প্রার্থনা
Chapter 3
১. "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত," 'যেথা' বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছে? অংশটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ২+৩
উত্তর: 'যেথা': 'যেথা' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল যেখানে। পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কবি 'নৈবেদ্য' কাব্যগ্রন্থের এই সনেটটি রচনা করেন। কবি উপলব্ধি করেছেন, এদেশ কেবল ইংরেজদের হাতে রাজনৈতিকভাবে পরাধীন নয়, এদেশের মানুষ অন্ধ কুসংস্কার, জীবনবিবর্জিত আচার-আচরণ ও শাস্ত্রীয় রীতিনীতির ভূতশাসনতন্ত্রে পিষ্ট। এই শূন্যতা থেকে ভারতবাসীর উত্তরণ চান কবি। 'যেথা' শব্দটির মধ্যে সেই উত্তরণের ইঙ্গিত আছে।
তাৎপর্য: কবিগুরুর কাছে স্বাধীনতার ব্যঞ্জনা অনেক সুদূরপ্রসারী। মানুষ যতক্ষণ না তার চেতনার দীনতা, নৈতিক অবক্ষয়, ভীরুতা, কাপুরুষতা থেকে মুক্ত হবে, ততদিন সে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবে না। কবি ভারতবর্ষের পরাধীনতাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরাধীনতা হিসাবেই দেখেননি, তিনি উপলব্ধি করেছেন এদেশের মানুষ নিয়মসর্বস্ব জড়ভরত এক ভূতশাসনতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। সে মনের দিক দিয়ে দুর্বল, ভিরু, অন্যায়ের প্রতিরোধে দ্বিধান্বিত। অবনত মস্তকে শাসকের অত্যাচার সে সহ্য করে নেয়। অতীতচারিতা আর নির্জীব আচারসর্বস্বতার বাইরে কোনো মুক্ত চিন্তা, স্বচ্ছ জ্ঞান তার নেই। কবি এই নিষ্প্রাণতা থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে চান। তিনি আকাঙ্ক্ষা করেন, তাঁর স্বদেশবাসী প্রত্যেকেই নির্ভিক চেতনার অধিকারী হয়ে, আত্মশক্তিতে উদ্বোধিত হবে, উন্নত মস্তকে অন্যায়, অত্যাচার আর শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। বিশ্বের সকল জ্ঞান আহরণ করে চেতনার বুদ্ধদ্বারকে সে উন্মুক্ত করবে।
২. "...যেথা গৃহের প্রাচীর। আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী। বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি," 'গৃহের প্রাচীর' বলতে কবি এখানে কী বুঝিয়েছেন? অংশটির মধ্য দিয়ে কবি কী বলতে চেয়েছেন? ২+৩
উত্তর: 'গৃহের প্রাচীর': 'গৃহের প্রাচীর' শব্দবন্ধের আক্ষরিক অর্থ হল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'প্রার্থনা' কবিতায় শব্দবন্ধটিকে অবশ্য রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। আমাদের চেতনার সংকীর্ণতা, ভাবনার ক্ষুদ্রতাকে গৃহের প্রাচীরের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন কবি। সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা আবদ্ধ গৃহের সঙ্গে বহির্জগতের যেমন সম্পর্ক থাকে না, আমাদের চেতনাও তেমনি জড়বৎ অতীত সংস্কার আর সংকীর্ণতার বেষ্টনিতে আবদ্ধ থাকলে বিশ্বের চলমানতাকে, চঞ্চলতাকে উপলব্ধি করতে পারবে না।
কবির মূল বক্তব্য : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নৈবেদ্য' কাব্যগ্রন্থের শেষ পর্যায়ের কবিতাগুলিতে ভারতাত্মার বিকাশ এবং স্বদেশবাসীর চেতনার উদ্বোধনের কথা বলা হয়েছে। আলোচ্য কবিতাটিতেও কবির সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। কবি তাঁর জীবনদেবতা তথা এই বিশ্বস্রষ্টার কাছে এমন এক ভারতবর্ষের জন্য প্রার্থনা করেছেন যেখানে তাঁর স্বদেশবাসী নির্ভিক, উন্নত শীর ও মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী হবে। আমাদের কঙ্কালসার অতীত আর ভূতসর্বস্ব সংস্কারের মোহে যেখানে বিশ্বের চিরচঞ্চল প্রাণপ্রবাহ স্তব্ধ হবে না, আমাদের চেতনার প্রাঙ্গণে পৃথিবীর অখণ্ডতা ধ্বংস হবে না। জগতের সমগ্রতাকে যে চৈতন্য ধারণ করতে পারবে, কবি তেমনই এক গতিশীল, প্রাণস্পন্দনে পূর্ণ ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেন।
৩. "যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে। উচ্ছ্বসিয়া উঠে...." -'বাক্য' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? অংশটির তাৎপর্য আলোচনা করো। ২+৩
উত্তরঃ 'বাক্য': মানুষের পারস্পরিক ভাববিনিময়ের মাধ্যম হল ভাষা। ভাষা হল বাক্যের সমন্বয়। রবীন্দ্রনাথ 'প্রার্থনা' কবিতার আলোচ্য অংশে 'বাক্য' বলতে মানুষের ভাষাকে বুঝিয়েছেন। মানুষ অকপট চিত্তে তার মনের কথা নির্ভয়ে ব্যক্ত করতে শিখুক, বিশ্বস্রষ্টার কাছে এমনই প্রার্থনা করেছেন কবি।
তাৎপর্যঃ এদেশে ইংরেজ শাসনের সর্বগ্রাসী চেহারায় সংক্ষুব্ধ কবি স্বদেশবাসীর দৃঢ় প্রতিরোধ প্রত্যাশা করেন। তবে সত্যদ্রষ্টা কবি উপলব্ধি করেন, গণ প্রতিরোধ তখনই সফল হবে যখন মানুষ দৃঢ়চেতা, আত্মশক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আত্মশক্তির আধার হল সততা, অকপটতা, সমমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ। মানুষ যদি নির্দ্বিধায় তার অন্তরের কথা ব্যক্ত করতে না পারে, পারস্পরিক ভাববিনিময়ের মধ্যে যদি আন্তরিকতা না থাকে তাহলে সেই ভাব, সেই বাক্য অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে স্বতোৎসারিত কথাই হল মানুষের সত্যকার পরিচয়। এদেশের মানুষ যেদিন নির্ভয়ে নিজের অন্তরের কথা প্রকাশ করতে শিখবে, কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভেদকামী শক্তির আস্ফালনের কাছে মাথা নত করবে না, সেদিনই তার আত্মশক্তির পূর্ণ প্রকাশ ঘটবে। জীবনদেবতার কাছে কবি ভারতবাসীর সেই আত্মোন্নতির প্রার্থনা করেছেন।
8. 'অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 'অজস্র সহস্রবিধ' কীভাবে চরিতার্থ হবে বলে কবি মনে করেন? ২+৩
উত্তরঃ 'অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়': একটি জাতি তখনই সুগঠিত, সুনিয়ন্ত্রিত হবে যখন বিশ্বের সকল কর্মপ্রবাহে সে নিজেকে যুক্ত করতে পারবে এবং সেই কর্মের জগতে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করবে। 'অজস্র সহস্র' শব্দবন্ধটি প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাতীতকে ইঙ্গিত করছে। পৃথিবীর প্রবহমান কর্মধারা অনির্দিষ্ট, গণতাতীত। সেই অগুণিত কর্মে ভারতবাসীর সফলতা অর্জনের কথাই প্রার্থনা' কবিতার আলোচ্য অংশে কবি বলতে চেয়েছেন।
চরিতার্থ হওয়ার উপায় : সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষের কর্মব্যস্ততা কবিকে মুগ্ধ করে। কবি দেখেছেন বিরামহীন স্রোতের মতো কর্মমুখর মানুষের স্রোত একদিক থেকে অন্য আর একদিকে বয়ে চলে 'হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।' 'চরৈবেতি' মন্ত্রে উজ্জীবিত সেই মানবস্রোতে ভারতবর্ষের মানুষকেও ভেসে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কবি। অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার কতই না আগ্রহ মানুষের। কোথাও এতটুকু স্থিরতা নেই, এতটুকু সন্তুষ্টি নেই। যে জাতি যত বেশি গতিশীল, সেই জাতি তত বেশি প্রাগ্রসর। বিশ্বস্রষ্টার কাছে কবির আকুতি, অতীতচারিতা আর নিষ্প্রাণ সংস্কারের জড়ত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ভারতবর্ষের মানুষ যেন নিজ অন্তরে গতিময় জগতের আনন্দকে উপলব্ধি করতে পারে, তারাও যেন চেতনার আবদ্ধ দ্বার মুক্ত করে পৃথিবীব্যাপী সেই কর্মযজ্ঞের হোতা হয়ে উঠতে পারে। জাতির সংখ্যাতীত বৈচিত্র্যময় স্বার্থ চরিতার্থ করতে হলে দেশ-কালের সীমা ছাড়িয়ে অসীমের পথে যাত্রা করতে হবে।
৫. "বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি-" - 'বিচারের স্রোতঃপথ' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? তা কীভাবে গ্রাস হতে পারে বলে কবি মনে করেন? ২+৩
উত্তর: 'বিচারের স্রোত': পথঃ 'প্রার্থনা' কবিতার আলোচ্য অংশে 'বিচারের স্রোতঃপথ' বলতে কবি মানুষের বিচারক্ষমতার কথা বলেছেন। মানুষ যুক্তি দিয়ে, বিজ্ঞানমনস্কতা আর ইতিহাস চেতনা দিয়ে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সুন্দর-অসুন্দর, সত্য-মিথ্যার বিচার করে ব্যক্তি ও জাতির জন্য সঠিক মার্গ নির্বাচন করে। মানুষের বিচারধারার ওপরই নির্ভর করে দেশ তথা জাতির অগ্রগতি।
গ্রাস হওয়ার ভাবনা: পথ কীভাবে গ্রাস হতে পারে সঠিক বিচারের জন্য চৈতন্যের উৎকর্ষতা প্রয়োজন। মুক্ত জ্ঞান, নির্ভিক মন, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, নিরন্তর কর্মমুখরতার মাধ্যমে চেতনার বিকাশ ঘটে। মানুষ যদি অতীতচারী হয়ে গড্ডলিকা স্রোতে ভাসতে থাকে, জীবনবিমুখ নিষ্প্রাণ কিছু শাস্ত্রীয় আচার-আচরণের মধ্যে নিজের ভাবনার জগৎকে আবদ্ধ করে রাখে তাহলে বিশ্বের চলমানতার সঙ্গে নিজেকে সে মেলাতে পারবে না কোনভাবেই। মরুভূমির শুষ্ক তপ্ত বালুরাশিতে যেমন প্রাণের বিকাশ ঘটে না, ঠিক তেমনি ধর্মের নামে জড়বৎ অনুশাসন, নির্জীব আচার-অনুষ্ঠান, বিধিনিষেধ, জীর্ণ লোকাচার, সম্প্রদায়গত বিচ্ছিন্নতাবোধে কোনো জাতি যদি বুদ্ধ হয়, তাহলে সে-ও ক্রমে 'জীবনহারা অচল অসার' জাতিতে পরিণত হবে। কবি লক্ষ করেছেন সহস্রাধিক বছরের অযৌক্তিক, বিজ্ঞানবর্জিত, শুষ্ক, প্রাণহীন শাস্ত্রীয় অনুশাসনের প্রতি আনুগত্য ভারতবাসীর 'বিচারের স্রোতঃপথ'কে গ্রাস করে রেখেছে। কবি পরমেশ্বরের কাছে এই নির্জীবতা থেকে মুক্তির প্রার্থনা জানিয়েছেন।
৬. 'পৌরুষেরে করেনি শতধা'- 'পৌরুষ' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? তা কীভাবে শতধায় বিভক্ত হতে পারে বলে কবি আশঙ্কা করেছেন? ২+৩
উত্তরঃ 'পৌরুম': 'পৌরুষ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ 'পুরুষোচিত' বোঝালেও বৃহত্তর অর্থে এই শব্দটি বলিষ্ঠতা, সাহসিকতা, পরাক্রমের মতো গুণগুলিকে চিহ্নিত করে থাকে। 'প্রার্থনা' কবিতার আলোচ্য অংশে কবি ভারতবাসীর এই সকল পুরুষোচিত গুণাবলিকেই ইঙ্গিত করেছেন। মানুষের এইসব গুণ তাকে দৃঢ়চেতা করে তোলে, তার বিচারধারাকে স্বচ্ছ করে তোলে, তাকে কর্মমুখর রাখতে সাহায্য করে।
পৌরুষের শতধা বিভক্ত হওয়া : মানুষের চেতনায় যখন যৌক্তিক উপাদানগুলি হ্রাস পেতে থাকে, যখন সে নিশ্চেষ্ট, নির্জীব হয়ে পড়ে, যখন সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দের পারম্পর্য সে খুঁজে পায় না, তখনই তার পৌরুষ শতসহস্র ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। তুচ্ছ আচার-আচরণ, অযৌক্তিক প্রথা ও রীতি নীতি দিয়ে জ্ঞান ও বিচারশক্তি যদি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তখন চরিত্রের বলিষ্ঠতা ধ্বংস হয়ে যায়। যেখানে যুক্তিবোধ ও জ্ঞান, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাসের কাছে হেরে যায়, সেখানে সাহসিকতা বা পরাক্রমের অপমৃত্যু ঘটে। কবিগুরু ভারতাত্মার উদ্বোধনের স্বপ্ন দেখেন। তিনি অনুভব করেন তাঁর স্বদেশবাসীর চেতনার জাগরণ না ঘটলে যথার্থ স্বাধীনতার আস্বাদ লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি পরমশক্তিমানের কাছে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস মুক্ত দৃঢ়চেত পৌরুষে ভরপুর ভারতবর্ষের জন্য প্রার্থনা জানিয়েছেন।
৭. "তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা,"- কাকে, কেন কবি এই অভিধায় ভূষিত করেছেন? তাঁর কাছে কবি কী প্রার্থনা করেছেন? ২+৩
উত্তরঃ 'সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা': মরমিয়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশ্বরের প্রতি গভীর আস্থাশীল ছিলেন। তাঁর মতে এই বিশ্বসংসারের মূলিভূত আধার হলেন এক পরমপুরুষ। তিনিই আমাদের চালিকাশক্তি। তাঁরই লীলাময় প্রকাশ হল মানুষ। ব্রহ্মাণ্ডের সকল চলাচল, সমস্ত বিন্যাসের মূলে আছেন তিনি। কবি তাই পরমেশ্বরকে আমাদের সমস্ত কাজ, সকল চিন্তা, সব আনন্দের নিয়ন্ত্রক বলে অভিহিত করেছেন।
কবির প্রার্থনা: সত্যদ্রষ্টা কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে স্বাধীনতার ব্যঞ্জনা সুদূরপ্রসারী। কবি শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেই তৃপ্ত নন, তাঁর কাছে স্বাধীনতা হল চেতনার স্বাধীনতা, জীবনভাবনার স্বাধীনতা, নৈতিকতার স্বাধীনতা। তিনি একদিকে যেমন পরাধীন দেশের বন্ধনমুক্তি চেয়েছেন, তেমনি স্বপ্ন দেখেছেন ভারতাত্মার উদ্বোধনের। নির্ভিক চিত্ততা, আত্মোন্নতি, আত্মনির্ভরতা, মুক্ত জ্ঞানের প্রসার এগুলি হল একটি বলিষ্ঠ জাতি গড়ে তোলার সূচক। কবি তাই পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, তিনি যেন নির্দয় হয়ে ভারতবাসীর চেতনার সব অন্ধকার দূর করেন। পৃথিবীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ সম্পদকে নির্দ্বিধায় যেন গ্রহণ করতে পারে এ দেশের প্রতিটি মানুষ, খণ্ডতার কোনো মূঢ় ধারণায় সে যেন আচ্ছন্ন না হয়। বিশ্বপিতা যেন ভারতবাসীকে সব রকমের অজ্ঞানতা, নিশ্চেষ্টতা, কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্ত করে এক বলিষ্ঠ জাতি গড়ে তোলার পথে উন্নীত করেন।
৮. "ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।।” – কবি কোন্ স্বর্গের কথা বলেছেন? কবি কীভাবে সেই স্বর্গে ভারতবর্ষকে জাগরিত করার প্রার্থনা করেছেন? ২+৩
উত্তর: কবির স্বর্গ : আমাদের চেতনায়, আমাদের সংস্কারে স্বর্গ হল সেই সর্বোন্নত স্থান যেখানে কোনো দীনতা, কোনো জীর্ণতা থাকে না, যেখানে সৎ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে, যেখানে ক্লিষ্ট চিন্তায় কোনো বিভেদ রচিত হয় না। 'প্রার্থনা' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষকে সেই স্বর্গের মতো এক পবিত্র মানবভূমি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কবির কাছে নীচতা-দীনতা-ক্ষুদ্রতা-চেতনার স্থবিরতামুক্ত পরিবেশই হল স্বর্গ।
ভারতবর্ষকে জাগরিত করার প্রার্থনা: আত্মনির্ভরতা, আত্মপ্রত্যয়, আত্মসম্মানবোধ, চেতনার ঋজুতা, নির্ভিক চিত্ততা মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি যোগায়। জীর্ণতাকে পরিত্যাগ করে প্রথা, আচারের শিকলকে ভেঙে প্রাণের আনন্দে বিশ্বের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করতে না পারলে জাতির উদ্বোধন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আপন চেতনার দ্বার বুদ্ধ করে পৃথিবীর বহমানতা থেকে মুখ ফিরিয়ে 'প্রবুদ্ধমেব সুপ্তঃ' অবস্থাকে পরম প্রাপ্তি মনে করলে সে জাতির বিনাশ সুনিশ্চিত। কবি জগৎস্রষ্টার কাছে নিশ্চেষ্টতা, নিষ্প্রাণতা মুক্ত ভারতবর্ষের জন্য প্রার্থনা করেছেন। ভারতবাসীর অন্তরের তমসা দূর করার জন্য পরমেশ্বরকে তিনি নির্দয় হওয়ারও অনুরোধ করেছেন, নির্জীব চৈতন্যের মূলে আঘাত হানতে বলেছেন। আমাদের সমস্ত কাজ, সকল চিন্তা, সব আনন্দের সারাৎসার যিনি, সেই বিশ্বস্রষ্টা যদি 'অন্ধকারের উৎস' থেকে এদেশকে উত্তরিত হওয়ার পথ দেখাতে পারেন, তাহলেই বিশ্ব সংসারে সে আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'প্রার্থনা' কবিতার মূল ভাব আলোচনা করো।
উত্তর: মূল ভাবঃ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্বে রচিত 'প্রার্থনা' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং জাতির চেতনার সামগ্রিক বিকাশের কথা বলেছেন। কবি বিশ্বাস করেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে কোনো জাতির সার্বিক বিকাশ হতে পারে না। জ্ঞানের স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা যদি না আসে; ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, মানসমৈত্রীর অভাব যদি প্রকট হতে থাকে তাহলে জাতীয় সত্তা কখনোই আলোক পথে যাত্রা করতে পারবে না।
নিরন্তর আত্মোন্নতির পথে যাত্রার মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তখন চিত্ত নির্ভিক হয়, শরীরী ভাষায় আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। বিশ্বকে খণ্ড ক্ষুদ্র ভাবে বিবেচনা না করে নিজেকে এক অখণ্ড অনন্ত বিশ্বের পথিক বলে বিশ্বাস জন্মে। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয়ের কথা উৎসারিত হয়, মুখ আর মন বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে না। বিশ্বের নিরন্তর পথপরিক্রমায় যখন কোনো জাতি অংশী হয়ে ওঠে, তখন তার সমস্ত ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতা দূর হয়। কবি বিশ্বস্রষ্টার কাছে এমনই এক বলিষ্ঠ ভারতবর্ষের প্রার্থনা করেছেন, যে ভারত জীর্ণতাকে পরিত্যাগ করে প্রথা, আচারের শিকলকে ভেঙে প্রকৃত স্বাধীনতার সন্ধান পাবে। ঈশ্বর যদি তাঁর নিজ হস্তে ভেদাভেদ, উচ্চ-নীচ, মিথ্যা আচার, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের জড়রাজত্বকে আঘাত করেন, তবেই ভারত স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে পারবে।
১০. প্রার্থনা কবিতার নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
উত্তর: নামকরণঃ যে কোনো রচনার মতোই কবিতার নামকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কেন-না নামকরণের মধ্যে কবি অভিপ্রায় ইঙ্গিতপ্রাপ্ত হয় যা পাঠককে কবিতাটি সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্বে 'নৈবেদ্য' কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটির শিরোনাম ছিল না। পরবর্তী কালে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থে 'প্রার্থনা' নামে কবিতাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেন। ততদিনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জোয়ার এসেছে, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এর পাঁচ বছর আগে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। ইংরেজদের লুণ্ঠন এবং ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বচ্ছতার অভাব অনুভব করে কবি বিশ্বস্রষ্টার কাছে এমন এক ভারতবর্ষের জন্য প্রার্থনা জানিয়েছেন যেখানে মানুষ ভয়হীন চিত্তে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার হৃদয়ের কথা বলবে নির্দ্বিধায়, উন্মুক্ত জ্ঞান ও চেতনায় ঋদ্ধ হবে সকলে। কোনো ক্ষুদ্রতা,
কোনো সংকীর্ণতা দিয়ে পৃথিবীকে খণ্ডিত করবে না, নিরন্তর কর্মপ্রবাহে দেশ-দেশান্তর ব্যাপী নিজেকে সচল রেখে দেশের স্বার্থকে সুরক্ষিত করবে। কবি বিশ্বাস করেন, চেতনার দীনতা দূর না হলে কখনোই সত্যিকারের স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব নয়। তাই পরমেশ্বরের কাছে তাঁর প্রার্থনা, তিনি যেন নিজ হস্তে চৈতন্যের বুদ্ধদ্বারে আঘাত হেনে ভারতভূমিকে স্বর্গীয় উৎকর্ষতার পথে জাগ্রত করেন।