প্রদত্ত অনুচ্ছেদকে প্রস্তাবনা বা ভূমিকাস্বরুপ গ্রহণ করে প্রবন্ধ রচনা
Chapter 10
১. বাংলার ব্রত
ব্রত হল মানুষের সাধারণ সম্পত্তি, কোনো ধর্ম বিশেষের কিংবা বিশেষ দলের মধ্যে সেটি বদ্ধ নয়, এটি বেশ বোঝা যাচ্ছে। এটিও বেশ বলা যায় যে, ঋতুপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যে দশা বিপর্যয় ঘটত সেইগুলিকে ঠেকাবার ইচ্ছা এবং চেষ্টা থেকেই ব্রত ক্রিয়ার উৎপত্তি। বিচিত্র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মানুষের বিচিত্র কামনা সফল করতে পাচ্ছে-এই হল ব্রত। পুরাণের চেয়ে নিশ্চয়ই পুরোনো বেদের সমসাময়িক কিংবা তারও পূর্বেকার মানুষদের অনুষ্ঠান হল ব্রত।
উত্তরঃ
বাংলার ব্রত
ব্রত হল মানুষের মজাল কামনায়, পাপ বিনাশ ও পুণ্যার্জনের আশায় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত কৌম সমাজের পারিবারিক বা গোষ্ঠীভিত্তিক বিশেষ প্রকার ধর্মানুষ্ঠান। জীবনভর নানান ঘাত-প্রতিঘাতের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবনপথে এগিয়ে যেতে হয় মানুষকে। প্রতিনিয়ত জয়-পরাজয়ের অভিঘাত তার মনকে দুর্বল করে। তখন সে নিজেকে সঁপে দেয় লৌকিক নয় এমন কোনো শক্তির কাছে। তার বিশ্বাস অলৌকিক কোনো শক্তিই আমাদের জীবন চক্রের নিয়ন্তা। এভাবেই মানুষের জীবনে ব্যপ্ত হয়েছে ধর্ম, ব্যপ্ত হয়েছে নানান লোকাচার-দেশাচার। বাঙালি-সমাজ জুড়ে এমনই অযুত লোকাচার-দেশাচারের অন্যতম হল তার ব্রত উদযাপন।
বাংলার নানাবিধ ব্রতকে দুইভাবে শ্রেণিকরণ করা যেতে পারে। একটি হল বৈদিক-ব্রহ্মণ্য-শাস্ত্র নির্দেশিত ব্রত, অপরটি হল অনার্য-আর্য-সমাজ উদ্ভূত ব্রত। প্রথমোক্ত ব্রতগুলি মূলত পুরাণ নির্ভর। দেব-দেবী কেন্দ্রিক পৌরাণিক কথা-উপকথানির্ভর শাস্ত্রীয় বিধি বিধানের ওপর এই জাতীয় ব্রতগুলি অনেকাংশে নির্ভরশীল। ব্রাহ্মণ পুরুষের পৌরোহিত্যে আচমন - আসনশুদ্ধি - ঘটস্থাপন -সংকল্প প্রভৃতির মাধ্যমে গৃহস্থ এই ব্রতগুলি পালন করে থাকেন। এখানে পুরুষের প্রাধান্য থাকে।
অপর শ্রেণির ব্রত মূলত নারীরা পালন করে থাকেন। ভারতের তথা এই বাংলার প্রাচীন নিবাসী আর্য-পূর্ব নদীমাতৃক পল্লীগ্রামের সরল জীবনযাপনের মধ্যে একেবারেই লৌকিক উপাদান দিয়ে ঘরের মেয়েরা নিজের পরিবারের, নিজের সমাজের মঙ্গল কামনায় যে ব্রতগুলি উদ্যাপন করত, তার প্রাণময়তা শাস্ত্রীয় ব্রতগুলির তুলনায় অনেক বেশি গভীর। পরবর্তী সময়ে আর্যরা তাদের মেধা ও শ্রমের প্রয়োগ ঘটিয়ে বহু সহস্র বছর ধরে ভারতের উত্তরখণ্ডে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করলেন। ধীরে ধীরে আর্য-অনার্য মেলামেশা স্থাপিত হল। আর্যদের আচার-আচরণ-অভ্যাসের প্রভাব পড়ল অনার্যদের ওপর। অনার্য কৃষ্টিকে আর্থীকরণ করে নিতে তাদের পালিত রীতি-অভ্যাসের সঙ্গে আর্য দেবদেবী, আর্য উপাসনা পদ্ধতিকে মিলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলল। আর এভাবেই আর্য পূর্ব ব্রত ইত্যাদির ওপর এসে পড়ল আর্যোত্তর রীতিনীতির ভার।
এরপর দীর্ঘসময় ভারতীয় সভ্যতাতে নানা অভিঘাত নেমে এলেও সাধারণের সমাজে তার বড়ো কোনো প্রভাব পড়েনি। প্রভাব পড়ল মুসলিম আধিপত্যের পর। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পৌরাণিক ও লোকায়ত ধর্মবিশ্বাস আরও কাছাকাছি এল। ব্রত উপাদানগুলিও একটু একটু করে পরিবর্তিত হতে লাগল। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, হিন্দু সমাজের অবহলিত ও অপমানিত 'নিম্নশ্রেণি' ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও লোকায়ত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তারা নিকটবর্তী হয়েই রইল, কেন-না লোকায়ত সংস্কৃতি যতটা না ধর্মভিত্তিক, তার চেয়ে অনেক বেশি জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতি নির্ভর। বহিরাবরণের পরিবর্তন ঘটল ঠিকই, তবে অন্তঃপুর একই থেকে গেল আজও।
একারণেই সত্য নারায়ণ ও সত্যপীরের মধ্যে মূলগত কোনো ভেদ রইল না। এজন্যই ভাদু-টুসুতে গ্রামের মানুষ একসাথে রীতি উদ্যাপন করেন। ধান সহ নানান শস্যের ফলন যাতে ভালো হয়, বন্যা যেন সবকিছুকে গ্রাস না করে, কন্যার যাতে ভালো ঘরে বিয়ে হয়, স্বামী যেন সুপাত্র হন, গৃহ যেন সুস্থ সবল সন্তানে ভরে ওঠে, সংবৎসর এমনই বিচিত্র প্রার্থনা - যেন 'দুধেভাতে' থাকতে পারেন সকলে - জানিয়ে উদ্যাপন করা হয় ব্রতগুলি। এই কামনা বাসনাগুলি তো ধর্মীয় নয়, নিতান্তই জীবনযাপনের। ফলে এ জাতীয় বিষয়গুলি নিয়ে তৈরি ব্রতগুলিতে ধর্মনির্বিশেষে সম্মিলিত হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত। সেঁজুতিব্রত, মাঘমণ্ডল ব্রত, পুণ্যিপুকুর ব্রত, নাটাই ব্রত, তুষখালি ব্রত, টুসুব্রত এমন নানা ধরণের ব্রত-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলার নানা প্রান্তের মানুষ ইহলকের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে থাকেন।
২। শক্তির সন্ধানে মানুষ
অঙ্গার সম্পদ বা মাটির নীচের তেল চিরদিন থাকবে না। ভান্ডার হতে যা খরচ হচ্ছে, তার প্রতিপূরণ হচ্ছে না। যে অবস্থায় এইসব সম্পদ সঞ্চয় সম্ভব হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তারও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তাই আজকের সাবধানি মহলে শোনা যায় সতর্কতার বাণী। আর কতকাল অঙ্গার বা তেল মনুষ্য সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে পারবে তাও হিসেব হচ্ছে মাঝে মাঝে। মানুষ ছুটছে নতুন কয়লাখনির সন্ধানে, নতুন তেলের উৎস মাটির বাইরে আনতে।
উত্তরঃ
শক্তির সন্ধানে মানুষ
যেদিন সেই আদিমতম মানুষটি প্রথম আগুনে পোড়া মাংস খাওয়ার স্বাদ অনুভব করল এবং এরপর নিজেই আগুন জ্বালাতে শিখলো, সেদিনই যেন স্থির হয়ে গেল যে মানবসভ্যতা সম্পূর্ণভাবে শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে রচিত হবে। তখন থেকেই শক্তির সন্ধানে মানুষ উন্মুখ। পাথরে পাথরে, শুকনো বৃক্ষশাখার পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে সে আগুন জ্বালায়, গরু ইত্যাদি গবাদি পশুর শুকনো মলে আগুন জ্বালায়। শস্যকণার নির্যাস থেকে প্রাপ্ত তেল দিয়ে সে অনেকক্ষণ আগুন প্রোজ্জ্বলিত রাখে। কিন্তু এতে তো সে সন্তুষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ কোনো কিছুতেই তুষ্ট হতে পারে না। তার আরও নতুন কিছু চাই। জীবনকে আরও স্বচ্ছন্দ করে তোলার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা। এভাবেই খোঁজার নেশায় পাগল হয়ে একসময় সে একেএকে সন্ধান পেল ভূগর্ভে সঞ্চিত কয়লার, সন্ধান পেল খনিজ তেলের, প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির। এবার তাকে পায় কে। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ এখন তার হাতের মুঠোয়। কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন-জ্বালানির রকমারি সম্পদের অধিকারী মানুষ বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার শিখল, শিল্প গড়ল, ইঞ্জিন তৈরি করল, কলকারখানা তৈরি হল। ভোল পালটে গেল সভ্যতার।
সমস্যা তবু থেকেই যায়। এক সমস্যার সমাধান অন্য সমস্যার জন্ম দেয়। প্রথমত, এইসব জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর সময় সেই জ্বালানি থেকে নির্গত সালফার, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং অন্য নানাপ্রকার ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ ব্যাপক হারে পরিবেশকে দূষিত করে। শিল্পোন্নত মানবসভ্যতা আজ নিজের অবিবেচনাপ্রসূত দূষিত পরিবেশে রীতিমতো খাবি খাচ্ছে। মানুষ উপলব্ধি করছে, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প দ্রুত পাওয়া না গেলে পরিবেশ দূষণ সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খনিজ তেলের ভাণ্ডার সীমিত, অথচ মানুষের শক্তির চাহিদা ক্রমবর্ধমান। জীবাশ্ম-জ্বালানির ওপর কেবল নির্ভর করে থাকলে মানুষের শক্তির উৎস নিঃশেষিত হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। এখন তাই নতুন নতুন কয়লা খনি বা নতুন নতুন তৈল খনির সন্ধানের পাশাপাশি মানুষ আজ বিকল্প শক্তির সন্ধানে করছে। উন্নত দেশগুলি পারমাণবিক শক্তিকে ব্যবহার করছে। কিন্তু এর ঝুঁকি আর সমস্যা অনেক। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের কোনো ত্রুটি মুহূর্তে একটা দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তা ছাড়া পারমাণবিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সহজলভ্য নয়। খনিজটি কয়েকটি মাত্র দেশে পাওয়া যায় বলে ইউরেনিয়াম আমদানি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
এবার সবাই উঠেপড়ে লাগলেন অচিরাচরিত শক্তিকে ব্যবহার করতে। অচিরাচরিত শক্তিগুলির মধ্যে সবচেয়ে সহজলভ্য হল সৌরশক্তি। কিন্তু সৌররশ্মিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর নিরন্তর গবেষণা সাফল্যের মুখ দেখেছে। গবেষণা আরো চলছে। সৌরশক্তির ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই পাশাপাশি বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়েও নানা
স্থানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। নিরন্তর গবেষণার ফলে আগামী দিনে জ্বালানির মাধ্যম হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবেই। এইভাবে আগামী অর্ধ শতাব্দীকালের মধ্যেই শক্তির ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি স্থান দখল করবে।
৩. সংস্কৃতি
সংস্কৃতি জীবনের সঙ্গে জড়িত-সেই জন্য এর চরম রূপ কানো এক সময়ে চিরকালের জন্য বলে দেওয়া যেতে পারে না। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতা আর সংস্কৃতিও গতিশীল। ভারতের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি যুগে যুগে নতুন নতুন ভাব-পরম্পরা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছে, সমর্থও হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা আর সংস্কৃতি তার বিশিষ্ট রূপ পাবার পরে, এদশে ইসলামি সংস্কৃতির আবির্ভাব হল। এই সংস্কৃতির মধ্যে যা সনাতন এবং বিশ্বমানের গ্রহণযোগ্য, সেটি হল এর অন্তর্গত সুফি দৃষ্টিকোণ, সুফি আধ্যাত্মিক অনুভূতি। একে মধ্যযুগের ভারত সাদরে বরণ করে নিলে, এর মধ্যে সে অচেনাকে খুঁজে পেল।
উত্তর:
সংস্কৃতি
'সংস্কৃতি বলতে সেই সকল প্যাকে বোঝায় যার মধ্য দিয়ে মানব জাতি তাদের প্রকৃত বর্বরতাকে কাটিয়ে ওঠে এবং পূর্ণরূপে মানুষে পরিণত হয়।' -স্যামুয়েল পুফেনডর্ফ
মানুষ সমাজবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই সমাজের সংহতিকে দৃঢ় করা, পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করা, প্রত্যেকের স্বকীয়তাকে প্রকাশ করা, সম্মিলিত আচার-আচরণ, সম্মিলিত বিনোদনের সাহায্যে সমন্বয়ের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বকে সুনিশ্চিত ও সুগঠিত করার চেষ্টা করে আসছে। তার এই প্রয়াসের অঙ্গগুলি অর্থাৎ তার আচার-আচরণ, যোগ্যতা, জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, ক্রীড়াশৈলী, খাদ্যাভ্যাস, নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ, আইন, প্রথা ইত্যাদির এক যৌগিক সমন্বয়কে সংস্কৃতি বলা যেতে পারে। বাংলায় 'সংস্কৃতি' শব্দটি মারাঠি ভাষা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলায় 'কালচার'-এর প্রতিশব্দ হিসেবে 'সংস্কৃতি' শব্দটির প্রস্তাব করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেন।
মানুষের সাংস্কৃতিক কৌশলগুলি ভৌগোলিক, সামাজিক, জৈবিক উত্তরাধিকারের সমন্বিত ৰূপ। সংস্কৃতির উপাদান দেশ-কাল ভেদে সর্বজনীন। এরমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিশেষ গুরুত্ব আছে। প্রায় প্রতিটি সভ্যতার সাংস্কৃতিক কাঠামো সেই সভ্যতায় ব্যপ্ত ধর্মানুসারে গড়ে উঠেছে। শিল্পকলা, অর্থাৎ সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন, স্থাপত্য, ভাস্কর্য থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন উপাদান, যেমন- গৃহ ও গৃহসজ্জা, রন্ধনপ্রণালী, পোশাক-পরিচ্ছদ সহ রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ম নীতি, সমাজে অনুশীলিত বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন ধারার দৃষ্টিকোণের সমন্বয়ে একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গঠিত হয়।
বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলা ভাষী রাষ্ট্র বাংলাদেশ সহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা জুড়ে রয়েছে চার হাজার বছরেরও বেশি পুরাতন বাঙালি সংস্কৃতির ধারা। বাঙালির ধর্মীয় ও শিল্পকলা সম্ভূত সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। নানারকম বৈচিত্র্যে পূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতিকে ভাবগত দিক দিয়ে দুটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়। তার একটি হল লোকায়ত, অপরটিকে নাগরিক সংস্কৃতি বলা যেতে পারে। লোকায়ত সংস্কৃতির অঙ্গ হল নানারকম লোকধর্ম, লোকাচার, দেশাচার যা হাজার হাজার বছর ধরে আর্য ও আর্য-পূর্ব বাঙলার অধিবাসীদের সম্মিলনের মাধ্যমে নানান রূপে আজও বিকশিত হয়ে চলেছে। লোকায়ত সংস্কৃতির আরেকটি ধারা হল দেহবাদী সাধনা এবং সেই সাধনার সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকগান। বাউল-ফকিরি, কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলরামী, সখীভাবুকী এরকম অজস্র সাধনসংগীত বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ। এ ছাড়াও রয়েছে ঝুমুর-জারি-সারি-ভাটিয়ালি সহ বিচিত্র লোকগান। আছে পটচিত্র, ছৌনৃত্য, যাত্রা প্রভৃতি।
নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যে আছে চিত্রাঙ্কন, থিয়েটার, ভারতীয় মার্গসংগীত, রবীন্দ্র নজরুল চর্চা, আধুনিক ও জীবনমুখী বাংলাগানের ধারা থেকে শুরু করে ধ্রুপদী নৃত্য, কাব্য ও কথা সাহিত্যের নিরন্তর চর্চা, বাচিক শিল্প প্রভৃতির রসসিক্ত সমাবেশ।
বাংলার ধর্মমূলক সংস্কৃতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল সমন্বয়। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, প্রধান এই তিনটি ধর্মের মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবে নির্দ্বিধায় যোগ দেন অন্য ধর্মের মানুষ। 'দিবে আর নিবে। মিলাবে মিলিবে'-এই সত্যতাই বাঙালির আসল পরিচয়।
এভাবেই পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক চৈতন্য। এই চৈতন্যই যে-কোনো জাতির জীবনের চালিকাশক্তি।
8। স্বদেশ
শিক্ষার বিরোধ আসলে এইখানে, সে শুধু দেহের গঠনে নয়, সে অন্তরের আত্মায়। এই শিক্ষার প্রণালী নিয়ে বিবাদ বিসংবাদ চলছে, ওদের শিক্ষা অত্যন্ত মহার্ঘ্য, অতো বড়ো বড়ো বাড়ি কী হবে? হবে টানা পাখায়? কাজ কী আমার টেবিল চেয়ারে, দূর করে দাও মোটা মাইনের বিলিতি প্রফেসার-তার খরচ যোগাতেই যে দেশের বাপ-মা পাগল হয়ে গেল, এমনি আরো কত-শত। এর কোনোটাই মিথ্যে নয়, কিন্তু এও আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয়, যখন ভাবি পশ্চিম ও পূর্বের শিক্ষার সংঘর্ষ ঠিক কোনখানে? এদের সত্য মিলনের যথার্থ অন্তরায় কোথায়?
উত্তরঃ
স্বদেশ
পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্পর্শ পাওয়ার আগে ভারতের শিক্ষা ছিল টোল-চতুষ্পাঠী কেন্দ্রিক। সেই শিক্ষাব্যবস্থার একটা পর্যায়ে পৃথিবীর বিবর্তনের রূপচিত্রটি সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা কোনো জ্ঞান আহরণ করতে পারত না। শিক্ষা হয়ে পড়েছিল অতীতের চর্বিতচর্বণ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা, দর্শন, সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনায় ইউরোপ যখন নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে বিকশিত করে চলেছে, ভারত তখন হাজার বছরের পুরাতন চিন্তাভাবনা, শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের নামে রক্ষণশীলতার জগদ্দল পাষাণে মাথা ঠুকে ঠুকে নিজের মস্তিষ্কের স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করে চলেছে।
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হলে ইংরেজরা কিছুটা নিজেদের স্বার্থেই শিক্ষাবিস্তারে উদ্যোগী হয়। তাঁদের সেই উদ্যোগে সামিল হলেন রাজা রামমোহন রায়। এঁদের প্রয়াসে সংস্কৃত আরবি ফারসির পরিবর্তে ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হল এদেশে। পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে এসে পড়ল আমাদের চৈতন্যে।
এই পর্যায়ে পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের বৌদ্ধিক বা সামাজিক স্বার্থের কোনো সংঘাত তৈরি হল না। পুরাতনপন্থীরা ফোঁস ফোঁস করলেও নতুনের আগমনের দ্বারকে তাঁরা বুদ্ধ করতে পারেননি। বাংলায় ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, গদ্যভাষার বিকাশ, বিজ্ঞান ও ভূগোল সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রসারতার মধ্য দিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল, যাকে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বললে অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু কিছুকাল এভাবে চলার পর থেকেই ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষার বেআবরু দিকটি প্রকট হতে থাকে। এদেশের কিশোর, তরুণ, যুবকেরা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে স্বদেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। বাইরের আড়ম্বর তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে, অন্তরের আবেদন হয়ে পড়ে গৌণ।
ঐতিহ্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে চাইলে শিকড় আলগা হয়ে যায়। ইংরেজ-শাসিত শিক্ষার এই ভ্রান্তিতেই মজেছিল উনবিংশ-বিংশ শতকের যুব সম্প্রদায়। পরাণুকরণপ্রিয়তা থেকে সৃষ্টি হল নৈতিক অধঃপতন। বাবু' সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল এই উপসর্গ থেকেই। আমাদের দেশের সমস্ত কিছুই খারাপ, এরকম একটি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ স্বদেশপ্রীতি গড়ে তুলতে বাধা সৃষ্টি করে, তা কোনভাবেই শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না। ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে মিশিয়ে চলার পথ প্রশস্ত করতে হয়।
এ দেশে ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কেরানি গড়ে তোলা। সেই চাকরমুখীনতা থেকে পরবর্তীকালের শিক্ষাপ্রণালী আর বেরোতে পারল না। শিক্ষা ব্যক্তির অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ সাধনের বাহক হয়ে উঠল না। ফলে চাকরির পিছনে ইঁদুরদৌড় শিক্ষার বুনিয়াদকেই নষ্ট করে দিয়েছে। স্কুল-কলেজের বাইরে প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার ইত্যাদির পিছনে অর্থ ব্যায় করতে হয়। ভালো রেজাল্ট ও কেরিয়ারের সন্ধানে সন্তানকে বহু টাকা ব্যায় করে প্রাইভেট ইন্সটিটিউশনে ভরতি করতে বাধ্য হন পিতামাতা। এই অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে অনেকে নিজেদের যথাসর্বস্ব হারান, অনেকে অবৈধ উপায় অবলম্বন করেন, নিজেকে বিকিয়ে দেন অনেকে। এর ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে মূল্যবোধের ক্ষয় হতে থাকে, ভবিষ্যতে সে আর সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে না, দেশকে কোনো দিশা দেখাতে পারে না। মহার্ঘ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর ভিতর স্বদেশপ্রীতি গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।
পাশ্চাত্য শিক্ষা এসে যে আলো জ্বালিয়েছিল, পরিকল্পনাহীনতা ও অনুকরণপ্রিতা সেই আলোককে ক্রমে ধূসর করে তুলল। দেশ আর স্বদেশ হয়ে উঠতে পারলো না, দেশের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন তৈরি হল না। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে'-র আদর্শে শিক্ষাকে করে তুলতে হবে প্রাণবন্ত।
৫। দেশসেবা
দেশসেবা কঠিন কাজ। দেশ শুধু মাটি দিয়ে গড়া নয়, মানুষ দিয়ে গড়া। তাই মাটি-মানুষ সমান শ্রদ্ধা পেলে বা মর্যাদা পেলে দেশসেবা পূর্ণতা পায়। দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করাই দেশসেবকের লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেশসেবায় মনে ন্যূনতম স্বার্থচিন্তা থাকবে না। দেশসেবা হল দেশের সার্বিক উন্নয়নের ভাবনা। এই ভাবনার সুফল দেশের সকল প্রান্তে সমানভাবে পড়বে। তবেই দেশ বা জাতি সমানভাবে এগোবে। দেশের আংশিক উন্নতি দেশকে পিছিয়ে দেয়। দেশ ও জাতি অখণ্ড।
উত্তর:
দেশসেবা
দেশকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে দেশের শ্রীবৃদ্ধির জন্য নিজেকে সমর্পণ করাই হল দেশসেবা। কিন্তু প্রশ্ন হল দেশ কী? দেশ কি শুধুই একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড? শুধুমাত্র ভূখণ্ডের সেবা কীভাবে সম্ভব? দেশ কি অ্যাবস্ট্রাক্ট কিছু, যাকে শুধুই উপলব্ধি করতে হয়? না, তা নয়। দেশ বলতে বোঝায় একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষ ও প্রকৃতির সমন্বয়। দেশের মানুষ ও প্রকৃতির সুরক্ষা এবং শ্রীবৃদ্ধির জন্য নিরন্তর প্রয়াসকে দেশসেবা বলা যেতে পারে।
দেশের উন্নতির অর্থ হল অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশের অগ্রগতি। এই অগ্রগতি কাদের জন্য? মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিবাদী ধনিক শ্রেণির নাকি দেশের সাধারণ মানুষের। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর 'দেশের শ্রীবৃদ্ধি' প্রবন্ধে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দেই এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন 'দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয় জন? আর এই কৃষিজীবী কয় জন? তাহাদের ত্যাগ করিলে দেশে কয় জন থাকে? হিসাব করিলে তাহারাই দেশ-দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী। তোমা হইতে আমা হইতে কোন কাৰ্য্য হইতে পারে? কিন্তু সকল কৃষিজীবী ক্ষেপিলে কে কোথায় থাকিবে? কি না হইবে? যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোনো মলাল নাই।"
প্রশ্নটা শুধু কৃষিজীবীদের নিয়ে নয়। কৃষিজীবী, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের জন্য। দেশের প্রতিটি মানুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে না পারে, প্রত্যেকের জন্য যদি খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে, প্রত্যেকের যদি সামাজিক সম্মান না থাকে, বাক স্বাধীনতা না থাকে, ধর্ম ও সংস্কার পালনের অধিকার না থাকে, তাহলে সেই দেশ উন্নতির পথে চলেছে তা কোনোভাবেই বলা যায় না। স্বাধীনতার পর পঁচাত্তরটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, এখনও এদেশে নিরন্ন অভুক্ত মানুষ রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এখনও এদেশে সকলের জন্য সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা যায়নি, সকলের মাথার ওপর ছাদ নেই। এখনও এদেশের সব শিশুকে স্বাক্ষর করা যায়নি, শিশুশ্রম দূর করা যায়নি। সম্পদের অসম বণ্টন ধনী-দরিদ্রের বিভেদ ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। ধর্মীয় অসহিষুতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ধর্মব্যবসায়ীরা সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়ে দিয়ে কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ভারতের জাতীয় সংহতিকে বিনষ্ট করতে চাইছে। দুর্নীতির বাড়বাড়ন্তে সৎ মানুষেরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
দেশকে যদি এই তমসাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে উদ্ধার করা না যায় তাহলে ব্যক্তিগতভাবে কোনো মানুষই সুখী হতে পারবেন না। দেশ অস্থির হলে দেশের মানুষ সংকটে পড়তে বাধ্য। তাই দেশকে সকলের সচ্ছন্দ বাসভূমি করে তোলার জন্য আমাদের প্রত্যেককে ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। সকলের উন্নতির জন্য সবাইকে নিয়ে সমবেতভাবে এগিয়ে চলাই হল প্রকৃত দেশ সেবা। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত উন্নতি দেশের সামগ্রিক উন্নতি হতে পারে না। দেশের প্রতিটি মানুষের যখন উন্নতি ঘটবে, দেশের উন্নয়নের সুফল যখন প্রত্যেকে ভোগ করবে, শ্রেণি শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা যখন গড়ে উঠবে, তখনই সেই দেশকে উন্নত দেশ বলা যাবে।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, "আমরা জন্ম থেকে দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত।" দেশকে অন্তর থেকে ভালোবেসে দেশের প্রতিটি মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত করার দায়িত্বের অংশীদার হতে পারলে একজন প্রকৃত দেশ সেবক হয়ে ওঠা যাবে।
৬। গোড়ার কথা
মানুষের জীবনে শৈশব, যৌবন, প্রৌঢ়াবস্থা ও বার্ধক্য আছে, জাতীয় জীবনেও সেইরূপ ক্রমান্বয়ে এইসব অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। মানুষ মরে এবং মৃত্যুর পর নূতন কলেবর ধারণ করে। তবে ব্যক্তি ও জাতির মধ্যে প্রভেদ এই যে, সব জাতি মৃত্যুর পর বেঁচে ওঠে না। যে জাতির অস্তিত্বের আর সার্থকতা নেই, যে জাতির প্রাণের সম্পদ একেবারে নিঃশেষ হয়েছে সে জাতি ধরাপৃষ্ঠ থেকে লোপ পায় - অথবা কীটপতঙ্গের মতো কোনো প্রকারে জীবনধারণ করতে থাকে এবং ইতিহাসের পৃষ্ঠার বাহিরে তার অস্তিত্বের আর নিদর্শন থাকে না।
উত্তরঃ
গোড়ার কথা
"তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে
কেহ নহে নহে দূর
আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে
তার বিচিত্র সুর।"
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে-কোনো জাতির অস্তিত্বের মূলে আছে তার গতিময়তা, তার প্রাণস্পন্দন, কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা-আন্তরিকতা ও একাগ্রতা, তার হৃদয়ের ঔদার্য, সৌন্দর্যকে গ্রহণ ও অসুন্দরকে ত্যাগ করার প্রতি দ্বিধাহীনতার মতো তার অনেকগুলি ধ্বনাত্মক গুণের সমাবেশ। জাতি মানে অবয়বহীন কোনো বিমূর্ত সত্ত্বা নয়। জাতি হল কোনো একটি ভৌগোলিক পরিমন্ডলের সমভাষা, সমরূচী, সমকৃষ্টি, সমসংস্কৃতি সম্পন্ন মানুষের সম্মিলন। সেই মানবগোষ্ঠী তার বৈচিত্র্যকে অক্ষুন্ন রেখেও যখন বৃহত্তর ঐক্যের পথ তৈরি করে তখন সে জাতি বলিষ্ঠ ও ঋজু হয়ে ওঠে।
ভারতবর্ষ তেমনই এক জাতিসত্তা যার সুদীর্ঘকালের মেলবন্ধনের ধারাবাহিকতা আছে। ভৌগোলিক অবস্থানের পক্ষে নিরাপদ, সহনীয় জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এই দেশকে 'মহামানবের সাগরতীর্থে' পরিণত করেছে। স্মরণাতীত কাল থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এদেশে এসেছেন। তারপর আর তাঁরা ফিরে যাননি, এদেশকেই তাঁরা আপনার বাসভূমি করে তুলেছেন। নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর পদার্পণের মধ্য দিয়ে যে আগমন শুরু হল তা আজও অব্যাহত। নেগ্রিটোদের পর এদেশে এলেন অস্ট্রিক জনগোষ্ঠী। সমগ্র উত্তর, মধ্য ও পূর্বভারত জুড়ে এক সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে তুললেন তাঁরা। তারই মধ্যে কয়েক হাজার বছরের ব্যবধানে এসে পড়লেন বিদ্যাবুদ্ধিতে উন্নত দ্রাবিড়েরা। সুপ্রাচীন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা এই জনগোষ্ঠীরই অবদান। পরবর্তীকালে এঁদের বৃহত্তর অংশ বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করে দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করে। দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক সভ্যতার সহাবস্থান দীর্ঘকাল এদেশের ধর্ম-সংস্কৃতি সহ সামগ্রিক জীবনযাপন গড়ে তুলেছিল। এদেশের প্রায় সকল লোকধর্ম, লোকাচার, লোকায়ত সংস্কৃতি এই প্রাকআর্য জনগোষ্ঠীর অবদান।
এর পর এল নর্ডিক আর্য। শারীরিক সক্ষমতা থেকে শুরু করে মানসিক দৃঢ়তা, যুদ্ধাস্ত্র প্রয়োগের সূক্ষ্ম জ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতি স্থাপত্য - ভাস্কর্য সহ নানা দিকের পারদর্শীতা অচিরেই এদেরকে অপরাজেয় করে তোলে। ধীরে ধীরে উত্তরভারত থেকে পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য ভারত থেকে শুরু করে পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতে এরা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। দ্রাবিড়েরা চলে গেল দক্ষিণে। দুর্বল হয়ে যাওয়া অস্ট্রিকদের বৃহত্তর অংশ কালের নিয়মে মিশে গেলো আর্য ও দ্রাবিড়দের সঙ্গে, আর অবশিষ্ট অংশ নিজেদের আত্মমর্যাদা নিয়ে, সন্তর্পণে নিজেদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে আশ্রয় নিল অরণ্যে, পর্বতে, গিরিগুহায়। ভারতের উত্তরাংশের বৃহত্তম সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভাষা গড়ে উঠল আর্য আধিপত্যের মধ্য দিয়ে।
এরপরে ইসলাম ধর্মের অনুপ্রবেশ। দীর্ঘকালের ভারতীয় সভ্যতা প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ইসলামকেও গ্রহণ করে নিল। এভাবেই আত্মীকরণের মহানুভবতায় ভারতীয় 'হিন্দু' এবং অভারতীয় মুসলিম, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মের ভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থান এদেশকে মানবসভ্যতার এক ঈর্ষণীয় জাতিতে পরিণত করেছে।
আঘাত আসে অবিশ্রান্ত। অসুন্দরের ধারক যাঁরা, মানবধর্ম বর্জিত সেই হিংস্র শ্বাপদ আর গৃধুদের নিরন্তর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হয় সবসময়। বাঁধন কোথাও একটু ঢিলে হলেই অমানুষের দল হুমড়ি খেয়ে পড়ে, খুবলে নিতে চায় আমাদের যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস। তবু
হাজার যন্ত্রণা সহ্য করে আবার আমরা উঠে দাঁড়াই। প্রতিশোধ নয়, প্রতিরোধ গড়ে তুলে কাপুরুষদের আবার আমরা সুপুরুষ করে তুলি, তাদের হাতে তুলে দিই মানবতার সিন্দুক।
৭। নিরক্ষরতার শাপমোচন
"যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।" রবীন্দ্রনাথ এভাবেই নিরক্ষরতার অভিশাপ সম্বন্ধে সচেতন করেছেন জাতিকে। নিরক্ষর মানুষ চলার পথে বারে বারে বাধাপ্রাপ্ত হয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাক্ষরতা প্রয়োজনীয়। পড়াশোনা মানুষকে একতাবদ্ধ করে। যে-কোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে একতা জরুরি। আর শিক্ষাই ঐক্য আনে।
উত্তর: নিরক্ষরতার শাপমোচন "যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে পশ্চাতে রেখেছো যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।" -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিরক্ষর মানুষের সংখ্যাধিক্য থাকলে কোনো জাতি কখনোই উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। নিরক্ষরতা যে-কোনো জাতির অভিশাপ। জ্ঞানের জগতে যাদের প্রবেশাধিকার নেই, তারা সমাজ বা দেশের অগ্রগতির পথ নির্মাণ করবে কীভাবে? তারা 'শুধু বহি চলে মন্দগতি জীবনের ভার'। শিক্ষা মানুষের চেতনার জাগরণ ঘটায়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ একদিকে যেমন নিজেকে জানতে পারে, অপরদিকে অন্যকে বুঝতে বা উপলব্ধি করতে পারে। শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজের চালচিত্রকে সে বিশ্লেষণ করতে পারে, শোষণ নিপীড়ন বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ প্রকৃতপক্ষে অন্ধ। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- "মানুষের অন্ধত্বের মতো নিরক্ষরতা এই দুর্ভাগা দেশের হতভাগ্য জনগণের সর্বাপেক্ষা নিষ্ঠুরতম অভিশাপ।" নিরক্ষরতার পিছনে মূলত স্বার্থান্বেষী মানুষের কূট ষড়যন্ত্র দায়ী। তারা ধর্মের নামে, শাস্ত্রের নামে, লোকাচার ও দেশাচারের নামে সমাজের অধিকাংশ মানুষকে নিরক্ষর থাকতে বাধ্য করে। সভ্যতার প্রাক লগ্নে রাজতন্ত্র যখন দীর্ঘমূল হচ্ছে, তখন শাসকের প্রত্যক্ষ মদতে একশ্রেণির বুদ্ধিমান মানুষকে দিয়ে শাস্ত্রীয় বিধি-বিধান তৈরি করা হল, যেখানে সমাজের মূল কারিগর কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষকে 'শুদ্র' আখ্যা দিয়ে তাদেরকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কৌশল রচিত হল। নারীকেও গৃহবন্দি করে নিরক্ষর থাকতে বাধ্য করা হল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে। রাজতন্ত্রের স্থান দখল করেছে গণতন্ত্র। শিক্ষিত মানুষ ছাড়া গণতন্ত্র যে কখনোই সফল হতে পারে না, এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে রাজনৈতিক বৃত্ত। তাই নিরক্ষরতা দূর করার একটা সার্বিক প্রয়াস রাজনৈতিকভাবেই লক্ষ করা যাচ্ছে। নিরক্ষরতা মুক্ত দেশ গঠন করতে হলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্য চাই গণশিক্ষা, সর্বজনীন শিক্ষা। প্রথম কথা অক্ষরজ্ঞান, রবীন্দ্রনাথের কথায়-"লেখাপড়া শেখাই সেই রাস্তা।" সার্বিক শিক্ষার জন্য গ্রহণ করতে হবে কার্যকরী পদক্ষেপে। কোনো শিশু যাতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, দারিদ্র্য যেন কোনোভাবেই শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, প্রতিটি বয়স্ক মানুষকে যাতে শিক্ষিত করে তোলা যায় সেই লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। সারাদিনের কাজ-কর্মের শেষে সন্ধ্যাবেলায় নিরক্ষর বয়স্ক মানুষদের সাক্ষর করে তোলার জন্য চালু করতে হবে বয়স্ক শিক্ষা প্রকল্প। আমাদের শাসকেরা অবশ্য নিরক্ষরতা মুক্ত দেশ গঠনে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন যেগুলোর সুফল ইতিমধ্যেই দেশ পেতে শুরু করেছে। নিরক্ষর বয়স্ক ও শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসার জন্য নানা রকম প্রকল্প গৃহীত হয়েছে এবং সেগুলি ঠিক মতন পরিচালিত হচ্ছে কিনা তার জন্য নজরদারীও রয়েছে। সর্বশিক্ষা অভিযানের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে শিক্ষালয় নিয়ে আসা, বয়স অনুপাতে তার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয়ে মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা করা, মধ্যাহ্ন ভোজে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, বিনামূল্যে পাঠ্য পুস্তক, খাতা, ব্যাগ, বিদ্যালয়ে নির্ধারিত পোশাক ও জুতো প্রদান থেকে শুরু করে নানারকম স্কলারশিপ এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহী করে তোলার বিভিন্ন প্রকল্প অত্যন্ত সদর্থকভাবে গতিশীল। ২০১১-র জনগণনায় এ দেশের ৭৪.০৪% মানুষ ছিলেন সাক্ষর, আশা করা যায় বর্তমানে সেটি ৮০-৮৫%-তে পৌঁছেছে। শিক্ষিত মানুষই হয়ে উঠবে মানবসম্পদ। সমৃদ্ধ মানবসম্পদ দেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে।
৮. পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ
বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধে এবং সেইসঙ্গে শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে মানবজীবনে নানা উন্নতি সত্ত্বেও আমাদের শান্তি অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছে। তাই কবিকে আক্ষেপের সুরে বলতে হয়েছে- "দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।" (-চৈতালি)। ঔপনিবেশিক শাসন ও ভারতের সমস্যাকে অনেকগুণ স্বার্থের সংঘাত, লোভের অপরিমিত স্বভাব, ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব, অনৈক্য বাড়িয়ে দিয়েছে। যার জন্য দেখা দিয়েছে আয় ও সম্পদের বৈষম্য। এই বৈষম্যের ফলে দেখা দিয়েছে দারিদ্রদ্র্য। দারিদ্র্য দ্বারা যেমন বিঘ্নিত হয়েছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য, তেমনি নষ্ট হয়েছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
ফলে বর্তমানে যে পরিবেশের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তাতে পৃথিবীর মানুষ বিপন্নতায় আক্রান্ত। তাই তার প্রয়োজনীয়তাও প্রকট হয়ে উঠেছে।
উত্তর:
পরিবেশ ও বিপন্ন মানুস
"পৃথিবী আমাদের অন্তর্গত নয়, আমরা পৃথিবীর অন্তর্গত।”
-মারলি ম্যাটলিন
বিজ্ঞানের হাত ধরে যেদিন থেকে মানবসভ্যতা যন্ত্রনির্ভর হতে শুরু করল, অরণ্য ধ্বংস করে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের দিকে ঝুঁকে পড়ল মানুষ, কলকারখানা ও গতিশীল যানবাহনের নামে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের প্রতিযোগিতায় সামিল হল সে, সেদিন থেকেই পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে। শান্ত স্নিগ্ধ নির্মল আনন্দঘন পরিবেশে বাস করার সম্ভাবনা আজ ম্রিয়মাণ। পরিবেশের কোথাও এতটুকু সুস্থতার লেশমাত্র নেই। একসময় দূষণের কবলে ছিল শুধুমাত্র নগর, গ্রামগুলি ছিল মুক্ত; আজ পৃথিবীর সমস্ত অতল- ভূতল দূষণের কাছে অসহায়।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার: কলকারখানা, যানবাহন, জাহাজ- উড়োজাহাজ চালানো, বৈদ্যতিক শক্তি উৎপাদন ইত্যাদি নানা প্রয়োজনে কয়লা, পেট্রোলিয়ামের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাতাসে CO. CO₂-এর মতো ক্ষতিকর গ্যাসীয় উপাদান ভরে যাচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন শ্বাসকষ্ট, উচ্চরক্তচাপ, ক্যানসারের মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে, অপরদিকে এই সমস্ত গ্যাস তাপগ্রাহী হওয়ায় বায়ুর উদ্বুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অবাধে বৃক্ষচ্ছেদনঃ কৃষিকাজের জন্য জমি তৈরি, শিল্প- কারখানা, বড়ো-ছোটো অট্টালিকা গড়ে তোলা, প্রশস্ত রাস্তা, সেতু নির্মাণ প্রভৃতি কারণে নিরন্তর বৃক্ষচ্ছেদন হয়েই চলেছে। গাছ আমাদের প্রাণদাত্রী। গাছ বাতাসের CO₂ গ্রহণ করে বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে, অপরদিকে অক্সিজেন ত্যাগের মাধ্যমে বাতাসকে নির্মল রাখে। গাছ মৃত্তিকাকে ধারণ করে, বন্যা প্রতিরোধ করে। ছায়া প্রদানের মাধ্যমে পরিবেশকে শীতল রাখে গাছ। পাখিরা বাস করে গাছে। জীবধাত্রী সেই গাছকেই নির্মমভাবে হত্যা করে আমরা নিজেদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলছি।
ক্রমবর্ধমান CFC-এর ব্যবহাঃ রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক শিল্পে CFC-এর মতো বিষাক্ত গ্রিন হাউস গ্যাসের ব্যাবহারের ফলে জলবায়ু উয় হচ্ছে। উন্নতা বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টিপাত অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। বৃষ্টিবহুল অঞ্চলগুলি খরার কবলে পড়ছে, আবার মরু অঞ্চল বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। বিধ্বংসী ঝড়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে অনেক। বেড়ে গেছে দাবানলের পরিমাণও।
জনদূষণঃ শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ নদ-নদী-খাল-বিলের জলে মিশ্রিত হয়ে জলের দূষণ ঘটাচ্ছে। তৈলবাহী জাহাজ, পরিবহণকারী জাহাজ থেকে নিঃসৃত বর্জর্জ্য সমুদ্রের জলকে দূষিত করছে। কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ওষুধ জলের শুদ্ধতাকে নষ্ট করছে। এর ফলে পরিশ্রুত পানীয় জল পাওয়া ক্রমশ দুষ্কর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দূষিত জলে স্নান করে নানা রকম ব্যাধির মুখোমুখি হচ্ছে মানুষ। জলজ প্রাণীদের অপমৃত্যু ঘটছে যা একদিকে বাস্তুতন্ত্রকে নষ্ট করছে, অপরদিকে মানুষের খাদ্যের অভাব সৃষ্টি করছে।
শিল্পায়ন বা নগরায়ন যাই হোক না কেন, মানুষ যদি সুস্থ শরীর ও মন নিয়ে বেঁচে থাকতে না পারে তাহলে সব কিছুই নিরর্থক হয়ে যাবে। তাই আমাদেরকেই পথ খুঁজতে হবে কীভাবে বিপন্নতা মুক্ত করা যায়। ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে গেলে পরিবেশকে সর্বাগ্রে সুস্থ রাখতে হবে।
৯। ভাষা, ধর্ম, মানুষ
আমাদের ভারতীয়তা ঠিক কোথায়? ভারত নামক দেশে আছি বলেই ভারতীয়? কিন্তু এই যে বিভূতিভূষণের ভানুমতী বলেছিল, "ভারতবর্ষ কোন্ দিকে?" তার কী হবে? নাকি ভানুমতী অতীত, আমরা বর্তমান? তার ভাষা কি এখন আমরা বুঝি, আমাদের ভাষা সে? ভাষা বলতে শুধু মুখের কথা নয়, সর্ব অঙ্গের কথা। তার পাথর বা গাছ পুজো কি এখনও নিতান্তই 'নৃতত্ত্ব' আর আমরাই বা কারা, ভানুমতী ব্যতিরেকে সকলে? কিন্তু সেই সকল কি এক সকল, নাকি অনেক সকল। ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নে নিজেকে জর্জরিত করা ছাড়া আর কী উপায় আছে। সেই তুলনায় কোনো অভিবাসীর হয়তো অত উদ্বেগ নেই। চারপাশের প্রাত্যহিক অভারতীয়তা তাকে খানিক প্রতীকসুখীও করে তুলতে পারে। দূরের ভারত তার ধ্রুব। একটা গান ছিল, বোধ করি সুকৃতি সেনের, "জাগে নবভারতের জনতা/এক জাতি এক প্রাণ একতা।" বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই ছিল সেই সময়কার স্লোগান; এখন কি তা পালটে হয়েছে, ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য অর্থাৎ বৈচিত্র্যের মান কমেছে, ঐক্যের গুমর বেড়েছে? অথচ ঐক্য তো বৈচিত্র্যশাসিত, মানে, বৈচিত্র্য আছে বলেই ঐক্যের সন্ধান। প্রশ্নটা ঋজুরৈখিক আগে-পরের নয়, যুগপৎ কার্যকারণের।
উত্তরঃ
ভাষা, ধর্ম, মানুষ
বহু ধর্মের দেশ ভারতবর্ষ। এখানে কোনো একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সংবিধান মতে এদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। প্রতিটি ধর্মের মানুষেরই অপরের ক্ষতি বা সম্মানহানি না করে ধর্ম পালনের অধিকার আছে এ দেশে। ধর্মের মতোই ভারতবর্ষ বহুভাষী রাষ্ট্র। ফলে এ ক্ষেত্রেও বিশেষ কোনো একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়। অবশ্য হিন্দি বলয়ের বেশির ভাগ লোকের ইচ্ছা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষার মর্যাদা দান করা হোক। সেটা হলে অপর সকল অহিন্দি ভাষী ভারতীয়দের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়বার সম্ভাবনা। ফলে অহিন্দি ভাষীদের পক্ষে এই প্রস্তাব বা পদক্ষেপ মেনে নেওয়া কঠিন।
ধর্ম মানুষের নিজস্ব আচরণীয় বিষয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই, কিন্তু ভাষা ব্যক্তিগত নয়। পারস্পরিক ভাবের আদানপ্রদানের মাধ্যম হল ভাষা। রাষ্ট্রের সঙ্গেও মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয় ভাষার মাধ্যমে। ফলত রাষ্ট্র ও ব্যক্তির পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদানে ভাষার ভূমিকাকে অনেক বেশি বাস্তব ও সংবেদনশীল দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। বহুভাষার ভারতে একভাষী রাষ্ট্রই আদর্শ ব্যবস্থা হতে পারে? এখানে চোদ্দো-পনেরোটি প্রধান ভাষার মধ্যে হিন্দিভাষীর সংখ্যা সর্বাধিক হলেও এককভাবে তা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা নয়। এ দেশে এমন বহু ভাষা আছে যার সঙ্গে হিন্দি বা এর মূল সংস্কৃতের কোনো মিল নেই। হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হলে এক বৃহত্তর গোষ্ঠীর মানুষ প্রতিবাদী হবে।
এদেশ হিন্দু প্রধান দেশ। কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দকে মুছে দিয়ে এদেশকে হিন্দু দেশে পরিণত করতে চাইছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক প্রবণতা। বহুত্ববাদ হল ভারতবর্ষের শক্তি। অগণিত বৈচিত্র্যের লীলাভূমি এই দেশ। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই হল ভারতীয়ত্ব। এ দেশের যে-কোনো ধর্মকে আঘাত করলে ভারতীয়ত্বকে আঘাত করা হবে। ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসসহ জীবনযাপনের নানা বিষয়। তাই ধর্মের ওপর আঘাত হানার অর্থ হল মানুষের বেঁচে থাকার উপাদানগুলিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র। এই ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এমনিতেই নানা রকম প্ররোচনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বহু সময় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে। তার ওপর যদি ধর্মীয় সংকীর্ণতায় দেশকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হয় তাহলে এ দেশের অস্তিত্বই প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের ঔদ্ধত্য এক বিপজ্জনক প্রবণতা। এই ঔদ্ধত্য সংখ্যালঘুদের মানুষ বলে গণ্য করে না-সেটা কী ধর্মের ক্ষেত্রে, কী ভাষার ক্ষেত্রে। তখন বিদ্বেষ আরো প্রকট হয়, ভ্রাতৃত্বের লেশমাত্র থাকে না। মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা, হিংসা, ক্রোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। একটু ইবনেই সেই অসহিষুতায় বিস্ফোরণ ঘটে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের ইতিহাস বারংবার তার প্রমাণ দিয়েছে। তারপরেও যদি এতটুকু শিক্ষা অর্জন না করে থাকি আমরা, তাহলে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠব। ধর্মই হোক বা ভাষা, সহিহ্বয়ুতা, সহমর্মিতা আর সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই এ দেশকে এগিয়ে যেতে হবে।
১০। পল্লিসাহিত্য
রূপকথা, পল্লিগাথা, ছড়া প্রভৃতি দেশের আলো জল বাতাসের মতো সকলেরই সাধারণ সম্পত্তি। তাতে হিন্দু মুসলমান কোনো ভেদ নেই। যেমন মাতৃস্তনে সন্তান মাত্রেরই অধিকার, সেইরূপ এই পল্লিসাহিত্যে পল্লি জননীর হিন্দু মুসলমান সকল সন্তানেরই সমান অধিকার। এক বিরাট পল্লিসাহিত্য বাংলায় ছিল। তার কঙ্কাল-বিশেষ এখনও কিছু আছে, সময়ের ও বুচির পরিবর্তনে সে অনাদৃত হয়ে ধ্বংসের পথে দাঁড়িয়েছে। নেহাত সেকেলে পাড়াগেঁয়ে লোক ছাড়া সেগুলি আর কেউ আদর করে না।
উত্তরঃ
পল্লিসাহিত্য
গ্রামবাংলার রূপচিত্র বহন করে পল্লিসাহিত্য। বাংলার দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে গ্রামীণ জনপদ। এখানেই মানুষের প্রতিদিনের যাপনের প্রায় সবকয়টি উপাদানের উৎপাদন হয়। বাংলার মানুষের খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে তার পোশাক পরিচ্ছদ, গৃহ, আসবাব সবকিছুর প্রয়োজন মেটে পল্লিমানুষের নিরলস শ্রমের মধ্য দিয়ে। আবার এই মানুষেরাই নিজেদের হৃদয়ের কথা, মনের আবেগ, অনুভূতির প্রকাশ ঘটান তাঁদের স্বতোৎসারিত শিল্প-কলার মধ্য দিয়ে। নানা বৈচিত্র্যে পূর্ণ সংখ্যাতীত গল্পগাথা, ছড়া, গান, রূপকথা, ধাঁধা পল্লির স্বশিক্ষিত মানুষের অসীম সৃজনী প্রতিভার পরিচয় বহন করে। পল্লিসাহিত্য হল বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির ধাত্রী।
পল্লিসাহিত্যে ফুটে ওঠে গ্রামজীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, আচার-আচরণ, সংস্কার, লোকাচার দেশাচার, বিশ্বাস-মূল্যবোধ সহ খুঁটিনাটি সমস্তকিছু। মানুষ তার অতীত ও বর্তমান জীবনের সৌন্দর্য ও সুষমাকে পল্লিসাহিত্যের মধ্যেই আবিষ্কার করে। পল্লিসাহিত্যের পরতে পরতে রয়েছে গ্রামবাংলার অতীত গৌরব, তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, তার ইতিহাসের লেখচিত্র।
পল্লিসাহিত্যের আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হল, এগুলি একক মানুষের সৃজন নয়। গ্রামজীবনের পটভূমিকায় বহু মানুষের আবেগ-অনুভূতি লোকপরম্পরায় গল্প-ছড়া-গান প্রভৃতি নানান স্বাদের সাহিত্যের আকারে সৃজিত হয়। ফলে পল্লিবাংলার কোনো লোককথা, ছড়া প্রভৃতির স্রষ্টার কোনো হদিস মেলে না। সাহিত্যের এ এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। গতিময়তা এই সাহিত্যের প্রাণ। সাহিত্যের মূল ভাবকে অক্ষুণ্ণ রেখে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথক পৃথক মানুষের প্রতিভার স্পর্শে এই সাহিত্যগুলির পরিবর্তন ঘটে অনায়াসে। তাতে কেউ বাধা দেয়না, অনধিকারচর্চার অভিযোগে কেউ কাউকে অভিযুক্ত করে না। পরিবর্তনশীলতা ও সংরক্ষণ পল্লিসাহিত্যের অন্যতম চরিত্রলক্ষণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এভাবেই পল্লিসাহিত্য একটি জাতির জীবনভাবনার সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
পল্লিসাহিত্য নানাপ্রকারের হয়ে থাকে। ছড়া, রূপকথা, পশুকথা তো আছেই; প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা এগুলিও পল্লিসাহিত্যের আকর্ষণীয় রূপ। শিশুর মনোরঞ্জনের জন্য মা-ঠাকুমা, দাদু-ঠাকুরদারা মুখে মুখে নানাধরনের ছড়া কাটতেন। শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও সেই ছড়ায় কৌতুকরসের আড়ালে থাকত তাঁদের দীর্ঘ জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নির্যাস। অবাস্তব ও স্বপ্নিল পরিবেশের পটভূমিকায় বিভিন্ন কল্পিত চরিত্র অবলম্বনে অবিশ্বাস্য সব রোমাঞ্চকর ঘটনার সমাহারে তৈরি হয় রূপকথা। রূপকথার নায়ক প্রধানত কোনো প্রবল শক্তিশালী রাজকুমার, যে নানান বাধা বিপত্তি পেরিয়ে মনের জোর ও সাহসিকতায় ভর করে অভিষ্ট লক্ষ্যে সফল হয়। এই গল্পগুলি শিশু-কিশোরদের মনে একদিকে যেমন কল্পনার জগৎ তৈরি করে, অপরদিকে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। পশুপাখিকে কেন্দ্র করে, পশুর ওপর কখনও মানবত্ব, কখনও দেবত্ব আরোপ করে কৌতুকরস সৃষ্টির জন্য রচিত হয় পশুকথা। বহু পশুকথা শেষ হয় নীতিবাক্য দিয়ে। প্রবাদ প্রবচনগুলিতে বাইরের অর্থের ভিতর লুকিয়ে থাকে অভিপ্রেত অর্থ। সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষাকে এগুলির মাধ্যমে গ্রামের মানুষেরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন।
তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান সময়ে পল্লিবাংলার নব প্রজন্ম মানসিকভাবে শহরমুখী। শহুরে সাহিত্য, শিল্পকলার হাতছানিকে এরা এত বেশি আপন করে নিচ্ছে যে শিকড় ধীরে ধীরে নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতায় রাশ টানতে না পারলে বাংলার সাহিত্য, সংগীত বা কারুশিল্প বৈচিত্র্যহীন একপেশে হয়ে পড়বে।