতে করতে ঝরনাটি সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে।


৯. "আমি যে ফকির মানুষ আমারই লোভ হয়।"- ফকিরের কীসে, কেন লোভ হয়?

উত্তর: প্রেক্ষিত: ফকিরের বেশে ঠাকুরদা এসে অমলকে নানান সম্ভাব্য, অসম্ভব দেশের গল্প শোনাতেন। কল্পনাবিলাসী অমল সেইসব দেশের ছবি নিজের মতো বিনির্মাণ করে নিতো। একদিন ফকির তাকে ক্রৌঞ্চদ্বীপের গল্প করেন। সেখানে কেবল পাখিরা থাকে। সেখানকার পাহাড়, ঝরনার গল্প শুনে মুগ্ধ অমল ভাবে সে যদি পাখি হত, তাহলে কী ভালোই না হত। ঠাকুরদা ওরফে ফকির তখন তাকে মনে করিয়ে দেন, তাহলে একটি সমস্যাও হত। কারণ অমল ইতিমধ্যেই দইওয়ালাকে বলে রেখেছে সে বড়ো হয়ে দই বিক্রি করবে। তবে পাখিদের মধ্যে দইয়ের ব্যাবসাটা জমবে না বলে ঠাকুরদা পরিহাস করেন।


দইওয়ালার ব্যস্ততা: দইওয়ালার কথা উঠতেই অমল পিসেমশায়কে জিজ্ঞেস করে, তার দইওয়ালা এসে চলে গেছে কিনা। মাধব দত্ত ঠাকুরদাকে ইঙ্গিত করে কিছুটা ব্যঙ্গসহ জানান, "গেছে বৈকি। তোমার ওই শখের ফকিরের তলপি বয়ে ক্রৌঞ্চদ্বীপের পাখির বাসায় উড়ে বেড়ালে তার তো পেট চলে না।” মাধব দত্ত আরও জানান, দইওয়ালা অমলের জন্য এক ভাঁড় দই রেখে গেছেন। গ্রামে তার বোনঝির বিয়ে। তাই তিনি কলমিপাড়ায় বাঁশির ফরমাশ দিতে যাচ্ছেন।


বোনঝির সংজ্ঞা অমলের বিয়ের কথা: দইওয়ালার বোনঝির বিয়ের কথা শুনে অমল অবাক হয়ে বলে, তার সঙ্গে বোনঝির বিয়ে দেবে বলেছিল দইওয়ালা। দইওয়ালা অমলের বালক মনে অস্ফুট প্রেমের উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন এই বলে যে, তার বোনঝি অমলের টুকটুকে বউ হবে। তার নাকে নোলক ও পরনে লাল ডুরে শাড়ি। সে সকালবেলায় নিজের হাতে কালো গরু দুইয়ে নতুন মাটির ভাঁড়ে অমলকে ফেনাসুদ্ধ দুধ খাওয়াবে। সন্ধ্যার সময় গোয়ালঘরে প্রদীপ দেখিয়ে এসে অমলের কাছে বসে সাত ভাই চম্পার গল্প করবে। এই বর্ণনা শুনেই ফকির প্রশ্নোধৃত উদ্ধৃতিটি করেছেন। ফকিররা সাধারণত নির্লোভ এবং সংসার সম্বন্ধে মোহমায়ামুক্ত হন। তা সত্ত্বেও অমলের মুখ থেকে অনাগত দাম্পত্যের মিষ্টি কাহিনি শুনে তার স্বভাববিরুদ্ধভাবে লোভ হয় জানিয়েছেন।


১০. 'ডাকঘর' নাটক অবলম্বনে অমল চরিত্রটির পরিচয় দাও।

উত্তর: অমলের পরিচয়: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমল। শৈশবে পিতৃমাতৃহীন অমলকে তার পিসি ও পিসেমশাই পোষ্য নিয়েছিল। অসুস্থতার জন্য কবিরাজ তাকে বাইরে বেরোতে বারণ করে। কিন্তু কল্পনাপ্রবণ শিশুমনকে ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি রাখা কার্যত অসম্ভব। অমল তাই বাড়ির বাইরে বেরোতে না পারলেও রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, তাদেরই সঙ্গে যেন মানসভ্রমণ সেরে আসে।


অমলের সারল্য ও মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা: তার চরিত্রে এমন এক সারল্য ও মানুষকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল, যে সকলেই তাকে ভালোবেসে ফেলত। অমল নামকরণের মধ্যে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মালিন্যহীন এক নিষ্পাপ চরিত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্থূল মলিনতা থেকে সে মুক্ত। দইওয়ালা, সুধা, ছেলের দল, প্রহরী, ছিদাম ভিখারি, ফকিরবেশী ঠাকুরদা এমনকি খলচরিত্র মোড়লের সঙ্গেও তার অনায়াস সখ্য গড়ে ওঠে। বাইরের পৃথিবী অমলকে দুর্বার আকর্ষণে টানত। তাই সে নানান পেশা অবলম্বন করে গৃহ প্রাচীর থেকে মুক্তি পেতে চায়।


বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করে বাইরের জগতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাঃ দইওয়ালাকে দেখে সে ভাবে বড়ো হয়ে তার মতো দই বিক্রি করবে। সুধাকে জানায় যে সুস্থ হলে সে গাছ থেকে ফুল পেড়ে দেবে। প্রহরী যেভাবে ঘণ্টা বাজায় সেটিও অমলের ভীষণ ভালো লাগে। আবার ছিদাম ভিখারির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতেও সাধ জাগে তার।


রাজার চিঠির জন্য অপেক্ষা : অমল যেদিন শুনেছে সেও রাজার কাছ থেকে চিঠি পাবে, সেদিন থেকেই তার জীবন আমূল বদলে গেছে। আগে গৃহ প্রাচীরে বন্দিদশা তার খুবই খারাপ লাগত। কিন্তু পরিহাসছলে হলেও প্রহরী যখন তাকে ডাকঘর থেকে রাজার চিঠি আসার কথা জানায়, সেদিন থেকেই সে এক অনির্বচনীয় অপেক্ষায় বিভোর হয়ে থাকে। সেদিন থেকে ঘরের কোণও তার প্রিয় হয়ে উঠেছে। আসলে রাজা, অর্থাৎ ঈশ্বরের থেকে জগতের যাবতীয় সৌন্দর্য এবং মঙ্গলের বার্তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তার জীবন একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ লাভ করেছিল। তাই বাইরের সমস্ত অজানা, অচেনা, অদেখাকে একে একে জানার, চেনার, দেখার বাসনা ছাপিয়ে রাজার চিঠির জন্য অপেক্ষাই অমলের জীবনকে একটা তাৎপর্যময় পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।